• ঢাকা
  • রবিবার, ২৩ জুন, ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৩, ০১:২৩ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ২৮, ২০২৩, ০১:২৩ পিএম

কল্পলোকের গল্প

কৃষ্ণনগরের আকাশে কৃষ্ণমেঘের ছায়া

কৃষ্ণনগরের আকাশে কৃষ্ণমেঘের ছায়া
অলংকরণ : আবু হাসান

রাজদরবারের বিশাল ফটকে পা রাখার আগেই গোপাল ভাঁড় একটু থমকাইয়া দাঁড়াইল। দরবার কক্ষে যেন গুঞ্জন শোনা যাইতেছে। মনে হয় পাঠশালা চলিতেছে—অনেক ছাত্রছাত্রী যেমন করিয়া পাঠাভ্যাস করে, ঠিক সেই রকম গুনগুন ধ্বনি—মাঝেমধ্যে টেবিলের ওপর ছড়ির বাড়ির শব্দও শোনা যাইতেছে।

কৌতূহল নিবৃত করিতে না পারিয়া গোপাল একরকম দৌড়াইতে দৌড়াইতে রাজদরবারে প্রবেশ করিয়া দেখিল—বিজ্ঞানী, সভাকবি এবং সেনাপতি ছাড়া সবাই ছড়া পড়ার মতো করিয়া পড়া পড়িতেছে আর মন্ত্রী হাতে ছড়ি লইয়া কখনো কখনো বেঞ্চে সপাৎ সপাৎ করিয়া বাড়ি মারিতেছে। গোপাল দরবার পক্ষে প্রবেশ করা মাত্র মন্ত্রী রুষ্ট কণ্ঠে বলিল—

মন্ত্রী: একি গোপাল, তুমি এত দেরি করে এলে কেন? জানো না যে কৃষ্ণনগরে নির্বাচন নিয়ে কত কাজকর্ম হচ্ছে আর মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র এ নিয়ে সবাইকে পড়াশোনা করতে বলেছেন?

গোপাল: আমি জানতেই পারলাম না মহারাজ কবে এই নির্দেশ দিলেন, এ এক আশ্চর্যের ব্যাপার তো!

মহারাজ তো সবসময় দরবারে বসেই সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কবে এই সিদ্ধান্ত মহারাজ নিলেন এবং আমরা জানলামই না, বুঝতে পারছি না কিছুই—

মন্ত্রী: দেখো গোপাল, তোমার কেন মনে হচ্ছে যে, তোমার সবকিছুই জানতে হবে। তুমি তো মূর্খ মানুষ, পড়াশোনার ব্যাপারটি তো তোমার সঙ্গে যায় না। তাই হয়তো মহারাজ তোমাকে জানাতে বিশেষ উৎসাহ দেখাননি। আর তা ছাড়া বিদেশি সাহেবদের খুশি করতেই তো এই নূতন ব্যবস্থা কৃষ্ণনগরে চালু করতে হয়েছে। এ নিয়ে আমাকে যে কত পরিশ্রম করতে হচ্ছে, তা তো আর তুমি বুঝবে না। যাকগে, বাদ দাও ওসব কথা। তবে শোনো একটা কথা, তোমায় বলে রাখি। মহারাজ কিন্তু এই নির্বাচনের ব্যাপারে আমাকে পুরোপুরি দায়িত্ব দিয়েছেন। এখানে তুমি কিন্তু একদম নাক গলাবে না, বলে দিলাম।

গোপাল: না না, আমি নাক গলাতে যাবই বা কেন? আমি কি আর অতশত বুঝি? আমার শুধু একটাই চিন্তা, দেশের যেন কারও ক্ষতি না হয় আর মহারাজ-মহারানির কোনো অসুবিধা না হয়।

মন্ত্রী (অধৈর্য হয়ে): থাক থাক, গোপাল তোমার আর অত ন্যাকামি করতে হবে না। আমি হলাম এই রাজ্যের মন্ত্রী। মহারাজের পরেই আমার স্থান। মহারাজের শরীরটা একটু খারাপ বলেই আমাকে এত কিছু সামলাতে হচ্ছে। তুমি এখন যাও গোপাল। কাজের সময় ঝামেলা করো না।

গোপাল: আমি যাব? কোথায় যাব? আমি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে একজন সদস্য হিসেবে এসেছি। আমি তো তারই কর্মচারী। আমি কেন যাব? গোপালের কথা শেষ হইতে না হইতেই দ্বাররক্ষী মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আগমন বার্তা ঘোষণা করিল। মহারাজ সিংহাসনে উপবেশন করিয়া সকলের সহিত কুশল বিনিময় করিয়া মন্ত্রীর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন।

মহারাজ: কী মন্ত্রী, আজ আলোচনার বিষয় ঠিক আছে?

মন্ত্রী: আজ্ঞে মহারাজ, আমরা সবাই পড়াশোনা করছি।

মহারাজ: পড়াশোনা? কী পড়াশোনা করবে, যে জিনিস নিয়ে তোমাদের কারও ধারণাই নেই, সেটা নিয়ে আবার কী পড়াশোনা?

রাজপণ্ডিত: না না। মন্ত্রী মশাই বললেন কি না, যে নির্বাচন একটা পড়াশোনার বিষয় আর এই নিয়ে অনেক কাজ করার আছে। তাই আমি একটা বিশ্লেষণ করছিলাম। এই বিশ্লেষণ আমি কোন ভাষায় ব্যাখ্যা দিব তাই ভাবছিলাম, মহারাজ। মহারাজ যদি চান তবে আমি...

মহারাজ: না না পণ্ডিত। তুমি বাংলা ভাষাতেই বলো।

রাজপণ্ডিত: শব্দটা হচ্ছে নির্বাচন, নির+বাচন। ‘নির’ শব্দের অর্থ জল আর ‘বাচন’ মানে, ‘বাচন’ মানে—ওই যে কী বলে বাচনভঙ্গির বাচন মানে কথা। অর্থাৎ যা শুনলে চোখ অশ্রু-জলে ভাসে, তাকেই বলে নির্বাচন।

মহারাজ: না না রাজপণ্ডিত, তুমি যা ব্যাখ্যা দিলে তাতে তো ওই জিনিস নিয়ে বেশি দূর এগোনো ঠিক হবে না। আমি তো কৃষ্ণনগরে এমন কিছু আনতেই চাই না, যা আমার প্রজাদের মনে কষ্ট দেবে।

মন্ত্রী: না মহারাজ, রাজপণ্ডিত যে ব্যাখ্যা দিলেন সেটা কিন্তু একেবারেই সঠিক নয়, আমাকে যেভাবে বুঝিয়েছেন সেটা কিন্তু একেবারে অন্য জিনিস।

মহারাজ: অন্য জিনিস মানে?

মন্ত্রী: অন্য জিনিস মানে ওই যে সিংহাসনটা আছে না, ওই জায়গায় কে বসবে তার জন্য নির্বাচন। বিদেশিরা বলেছে, রাজার ছেলে রাজা হবে—এই নিয়মটা আর কৃষ্ণনগরে চলবে না। প্রজারা ভোট দিয়ে জানাবে আসলে তারা কাকে ওই সিংহাসনে বসাতে চায়। মহারাজ, বিদেশি সাহেবরা আমাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে, ছলে-বলে-কৌশলে তারা আপনাকে ওই সিংহাসন ছাড়া করবেই। সে ক্ষেত্রে আপনি যদি অনুগ্রহ করে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে আমার হাতে ক্ষমতাটা দিয়ে দেন, তাহলে কৃষ্ণনগরের নিরীহ প্রজাদের একটু স্বস্তি হয়।

মন্ত্রীর এই প্রত্যাশিত বক্তব্যে রাজদরবারের সদস্যরা স্তম্ভিত হইয়া পড়িল। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কিয়ৎকাল বাক্যহারা হইলেন। অতঃপর, অস্ফুট কণ্ঠে বলিলেন,

তার মানে?

গোপাল ভাঁড় এবার করজোড়ে বলিল,

—রাজন, আমি তো একজন শিক্ষাদীক্ষাহীন নরসুন্দর মাত্র।

তবে আমার ক্ষুদ্রবুদ্ধিতে যতটুকু বুঝি, কৃষ্ণনগরের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির ওপর এই উর্বর অঞ্চলের লোভী বিদেশিদের কুদৃষ্টি পড়েছে। আর এই বিদেশি সাহেবদের গোপনে সাহায্য করছে এই কৃষ্ণনগরেরই খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

মন্ত্রী: খবরদার গোপাল, আমি কিন্তু এর সঙ্গে একদম জড়িত নই। আমার কথা কিন্তু এখানে কিছুতেই উচ্চারণ করবে না।

গোপাল: আমি কি কারও কথা বলেছি, মহারাজ! এত সেই ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি তো কলা খাইনি কাহিনির মতো হলো না?

রাজ জ্যোতিষী: আমি গণনা করে দেখেছি, কৃষ্ণনগরের আকাশে কালো মেঘ জমেছে। ঘোর অমাবস্যায় অন্ধকার হয়ে গেছে চারদিক।

রাজকবি: মহারাজ, আমার একটা কবিতা মাথায় এসেছে, বলব?

মহারাজ: আরেকদিন হবে কবি। তোমার কবিতা আমরা সবাই শুনব সময়মতো। আজ আর কিছুই ভালো লাগছে না। আজকের মতো সভা শেষ। আবার পরে হবে এ নিয়ে কথাবার্তা।

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ ও প্রধান সম্পাদক, দৈনিক কালবেলা