• ঢাকা
  • রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ১৩ ফাল্গুন ১৪৩০
প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৩, ০৬:৪২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ১১, ২০২৩, ১২:৪৫ এএম

নবাবের খাস পেয়াদা

নবাবের খাস পেয়াদা
অলংকরণ : আবু হাসান

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র দরবারে বসিয়া অস্থিরভাবে অপেক্ষা করিতেছেন গোপালের জন্য। কিন্তু যথারীতি গোপাল তখনো অনুপস্থিত। মন্ত্রী মহারাজকে লক্ষ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে বলিল— দেখলেন মহারাজ, গোপালের কোনো পাত্তাই নেই! ও আপনার জারি করা কোনো নিয়মই মানবে না। আইনের কোনো পরোয়াও করে না, নিজের খুশিমতো চলে, যখন খুশি আসে, বেশিরভাগ সময় আসেই না। এভাবে চললে তো দরবারের কোনো শৃঙ্খলাই থাকবে না। মহারাজ, আপনার আশকারা পেয়ে তো সে রীতিমতো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আপনি তাকে সামলান, মহারাজ। এমন শাস্তি দিন যাতে সে কখনো রাজসভার অসম্মান না করতে পারে।

—মন্ত্রীর ক্রমাগত বিষোদগারে মহারাজ অধীর হইয়া উঠলেন।

—আহা থামো তো, থামো। গোপালের নামে তোমারও তো যে পরিমাণ গায়ে জ্বালা ধরে, তাতেও তো আমার পিত্তি জ্বলে যায়।

—মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কথা শেষ হইতে না হইতেই দরবারে আগমন ঘটিল গোপাল ভাঁড়ের। সে প্রণাম জানাইয়া আসনে উপবেশন করার সময় মন্ত্রী শ্লেষের সঙ্গে বলিল,

—তা গোপাল, তোমার শেষ পর্যন্ত ঘুম ভাঙল? এদিকে তো আমাদের মহারাজের ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে তোমাকে নিয়ে। তুমি কি বেঁচে আছো না টেঁসে গেছো সেই দুশ্চিন্তায় মহারাজ খুব মুষড়ে পড়েছেন।

গোপাল : বালাই ষাট! শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে আমি তো দিব্যি ভালোই আছি মহারাজ। তবে আমার পথে দেখা হলো মুর্শিদাবাদের নবাবের এক পেয়াদার সঙ্গে। সে আমার কাছে মন্ত্রী মশাইয়ের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছিল। সে জানতে চেয়েছিল, মন্ত্রী মশাই কখন দরবারে আসেন, যান, কোন পথ দিয়ে চলাফেরা করেন—এইসব খবর।

মন্ত্রী : বলো কী গোপাল, আমার ব্যাপারে এত খোঁজখবর তো কোনো সুখের খবর বলে মনে হচ্ছে না। আর যে পেয়াদার কথা তুমি বললে, তাকে তুমি চেনো? কী খবর দিয়েছ তাকে? মহারাজ, এ তো ভয়ংকর কথা! আমার তো বাসায় থাকা, দরবারে আসা-যাওয়া খুব বিপজ্জনক হয়ে যাবে দেখছি। এখন আমি কী করব, কোথায় থাকব, গোপাল! কী সব্বেনেশে খবর বললে তুমি?

..............‘’..............
মহারাজ, আমি কয়েক দিন ধরে অনেক নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম, বিলাতে এই ধরনের একটা ব্যবস্থা রয়েছে বটে, তবে এই অঞ্চলে বিষয়টি নিয়ে কারও কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই, কেউ কিছু জানেও না। তবে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের এই পুণ্যভূমিতে যদি এই উদ্যোগ নেওয়া যায় আর তা যদি খুব সৎভাবে ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে এই কৃষ্ণনগরই ভারতে একটা অসাধারণ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে, মহারাজ।
..............‘’..............

গোপাল : এত উতলা হবেন না মন্ত্রী মশাই। আমাকে আপনি যত গালমন্দই করুন না কেন, আমি কিন্তু আপনার কিংবা কারও ক্ষতি করার মতো কিছু করি না কখনো। এমনও কিছু করি না যাতে মহারাজের কিংবা কৃষ্ণনগরের কোনো অকল্যাণ হয়।

মহারাজ : তাহলে তুমি তাকে, মানে সেই পেয়াদাকে কীভাবে সামলালে?

গোপাল : কথার প্যাঁচে ফেলে বেটার পেটের সব গোপন কথা বের করে নিলাম মহারাজ।—

বলিতে বলিতে গোপাল মুচকি হাসিয়া মন্ত্রীর দিকে তাকাইল। তারপর কিছু বলা শুরু করার আগেই মন্ত্রীর উদ্বিগ্ন জিজ্ঞাসা—

মন্ত্রী : তুমি আমার দিকে ওভাবে তাকালে কেন গোপাল? কী বলতে চাও তুমি? তুমি কি বলতে চাও যে, ওই পেয়াদার ব্যাপারটা আমি জানি?

গোপাল : অ্যাই দেখেন মহারাজ। ঠিক সেই ‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি তো কলা খাইনি’ গোছের কথাই হলো! আমি তো কিছুই বলিনি ধর্মাবতার, আমি শুধু বলেছি পেয়াদার পেটের কথা আমি বের করে ফেলেছি—এখানে মন্ত্রী কেন বিচলিত হয়ে পড়লেন কিছুই বুঝলাম না।—

মহারাজ : আহ গোপাল, মন্ত্রী, বন্ধ করো তো তোমাদের সেই একঘেয়ে ঝগড়া! বলো গোপাল, কেন ওই পেয়াদা মুর্শিদাবাদ থেকে এই কৃষ্ণনগর পর্যন্ত এলো, আর এলো কি না সে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য কিন্তু দেখাটা হয়ে গেল তোমার সঙ্গে! সব মিলিয়ে ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে লাগছে আমার কাছে। আচ্ছা বলো এখন, কেন এসেছিল ওই পেয়াদা আর কেন খোঁজ করছিল মন্ত্রীকে? সবকিছু সবার সামনে খুলে বলো।

গোপাল : মুর্শিদাবাদের নবাব তার এই খাস পেয়াদাকে আমাদের মন্ত্রী মশাইয়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরে যে নির্বাচন হবে সামনে তাতে কে কে দাঁড়াবে মন্ত্রীর পক্ষে—তারই একটা তালিকা বানানোর জন্য। যদি নির্বাচন হয়, তাহলে মন্ত্রীর পক্ষের কাকে কোন পদে বসানো হবে—তারই একটা গোপন শলাপরামর্শ করার জন্য নবাব বাহাদুর মন্ত্রী মশাইকে আজ মাঝরাতেই মুর্শিদাবাদে যাওয়ার কথা বলেছিলেন।

মন্ত্রী : না, না আমি তো এর কানাকড়ি কিছুই জানি না। গোপাল, তুমি তো এভাবে আমাকে মিথ্যে অভিযোগে দায়ী করতে পারো না।

গোপাল : কী মুশকিল, আমি তো বলিনি যে আপনি জানেন। মুর্শিদাবাদের ওই পেয়াদা আপনার কাছে আসতে চেয়েছিল নবাবের নির্দেশনাক্রমে। যদি আপনার সঙ্গে নবাব বাহাদুরের এই নির্বাচন নিয়ে কোনো গোপন কথাবার্তা আগে কখনো হয়েই থাকে, তো সেটা জানবেন স্বয়ং নবাব বাহাদুর এবং আপনি। এ নিয়ে তো আমি কিছুই জানি না। মন্ত্রী মশাই আমার ওপর কেন অহেতুক চটে যাচ্ছেন আমি তো বুঝতেই পারছি না।

মহারাজ : তোমরা থামবে একটু! রাজসভায় এসে বসতে না বসতেই যদি তোমরা এরকম হট্টগোল শুরু করো, তাহলে তো আসল সমস্যার সমাধানই হবে না। দেখো, মুর্শিদাবাদের নবাব হয়তো দিল্লির বাদশাহের হুকুম মানার জন্যই ওই পেয়াদাকে পাঠিয়েছেন। এখন সবাই মিলে চিন্তাভাবনা করতে হবে আসলে আমাদের কোন পথে এগোনো উচিত।

এবার দরবারের প্রবীণ সদস্য রাজবিজ্ঞানী উঠিয়া দাঁড়াইলেন। অত্যন্ত বিনীতভাবে বলিলেন,

বিজ্ঞানী : মহারাজ, আমি কয়েক দিন ধরে অনেক নথিপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম, বিলাতে এই ধরনের একটা ব্যবস্থা রয়েছে বটে, তবে এই অঞ্চলে বিষয়টি নিয়ে কারও কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই, কেউ কিছু জানেও না। তবে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের এই পুণ্যভূমিতে যদি এই উদ্যোগ নেওয়া যায় আর তা যদি খুব সৎভাবে ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে এই কৃষ্ণনগরই ভারতে একটা অসাধারণ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে, মহারাজ।

রাজকবি : সাধু, সাধু। আমি এ নিয়ে একটা কবিতা লিখে ফেলেছি মহারাজ। যদি অভয় দেন, তবে পড়ব।

মহারাজ : শুনব আর একদিন। আজ আমার সবকিছু বড় গোলমেলে মনে হচ্ছে। আজকের মতো সবার কাজ শেষ হোক। পরের দিন এ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।

 

লেখক : সম্পাদক দৈনিক  জাগরণ এবং প্রধান সম্পাদক, দৈনিক কালবেলা