• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২১, ০৩:১৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ২৬, ২০২১, ০৯:৩৬ এএম

সরকারের উচিত এখন আইসোলেট টিম গঠন করা: ডা. বে-নজির আহমেদ

সরকারের উচিত এখন আইসোলেট টিম গঠন করা: ডা. বে-নজির আহমেদ

অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। দেশের করোনার পরিস্থিতি, লকডাউন, সংক্রমণের নতুন ধরন, মিউটেশন এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণসহ কয়েকটি বিষয়ে দৈনিক জাগরণের সঙ্গে আলাপ করেছেন তিনি। আলাপচারিতায় অংশ নিয়েছেন শাহাদাত হোসেন তৌহিদ


জাগরণ: বিধিনিষেধ প্রায় উঠে গেল, শপিং মলগুলো খুলে দেওয়া হলো, একজন চিকিৎসক হিসেবে বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

ডা. বে-নজির: এতে সংক্রমণ আবার বৃদ্ধির ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। কারণ, আমাদের সংক্রমণটা কমেছে, কিন্তু থেমে যায়নি। লকডাউন দেওয়ার ফলে আন্তজেলা চলাচল ছিল না। এক জেলা থেকে আরেক জেলা সংক্রমণ বেশি যায়নি। কিন্তু যখন লকডাউনটা উঠিয়ে দেওয়া হবে মানুষ এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাবে, বাজারে যাবে। একজন আরেকজনের সংস্পর্শে আসবে, সব মিলিয়ে আবার সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি সৃষ্টি হবে।

জাগরণ: তাহলে এ ক্ষেত্রে উপায় কী?

ডা. বে-নজির: লকডাউন ছাড়া আমাদের অন্যান্য যে ব্যবস্থাগুলো আছে, যেমন আইসোলেশন। এটাতে আমাদের জোর দিতে হবে। প্রত্যেক রোগীকেই যেন আইসোলেশেন রাখা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে। যেহেতু আমাদের রোগী কমে গিয়েছে সুতরাং এটা অসম্ভব না। আমাদের ঢাকা শহরে যদি জনস্বাস্থ্যের এ রকম পাঁচশ টিম থাকে, যারা এই আইসোলেশন নিশ্চিত করবে। প্রতিটা টিমে একজন ডাক্তার নেতৃত্বে দেবেন। সেখানে নার্স থাকবে, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকবে, স্বেচ্ছাসেবক থাকবে, পুলিশ থাকবে, স্থানীয় প্রতিনিধিরা থাকবেন। সবাই মিলে যে এলাকাগুলোতে রোগী আছে সেই রোগীগুলোকে যদি আইসোলেট করার ব্যবস্থা করবেন। যেমন ধরুন, যখনি আমাদের অধিদপ্তর থেকে একটা রোগীকে পজিটিভ পাওয়া যাবে তখন তাদের তালিকাটা ওই স্ব স্ব এলাকার টিমকে দেবে। তখন তারা তালিকা ধরে সেই রোগীর বাড়িতে যাবে। একদিকে রোগীকে চিকিৎসায় সাপোর্ট দেবে, দেখবে কী অবস্থায় আছে, তার হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন আছে কি না। থাকলে হাসপাতালে পাঠাবে। আর যদি হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন না থাকে, তাহলে বাড়িতে কীভাবে আইসোলেশন করবে, সেটা দেখাবে। যাতে করে পরিবারের আর কোনো সদস্য আক্রান্ত না হয়। এবং তাকে বোঝাবে, দেখাশোনা করবে। পরিবারের সদস্য যারা সংস্পর্শে আসছে তাদের নজরদারিতে রাখবে। তাদের টেস্ট করবে। এবং তাদের মধ্যে কেউ আবার শনাক্ত হলে তাকে দ্রুত আইসোলেট করবে। এটা যদি করা যায় তাহলে আমরা রোগের উৎসে ব্যবস্থা নিতে পারব। তখন অন্যান্য জায়গাগুলোতে কাজ তেমন না হলেও যেহেতু আমরা উৎসতেই নিয়ন্ত্রণ করলাম, তাহলে হয়তো কিছুটা এর রাশ টেনে ধরা যাবে। এটাই করা উচিত এখন। কারণ, লকডাউন আর সহসা দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি ভারত থেকে অধিক সংক্রমণ যাতে করে না আসে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে যাতে না আসে, সেই জন্য ১৪ দিনে জন্য কোয়ারেন্টাইন মেইন্টেইন করতে হবে। পাশাপাশি এই সময়ে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়াতে সরকারের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। আমাদের হাসপাতালগুলোর যেখানে যা ঘাটতি আছে লোকবল, ডাক্তার, নার্স, ক্লিনার সেগুলো ঠিক করা, তাদেরকে ট্রেনিং দেওয়া, যেখানে ওষুধপত্রের ঘাটতি আছে সেখানে সেগুলো পূরণ করা, অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা। সামনে যে রোগী বাড়বে তাদের জন্য ঠিকমতো ব্যবস্থা করা। এটিই বর্তমানে সরকারের কৌশল হওয়া উচিত।


যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের কথা বলতে পারি, তারা ইতিমধ্যে করোনাকে নিয়ন্ত্রণের পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ লোক এক ডোজ টিকা পেয়েছে।  ২২ ভাগ লোক ২ ডোজ টিকা পেয়েছে। এবং তারা আগামী মে-জুন মাসের মধ্যে যদি মোটামুটি ৭০-৮০ ভাগ টিকা দিয়ে ফেলতে পারে তাহলে তারা করোনাকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলবে। এ রকম ইউরোপের দেশগুলোতে তাই হতে যাচ্ছে।

জাগরণ: এরই মধ্যে নতুন ধরন ও মিউটেশনে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। এ নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ডা. বে-নজির: একেবারে নিয়মিত আমাদের জিনোম সিকোয়েন্স করতে হবে। ধরেন, ঢাকার বাইরে যেগুলো হচ্ছে তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক এ জিনোম সিকোয়েন্সি করতে হবে। সিলেট, চট্টগ্রাম এরকম শহরগুলোতে। যাতে করে আমরা বুঝতে পারি যে বাংলাদেশে কোন ভ্যারিয়েন্ট আসছে, কোন ভ্যারিয়েন্ট কী রকম সংক্রমণ করছে এবং সেই ভ্যারিয়েন্টগুলোর বৈশিষ্ট কী? তারা কতটা মারাত্মক। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। যদি মনে হয় কোনো একটা ভ্যারিয়েন্ট কোনো একটা এলাকায় খুব বাড়ছে, তাহলে ওই এলাকায় এলাকাভিত্তিক লকডাউন দেওয়া। যাতে করে ভ্যারিয়েন্টটা অন্যখানে ছড়িয়ে না পড়ে।

জাগরণ: করোনা নিয়ন্ত্রণের উপায় কী?

ডা. বে-নজির: ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে, এটা বলা কঠিন। তবে কিছু কিছু জিনিস এখন আস্তে আস্তে হচ্ছে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে একটা ব্যবধান তৈরি হবে। যে দেশগুলো ধনী তারা করোনা নিয়ন্ত্রণের দিকে এগোচ্ছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের কথা বলতে পারি, তারা ইতিমধ্যে করোনাকে নিয়ন্ত্রণের পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ লোক এক ডোজ টিকা পেয়েছে।  ২২ ভাগ লোক ২ ডোজ টিকা পেয়েছে। এবং তারা আগামী মে-জুন মাসের মধ্যে যদি মোটামুটি ৭০-৮০ ভাগ টিকা দিয়ে ফেলতে পারে তাহলে তারা করোনাকে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলবে। এ রকম ইউরোপের দেশগুলোতে তাই হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু ভারত যে রকম এবার উদাহরণ দিয়ে দেখাচ্ছে আমাদের মতো এ উন্নয়নশীল দেশগুলো মারাত্মক পরিণতিতে পড়তে পারে। যে রকম ব্রাজিলের হয়েছে, যে রকম ভারতের হয়েছে। এটা আমাদের সামনে খুব ভালো উদাহরণ, তার মানেই হলো যে গরিব দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের জন্য এটা আরও কিছুদিন সমস্যা হিসেবে থাকবে এবং দেশের মধ্যেও এটা ধনী দরিদ্রের পার্থক্য বাড়িয়ে দেবে। দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হবে, ধনীরা আরও ধনী হবে। তো, সামনে করোনার অবস্থাটা মোটামুটি এ রকম।