• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২১, ১০:১৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২১, ২০২১, ১০:২১ পিএম

তারুণ্যের মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুত্ব দিতে হবে

তারুণ্যের মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুত্ব দিতে হবে

সমাজের বৈচিত্র্যের বাগানে তরুণ সমাজ বিশেষ জায়গাজুড়ে অবস্থান করে। এদেশের মুক্তিযুদ্ধে যেমন তরুণ সমাজের বিশেষ ভূমিকা ছিলো তেমনি যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও সমস্ত আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। মানবজন্মের বয়সকেন্দ্রিক ধাপের মধ্যে তরুণ বয়স সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় মাথা নোয়াবার নয়, এ বয়স পিছু হটবার নয়, এ বয়স সামনে এগোবার। এ দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনসহ নানা সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে তরুণ সমাজই মূলত সোচ্চার থেকেছে।

এবার আসা যাক তরুণ সমাজের বর্তমান অবস্থার দিকে। মিডিয়া এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যা বলে; তা অবক্ষয়ের একটা দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। আমরা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে প্রায়ই জানতে পারি বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের কথা। এ ধরনের গ্যাংয়ের অস্তিত্ব ’৭১-এর আগে এবং পরে দেখা যায়নি। নব্বইয়ের দশকেও তরুণ সমাজের অবক্ষয়ের তেমন কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সারাদেশের বিভিন্ন শহর থেকে শুরু করে রাজধানীকেন্দ্রিক নানা সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্য দিয়ে এদেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে বেড়ে উঠেছে; যা মানসিক এবং শারীরিক বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ক্রীড়া চর্চার একটা বিরাট সচল সময় ছিলো গত দশকেও।

বলা বাহুল্য তরুণ প্রজন্মই আগামীতে বিভিন্নভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার কথা। বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে তাই অবহেলা করার সুযোগ নেই। অবক্ষয়ের সংস্কৃতি থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কোনোভাবেই হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। সম্প্রতি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র দিহানের উদাহরণ টানা যায়। সন্তানের বা শিশুর বেড়ে ওঠা, তার চারপাশ প্রতিবেশ, মস্তিস্ক গঠনের ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। দিহানের এই মানসিকতার জন্য দায়ী প্রথমত তার পরিবার, এরপর তার চারপাশ। অর্থাৎ তার পরিবেশ তাকে ভিন্ন পথে নিয়ে গেছে। আধুনিক নাগরিক সমাজে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার গঠন, বাবা-মায়ের অধিক ব্যস্ততা, সন্তানকে সময় না দেয়া, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, সহশিক্ষা হিসেবে অনান্য ঊীঃৎধ পঁৎৎরপঁষঁস ধপঃরারঃরবং এর অভাব, অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে সম্পদের আধিক্য যা সন্তানের মূল্যবেধের ঘাটতি তৈরি করে। তরুণ প্রজন্মের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে মাদকদ্রব্য বড় পরিসরে দায়ী বলে আমরা মনে করছি। তরুণ সমাজের কিছু অংশ হেরোইন, মদ, গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল, খুন, ধর্ষণ, ইভটিজিং, হানাহানি, দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছে। আর এই মাদকদ্রব্যসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামিতা থেকে সরানো সম্ভব হবে না। এছাড়া এদেশে কিছু বার, সিসাবারের সংস্কৃতি চালু হয়েছে। উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীদের আড্ডাস্থল এইসব বারগুলো।

মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ আজ অভিভাবকরাও। পরিবার শিশুর প্রথম পাঠশালা। প্রথম গ্রুমিং পরিবারেই হয়ে থাকে। এখান থেকেই মূলত ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। অতি দরিদ্রতা এবং অবৈধ পথে অতিরিক্ত সম্পদশালীতা দুটোই সন্তানের সঠিক আদর্শিক পথ তৈরিতে অনেক ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে। বলা প্রয়োজন সৎ উপায়ে অর্জিত সম্পদের আধিক্যও কখনো কখনো সন্তানের বিপথে যাওয়ার কারণ হয়ে ওঠে।

এবার আসা যাক রাজনীতির দিকে। এদেশে একটা সময় ছিলো যখন তরুণ নেতৃত্ব বিপথে নিয়েছিলো গোটা দেশের তরুণ প্রজন্মকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে গিয়ে অন্য অপরাজনীতির চর্চা শুরু হয়েছিলো যা আমাদের তরুণদের অবক্ষয়ের কালো সময় বলে ধরে নেয়া যায়। অবক্ষয়ের বীজ বপন করা হয়েছিলো গোটা জাতির মধ্যে। মানুষের, দেশের কল্যাণের পরিবর্তে রাজনীতি হয়ে উঠেছিলো আয় রোজগারের প্রধান উপায়। ফলে কাঁচা পয়সা হাতে উঠেছিলো তরুণ প্রজন্মের হাতে। দেশের আনাচে-কানাচে দাঙ্গা-হাঙ্গামার অপরাজনীতি শুরু হয়েছিলো। তরুণদের হাতের অস্ত্রের ঝনঝনানিতে এদেশের মাটি কলঙ্কিত হয়েছিল।

এমনকি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশের বদলে অপরাজনীতির প্রভাব বিস্তার মূখ্য হয়েছিলো। দলীয়করণের মাধ্যমে তরুণদের করা হয়েছিল বিভক্ত। মানবিক মানুষ হওয়ার পরিবর্তে দলীয় বিবেচনার শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়েছিলো। প্রকৃতপক্ষে সেই সংস্কৃতির ধারা আজও বহমান। তখন থেকেই অবক্ষয়ের যাত্রা শাখা -উপশাখায় আজও দ-ায়মান।

আজকের শূন্য দশকে এসেই সেসব প্রেতাত্মা সব বিষয়ের উপর প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের অপব্যবহার তরুণ সমাজকে আইসোলেট করে দিয়েছে। ডিজিটাল মানবিকতার পথ সৃষ্টি করে গোটা জাতি পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতার পথ পরিহার করে এক ভিন্ন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন ডিজিটালাইজেশন মানবজাতির কল্যাণের জন্যই মূলত তবে পিরয়োগের সঠিক ব্যবহার সবক্ষেত্রে না হওয়ায় বিপত্তি ভোগ করছে গোটা মানবজাতি।

ঐতিহ্য বিমুখতা। এদেশের আত্মীয়তা, আপ্যায়ন, পারস্পরিক সম্মান, শ্রদ্ধা, ভক্তি, স্নেহ ইত্যাদির ঘাটতি। আধুনিক সমাজে যোগাযোগ, আত্মীয়তাপ্রায় ভঙ্গুর বা ছিন্ন; যা মানুষকে শুধু ভোগের দিকে ধাবিত করছে, ত্যাগের সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্ত। এর প্রভাব তরুণ সমাজের দিকেও। শিশু, কিশোর থাকা অবস্থাতেই ঘরবন্দী জীবন, ইন্টারনেটনির্ভর জীবন মনঃবৈকল্যের জন্ম দিচ্ছে যা পরবর্তীতে নানাধরনের মানসিক রোগের কারণ হয়ে তরুণ প্রজন্মকে অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে চলেছে।

শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার অভাব এক্ষেত্রে আরেকটি বড় কারণ বলা যায়। সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে মানুষ তার সৃজনশীলতা প্রকাশ করতে চায়, সেটি ব্যর্থ হচ্ছে বিধায় এর থেকেও হতাশার জন্ম দিচ্ছে যা তরুণ প্রজন্মের একটা অংশকে অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে চলেছে। ঠিক এভাবেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্ম তাদের কাক্সিক্ষত জায়গাটি ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে।

গত এক বছরে এর ভয়াবহতা কয়েকগুণ বেড়েছে। কোভিড-১৯ এর কারণে পুরো পৃথিবীর মানুষের জীবন-যাপন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল কিছুতে। শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ প্রত্যেকের জীবনে এর প্রভাব পড়েছে। মানুষ জন্মগতভাবেই স্বাধীন। মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতায় কোভিড-১৯ বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। জন্ম দিয়েছে মানসিক বিকৃত বৈকল্যের। ফলে তরুণ সমাজ মানসিক স্বাস্থ্যের দিক দিয়েও হুমকিতে রয়েছে। অস্বাভাবিক জীবনে নানা রকম রোগ জন্ম দিয়েছে যা থেকে হতাশা তৈরি হয়েছে।

ধর্মীয় অনুশাসন না মানা তরুণ প্রজন্মের অবক্ষয়ের আরেকটি প্রধান দিক। তরুণরা শিক্ষিত হচ্ছে কিন্তু তা শুধু সনদপত্রেই সীমাবদ্ধ। জীবনে-কর্মে কাজে লাগানোর কোনো প্রয়াস নেই। অপরদিকে ধর্মীয় নিয়ম না মানার ফলে তরুণ সমাজ দিক হারিয়ে ফেলছে।

   ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,

           ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ

আধ মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা

 

যারা আধ মরা হয়ে আছি। যাদের আর কোনো হাল ধরার ক্ষমতা নেই, তাদের জাগিয়ে তুলতে পারে তরুণেরা। তাই তরুণের জয় গোটা জাতির জয়। তরুণদের এটা মনে রেখেই অবক্ষয়ের দিক পরিহার করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সেই তরুণেরা আবার ফিরে আসুক এই বাংলায়। তারাই এদেশের ভবিষৎ। এদেশের নেতৃত্বে তারাই একদিন আসীন হবে। তাদের হাতেই এদেশের সকল অকল্যাণ, দুর্নীতি, অন্যায়, অত্যাচার দূর হয়ে স্বাভাবিক উন্নত দেশের ধারা অব্যাহত থাকবে। প্রত্যাশা, অবক্ষয়ের পথ পরিহার করে আজকের তরুণ প্রজন্ম পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত রাখবে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়