• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২১, ১০:২৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২১, ২০২১, ১০:২৯ পিএম

ভস্ম না করে আলো ছড়াক তারুণ্যের আগুন

ভস্ম না করে আলো ছড়াক তারুণ্যের আগুন

তারুণ্য নিয়ে বুক চিতিয়ে বলার মতো অনেক গল্প আছে। অনেক প্রেরণার উদাহরণ আছে। ইতিহাসের পাতাভার্তি সেসব গল্প নতুনদের পথ দেখায়; শক্তি যোগায়। নির্দ্বিধায় বলা যায়Ñ তারুণ্য এক শক্তির প্রত্যয়। ভরসার নাম। অজেয়- অপ্রতিরোধ্য ঝলমলে সূর্যের প্রতীক। কিন্তু সেই তেজদীপ্ত সূর্য যখন মোহের মেঘে ঢাকা পড়ে তখন দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর বার বারই ঘুরেফিরে এই দুশ্চিন্তা তাড়া করছে। ধানমন্ডির মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকা নূর আমিনের   প্রেমিক কর্তৃক ধর্ষণের শিকার ও মৃত্যুর দিকে লক্ষ্য করিÑ অভিযুক্ত ফারদিন ইফতেখার দিহানও ছাত্র। গত বছর ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল শেষ করেছে। জিইডি’র প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে মেধাবী এতে কোনো সন্দেহ নেই। দিহানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাটাও স্বাভাবিক। আগামী তো ওদের কাঁধে ভর করেই এগিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেই দিহান কিসের মোহে এমন কর্মে নিয়োজিত হলো?

প্রতিদিনই কোনো না কোনো কিশোর অপরাধের খবর গণমাধ্যমে জায়গা করে নেয়। আড়ালে থাকে এরচেয়ে অনেক বেশি। এসব কিশোররাও হতে পারতো স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দু। কবি শামসুর রাহমান তো এই সব তরুণ মেধাবীদেরই স্বাধীনতার সমার্থক হিসেবে দেখিয়েছেন। শুধু স্বাধীনতা কেন? প্রতিটি গৌরবজ্জল অর্জনেই রয়েছে তারুণ্যের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে বায়ান্ন, ঊনসত্তর হয়ে একাত্তর পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই জয় এসেছে তারুণ্যে ভর করে। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে সাম্প্রতিক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যে; কোথায় নেই তারুণ্যের ভূমিকা? সাহিত্যের ভাঁজে ভাঁজেও তারুণ্যদীপ্ত অনেক রচনা লেপ্টে রয়েছে। নজরুল-সুকান্ত রচনা করেছেন দ্রোহের-বিপ্লবের হাজারো গান-কবিতা।

প্রশ্ন থাকে; তাহলে কেন এমন হলো? গেল কয়েক বছরে যে সব জঙ্গী সদস্যদের পরিচয় প্রকাশ হয়েছে তারাও অধিকাংশ তরুণ। যে তরুণদের ওপর ভর করে দেশ এগিয়ে যাবে তারাই আজ ভ্রান্তির পথে। আসলে তারুণ্য হলো আগুন, তাকে দুভাবেই ব্যবহার করা যায়। মানুষের কল্যাণে এবং ধ্বংসাত্মক কাজে। যে আগুন মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ভস্ম করে, সেই আগুনই অন্ধকার পথে আলো ছড়াতে পারে। আবার সে আগুনকেই মানুষের ভয়। পার্থক্য ব্যবহারে। আপনি যেভাবে ব্যবহার করবেন তেমন ফল পাবেন; এটাই স্বাভাবিক। তারুণ্যের বেলায়ও একই কথা। তারুণ্য যখন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তা দিয়ে অন্যায়-অবিচার দূর করা সম্ভব। আবার যখন বিপথগামী হয় তখন ভয়ঙ্কর পরিণতি হয়। যার প্রভাব থেকে দেশ, সমাজ, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান; কেউ-ই রক্ষা পায় না।

একাত্তরে বা তারও আগে বাংলাদেশের তরুণেরা বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যে ভূমিকা পালন করেছেন তা গৌরবের সঙ্গে আজও উচ্চারিত হয়। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশের তরুণদের অনেকের ভূমিকা গৌরবজনক ধ্বংসাত্মক কাজেও তরুণেরা ব্যবহৃত হন, তার পরিণাম তাদের জন্য যেমন খারাপ, তেমনি সমাজের জন্যও। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ৮০ ভাগেরই বেশি ছিলেন তরুণ, যাদের বয়স ৪০-এর নিচে। রাজাকার-আলবদরদের খাতায় যারা নাম লিখিয়েছিল, তাদেরও বেশির ভাগই তরুণ। ইসলামিক স্টেট বা আইএসসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্যদের প্রায় সবাই তরুণ।

বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদে যারা দীক্ষিত বলে শোনা যায়, তারাও আমাদের যুবসমাজের একটি পথভ্রষ্ট গোত্র। স্পষ্টই বলা যায়Ñ এর মূলে রয়েছে মোহ। কেউ ক্ষমতার মোহে, কেউ অর্থের মোহে, কেউ মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অজানা শান্তির মোহে; অনাকাঙ্খিত ন্যাক্কারজনক ঘটনাগুলি ঘটাচ্ছে। তাদের শিক্ষিত, সচেতন বিবেকও অকেজো হয়ে যাচ্ছে মোহের কাছে। এর ফল হিসেবে প্রতিনিয়ত শিরোনাম হচ্ছে তিক্ত সব ঘটনা। অস্থির হয়ে পড়ছে সমাজব্যবস্থা। কাজেই তরুণদের মোহের জাল থেকে মুক্ত করতে হবে এখনই। এজন্য পরিবার থেকে সমাজ; সবারই দায়িত্ব পালন করতে হবে। হতে হবে সচেতন। যে তরুণ পরিবার থেকে নীতি নৈতিকতার শিক্ষা নিয়ে বেড়ে ওঠে সে সহজে মোহে আকৃষ্ট হতে পারে না। বাস্তবতা মেনে বুঝেই এগিয়ে যায় প্রতিকূলতা পেরিয়ে।  তারুণ্যের এ পরিণতির জন্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থাও অনেকাংশে দায়ী। অনেক তরুণই বিপথগামী হয় সমাজের দায়িত্বজ্ঞানহীনতায়। বাংলাদেশের জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছর।

আগামী ১৫ বছর পর তারাই সমাজের সব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের মেধা ও প্রতিভা বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে না দিলে তারা যে শুধু অযোগ্য নাগরিক হবেন তা নয়, তাদের একটি অংশ বিপথগামী হতে পারে। মোহ থেকে বের করে তরুণদের মাঝে নীতিবোধ জাগ্রত করতে হবে। তরুণদের মধ্যে সব সময়ই কিছু করার বাসনা তাড়া করে। তারা কিছু করতে চায়। এই আকাঙ্খাকে ভালো দিকে ব্যবহার করলেই আমাদের তরুণরা অনেক ভালো কিছু করতে পারে। ভালো সুযোগ না পেলে মন্দ কাজে জড়াবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ তাদের কিছু করতেই হবে। এ পর্যায়ে একটি গল্প উল্লেখ করি। এক সাধকের দীর্ঘদিনের চাওয়া ছিল, তার একটি দৈত্য থাকবে। যখন যা খুশি কাজ করিয়ে নিতে পারবে। শ্রষ্টা একদিন তার সাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে একটি দৈত্য দিতে রাজি হলো। শর্ত হচ্ছে- দৈত্যটিকে কাজের ওপর রাখতে হবে। অবসর পেলেই ধ্বংসাত্মক কিছু করবে। আমাদের তরুণদের বেলায়ও এমটিই মনে হয়। তাদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস, জানার ও শেখার আগ্রহ আছে আমরা তার সঠিক ব্যবহার করতে পারছি না কারণেই আজ তারা ধ্বংসাত্মক সব কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের আগ্রহের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারলে ক্রমেই তা বাড়বে; সৃষ্টি ও কৃষ্টিতে হবে বলীয়ান ও সাহসী। এর মাধ্যমে তারা সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের মৌলিক প্রশ্নে বিভ্রান্তি, বিভক্তি এবং এর দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ রোধ করবে।

নিজেরা যেমন বিভ্রান্তিতে থাকবে না এবং সত্যকে সত্য মনে করে বিশ্বাসকে পাকাপোক্ত করবে, তেমনি অন্যকেও সত্য জানতে ও মানতে উৎসাহিত করবে। এভাবে এদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত হবে। জাগ্রত হবে বিবেকবোধ। বাড়বে জবাবদিহি এবং এর ফলে তৈরি হবে দায়বদ্ধতা। তারুণ্যের পূর্ণ আলোয় আলোকিত হবে সমাজ। কেটে যাবে সব ভ্রান্তি। এগিয়ে যাবে দেশ।

লেখক: কথাশিল্পী ও সাংবাদিক