দৌলতপুরে কবি নজরুল

বাসার তাসাউফ প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২১, ০৫:৫৬ পিএম দৌলতপুরে কবি নজরুল

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম কুমিল্লার দৌলতপুরে এসেছিলেন ৬ এপ্রিল ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দ, ২৩ চৈত্র ১৩২৭ বঙ্গাব্দে। এই গ্রামে কবির জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু সময় কেটেছিল। এখানকার নারীর মমত্ববোধ ও ভালোবাসা তাঁর বিদ্রোহী মানসপটে প্রেমিক কবির বিমূর্ত ছবি এঁকে দিয়েছিল। কুমিল্লায় ও দৌলতপুরে না এলে নজরুলের কবিজীবন ও প্রেমিকজীবন হয়তো পরিপূর্ণ হতো না। দৌলতপুর আসার কারণে নজরুলের জীবনে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছিল, তাঁর সাহিত্যচর্চায় যোগ হয়েছিল নতুন মাত্রা। এখানে এসেই বিদ্রোহী কবি হয়ে গিয়েছিলেন প্রেমের কবি। নার্গিস নামের এক তরুণী তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। নার্গিসের সঙ্গে কবি নজরুলের প্রথম দেখা হয়েছিল খানবাড়ির এক বিয়ে অনুষ্ঠানে। নার্গিসকে প্রথম দেখার পরই বিদ্রোহী কবির মধ্যে প্রেমিক কবির আবির্ভাব ঘটেছিল। তাই তো তিনি লিখেছেন—‘এক অচেনা পল্লী-বালিকার কাছে এত বিব্রত আর অসাবধান হয়ে পড়েছি, যা কোন নারীর কাছে হয়নি...।’
কবির এই পল্লী-বালিকার নাম সৈয়দা খাতুন। কিন্তু কবি তাকে এই নামে ডাকতেন না। ইরানি ফুল নার্গিস নামে ডাকতেন। এই নার্গিস ফুলই পরবর্তী সময়ে কবির হদয়-বাগান সুরভিত করেছিল।

সৈয়দা খাতুন বা নার্গিস আরা খানমের খাট

কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার কোম্পানীগঞ্জ-নবীনগর রোডের পাশে দৌলতপুর গ্রাম। গ্রামের নাম দৌলতপুর হলেও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের আগমনের কারণে যোগ হয়েছে কবিতীর্থ। তাই কবিতীর্থ দৌলতপুর নামে আশপাশের গ্রামের লোকেরা চেনে। কবিতীর্থে প্রবেশের শুরুতেই চোখে পড়ে দুটো তোরণ, পথের দুই ধারে নির্মিত এই তোরণদ্বয়ের নাম রাখা হয়েছে, কবি নজরুল তোরণ। তোরণ দুটোর সামনে বিখ্যাত কিছু কবিতার চরণ খোদাই করে লিখে রাখা আছে। 
‘নার্গিস! নার্গিস!
কেন ফুটলে আমার 
ফুল-বাগিচায় 
আনলে মদির সুরভি
কেন গাইলে গজল শিরীন-সুর
কাঁদলো সাঁঝের পূরবি।’ 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কাজী নজরুল ইসলাম পাকিস্তানের করাচিতে থাকতেন, সেটা ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের কথা। যুদ্ধের সময় আলী আকবর খান ছিলেন ক্যাপ্টেন আর কবি নজরুল ছিলেন হাবিলদার। সেই সূত্রে তাদের পরিচয় হয়েছিল। শুধু পরিচয় হয়েই থেমে থাকেনি। দুজনের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। কবি নজরুলের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে আলী আকবর খান তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নিজের গ্রামের বাড়ি দৌলতপুরে আসতে। আলী আকবর খানের আমন্ত্রণে সাড়া দিলেও কবি নজরুল সরাসরি দৌলতপুরে আসেননি। প্রথমে এসেছিলেন কুমিল্লা শহরে। কান্দিরপাড়ে এসে তার বন্ধু বীরেন্দ্র কুমার সেনের বাড়িতে উঠেছিলেন। এখানে আসার পথে চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনে বসে তিনি ‘নীলপরী’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। কান্দিরপাড়ে দুই দিন থাকার পর ৬ এপ্রিল আলী আকবর খানের সঙ্গে এসেছিলেন দৌলতপুরে। এখানে আসার পর আলী আকবর খানের ভাগ্নি সৈয়দা খাতুন বা নার্গিস আরা খানমের সঙ্গে কবি নজরুলের পরিচয় হয়েছিল। নার্গিসের বাড়ি ছিল আলী আকবর খানের পাশের বাড়িতেই। বাল্যকালে নার্গিসের বাবা-মা মারা গিয়েছিল। তাই সে বেশির ভাগ সময় মামার বাড়িতে থাকত।

নজরুল মঞ্চ

তোরণ পেরিয়ে গ্রামের ভেতরে যে পাকা রাস্তাটা গেছে, সেটা দিয়ে একটু সামনে এগিয়ে চোখে পড়ে একটা মাঠ, নজরুল মাঠ। আসলে দৌলতপুরে যা কিছু চোখে পড়ে সবই নজরুলের নামে নামকরণ করা। মাঠের এক পাশে পাকা করে নজরুল মঞ্চ বানানো। প্রতিবছর ১১ জ্যৈষ্ঠ এই মাঠেই মেলা হয়। মাঠের দক্ষিণ দিকে আলী আকবর খানের সেই বাড়িটা চোখে পড়ল—যেখানে নজরুল-নার্গিসের বিয়ে ও বাসর রাত উদযাপিত হয়েছিল। সেটা ছিল ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জুন মোতাবেক ১৩২৮ সনের ৩ আষাঢ়, শুক্রবার। কিন্তু কী এক অজানা কারণে বিয়ের পর রাতেই নজরুল দৌলতপুর ছেড়ে কুমিল্লার কান্দিরপাড় চলে গিয়েছিলেন। কেন তিনি ওভাবে চলে গিয়েছিলেন, আজও জানা যায়নি। তবে কুমিল্লা থেকে নার্গিসের মামা আলী আকবর খানকে ‘বাবা শ্বশুর’ সম্বোধন করে তিনি যে চিঠি লিখেছিলেন, তাতে কিছুটা অনুমান করা যায়। তিনি লিখেছেন, ‘বাবা শ্বশুর! আপনাদের এই অসুর জামাই পশুর মতন ব্যবহার ক’রে এ’সে যা কিছু কসুর করেছে, তা ক্ষমা করো সকলে...।...আমি সাধ ক’রে পথের ভিখারী সেজেছি ব’লে লোকের পদাঘাত সইবার মতন ‘ক্ষুদ্র-আত্মা’ অমানুষ হয়ে যাইনি। আপনজনের কাছ থেকে পাওয়া অপ্রত্যাশিত এত হীন ঘৃণা, অবহেলা আমার বুক ভেঙে দিয়েছে...।’

নজরুল চলে যাওয়ার পর নার্গিস সুদীর্ঘ ষোলো বছর তার অপেক্ষায় ছিলেন। তারপর তিনি আজিজুল হাকিম নামের একজন অখ্যাত কবিকে বিয়ে করেছিলেন। আজিজুল হাকিম ও সৈয়দা খাতুনের (নার্গিস) সংসারে দুই ছেলে হয়েছিল। ছেলে দুজন বিদেশে থাকে এখন। নার্গিসের বর্তমান বাড়িতে এসে তারই ভাইয়ের ছেলে আব্দুর রউফ মুন্সির কাছ থেকে এসব কথা জেনেছি।

দৌলতপুরের আলী আকবর খানের বাড়ি

দৌলতপুরে নার্গিসের বসতবাড়িটা এখন আর নেই। তবে আলী আকবর খানের সেই বাড়িটা আছে। রাজপ্রাসাদের মতো কারুকার্যময় দ্বিতল ভবন। বাড়িটার সামনে আছে পুরোনো আমলের একটা পুকুর। এ পুকুরেই নজরুল ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কাটতেন। একবার পুকুরে নামলে উঠবার নামও নিতেন না। সাবানের পর সাবান মেখে ফেনা তোলে পুকুরের ফেনিল জলে ছোট শিশুদের সঙ্গে লাই খেলতেন। ডুব দিয়ে তাদের কলের গান শোনাতেন। আলী আকবর খানের এক বোন ছিল, নাম ইফতেখারুন্নেছা। নজরুল তাকে মা ডাকতেন। পুকুরের পশ্চিম পাড়ে একটা আমগাছ ছিল। সেটা এখন নেই। ইফতেখারুন্নেছা এই আমগাছের তলায় খাবার নিয়ে এসে নজরুলকে ডাকতেন ‘আয় নুরু, খেতে আয়!’ তখন নজরুল ভদ্র ছেলের মতো গোসল সেরে বাড়িতে এসে ভাত খেতেন। এই আমগাছের নিচে বসেই নজরুল রাতদুপুরে মনভোলানো উদাস সুরে বাঁশি বাজাতেন। দুপুরে শীতল পাটিতে বসে কবিতা ও গান রচনা করতেন। আমগাছের পাশেই ছিল কামরাঙা, কামিনী, কাঁঠালগাছের সারি। এখানে তিনি খানবাড়ি ও দৌলতপুর গ্রামের ছেলেমেয়েদের নাচ, গান, বাদ্য শেখাতেন। যদিও গাছগুলো এখন আর নেই। কয়েক বছর আগে মারা গেছে। তবে আমগাছের গোড়া এখনো পাকা করে রাখা হয়েছে। আমগাছটা ছাড়াও তখন খানবাড়িতে বারোটা কামরাঙাগাছ ছিল। কবির শোবার ঘরের সামনে ছিল একটি কামরাঙাগাছ, যা তার অনেক কবিতা গানে, হাসি-কান্না, মান অভিমান এবং মিলন-বিরহের নীরব সাক্ষী। এই গাছকে নিয়েই তিনি লিখেছেন— 
‘কামরাঙা রঙ্গ লোকের পীড়ন থাকে
ঐ সুখের স্মরণ চিবুক তোমার বুকের
তোমার মান জামরুলের রস ফেটে পড়ে
হায় কে দেবে দাম...।’

কাজী নজরুল মাঝেমধ্যে দুপুরবেলায় এই গাছের শীতল ছায়ায় বসে আপন মনে গান গাইতেন, গান রচনা করতেন। সেই গাছটা এখনো আছে। নজরুল স্মৃতি ধরে রাখতে গাছটাতে ফলক বানানো হয়েছে। নজরুল যখন বিকেলবেলায় এই গাছের ছায়ায় শীতলপাটি বিছিয়ে বসে কবিতা ও গান লিখতেন তখন নানা কাজের ছলে এখানে ছুটে আসতেন নার্গিস। আর তখনই নজরুল-নার্গিসের মন দেওয়া-নেওয়ার ঘটনা ঘটে গিয়েছিল।

কাজী নজরুল ইসলাম ৭৩ দিন ছিলেন দৌলতপুরে। সেই সময়ে তিনি ১৬০টা গান ও ১২০টা কবিতা লিখেছিলেন। ‘পাপড়ি-খোলা’ নামের বিখ্যাত কবিতাটাও লিখেছিলেন এখানে বসে। এছাড়াও ‘অ-বেলায়’, ‘অনাদৃতা’, ‘বিদায়-বেলায়’, ‘হারমানা-হার’, ‘হারামণি’, ‘বেদনা অভিমান’, ‘বিধুরা পথিক প্রিয়া’ কবিতাগুলো লিখেছিলেন।

আলী আকবর খানের বাড়ির পুকুরঘাট

রাতে বাজাতেন বাঁশি আর দিনের বেলা পুকুরের শান্ত জলে নেমে খেলতেন জলকেলি। গ্রামের বউ-ঝিয়েরা কলসি ভরতে পুকুরে এলে তিনি তাদের সঙ্গে ছেলেমানুষি করতেন। এজন্য নজরুল ঘুম থেকে ওঠার আগেই কলসি ভরে নিত গ্রামের মেয়েরা। কবিতীর্থের একজন প্রবীণ লোকের কাছ থেকে পত্রিকার রিপোর্টারের মতো প্রশ্ন করে করে এসব কথা আমি জেনে নিয়েছি।

আলী আকবর খান ১৯৭৭ সালে মারা যান। দৌলতপুরে নিজেদের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। নার্গিস মারা গিয়েছেন ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে। ইংল্যান্ডে অবস্থান করার কারণে তাকে ম্যানচেস্টার শহরে সমাহিত করা হয়েছে।

দৌলতপুরে কাজী নজরুল সম্পর্কে লিখতে যৎসমান্য ইতিহাস পড়তে গিয়ে জানতে পারি ৫০ বছর (১৯২১ থেকে ১৯৭১) কবি নজরুলের দৌলতপুরের অধ্যায়টি অজানা, একেবারে আড়ালে ছিল। কেউ কোনো রকম প্রচার কিংবা প্রকাশ করেনি। তারপর ১৯৭২ সালের ২৩ জুলাই দৌলতপুর নজরুলের স্মৃতি স্মরণী সংসদ গঠিত হয় আর ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমান নজরুল নিকেতনে রূপ দেন। বলা চলে, নজরুল স্মৃতি স্মরণী সংসদ গঠনের মধ্য দিয়েই দৌলতপুরে স্থানীয় পর্যায়ে নজরুলচর্চা ও স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য দিলারা হারুন নজরুল স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোতে স্মৃতিফলক লাগিয়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন। এখন অবশ্য বেশির ভাগ স্মৃতি নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। আমগাছের গোড়া পাকা করে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হলে শুকিয়ে মিলে যাচ্ছে প্রায়। নার্গিস ও নজরুল বাসররাতে যে খাট ব্যবহার করেছিলেন, সেটা এখনো খানবাড়িতে আছে। তবে অরক্ষিত আছে। খানবাড়ির লোকেরা ব্যবহার করছে। পুকুরে আর আগের মতো গাছগাছালিগুলো নেই। খানবাড়ির সামনে একটা নজরুল মঞ্চ তৈরি করা হলেও বেশির ভাগ সময়ে সেখানে এলাকার কৃষকদের বিভিন্ন কৃষিদ্রব্য অবস্থান করে। শুধু প্রতি বছর ১১ জ্যৈষ্ঠ এলে গ্রামের লোকেরা কিছুটা নড়েচড়ে বসে। দৌলতপুর গ্রামে নজরুলের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের প্রতি আরও যত্নবান হওয়া দরকার।