• ঢাকা
  • সোমবার, ২৪ জুন, ২০১৯, ১০ আষাঢ় ১৪২৬
Bongosoft Ltd.
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২, ২০১৮, ০৪:১৫ পিএম

দুনিয়া কাঁপানো সব সাইবার অপরাধী 

এস এম সাব্বির খান
দুনিয়া কাঁপানো সব সাইবার অপরাধী 

 

তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষের সাথে বাড়ছে বিব্রতি। নেটওয়ার্কিং দুনিয়ার বুকে হানা দেয়া তেমনি এক দস্যুর নাম 'হ্যাকিং'! বর্তমানে সারা পৃথিবী জুড়েই হ্যাকিং একটি পরিচিত শব্দ। বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায় যে, হ্যাকাররা সুরক্ষিত সব কম্পিউটার নেটওয়ার্ক আর কম্পিউটার সিস্টেম এর নিরাপত্তাবলয় ভেঙে লুটে নিচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য, হ্যাক করে নিচ্ছে নিরাপত্তা ও গবেষণা বিষয়ক কোনো তথ্য অথবা লুটে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অনেকের ক্ষেত্রে হ্যাকিং পেশা আবার কারো কারো ক্ষেত্র সেটি স্রেফ উন্মাদনা। তবে মজার বিষয়টি হচ্ছে এই আইন বহির্ভুত কাজে জড়িত প্রত্যেকেই দুর্দান্ত মেধাবী।

হ্যাকিং জগতে এমন জানা অজানা বহু নামের বিচরণ। তবে তাদের মাঝে কেউ কেউ আছেন যাদের তুলনা শুধুই তারা। এমন দুনিয়া কাঁপানো কয়েকজন হ্যাকারের সম্পর্কে জানা যাক তবে...


জন ড্রেপারঃ
হ্যাকিং-এর আদি পিতা হিসেবে খ্যাত এক অব্যর্থ হ্যাকিং কিং জন ড্রেপার। ১৯৭০ দশকে আমেরিকাতে ক্যাপ'ন ফ্রেঞ্চ নামে একটা খাবার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ক্যাপ'ন ফ্রেঞ্চ নামের বিখ্যাত খাবার নির্মাতা কোম্পানি তাদের পন্যের প্রচার কৌশল হিসেবে এর প্যাকেটের ভিতরে একটি খেলনা হুইসেল দেয়া শুরু করে। আর ড্রেপার এই হুইসেল দিয়েই দেখান তার খেল। একটি সক্রিয় টেলিফোন কল শেষ হলে টেলিফোন এক্সেঞ্জ থেকে যে স্বয়ংক্রিয় শব্দটি প্রদান করা হয় তার সাথে এই হুইসেলের হুবহু মিল আছে, যা খেয়াল করেন ড্রেপার। সে কল করার পর নির্দিষ্ট একটি সময়ে ওই হুইসাল দিয়ে শব্দ করতো যা থেকে এক্সেঞ্জ মনে করতো কলটি বোধয় শেষ হয়েছে। কিন্তু যেহেতু কলটি ছিল ড্রেপারের বানানো তাই বাস্তবে কলটি শেষ হত না। তাই হুইসেল বাঁজাবার পরে ড্রেপার ইচ্ছে মত কথা বলতে পারতো এবং এর জন্য তাকে বাড়তি কোন বিল দিতে হত না। কিন্তু 'চোরের দশ দিন গেরস্তের এক' দিন বলে কথা। বছর দুই এভাবে চলার পর অবশেষে ধরা পড়ে ড্রেপার আর সোজা গারদে।


কেভিন মিটনিকঃ
বিখ্যাত হ্যাকার কেভিন মিটনিক হ্যাকিং এর জগতে অন্যতম । হ্যাকিং জগতের বিস্ময় কাভিন ১৯৮১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে হ্যাকিং এর ভুবনে পদার্পন করেন। টুকটাক হ্যাকিং দিয়ে শুরু করলেও ক্রমেই এক ভয়ংকর হ্যাকিং মাস্টারে পরিণত হয়ে উঠেন তিনি ১৯৮৩ সালে। সে সময়ে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যালোলিনার ছাত্র ছিল সে। একদিন ইন্টারনেটে পূর্বসুরি আরপানেটে অ্যাকসেস পেয়ে যায় মিটনিক আর আরপানেট যেহেতু মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের একটি নেটওয়ার্ক ছিল সেহেতু মন্ত্রনালয়ের সকল স্পর্শকাতর ফাইল নিয়ে রীতিমত ছেলে খেলায় মেতে উঠেন তিনি। তবে সৌখিন হ্যাকার কেভিন কখনো এই ফাইল গুলোর অপব্যবহার করেছেন তেমন রেকর্ড পাওয়া যায়নি। পেন্টাগনের গোপন ফাইলে ঘুরে বেড়ানো ছিল তার শখের মতোই। কিন্তু এভাবে আর বেশিদিন চলে কি? আরপানেট-এর সিস্টেম এ্যাডমিন-রা টের পেয়ে যান যে কোনো এক দুষ্ট টিকটিকি নাগনা করছে তাদের সুরক্ষিত দুনিয়া জুড়ে আর এরপরেই আবিষ্কার হয় কাভিনের অস্তিত্ব। অবৈধ ভাবে কম্পিউটার সিস্টেমে প্রবেশ করার অপরাধে গ্রেফতার করা হয় তাকে এবং পাঠানো হয় সংশোধন কেন্দ্রে।

রবার্ট মরিসঃ
নিজের মেধাকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা নিয়েই হয়তো দুনিয়া জোড়া বিখ্যাত হতে হ্যাকিং এর খেলায় মাতেন মরিস। ১৯৮৮ সালে কর্নেল ইউনিভার্সিটির ছাত্র থাকা অবস্থায় মরিসের এক কডেই বাজিমাত! ৯৯ লাইনের এই কোডটি লিখে ছেড়ে দিয়েছিলেন বিভিন্ন নেটওয়ার্কে। যা খুব দ্রুত শত শত কম্পিউটারকে কাবু করে ফেলে। পরবর্তিতে এই কোড 'মরিস ওয়ার্ম' নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ধরা পরার পর মরিস আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলে, সে কোন খারাপ কাজ করে নি। কোড ছাড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইন্টারনেটের সাথে কতগুলো কম্পিউটার সংযুক্ত আছে তা বের করা। শত শত কম্পিউটারকে আক্রমন করার অপরাধে ১৯৮৯ সালে গ্রেফতার হয় মরিস। পরে অবশ্য আর্থিক দণ্ডেই দায় সারেন তিনি।


কেভিন পোলসেনঃ
মরিসের অধ্যয় শেষ না হতেই মার্কিন মুল্লুকে আসে আরেক হ্যাকিং স্টার। ১৯৮৯ সালে কেভিন পোলসেন নামের ২৪ বছর বয়সী এই যুবককে গ্রেফতার করে এফবিআই। কম্পিউটার ও টেলিফোন সার্ভারে আড়িপাতা ও তথ্য কব্জা করার দায়ে গ্রেফতার করা হয় তাকে। কিন্তু গ্রেফতার করে বেশীদিন আটকে রাখা যায়নি তাকে। বিচার শুরুর আগেই কৌশলে খাচা ছেড়ে পালায় সে। এর মধ্যে সে একটি ঘটনা ঘটায় লস এঞ্জেলেসে। সেখানকার একটি রেডিও স্টেশন একবার ঘোষণা দেয়, একটি নির্দিষ্ট দিনে তাদের কাছে যত কল আসবে তার মধ্যে ১০৩ নম্বর কলারকে দেয়া হবে একটি দামী পোর্শে গাড়ি! পোলসনও তার কাজের ধারা অনুযায়ী রেডিও স্টেশনের টেলিফোন সুইস বোর্ড লাইন হ্যাক করে বনে যান ১০৩ নম্বর কলার। তারপর দাবি করে পোর্শে গাড়িটি। কিন্তু এত কিছু করেও শেষ রক্ষা হয়নি বেচারার। দ্রুতই তার গুমোড় ফাঁস হয়। অবশেষে সেই পালিয়ে যাবার ১৭ মাসের মাথায় খাঁচায় আটকা পড়ে এই 'জেল ঘুঘু'।


ভ্লাদিমির লেভিনঃ
হ্যাকারদের জলসায় রীতিমত ডন বনে যাওয়া কুখ্যাত হ্যাকার ভ্লাদিমির লেভিনের মূল টার্গেট ছিল বিখ্যাত সিটি ব্যাংক। কয়েকটি কর্পোরেট ইউজারের পাসওয়ার্ড হ্যাক করে তাদের একাউন্ট থেকে সে সরিয়ে ফেলে ১০.৭ মিলিয়ন ডলার। এসব টাকা সরিয়ে ফেলে সেগুলো পাঠিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, ইসরায়েল ও জার্মানির কয়েকটি ব্যাংক একাউন্টে। এ কাজ অবশ্য লেভিন একা করে নি, তার সহযোগী ছিলো আরো চার-পাঁচজন। সুচতুর লেভিনের ভাগ্যে অলক্ষ্মীর দশা আসে তার সঙ্গী সাথীদের কয়েকজন বিভিন্ন দেশের ওই গোপন একাউন্টগুলো থেকে টাকা তুলতে গিয়ে ধরা পড়ায়। অবশেষে লেভিন নিজেও ধরা পড়ে ১৯৯৫ সালে। বিচারে তার ৩ বচরের জেল ও ২.৫ লাখ ডলার জরিমানা ধার্য করা হয়।


প্রযুক্তির জগতের বিস্ময়কর এসকল হ্যাকাররা প্রত্যেকেই ছিলেন দারুন মেধাবি। শুধু তাদের সেই মেধাকে ভালো পথে প্রয়োগ করতে পারেননি। কাভিন, মরিস, মিটনিকের মত ঘাগু হ্যাকিং দস্যুরাই যখন কুপোকাত হয়েছেন তখন আর নতুনদের কি বলা যায়। সময় থাকতে নিজেদের সেই মেধাকে সৃষ্টিশীল কাজে প্রয়োগ করলে হয়তো হ্যাকিং এর জগতে না গিয়ে এমন মেধাবিদের নাম ইতিহাসে ফুঁটে উঠতে পারে প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনের কিংবদন্তী হিসেবে।

 

 


লেখকঃ সহ-সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ


 

Space for Advertisement