• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২১, ০৯:০৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ২৭, ২০২১, ০২:০৮ পিএম

দুই ভাইয়ের সাক্ষাতে শান্তির বার্তা আসবে?

দুই ভাইয়ের সাক্ষাতে শান্তির বার্তা আসবে?

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সহসা শান্তি ফিরে আসছে না। একদিকে আবদুল কাদের মির্জা ও তার অনুসারীদের অবস্থান আর অন্যদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় অনড় অবস্থানে রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু উভয় পক্ষের অনড় অবস্থানের ফলে যে কোনো সময় সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। আবদুল কাদের মির্জা ও তার অনুসারী নেতাকর্মী এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে আলাপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ও বসুরহাট পৌরসভা দেশের রাজৗনতিক অঙ্গনে এক আলোচিত ও সমালোচিত নাম। চলতি বছরের শুরুর দিকে পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে ক্ষমতাশীল দল থেকে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে  দেশের নির্বাচনের বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে ঝড় তোলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক এবং সেতুমন্ত্রীর ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা।

তিনি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ধুয়া তুলে দেশের রাজনৈতিক মহলে সাড়া ফেলে দেন। তাছাড়া নিজের নির্বচনী প্রচারণার সময় প্রশাসনের কাছে নিজ পৌরসভার নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করারও দাবি জানান। নির্বাচনের সময় তার বিভিন্ন বক্তব্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে গেলে দেশব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে।

নির্বচনী বৈতরণী পার হওয়ার পরও তিনি দল, সাংসদ, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, নির্বাচনী ব্যবস্থা, প্রশাসনের বিভিন্ন পদের আমলাদের সমালোচনা, সবশেষে বড় ভাই দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং তার সহধর্মিনী ইসরাতুন্নেছারও সমালোচনাও করেন তিনি।

বৃহত্তর নোয়াখালীর কয়েকজন সাংসদের সমালোচনা দিয়ে শুরু আবদুল কাদের মির্জার। সেই থেকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনার জন্ম দেওয়া বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা এখনো ঘুরে ফিরে আসছেন আলোচনায়। গণমাধ্যমে হরহামেশাই আলোচিত সমালোচিত মেয়রকে নিয়ে এখনো শিরোনাম হচ্ছে। কথিত সত্যবচনের নামে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, আমলা, দলের স্থানীয় নেতাকর্মী, প্রশাসনের বিভিন্ন পদের ব্যক্তিদের সমালোচনা, দল থেকে ঘর কোনটাই বাদ যায়নি তার তোপ থেকে। একের পর এক তীর্যক বক্তব্য ও সমালোচনা করে যেমন তিনি আলোচিত সমালোচিত হয়েছেন ঠিক তেমনি দলকেও ফেলেছেন বিব্রতকর অবস্থায়।

কাদের মির্জা যখন তার ভাই ওবায়দুল কাদের ও তার সহধর্মীনি এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নেতাকর্মীদের নিয়ে বিষাদগার শুরু করেন তখন উপজেলা আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের নেতৃত্বে এক পক্ষ কাদের মির্জার কথিত সত্য বচনের বিরোধিতা করে মাঠে নামেন। এমন পরিস্থিতিতে পুরো কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিভাজিত রূপ প্রকাশ পায়। তার বক্তব্যের কারণে উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে একসময় কাদের মির্জা যাদের নিয়ে রাজনীতি করতেন তারাও হয়ে যান তার কড়া সমালোচক। বাকযুদ্ধ রূপ নেয় সরাসরি চরম সংঘাতে। সংঘাত, সংঘর্ষ, হামলা ,পাল্টা হামলা, পাল্টাপাল্টি বিভিন্ন কর্মসূচিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কোম্পানীগঞ্জ ও বসুরহাট পৌরসভা। ফলে সেই সংঘর্ষ ও সংঘাতের বলি হন স্থানীয় তরুণ সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির ও শ্রমিক লীগ নেতা আলাউদ্দিন। টনক নড়ে প্রশাসনের। তারা জনগণের জান-মাল, সরকারি সম্পদ রক্ষার করার জন্য কঠোর অবস্থান নেন। কয়েকবার ১৪৪ ধারা জারি করেন। পুলিশ প্রশাসন জেলার বাহিরে থেকেও পুলিশ আনতে বাধ্য হন। পাশাপাশি র‌্যাব ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) মোতায়েন করতে হয়। এসবের মধ্যেও কাদের মির্জা ফেসবুকে তার কথিত সত্য বচনের নামে উস্কানিমূলক বক্তব্য ও পোস্ট অব্যাহত রাখেন। এক সময় উপজেলা কমিটিতে যারা কাদের মির্জার সমর্থক ছিলেন তারাও দূরে সরে যান।

অন্যদিকে, তার প্রতিপক্ষ কাদের মির্জাকে ত্যাগ করা নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করে মাঠে নামে। তারা ওবায়দুল কাদেরকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠে কাদের মির্জার বিভিন্ন কর্মসূচির বিপরীতে কর্মসূচি দিতে থাকে। ফলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় একটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী আহত হচ্ছে, গুলি হচ্ছে, ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটছে। এমনকি সেতুমন্ত্রীর বাড়ি, তার বড় বোনের বাড়ি কোনটাই গুলি ও ককটেল থেকে রক্ষা পায়নি। এমন অবস্থায় কেন্দ্রীয় আ. লীগ দুপক্ষকে ঢাকায় ডেকে পাঠান। গত এপ্রিল মাসে উপজেলা আ. লীগের বড় অংশ ঢাকায় গিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আল মাহমুদ স্বপনের সঙ্গে সাক্ষাত করে কাদের মির্জার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে এসেছেন।    

গত ১৪ মে শুক্রবার কাদের মির্জা সাংগঠনিক সম্পাদক আল মাহমুদ স্বপনের সঙ্গে দেখা করে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তার পরদিন শনিবার তিনি তার বড় ভাই ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করেছেন। ওই সাক্ষাতের পর কোম্পানীগঞ্জ আ. লীগের রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। শুরু হয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণ।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সম্প্রতি আবদুল কাদের মির্জা ও ওবায়দুল কাদেরের মধ্যে সমঝোতার পর এর কোনো প্রভাব পড়বে কী না? এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ. লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, কাদের মির্জার প্রধান প্রতিপক্ষ মিজানুর রহমান বাদল বলেন, সমঝোতা বা মিলন তাদের পারিবারিক বিষয়। উপজেলা আওয়ামী লীগ কোনো ভাবেই আবদুল কাদের মির্জার নেতৃত্ব মেনে নেবে না, কাজ করবে না। আমরা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ। কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমাদেরকে বলেছেন, কোম্পানীগঞ্জে দলকে সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করতে, আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি।

উপজেলা আ. লীগ সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত ওবায়দুল কাদের ও আবদুল কাদের মির্জার দেখা-সাক্ষাতকে তাদের পারিবারিক বিষয় বলে উল্লেখ করে বলেন, এই সাক্ষাত কোম্পানীগঞ্জের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে না। কাদের মির্জাকে বাদ দিয়ে এখানকার আ. লীগ শতভাগ ঐক্যবদ্ধ। কাদের মির্জার সঙ্গে কেউ নেই।

উপজেলা আ. লীগের সদস্য এবং ওবায়দুল কাদের ও মির্জা কাদেরের ভাগনে মাহবুবুর রশিদ মঞ্জু বলেন, কাদের মির্জা গত ৫ মাস ধরে তার বড় ভাই, ভাবীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে যে বিষাদগার করেছেন, কুরুচিপূর্ণ আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন ঈদের সময় পারিবারিকভাবে দেখা করে তার জন্য ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, তিনি আর এসব বলবেন না।

তিনি আরও বলেন, আমরা যতটুকু জানি এবং মন্ত্রী মহোদয় আমাদেরকে জানিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ আ. লীগের রাজনীতি স্বাভাবিক গতিতে চলবে। এই গতির সঙ্গে মন্ত্রী মহোদয় আছেন। উপজেলা আ. লীগের মূলধারা কাদের মির্জার সঙ্গে নেই। মন্ত্রী মহোদয় তাকে চিকিৎসার জন্য বলেছেন। আর যদি দাঙ্গা-হাঙ্গামায় সে জড়িত হয় তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।

অন্যদিকে কাদের মির্জা বলয়ের নেতা, উপজেলা আ. লীগের সহ-সভাপতি হাসান ইমাম বাদল বলেন, ওবায়দুল কাদের সাহেব এ আসন থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বচিত হয়েছেন। উনি ঢাকায় থাকেন, মাঠের রাজনীতি করেন আবদুল কাদের মির্জা। কোম্পানীগঞ্জের গত ৪৭ বছরের আ. লীগের রাজনীতিকে সাজিয়ে-গুছিয়ে মাঠে ধরে রেখেছেন আবদুল কাদের মির্জা। তিনি মন্ত্রী মাহোদয়ের সঙ্গে দেখা করে একটা শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছেন। যারা বিরোধিতা করছেন স্বার্থের জন্য করছেন।

উপজেলা আ. লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মুজিবুর রহমান মোহন বলেন, “ওবায়দুল কাদের ও আবদুল কাদের মির্জার সাক্ষাতটা শতভাগই ইতিবাচক। এই দেখাটা আরও আগে হলে হয়তো উপজেলার রাজনীতি স্থিতিশীল হতো। আশা করি রাজনীতির শান্তির বাতাস বইবে। এখানে মির্জাকে বাদ দিয়ে যে আ. লীগের রাজনীতি চিন্তা করবে সে বোকার স্বর্গে বাস করবে। মির্জা হচ্ছে তৃণমূল রাজনীতি থেকে ওঠে আসা একজন চব্বিশ ঘণ্টার রাজনীতিবিদ। তার ধ্যান-জ্ঞান সব কিছু রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিয়ে। যারা আজকে মির্জাকে বাদ দিবে বলে বলছে তারাও কাদের মির্জার হাতে সৃষ্টি। কাদের মির্জার যারা বিরোধিতা করছেন তারা উলফা, মাওবাদী, পরেশ বড়ুয়া,তামিল টাইগার, ওরা বিচ্ছিন্নবাদী, বিদ্রোহী। ওরা স্বার্থান্বেষী মহল। এদের ভিতরে মন্ত্রী ও মেয়র মহোদয়ের ভাগিনারও আছেন।”
 
বড় ভাই ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাত বিষয়ে মেয়র আবদুল কাদের মির্জা বলেন, “মন্ত্রী মহোদয় সবাইকে নিয়ে কাজ করার জন্য বলছেন। কোম্পানীগঞ্জে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার জন্য তিনি বলেছেন। এছাড়া যারা তার বিরোধীতা করেছে তাদের সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করার জন্য বলেছেন। ইতিমধ্যে একটি পক্ষ আপনার সঙ্গে রাজনীতি করবে না বলে ঘোষণা করেছে, এটিকে কিভাবে দেখছেন- এটা তাদের ব্যাপার, কার সঙ্গে করবে, কার সঙ্গে করবে না। আমাকে মন্ত্রী যেভাবে বলেছে, উপজেলার রাজনীতি সেভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমি শান্তির পক্ষে কাজ করতেছি। কেউ অশান্তি করলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। আমার লোক হলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলছি।”