• ঢাকা
  • রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, ৯ আশ্বিন ১৪৩০
প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২৩, ০৮:০৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ১৭, ২০২৩, ০২:০৪ পিএম

কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে…!!!

কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে…!!!

বঙ্গবন্ধু তার জীবদ্দশায় কীভাবে তার জন্মদিন পালন করেছেন তার একটি বর্ণনা তিনি উল্লেখ করেছেন তার ‘কারাগারের রোজনামচা’ স্মৃতিকথার একাংশে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আজ আমার ৪৭তম জন্মবার্ষিকী। দিনটি ছিল ১৯৬৭ সালের ১৭ মার্চ। এই দিনে ১৯২০ সালে পূর্ব বাংলার এক ছোট্ট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিন নিজে পালন করি নাই। বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটা উপহার দিয়ে থাকত। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দি আছি বলেই। আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস! দেখে হাসলাম।’

যারা তার সাহচর্যে ছিলেন তারা খুব ভালোভাবেই জানেন যে তিনি নিজের জন্মদিনের বিষয়ে কখনোই আগ্রহী ছিলেন না।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আগে যখন সেই উত্তাল মার্চের সময়ে বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ব্যস্ত সময় চলছিল, সে সময় ৩২ নম্বর ছিল দেশি-বিদেশি সব সাংবাদিক-সমেত সব মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রস্থল। বঙ্গবন্ধু নিঃশ্বাস ফেলার সময় পর্যন্ত পাচ্ছিলেন না। নেতাকর্মী, স্থানীয়-বিদেশি সাংবাদিক সব মিলিয়ে তার অতিশয় ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। এমনই এক ব্যস্ততার মধ্যে বিদেশি এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, এই পরিস্থিতিতে আপনি আপনার এবারের জন্মদিনটি কীভাবে পালন করতে যাচ্ছেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার জন্মদিন পালন করি না। যে জাতি অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটায়, কথায় কথায় গুলি করে হত্যা করা হয়, সে জাতির নেতা হিসেবে আমি জন্মদিন পালন করতে পারি না।’ গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার আবার জন্মদিন কী, মৃত্যু দিবসই-বা কী? আমার জীবনই-বা কী? আমার জনগণই আমার জীবন।’

''আমরা এমন একটি মানুষের কথা বলব যিনি ইতিহাসকে অনায়াসে নিয়ন্ত্রণ করেছেন; একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সন্ধান দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে সব অনাচার-নির্যাতন-শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি জাতিসত্তার পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন। এ অঞ্চলের মানুষ যে ভাষায় কথা বলত তা তাদের মাতৃভাষা। এ মাতৃভাষাকে তিনি আত্মপরিচয়ের ভাষায় পরিণত করার অসামান্য পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি এ জাতিকে একটি ভৌগোলিক ঠিকানা দিয়েছেন। সার্বভৌমত্বের অধিকার নিশ্চিত করেছেন।''-- আবেদ খান 

এই আমাদের জনক। সামান্যতম ক্লান্তি নেই, চেহারার মধ্যে এতটুকু বিরক্তির ছাপ নেই। অত্যন্ত শান্তভাবে তিনি নানাজনের নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন, নেতাকর্মীদের নানা ধরনের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন, আন্দোলনের ব্যাপারে জানিয়ে দিচ্ছেন তার পরিকল্পনার কথা।

আমরা ইতিহাসে অনেক রাষ্ট্রনায়কের রাষ্ট্র পরিচালনার কিংবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনেক কাহিনি শুনেছি। পাঠ করেছি অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের নানা ধরনের নির্দেশ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনবদ্য ভূমিকা সব তুলনার ঊর্ধ্বে। আমরা এমন একটা সময় নিয়ে আলোচনা করছি যে সময়টা একটি নতুন জাতির আবির্ভাবের পূর্বক্ষণ, একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নতুন শক্তির স্ফুরণের লগ্নে। পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার অচলায়তনে চূর্ণবিচূর্ণ করে নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের অসম সাহসী সন্ধিক্ষণ। ঠিক এই মুহূর্তে অত্যন্ত নির্মোহভাবে যিনি নির্ণয় করতে পারেন ইতিহাসের গতিমুখ, তাকে আমরা কোন অভিধায় অভিষিক্ত করব? তিনি তো মানুষের সাধারণ গুণাবলির আরও ঊর্ধ্বে অসাধারণ মহিমায় উদ্ভাসিত এক মহামানব।

আমরা আজ ইতিহাসের কোনো চরিত্রের বিষয় নিয়ে আলোচনা করব না। আমরা এমন একটি মানুষের কথা বলব যিনি ইতিহাসকে অনায়াসে নিয়ন্ত্রণ করেছেন; একটি জাতির আত্মপরিচয়ের সন্ধান দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে সব অনাচার-নির্যাতন-শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে একটি জাতিসত্তার পরিচয় লিপিবদ্ধ করেছেন। এ অঞ্চলের মানুষ যে ভাষায় কথা বলত তা তাদের মাতৃভাষা। এ মাতৃভাষাকে তিনি আত্মপরিচয়ের ভাষায় পরিণত করার অসামান্য পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি এ জাতিকে একটি ভৌগোলিক ঠিকানা দিয়েছেন। সার্বভৌমত্বের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। পৃথিবীর মানুষকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে এটা এমন একটি জাতিরাষ্ট্র যা কারও অনুগ্রহের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়নি। নিজস্ব শক্তিতে, নিজস্ব ক্ষমতায়, অনেক রক্ত-ঘাম এবং ত্যাগের বিনিময়ে তার নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করেছে। সমগ্র পৃথিবীতে বাঙালির সংখ্যা প্রায় ৩৫ কোটির মতো। তারা বিভিন্ন দেশের নাগরিক হতে পারে। কিন্তু তার গৌরবের বিষয়টা হলো সে নির্দ্বিধায় দাবি করতে পারে যে তার ঠিকানা বাংলাদেশ। কারণ বাঙালির একটা নির্দিষ্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা আছে, নিজের পরিচয় আছে, নিজের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য রয়েছে—যা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কীর্তিতে। তিনি এমনই একটি দেশ উপহার দিয়েছেন পৃথিবীকে, যেই পৃথিবীর প্রতিটি বাঙালি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারে—আমার একটি দেশ আছে, যে দেশের নাম বাংলাদেশ।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে দীর্ঘ সময় এ মানুষটিকে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। এ পাপ সংঘটিত হয়েছে সুদীর্ঘ কয়েক দশক ধরে। তখন এ মহামানবের নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ করার সুযোগ ছিল না। তার পরিবারের সদস্যদের ব্রাত্য হিসেবে চিত্রিত করা হতো। বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত নীতিমালা কিংবা তার অনুসৃত পথকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হতো। কিন্তু ইতিহাসের পরিক্রমায় সত্যের জয়, আদর্শের জয় সুনিশ্চিত। আর তাই বঙ্গবন্ধুও ইতিহাসের গতিধারায় বাহিত হয়ে পৃথিবীর মানুষের কাছে তার মহিমা নিয়েই ফিরে আসেন বারবার।

কিছু মানুষ থাকেন যারা ইতিহাসে উদ্ধৃত হন, কেউ আছেন যারা ইতিহাসের অংশ হয়ে যান আর এমন সামান্য কয়েকজন আছেন, যারা নিজেরাই ইতিহাসের স্রষ্টা হয়ে যান। বঙ্গবন্ধু এই শেষোক্ত পর্যায়েরই মানুষ। যাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে ইতিহাস, সৃষ্টি হয়েছে গাঙ্গেয় বদ্বীপের একটি বিশাল জাতির জন্মগাথা। এই একটি মানুষ যার কর্মজীবনের প্রতিটি স্তরে রচিত হয়েছে এক মহান মুক্তিসংগ্রামের অমর পঙ্‌ক্তিমালা। বাঙালির হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে কখনো তার আত্মপরিচয়ের সন্ধান ছিল না, কখনো তার আত্মপরিচয়ের ইতিহাস ছিল না। এই মহান মানুষটি এই জাতির অপ্রাপ্তির যাতনার অবসান ঘটিয়েছেন। এখন বাঙালি জাতির একটা ঠিকানা আছে, একটা জাতীয় সংগীত আছে, একটা পতাকা আছে, একটা স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ড আছে। এসব কিছুর পেছনে যার অখণ্ড অবদান আছে, তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিশ্বনন্দিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আজ থেকে সাতচল্লিশ বছর আগে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে সপরিবারে হত্যা করে ভেবেছিল বাংলাদেশের হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, যতই সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে ততই তিনি অধিকতর ঔজ্জ্বল্য নিয়ে পরিব্যাপ্ত হচ্ছেন। তার দেশপ্রেম, তার দূরদর্শিতা, তার জাদুকরী সাংগঠনিক ক্ষমতা, তার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এখনো একইভাবে সবাইকে সম্মোহিত করে চলেছে।

বঙ্গবন্ধু যে কতখানি সাহসী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছিলেন তার অসংখ্য উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে এখানে একটি ঘটনার কথা বলব; যা হয়তো অনেকেই জানেন। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তেও সেই শৈশব থেকে রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ের আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু আমি যে ঘটনার কথা বলতে চলেছি সেটাকে শুধু সাহসী বললেও কম বলা হবে। রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো।

ঘটনাটির সময়কাল ষাটের দশকের শেষার্ধ। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তিসনদ হিসেবে ছয় দফা পেশ করেছেন এবং সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন মুক্তিসনদের পতাকা নিয়ে। ক্ষমতায় তখন পাকিস্তানের স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। তিনি তখন আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য সবরকম দমননীতির কৌশল প্রয়োগ করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুকে বারবার মামলা দিয়ে, বন্দি করে নাস্তানাবুদ করা হচ্ছে, কারাগারে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে মাঝারি সমর্থক পর্যন্ত সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের হয়রানি। অবশেষে সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করা হলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা। সামরিক আইনে গ্রেপ্তার করা হলো বঙ্গবন্ধুকে, গ্রেপ্তার করা হলো সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে, কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বেশ কয়েকজন নিষ্ঠাবান ব্যক্তিকেও। সামরিক আদালতে শুরু হলো কুখ্যাত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। বিচারক্ষেত্র ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট। প্রতিটি অভিযুক্তকে অমানুষিক এবং লোমহর্ষক নির্যাতন করা হয়েছে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য। উদ্দেশ্য শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহী চিহ্নিত করে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া যে, পাকিস্তান ভাঙার চেষ্টা যেই করবে তাকেই ঝুলতে হবে ফাঁসির দড়িতে। আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার নিশ্চিত ধারণা ছিল শেখ মুজিবের ছয় দফার অর্থ বাংলাদেশের স্বাধীনতা। অতএব, যেভাবেই হোক বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিতে হবে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করে হলেও রক্ষা করতে হবে পাকিস্তানকে। সামরিক আদালতে বিচার শুরু হলো। সরকারি নির্দেশ, পত্রিকা প্রকাশের সময় এমন একটি শব্দও লেখা যাবে না বা আকারে ইঙ্গিতে এমন ভাব প্রকাশ করা যাবে না বা কৌশলে এমন ধারণাও দেওয়া যাবে না যা থেকে মনে হতে পারে অভিযুক্তদের প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলায় আসামিদের নির্ধারিত পরিণতিই হচ্ছে ফাঁসির কাঠগড়া। বিচারকের আসনে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা যারা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত যে কী রায় দিতে হবে।

সাক্ষী আর আসামিদের আনা হলো সামরিক এজলাসে। মুহূর্তেই ঘটে গেল নাটকীয় ঘটনা। যেসব আসামিকে রাজসাক্ষী বানানো হয়েছিল তারা একে একে আদালতে বলতে শুরু করলেন তাদের ওপর কী ধরনের অমানুষিক নির্যাতন হয়েছে রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য। হতচকিত সামরিক আদালত একের পর এক রাজসাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করতে শুরু করল। মামলার এক নম্বর আসামি শেখ মুজিবকে কাঠগড়ায় একটা কাঠের চেয়ার দেওয়া হয়েছিল বসার জন্য। অনতিদূরে প্রেস বক্স। সেখানে ‘দৈনিক আজাদ’-এর রিপোর্টার হিসেবে উপস্থিত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ। সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ, কোনোভাবেই আসামিদের সঙ্গে সাংবাদিকরা কথা বলতে পারবে না। তেমনটি ঘটলে কঠোর শাস্তি। শেখ মুজিব সামরিক আদালতের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হাস্যপরিহাসরত মুঠোবন্দি তার বিখ্যাত পাইপ। এমন সময় তার চোখ পড়ল তারই অত্যন্ত প্রিয়ভাজন সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের দিকে। তিনি উচ্চৈঃস্বরে ডাকলেন, ‘ফয়েজ, এই ফয়েজ।’ ফয়েজ আহমদ সামরিক নির্দেশনামা মেনে ঘাড় নিচু করে আসনে বসে রইলেন। সামরিক আদালতের বাঘা বাঘা কর্মকর্তার কুঞ্চিত ভ্রু। দু-তিনবার ফয়েজ আহমদকে ডাকলেন তিনি। হঠাৎ যেন গোটা সামরিক এজলাস এক বজ্রকণ্ঠে প্রকম্পিত হলো। সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল মেঘমন্দ্র গর্জনে।

‘কি রে ফয়েজ, কথা ক’স না কেন? শোন, আমার বাংলাদেশে থাকতে হলে শেখ মুজিবের কথা শুনতে হবে।’ থতমত খেয়ে বিপর্যস্ত এজলাস। বিহ্বল দৃষ্টিতে বসে বিচারকরা। সেদিনের মতো বন্ধ হয়ে গেল মামলার কার্যক্রম। এই হলেন আমাদের সাহসী নেতা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার রাজনৈতিক দর্শনে পরমতসহিষ্ণুতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় ও মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন এ সাধারণ মানুষের কাছে। রাজনৈতিক শিষ্টাচার প্রতিষ্ঠায় তিনি বিরোধী পক্ষের মতপ্রকাশের অধিকারকেও সবসময় সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি তার শত্রুকেও শ্রদ্ধা করতেন এবং তার মতপ্রকাশের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। ধর্ম-গোত্র-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তার জীবনের মূল মন্ত্র এবং আদর্শ। সারা জীবন তিনি মানুষকে ভালোবেসেছেন। মানুষকে ভালোবেসে তার সমগ্র জীবন উজাড় করে দিয়েছেন। কী পরিমাণ ভালোবাসতেন মানুষকে বোঝা যায় তার এই কথায়—‘আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি, সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমি তাদের খুব বেশি ভালোবাসি।’

আজ মনে পড়ে তিনি বলেছিলেন, ‘রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করব!’ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘দেশ থেকে সর্বপ্রকার অন্যায়, অবিচার ও শোষণ উচ্ছেদ করার জন্য দরকার হলে আমি আমার জীবন উৎসর্গ করব।’ জীবন দিয়ে, রক্ত দিয়েই মানুষের ভালোবাসার ঋণ তিনি শোধ করেছিলেন। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই দেশি-বিদেশি চক্রান্তের রোষে তাকে জীবন দিতে হয়। পরবর্তীকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সরকারগুলোর ভূমিকা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোর কার্যক্রম থেকে আজ আমরা অনায়াসে বুঝে নিতে পারি—বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী নষ্ট রাজনীতির প্রবর্তন, লালন, পরিচর্যার পেছনে কারা অদ্যাবধি সক্রিয়। আমরা এখনো দেখি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ মানুষের বিরুদ্ধে অব্যাহত ষড়যন্ত্রের মধ্যেও এ দেশের মানুষ চালিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নের অভিযাত্রা।

আমরা আজ সেই সময় পেরিয়ে এসেছি। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাদের এই নিগড় থেকে মুক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর মতোই একইভাবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী অপশক্তির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা।

আজ এই মহামানবের ১০৩তম জন্মবার্ষিকীতে তাকে গভীর শ্রদ্ধারভরে স্মরণ করছি।

জয় বাংলা।

 

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক জাগরণ এবং প্রধান সম্পাদক, দৈনিক কালবেলা