• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮
প্রকাশিত: মার্চ ২৫, ২০২১, ০২:৫৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২৬, ২০২১, ১১:৪১ এএম

নাটক শুধু বিনোদন নয়, গণশিক্ষার মাধ্যম: আতাউর রহমান

নাটক শুধু বিনোদন নয়, গণশিক্ষার মাধ্যম: আতাউর রহমান
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের থিয়েটার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা আতাউর রহমান। তার হাত ধরেই সমৃদ্ধ হয়েছে নাট্যাঙ্গন। সে কারণে নাটক ও শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য ২০২১ সালের স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন এই মঞ্চসারথি। জীবনের শেষ লগ্নে এসে রাষ্ট্রের এমন স্বীকৃতি অর্জন গৌরবের বলছেন আতাউর রহমান। জাগরণের সঙ্গে আলাপকালে মনের জানালা খুলেছেন তিনি। কথা বলেছেন নিজের অর্জন, নাট্যচর্চাসহ নানা বিষয়ে।

জাগরণ: স্বাধীনতা পুরস্কারে আপনার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদক পাচ্ছেন। অনুভূতির কথা জানতে চাই।

আতাউর রহমান: জীবনের এই সময়ে এসে এমন একটি অর্জন আমার জন্য সত্যিই অনেক গর্বের। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে এই পুরস্কার অন্য রকম এক পাওয়া। এই সরকার আমাকে একুশে পদক দিয়েছে। আবার এই সরকারই আমাকে স্বাধীনতা পদক দিল। আমি কৃতজ্ঞ সরকারের প্রতি।

জাগরণ: প্রথমে একুশে পদক, তারপর স্বাধীনতা পদক। এক জীবনে রাষ্ট্রের দুটি সম্মানজনক অর্জন। তবু কোনো আফসোস কি আছে?

আতাউর রহমান: না, জীবনে কোনো আফসোস নেই। যদি পুরস্কারগুলো মৃত্যুর পর পেতাম তাহলে আফসোস নিয়েই মারা যেতাম। মৃত্যুর আগে এত সব অর্জন দেখে যেতে পারছি, এটা আমার কাছে আনন্দের। আমি ভাগ্যবান। কোনো অপ্রাপ্তি থাকল না জীবনে। যদিও এখনো স্ট্রাগল করছি। বঙ্গবন্ধুও স্ট্রাগল করেছেন। সবার জীবনে এটা আছে। নাটক, লেখালেখি, পেশা—সব ক্ষেত্রে আমার সংগ্রাম আছে। আমি মনে করে, জীবনসংগ্রাম মানুষকে সফলতার দিকে নিয়ে যায়।

জাগরণ: অর্ধশত বছর ধরে তিন ডজনের মতো মঞ্চনাটক নির্দেশনা দিয়েছেন, দুই হাজার প্রদর্শনীতে অভিনয় করেছেন। এত বছর মঞ্চজীবনে উপলব্ধির কী হলো?

আতাউর রহমান: কয়েক দিন আগে উৎপল দত্তর একটি সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। সাক্ষাৎকারে উৎপল দত্ত বলেছেন, আমি টাকার জন্য সিনেমাতে অভিনয় করেছি। কিন্তু আমার মনটা পড়ে রয়েছে মঞ্চে। কারণ, সেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংযোগ থাকে। একমাত্র মঞ্চেই দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়া যায়।

আমি ঠিক তাই মনে করি। আমাকে মঞ্চনাটক অনেক শান্তি দেয়। সেখানে আমি জীবনকে দেখতে পাই। এই মঞ্চ আমাকে স্ট্রাগল করা শিখিয়েছে। শিখিয়েছে কীভাবে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায় প্রতি মুহূর্তে।

জাগরণ: নাটক বিষয়টিকে আপনি ঠিক কীভাবে দেখেন?

আতাউর রহমান: নাটক শুধু বিনোদন নয়, গণশিক্ষার মাধ্যম। নাটকের ভেতর দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী, মৌলবাদবিরোধী আন্দোলন করেছি। নাটক সমাজের দর্পণ। যখন একটা ভালো নাটক দেখি, ভেতরে কোথায় যেন একটা টঙ্কার ওঠে। শিল্প কখনো কলকবজা খুলে বোঝা যায় না। এ আপনাকে আভাস-ইঙ্গিত দেয় শুধু। এই ইঙ্গিতটাই শিল্প। অভিনয়ের সময় মঞ্চে এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়, তখন মনে হয় এ জন্যই বেঁচে ছিলাম, আমি যেন স্বর্গকে স্পর্শ করছি। যদি এর পরমুহূর্তে মারাও যাই, কিছুই আসবে-যাবে না।

জাগরণ: এখনো আপনি মঞ্চে অভিনয় করেন। এই বয়সে এসে অভিনয় করতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন না?

আতাউর রহমান: এখনো হাঁপিয়ে উঠছি না। তবে যেদিন হাঁপিয়ে উঠব, যখন বুঝব আমার কথা জড়াচ্ছে। আমার স্মরণশক্তি ধূসর হয়ে যাচ্ছে, তখন চির বিদায় নেব।

জাগরণ: আপনি যখন নাট্যচর্চা শুরু করেন, তখনকার পরিস্থিতি বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা কেমন ছিল?

আতাউর রহমান: স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের প্রথম নাটক ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকটি আমি নির্দেশনা দিয়েছিলাম। স্বাধীন দেশে নাট্যচর্চা করা বাঁধভাঙা আনন্দের মতো। সে সময় নাট্যচর্চায় রেনেসাঁস বা নবজাগরণ শুরু হলো। তখন বড় বড় নাট্যকারদের নিয়ে আমরা ঢাকা থিয়েটার, আরণ্যক, ঢাকা পদাতিক—এই দলগুলো মিলে নাট্যচর্চা শুরু করেছিলাম। মহিলা সমিতি, গাইড হাউস—এই দুই মঞ্চে অসাধারণ নাট্যকৃত্য করেছি আমরা। সপ্তাহে ৭-৮টি শো করেছি। তখন এত দর্শক ছিল যে অনেকে টিকিট পেত না। সে সময় যানজট ছিল না, এত চ্যানেল ছিল না।

নবজাগরণ ঘুরে ঘুরে আসে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমের সময় রেনেসাঁস স্তিমিত হয়ে পড়েছিল। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময় নবজাগরণ এলো। আমাদের দেশে ত্রিশ বছর পর হয়তো স্তিমিত হতে পারে। তারপর আবার নবজাগরণ আসবে নতুন প্রজন্মের হাতে। এটা আমি নিশ্চিত। কারণ, নাটককে পেশাদারি অর্জন করতেই হবে। আমরা সেদিকটায় ধাবিত হচ্ছি। সরকারও ভাবছে—নাটকের মানুষদের স্যালারি দেওয়া যায় কি না!

আতাইর রহমান

জাগরণ: থিয়েটার কি জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হওয়া উচিত?

আতাউর রহমান: আমাদের সময় আমরা অন্য কাজের পাশাপাশি থিয়েটার করেছি। তবে এখন আমরা মনে করছি, জীবিকার মাধ্যম যদি টেলিভিশন হতে পারে তাহলে থিয়েটার হবে না কেন! মঞ্চকর্মীদের বেতনের বিষয়টি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। এমনও হতে পারত, নাটকের একটি ভালো দলকে বছরে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হলো। এই টাকা দিয়ে দলটি বছরে দুটি নাটক করবে। বাকি টাকা বেতনের মতো করে দেওয়া হবে। কিন্তু শুধু এর মুখাপেক্ষী থাকতে বলব না আমি। মানুষ তো একই সঙ্গে দু-তিনটি পেশার সঙ্গে জড়িত থাকেন। অনেকে আছেন সারা দিন চাকরি করে সন্ধ্যায় অন্য কাজ করছেন। দেখুন, ভালোবাসার সঙ্গে পেশা মিলিয়ে ফেললে তো হবে না। এটা শুধু করপোরেট দুনিয়ায় সম্ভব। এসব শিল্পীর ক্ষেত্রে হয় না। অনেক খ্যাতিমান শিল্পী আছেন, যারা আর্থিক কষ্ট ভোগ করে মারা গেছেন। দুঃখ থেকেই সৃজনের সৃষ্টি হয়। বিত্ত মানুষকে অনেক সময় নষ্ট করে দেয়।

জাগরণ: স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের নাট্যচর্চা কি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে?

আতাউর রহমান: স্বাধীনতা-পরবর্তী ৩০-৩৫ বছর নাট্যচর্চা তুঙ্গে উঠেছিল। কলকাতার লোকেরা আমাদের নাটক দেখে ঈর্ষান্বিত হতো। এখন তো যানজট বেড়ে গেছে। যানজটের কারণে মানুষ চাইলেও নাটক দেখতে আসতে পারে না। সে জন্য আমরা ভাবছি, ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় মঞ্চ গড়ে তুলব। সারা দেশে যদি বিভিন্ন এলাকায় মঞ্চ থাকে তাহলে মানুষকে রাস্তার ধকল সহ্য করে নাটক দেখতে আসতে হবে না। সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। আস্তে আস্তে আরও উন্নতি হবে বলে আমার বিশ্বাস।