• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল, ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২০, ০৬:৩৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ৭, ২০২০, ০৪:২৭ পিএম

শেকড়ের টানে বাঙালির পাশে-৩

মানবতা আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মাঠে নেমেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়

সবিশেষ
মানবতা আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মাঠে নেমেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়
সুভাষ মুখোপাধ্যায়

মু ক্তি যু দ্ধে র  সু হৃ দ

একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিন। গোটা ভারতের লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীর‍া সোচ্চার আমাদের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ ‘মানবিক বোধ’ এর টানে। আবার অনেকের হৃদয়ে এই বোধের সঙ্গে ছিল মাটি ও শেকড়ের টান। এবারের অগ্নিঝরা মার্চে তাদের নিয়েই দৈনিক জাগরণ এর বিশেষ আয়োজন। আজ প্রকাশিত হলো তৃতীয় কিস্তি। লিখেছেন জাকির হোসেন

......

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় একাত্তরের মার্চে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের খবর পান সুদূর ভিয়েতনামে বসে। তখন তিনি আফ্রো-এশীয় লেখক সংঘের ডেপুটি সেক্রেটারি হিসেবে ভিয়েতনাম সফর করছিলেন। সেখানেই শুনতে পান নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের কথা। বিষয়টি তিনি তৎক্ষণাৎ আফ্রো-এশীয় লেখক সংঘের নেতাদের জানান এবং মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে তাদের সমর্থন আদায় করেন। পরে তিনি দেশে ফিরেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সভা-সমাবেশে একাগ্র হন। সংগঠিত করেন কলকাতার কবি-লেখক-সাহিত্যিকদের। তিনি ছিলেন ‘বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতি’র সহ-সভাপতি। আর এই সংগঠনের অধিকর্তা বা সভাপতি ছিলেন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক ও রাজনীতিক তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়। সংগঠনটির অফিস ছিল লেনিন সরণিতে। এই সংগঠনের ডাকে একাত্তরের ৩১ মার্চ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সমর্থনে এবং নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচারের প্রতিবাদে কলকাতায় বনধ পালিত হয়।

ভারত সরকারের ভূমিকা কি হবে, জাতীয় নীতি কিভাবে এগুবে, এসব কথা তখন তারা ভাবেননি।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও কণ্ঠশিল্পী আরতি মুখোপাধ্যায়

কলকাতার লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা অন্তর থেকেই বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে কলম ধরার তাগিদ অনুভব করেন। ভারতের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক জগতে সচেতনতা বাড়াতে তারা অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখেন।

শিল্পী সাহিত্যিকদের ডাকে বনধ পালনের নজির খুব একটা নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীদের জন্য কলকাতার কবি-লেখক-শিল্পী-সাহিত্যিকদের এই সমর্থন ছিল নতুন প্রেরণার উৎস। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ যে একা নই, ঘরের পাশেই যে আমাদের মিত্র আছে, এটা জানান দিয়েছিল কলকাতার ‘বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতি’। এই সংগঠনের হয়ে একাত্তরে কলম ধরেছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, শংখ ঘোষ, নীরেন চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, অমিতাভ দাশগুপ্ত, গোলাম কুদ্দুস, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজসহ আরও অনেকে।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ে মতে, একাত্তরে তাদের মধ্যে যে বোধ তাড়িত করেছিল তাতে মানবিকতা ছিল রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি। কারণ বাংলাদেশের দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী প্রকৃতপক্ষে হত্যা করছিলো মানব সভ্যতাকে। এজন্যই সবাই দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকে রক্ষার জন্য মাঠে নেমেছিলেন।

একটি পারিবারিক ছবি

সুভাষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিংশ শতাব্দীর উল্লেখযোগ্য বাঙালি কবি ও গদ্যকার। কবিতা তার প্রধান বিষয় হলেও ছড়া, ভ্রমণসাহিত্য, অর্থনীতিমূলক রচনা, বিদেশি গ্রন্থের অনুবাদ, কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা, উপন্যাস, জীবনী, শিশু ও কিশোর সাহিত্য সব প্রকার রচনাতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ এবং বহু দেশি-বিদেশি কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন।

‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা’ কিংবা ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক/আজ বসন্ত’ প্রভৃতি তার অমর পঙক্তি বাংলায় আজ প্রবাদতুল্য।

পরিণত বয়সে গায়ে খদ্দরের পাঞ্জাবি, পরনে সাদা পায়জামা, মাথাভর্তি ঘন কোঁকড়ানো চুল, বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে চোখ, চোখে চশমা, বামে চশমার নিচে বড় একটা আঁচিল– কলকাতার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এ রকম একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

কবি-লেখক-সাহিত্যিকদের আড্ডায় সরব সুভাষ মুখোপাধ্যায়

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশের দর্শনায়। জন্ম ১৯১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে মামাবাড়িতে। শৈশব কেটেছে নওগাঁয়। নিজের বাল্যকাল সম্পর্কে এক চিঠিতে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘‘আমার শৈশব কেটেছে রাজশাহীর নওগাঁয়। বাবা ছিলেন আবগারির দারোগা। নওগাঁ শহর ছিল চাকরি, ব্যবসা, নানা বৃত্তিতে রত বহিরাগতদের উপনিবেশ। হিন্দু-মুসলমান এবং বাংলার নানা অঞ্চলের মানুষজনদের মেলানো-মেশানো দিলদরাজ আবহাওয়ায় আমরা একটু অন্যরকমভাবে মানুষ হয়েছিলাম। একদিকে প্রকৃতি, অন্যদিকে যৌথ জীবন। সব সম্প্রদায়েই এমন সব মানুষের কাছে এসেছি যারা সধর্মে গোঁড়া, কিন্তু মানুষের সম্বন্ধে উদার। আমার অক্ষর-পরিচয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা নওগাঁয়। পড়েছি মাইনর স্কুলে। পাঠ্যবইয়ের চেয়েও বেশি পড়েছি পাঠাগারের বই। সেই সঙ্গে আমাকে শিক্ষা দিয়েছে খেলার মাঠ, গান আবৃত্তি অভিনয়ের মঞ্চ। নওগাঁ শহরের জীবন আমার ব্যক্তিত্বের গোড়া বেঁধে দিয়েছিল।’’

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তা প্রতিক্রিয়া ছিল এমন— ‘‘চোখের সামনে জ্বলছে আমার প্রিয় জন্মভূমি, বাংলাদেশ। বাতাসে ভাসছে আমার ধর্ষিতা বোনের চিৎকার। দু’আঙুলে কান চাপা দেই। বানের জলের মতো সর্বহারা মানুষ আসছে এপারে, প্রাণ নিয়ে, সম্ভ্রম বাঁচাতে। কি লিখবো আমি ভিয়েতনাম নিয়ে, আমার সামনে তো আরেক ভিয়েতনাম বাংলাদেশ।”

যকৃৎ ও হৃদপিণ্ডের অসুস্থতার কারণে দীর্ঘকাল রোগভোগের পর ২০০৩ সালের ৮ জুলাই কলকাতায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুহৃদ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

জেডএইচ/এসএমএম