• ঢাকা
  • শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১, ২৭ চৈত্র ১৪২৭
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২১, ১১:১১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২১, ১১:২২ এএম

আশা, ভয়, গুজব ও উপাসনা

আশা, ভয়, গুজব ও উপাসনা

মানুষ জীবনে সাধারণত দুটি প্রধান অবলম্বনকে পাথেয় হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। একদিকে দৃশ্যমান বস্তুর অবস্থান, অন্যদিকে কল্পনাগত অশরীরী বিষয়ের অন্ধ বিশ্বাস। পরিষ্কার করে বলা যায় জীবনে আমরা যা কিছু দৃশ্যমান দেখি, যেমন খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর-বাঁওড় এবং সমুদ্রে-মহাসমুদ্রে নানা প্রজাতির মাছসহ অন্যান্য প্রাণী বাস করার দৃশ্যমান অবস্থান। 

সারা পৃথিবীর ভূমিতে কযেক হাজার নৃগোষ্ঠীর মানুষসহ বিশালাকার হাতি ও জিরাফ, সিংহ, বাঘ, ভাল্লুক, উট, দুম্বা, গরু, ছাগলসহ নানা প্রজাতির ও আকারের প্রাণীসহ অতিশয় ছোট উকুন মুরগির গায়ের ফুতালসহ বিচিত্র রকমের প্রাণী বিদ্যমান। গাছে গাছে হাজার হাজার প্রজাতির পাখি। 

আকাশে চন্দ্র, সূর্য, অগণিত গ্রহ-নক্ষত্র, উল্কাপিণ্ডের হিসাব শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে আছে। পৃথিবী নামক গ্রহের মানুষের কাছে প্রেরিত কোনো ধর্মের আসমানি ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ নেই। আসমানি কিতাবে আসমানে সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ এবং নক্ষত্রের বিশদভাবেভাবে বর্ণনা নেই। 

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধ, যানবাহন, বাড়িঘর, আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি দৃশ্যমান বস্তুগত জিনিস। আশা, ভয়, গুজব ও উপাসনার বিষয়গুলোর বস্তুগত অবস্থান না থাকলেও অদৃশ্য পণ্য হিসেবে মানুষের চেতনায় অবস্থান নিয়ে আমাদের কর্মময় জীবন পরিচালনায় হাজার হাজার বছর ধরে  শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে আছে। 

যেহেতু এগুলো মানুষ নিজে বা মানুষের নেতা সংগঠন দল বা গোষ্ঠীর কাছে যখন অবস্তুগত পণ্য হিসেবে বিবেচনায় আসে, তখনই মাথায় তাদের বাজারজাতকরণের কল্পনা স্থান পায়। তাই কীভাবে কারা এসব পণ্যের বাজারজাতকারী, তা নিয়ে নাতিদীর্ঘ তথ্য লেখার প্রয়াস।
 
জার্মানির নোবেল বিজয়ী লেখক গুন্টার গ্রাস লিখেছেন, ‘আশা’ একটি খুবই দামি পণ্য। এ পণ্যটিকে বাজারজাতকরণে দুই শ্রেণির সংগঠন কাজ করে। প্রথমটি ধর্ম ব্যবসায়ী, দ্বিতীয়টি রাজনীতিবিদ। উল্লেখিত বিষয়ের পণ্যের সঙ্গে শ্রেণিস্বার্থ জড়িত বিধায় মানুষের চিন্তা থেকে বাদ দিতে পারে না। জগতের সচেতন মানুষেরা জার্মানির গুন্টার গ্রাসের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে ভয়, গুজব এবং উপসনাকেও বিক্রয়যোগ্য পণ্যসামগ্রী হিসেবে বাজারজাত করা শুরু করে। 

মানুষের কর্মময় জীবনের মূল লক্ষ্য কর্মের ধ্যান জ্ঞান বিবেচনা করা। সারকথা কর্মের অনুশীলনে মানুষের জীবনের গতিময়তা থাকে। 

আশার আরেক নাম স্বপ্ন। স্বপ্ন দুই প্রকারের—প্রথমটি মানুষ ঘুমের ঘোরে দেখে। দ্বিতীয়টি হলো জম্মের পর থেকে বেড়ে ওঠা ও বুদ্ধিবৃত্তির সময়কালে জেগে থেকে ভবিষ্যতের বিপদসঙ্কুল সমাজে নিজেকে ভালো করে টিকিয়ে রাখার নিরবচ্ছিন্ন পরিকল্পনার নাম।

কঠিন ত্যাগ স্বীকার করতে পারলে দিবাস্বপ্নের বাস্তবায়ন সম্ভব হয়। ঘুমে দেখা স্বপ্নের আশা কখনো বাস্তবায়ন হয় না। 

শিশুকাল থেকেই ভয় অনুভূতিটির সঙ্গে মানবশিশুর পরিচয় ঘটে। শিশুর বয়স যখন ১ থেকে ৩ বৎসর, তখন থেকেই মা-বাবাসহ অন্যেরা শিশুকে ভয় পাওয়ার অভিব্যক্তি দেখায়। সবাই শিশুদের নানা কারণে ভয় দেখাতে থাকে। খাওয়ানো কিংবা ঘুমাতে বাধ্য করতে ভূত ও দৈত্য  ছাড়াও জুজু বুড়ির ভয় দেখিয়ে তাদের মনে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলে।
 
মনে রাখা দরকার, কোনো ভয়-ভীতি স্বার্থহীন বা উদেশ্য ছাড়া দেখানো হয় না। নিজের অসৎ উদেশ্য হাসিলে অবাস্তব কাজ, যেমন জিনে ধরা, ভূত তাড়ানো, বাটি চালান দেওয়া, ফুঁ দেওয়া ইত্যাদি কর্মকাণ্ড চালানো হয়ে থাকে। ভয় হলো ভণ্ড মানুষদের ব্যবসার হাতিয়ার; আবার দুষ্কৃতকারীদেরও হাতিয়ার। তারা মানুষকে ভয় দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন ঘটায়। আসলে ভয়ের কারণ খুঁজলে দেখা যায়, ভয়ের পেছনে থাকে একশ্রেণির লোকের অন্যায় ও অবৈধ কর্ম, লোভ থেকে যার উৎপত্তি হয়েছে। বস্তুগত কিছু অর্জনে অবৈধ পন্থা গ্রহণ থেকে জম্ম নেয় ভয়। সামাজিক জীবনে রয়েছে ভীতির হাজারো কারণ। সমাজে বিদ্যমান অনিয়ম ও অনাচার থেকে এসব ভয়ের কারণগুলো সৃষ্টি হয়। চোর-ডাকাতের ভয়, ছিনতাইকারীর ভয়, রাস্তায় দুর্ঘটনার ভয়, আগুনের ভয় ইত্যাদি। অন্য ধরনের ভয় আছে, যেমন কিশোরী, যুবতী ও মহিলাদের শারীরিক লাঞ্ছনার ভয়। বালকদের থাকে বলৎকারের হাত থেকে নিজেকে রক্ষার ভয়। আরো আছে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ভয় এবং পরজীবনের বিভিন্ন ধর্মের বিধান মতে আত্মার প্রতি হরেক রকমের শাস্তির ভয়। এসব ভয় দেখা যায় না বা ছোঁয়া যায় না। এমনকি অনুভব করাও যায় না। কারণ কারো কোন চাক্ষুষ প্রামাণ্য অভিজ্ঞতা নেই। অথচ মানবজাতি বিশ্বাসের ভয়ে তাড়িত হয়ে বেড়াচ্ছে এবং এর থেকে পরিত্রাণ পেতে স্বল্প বছরের কর্মজীবনে ভয়ে কত রকম কর্মকাণ্ড পালন করে চলছে। 

ভয় নামক শব্দটির কোনো বস্তুগত অস্তিত্ব নেই। এটি  ব্যক্তি মানুষ ছাড়াও ধর্ম ব্যবসায়ী এবং মতলববাজ রাজনৈতিক নেতারা পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে। 

চীনের উহান থেকে সৃষ্ট করোনা জীবাণু সারা বিশ্বের মানুষকে ভীতিকর অবস্থার মধ্যে রেখেছে। লকডাউনের মধ্যে গত বছর আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজারের বেশি লোকের মৃত্যু হয়েছে। আমাদের দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার মানুষ বিভিন্ন রোগ ও বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যায়। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ডায়াবেটিস রোগী আছে। ডায়াবেটিস হলো সব অসুখের মা। প্রত্যেক পরিবারে আত্মীয়র মধ্যে কিডনি ও ক্যানসারের রোগী আছে। যাদের চিকিৎসা করতে অনেক পরিবার জমি বাড়িঘর বিক্রি করে রিক্ত হয়ে পড়ে।
 
সারা পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় ৭৮০ কোটি। পৃথিবীর হাজার হাজার হাসপাতালের বেড বিভিন্ন রোগের রোগীতে পরিপূর্ণ। প্রতিদিন সমগ্র পৃথিবীতে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার লোক স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুবরণ করে। প্রতিদিন প্রায় গড়ে ৪ লাখ ৪৪ হাজার শিশু জন্ম গ্রহণ করে। অথচ ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ হিসাব অনুযায়ী ১০ কোটি ৬ লাখ ৫৮ হাজার ২৪৪ জন রোগী আক্রান্ত হয়েছে। ৭ কোটি ৭৯ লাখ ৯ হাজার ৬৯৪ জন রোগী সুস্থ হয়েছে এবং ২৩ লাখ ২০ হাজার ৭৯৮ জন রোগী মৃত্যুবরণ করেছে। জম্ম ও মৃত্যুর খবর টিভি কিংবা অন্যান্য মিডিয়ায় প্রচার করা হয় না! তবে কোন উদ্দেশ্যে শুধু করোনা রোগীদের খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়? 

গুজব 
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত অভিযুক্তদের আন্তর্জাতিক আদালতে রায়ে যখন ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হচ্ছিল, তখন একদল ধর্মব্যবসায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে ১০০% মিথ্যা গুজবকে সারা দেশে ছড়ানোর ফলে কিছুসংখ্যক সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের মূলে ক্ষণিকের জন্য হলেও চিড় ধরাতে সক্ষম হয়েছিল।

করোনার শুরুতে এই বাংলাদেশেই করোনায় বেশুমার মৃতদেহ রাস্তায় পড়ে থাকবে বলে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বার্থপর লোকদের লেখা  অনেক গুজব দেখেছি। 

আর পদ্মা সেতুতে ‘শিশুদের মাথা ও রক্ত লাগবে’— এই গুজবে গত বছরের জুন মাস থেকে পরবর্তী তিন মাসে বাংলাদেশে ছেলে ধরা আতঙ্কে অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কয়েক দশক আগে ১৯৮৭ সালে ‘ঢোল কলমির’ গুজবে সারা দেশে অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরি করা হয়ে ছিল। পরে দেখা গেল পুরোটাই গুজব। 

আমাদের দেশে সরকারবিরোধী রাজনীতিতে গুজবের ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিলিতভাবে চক্রান্তকারীরা ওই সময় বঙ্গবন্ধু এমনকি তার পরিবারের সদস্যদের নামেও নানা রকম গুজব ছড়িয়েছিল।

সে সময় আমরা জনজীবনে গুজবের ফলাফলের ক্ষতিকর প্রভাব লক্ষ করেছি। সুতরাং গুজব যতই বায়বীয় বা ভিত্তিহীন হোক না কেন, তার বিধ্বংসী ক্ষমতাকে সচেতন মানুষকে কখনো ছোট করে দেখা উচিত নয়। 

উপাসনা 
বাংলা ভাষায় উপাসনার অনেক প্রতিশব্দ আছে, যেমন—আরাধনা, প্রার্থনা, প্রেয়ার, নিবেদন ইত্যাদি। 

পৃথিবীর মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, ইহুদি, শিখ, জৈন, পারসিক ইত্যাদি ধর্মালম্বীসহ মোট ৪,২০০ ধর্মের মানুষ তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে সৃষ্টিকর্তাকে সর্বোচ্চ একক শক্তিমান বিশ্বাস করে মানুষেরা উপাসনা করে। 

পরিশ্রম সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। এই প্রচলিত প্রবাদ বাক্যকে সম্বল করে জীবনে অনেক মানুষ সাফল্য অর্জন করে। সাফল্যের মূল ছিল তার কঠোর পরিশ্রম লক্ষ্যে পৌঁছার একাগ্র অধ্যবসায়। এই কঠিন সত্যকে কেউ কেউ আরাধনা বা প্রার্থনার মাধ্যমে সফল হয়েছে বলে বিশ্বাস ও প্রচার করে। 

মানবসমাজের প্রত্যেকটি মানুষ নানা ধর্ম বিশ্বাসের সাথে জড়িত হয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে ভালো এবং মন্দ কাজ শুরু করে। ভালো লোক, সৎ লোক, চোর-ডাকাত, গুণ্ডা, বদমাইশ, ভূমিদস্যু সবাই কাজের শুরুতে মনে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে। এটা মানুষের মজ্জাগত ধর্মীয় ও সামাজিক স্বভাব। আমাদের দেশে বিপুলসংখ্যক লোক সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে মিথ্যার বেসাতি করে। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের একটি ব্যাংকে সুড়ঙ্গ কেটে ভোল্টের টাকা ট্রাক ভর্তি করে অন্যত্র স্থানান্তরিত করেছিল। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে বলেছিল, সুড়ঙ্গ কাটা শেষে, ভোল্ট ভাঙার পর যখন সে টাকা দেখতে পায় তখন টাকায় হাত দেয়ার আগে সৃষ্টিকর্তার সহায়তা লাভের জন্য দু-রাকাত নফল নামায পড়ে নেয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেমন— ঝড়-ঝঞ্ঝা, সুনামি, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রে জাহাজডুবি, মরুভূমিতে মরুঝড়ে পতিত সকলেই বাঁচার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করেই আরাধনা করে। সৃষ্টিকর্তা মানুষ এবং মানুষকে সুশৃঙ্খল কারার জন্য ধর্ম সৃষ্টি করেছেন। এটা জেনেও এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের লোককে বিধর্মী বলে অভিহিত করে। মানুষ আসলে উপাসনার ধারণাকে পুঁজি করে কোটি কোটি মানুষ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসের মানসিকতা  নিয়ে সেটিকে পাথেয় হিসাবে গণ্য করে। জ্ঞান বিজ্ঞানের চরম উন্নতির এ যুগে আমাদের প্রশ্নাতীতভাবে স্বীকার করতে হবে যে, ধর্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্যই ধর্ম।