• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০১৯, ১১:৪৯ এএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ২৫, ২০১৯, ০৪:০৯ পিএম

ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি (ছয়)

সিআইএ, বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং মার্কিন দূতাবাস

আবেদ খান
সিআইএ, বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং মার্কিন দূতাবাস

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর যাত্রা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে, সাতচল্লিশের সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের হাত ধরে। এই ট্রুম্যান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানিদের আত্মসমর্পণ ত্বরান্বিত করতে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ট্রুম্যানসৃষ্ট এই সিআইএ জন্মলগ্ন থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক গোলযোগ সৃষ্টি করছে, সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাচ্ছে, নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ও দেশপ্রেমিক সরকারগুলোকে উৎখাত করছে এবং স্বাধীনতা ও মুক্তি আন্দোলনের জনপ্রিয় নেতাদের হত্যা করে নিজেদের পছন্দসই সরকার প্রতিষ্ঠা করছে। কোরীয় যুদ্ধের সূত্রপাত এবং কঙ্গো ও ইরানের সরকার উৎখাত করে একনায়কদের অধিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে এই ঘাতক সংস্থাটি। নিজেদের স্বার্থে সিআইএ একদিকে যেমন প্রকাশ্যে আমেরিকা-বিরোধী গোষ্ঠী আল কায়েদার মতো জঙ্গিগোষ্ঠী  সৃষ্টি করেছে, তেমনি কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নে শীর্ষ মাদক চোরকারবারী ও মাফিয়াদের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছে। ৭২ বছর বয়সী এ সংস্থার ইতিহাস এক দীর্ঘ চক্রান্ত  ষড়যন্ত্রের রক্তাক্ত ইতিহাস। তবে সিআইএর গোপনীয়তার দেয়াল এতই শক্তিশালী যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তেমন কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা যায় না। যেকোনো অভিযোগই অস্বীকার করতে পারে সংস্থাটি। সিআইএর অবসরপ্রাপ্ত এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা টম ডনোহই স্বয়ং এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সিআইএ এমন কিছুই করে না, যা অস্বীকারের ক্ষমতা তার নেই।’ 

মার্কিন টিভি ব্যক্তিত্ব ও ‘ফোনিক্স প্রোগ্রামের’ লেখক ডগলাস ভ্যালেন্টাইন সিআইএকে ‘মার্কিন সরকারের সংগঠিত অপরাধ সংস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মার্কিন পত্রিকা লারস শেলে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘সিআইএ যা কিছুই করে, সব বেআইনি। কারণ সরকার সংস্থাটিকে এক অচ্ছেদ্য গোপনীয়তা অবলম্বনের এখতিয়ার দিয়ে রেখেছে। সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন অপরাধী সংগঠনের ব্যবস্থাপকের কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যার জন্য সংস্থাটি আমেরিকার শীর্ষ মাদকদ্রব্য চোরাচালানকারী সান্তো ত্রাফিকান্তেকে নিয়োগ করেছিল। এর বিনিময়ে সান্তোকে কয়েক টন মাদকদ্রব্য আমেরিকায় আনার ছাড়পত্র দিয়েছিল। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। মাফিয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের অন্ধকারের শক্তির সঙ্গেই এর লেনদেন রয়েছে।’ 

স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে জার্মান নাৎসি বিজ্ঞানীদের একটি দল নিয়োগ করে সিআইএ। আমেরিকা ও এর বাইরে ক্রিয়াশীল এ বিজ্ঞানী দলটির কাজ ছিল নাৎসি জার্মানির অধীনে তৈরি করা বিভিন্ন জৈবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র সংগ্রহ করা। একইসঙ্গে এ ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র প্রস্তুতেও গবেষণা করা। বহু বিস্তৃত এ প্রকল্পের আওতায়ই বিখ্যাত চন্দ্রাভিযান প্রকল্প করা হয়েছিল। এখানে উল্লেখ করা যায় ‘অপারেশন ক্যাওস’-এর কথা। বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলন, কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার, নাগরিক অধিকার  এবং সামাজিকভাবে গড়ে ওঠা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনসমূহকে  নানা কৌশলে দমন ও নিশ্চিহ্ন করতে এ প্রকল্প নেয়া হয়। ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশক উপলক্ষ করে এ প্রকল্প হাতে নেয়া হলেও এখনো তা নানা আঙ্গিকে চলমান রয়েছে।  

জন্মমুহূর্ত থেকেই সিআইএ সংবাদমাধ্যমের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। বিভিন্ন পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মিত তথ্য পরিবেশনই এর মূল কার্যক্রম। সিআইএর রয়েছে মাদক প্রভাবিত তথ্য আদায়ের এক অভাবনীয় প্রকল্প। ১৯৫০ সালে এ প্রকল্প শুরু করে সংস্থাটি। মানুষের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এ প্রকল্প আক্ষরিকভাবে সাফল্য না পেলেও, সারা বিশ্বের মানুষের মনে বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যমান অনিশ্চয়তাবোধকে এর একটি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে সহজেই উল্লেখ করা যায়। 

সিআইএ অনেক সময় কোনো কারণ ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজের গরজে বিভিন্ন দেশে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালিয়ে থাকে। যদি সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নির্দেশ আসে তাহলে কোনো দেশের জাতীয় নেতাকে হত্যা করাটা রীতিমতো পবিত্র দায়িত্ব, কর্তব্য ও দেশপ্রেমমূলক কাজ বলে মনে করে। সিআইএ মনে করে কমিউনিস্ট নেতারা খারাপ। সকল মার্কিনবিরোধী রাজনীতিক অগণতন্ত্রী। দেশপ্রেমের সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো রাষ্ট্রপ্রধানের কাছ থেকে যে কোনো নির্দেশ পেয়ে সেটা অন্ধের মতো পালন করা। সিআইএ এভাবে অন্ধের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করলেও এসব তৎপরতা সম্পর্কে মার্কিন সরকার এমন আচরণ করে যে তারা এসবের কিছুই জানে না। এসব বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ ও অন্ধকারে।  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রো   - ফাইল ছবি 

১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে একনায়ক শাহ সরকারের পত্তন করেছিল সিআইএ। পেছনে কাজ করেছিল জ্বালানি স্বার্থ, যা মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে আজও। আজকের ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার মূল সূত্রটি ওই ঘটনাতেই ভিত গেড়ে আছে। ইরানের পর ১৯৫৪ সালে গুয়েতেমালার প্রেসিডেন্ট কার্লোস কাস্টিলো আর্মস, ১৯৬১ সালের কঙ্গোর স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বা, ১৯৬১ সালে দক্ষিণ আমেরিকার ডোমিনিকান রিপাবলিকের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল লিওনিদাস ট্রুজিলো, ১৯৬৩ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট নগো দিন দায়েম, ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্ত, ১৯৭৩ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দে এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে নিজেদের পছন্দসই সরকার বসিয়েছিল সিআইএ। আলেন্দেকে হত্যার কথা সিআইএ স্বীকার করেছে। গত প্রায় সাত দশক ধরে সিআইএ এমন অজস্র অমানবিক ও নৃশংস হামলা পরিচালিত করেছে। সেই সঙ্গে এসব হামলার যথার্থতা প্রমাণ করতে ও প্রেক্ষাপট সৃষ্টির জন্য কত যে প্রহসন ও নাটকের মঞ্চায়ন করেছে, অজস্র মিথ্যা গল্প ও গুজব ছড়িয়েছে সেসব কাহিনী বলে শেষ করার উপায় নেই। অথচ এই কুখ্যাত সংস্থাটির অঘোষিত শ্লোগানটি কি জানেন, ‘সত্য জানার অধিকার তোমার আছে, আর সত্যই তোমাকে মুক্ত করবে।’  সিআইয়ের এই শ্লোগান বিশ্ব মানবতার জন্য এক নির্মম প্রহসন বৈকি!

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরি করতে মার্কিনিরা কীভাবে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করছিল সেটা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। এই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি ছাড়াও সিআইএ এবং তাদের এদেশীয় দোসররা যে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কত মিথ্যা গালগল্প ও গুজব ছড়িয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টিতে কীভাবে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে সেসব আমরা পর্যায়ক্রমে তুলে ধরব।  

সিআইয়ের কার্যক্রম শুধু সাম্রাজ্যবাদী সামরিক হামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, আরো নানারকম অভিনব উপায়ে বিশ্বের দেশে দেশে, বিশেষভাবে তৃতীয় বিশ্বের প্রান্তিক ও অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম রেখেছে, অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতার মাধ্যমে হত্যা অথবা ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে, সেটি শুধু কয়েক বছরের ঘটনা নয়। গত প্রায় সাত দশক ধরে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, এমনকী ইউরোপের অনেক দেশেও তাদের বহুবিধ অপকর্ম চলছে। এদের অপকর্মের তালিকা শেষ হওয়ার নয়। হত্যা, গুপ্তহত্যা, যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্র এসবই লেগে আছে ৭২ বছর বয়সী সিআইএর প্রতিটি অংশে।

আগেই বলেছি সিআইয়ের উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার ব্লুপ্রিন্ট এবং গঠিত হয়েছিল প্ল্যানিং সেল। আর এসব ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল মার্কিন দূতাবাস। মার্কিন দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্রে প্রকাশ- বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িতদের মার্কিন দূতাবাসের অফিসিয়ালদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ১৯৭৪ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭৫-এর জানুয়ারি মাসে দূতাবাসের মধ্যে দফায় দফায় মিটিং হয়। মার্কিন গোয়েন্দা চক্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার সঙ্গে আমেরিকা কীভাবে, কতখানি যুক্ত- তা প্রকাশ করেছেন মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুল্টজ তাঁর ‘বাংলাদেশ : দ্যা আনফিনিসড রেভ্যুলেশন’ গ্রন্থে। লিফসুল্টজ বলেছেন, দূতাবাসের এই প্রকাশ্য মিটিং বন্ধ হয়ে গেলেও ঢাকাস্থ সিআইএর স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরী তার চ্যানেল ওপেন রাখেন। লিফসুল্টজ নিউইয়র্কের ‘দি নেশন’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক কাই বার্ডের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন সমীক্ষা চালিয়ে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছন যে, বঙ্গবন্ধু হত্যায় আমেরিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

‘বাংলাদেশ : দ্যা আনফিনিসড রেভ্যুলেশন’ গ্রন্থের লেখক মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুল্টজ   - ফাইল ছবি

ঐ বইয়ে লিফসুল্টজ আরো কয়েকটি তথ্য তুলে ধরেছে- এক.  মার্কিন বিদেশ দপ্তরের অফিসাররা তাঁদের বলেছেন, যে চক্রটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে তাদের প্রতিনিধিগণ ১৯৭৪ সালের শরৎকালে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে এসে এ ব্যাপারে সাহায্য চায়। দুই. ঐ বিদেশ দপ্তরের সূত্র থেকেই জানা যায়, ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সিআইয়ের স্টেশন চিফ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিন পর্যন্ত চক্রান্তকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। ঐ সূত্রেই লিফসুল্টেজকে জানিয়েছে যে, মাহবুবুল আলম চাষী, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, এবিএস সফদার ছিলেন তখন মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএর মুখ্য এজেন্ট। এই সফদার যুক্তরাষ্ট্রে সিআইয়ের পোষকতায় পরিচালিত বিভিন্ন স্কুলে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। ১৯৭৫ সালের আগস্টে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা সে অনেকদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিয়েছিল।

ঢাকার সিআইএর স্টেশন চিফ (১৯৭৪-১৯৭৬) ফিলিফ চেরি ভারতীয় সাংবাদিক পরেশ সাহাকে (ঢাকায়) বলেছেন, ঘাতক চক্রের সঙ্গে সিআইএর যোগাযোগটা এত ভালো ছিল যে, অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে পেরেছিলেন। ফিলিপ স্বীকার করেন যে, তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রে খবর পাঠান, তখনও (ঢাকায়) অভ্যুত্থান চলছিল। অন্যদিকে মার্কিন বিদেশ দপ্তরের জনৈক উচ্চপদস্থ অফিসার জানান, বঙ্গবন্ধুবিরোধী অভ্যুত্থানের সঙ্গে ফিলিপ চেরি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। বিদেশ দপ্তরের ঐ অফিসার ও অন্যান্য সূত্র বলেন, ‘মোশতাক চক্রের সঙ্গে এই যোগাযোগ ছিল ১৯৭১ সালে, সেই কলকাতা থেকেই। তৎকালীন মার্কিন বিদেশ মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ-পাকিস্তানের একটি পৃথক শান্তি চুক্তি সম্পাদনের জন্য মোশতাক চক্রের সঙ্গে আলোচনা করেছিলো। ১৯৭১ সালে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি পর প্ল্যানিং সেল গঠনের জন্য সিআইয়ে আবার তাদের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ করে।

ঢাকায় নিযুক্ত সিআইএর স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি অপর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ব্যাপারটা তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন। কিন্তু... চেরি তাঁর কথা শেষ করেননি। তা শেষ না করলেও বোঝা যায়, তিনি কি বলতে চেয়েও বলতে পারেননি। সম্ভবত তিনি বলতে চেয়েছিলেন, যা ঘটেছে সে সম্পর্কে সব কিছুই তাঁর আগে থেকেই জানা ছিল। কিন্তু সরকারি গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সেসব কথা বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

এদিকে ঢাকার মার্কির দূতাবাস তিন দিন আগেই পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট ছুটির দিন ঘোষণা করেছিল। এ ছুটি ছিল তালিকা বহির্ভূত। ওই দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এক্ষেত্রে যে কারো মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, ঢাকার মার্কিন দূতাবাস ১৫ই আগস্ট হঠাৎ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল কেন? এর উত্তরটাও বেশ সহজ, কেননা  তাদের কাছে আগাম খবর ছিল, ঐদিন সৈন্যবাহিনীর একদল চক্রান্তকারী অফিসার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করবে। অন্যদিকে ঐ বছর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মাহবুবুল আলম চাষী ছিল তার রাঙামাটির খামার বাড়িতে। দ্বিতীয় সপ্তাহের গোড়ায় সে কুমিল্লায় আসে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিন-তিনেক আগে সে গা ঢাকা দেয় ঢাকায়। ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে  হত্যার পর তাকে দেখা যায় ঢাকা বেতার কেন্দ্রে। নতুন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাকের পাশে। 

বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের যে ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল এ বিষয়েটি আরো কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণে বেশ পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায়। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রথম ঘোষণা আসে ওয়াশিংটনে ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ থেকে। এই ঘোষণা দ্রুত পৃথিবীময় ছড়িয়ে যায়, তখনও অভ্যুত্থানের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। হত্যাকারীদের গাড়িগুলো তখনও ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়ে এদিক সেদিক ছুটোছুটি করছে।  

ঘাতকের গুলির আঘাতে রক্তাক্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিথর দেথ    - ফাইল ছবি

ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ স্টেশনের চিফ ফিলিপ চেরি স্বীকার করেছেন, চক্রান্তকারীদের সঙ্গে বরাবরই তার যোগাযোগ ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যার সংবাদ তিনিই ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। ‘ভয়েস অব আমেরিকা’ সেই সংবাদ বুলেটিনও প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে আমেরিকার চক্রান্ত কতটা গভীর ছিল। এখানে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এটা এই যে বঙ্গবন্ধু হত্যার সেই বীভৎস কালো রাতে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের অবস্থা কী ছিল? আগেই থেকেই ১৫ই আগস্ট দূতাবাসের ছুটির দিন বলে ঘোষণা করা হলেও সারারাত ঐ দূতাবাসে ছিল অসীম কর্মব্যস্ততা। দূতাবাসের উচ্চপদস্থ অফিসারদের অধিকাংশই সেদিন অফিসে রাত কাটিয়েছেন। এ বিষয়ে ভারতীয় সাংবাদিক পরেশ সাহা তাঁর ‘মুজিব হত্যার তদন্ত’ বইয়ে বলেছেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানতে পেরেছি, শেখ মুজিবকে যেদিন হত্যা করা হয়, সেদিন রাতে মার্কিন দূতাবাস খুবই কর্মচঞ্চল ছিল। উচ্চপদস্থ অনেক অফিসারই সেদিন ঘুমোতে যাননি। ...ঐ অভ্যুত্থানের সময় শেখ সেলিম ও শেখ মারুফ তাঁদের বাড়িতে নিকটবর্তী মার্কিন দূতাবাসের প্রধান সচিবের বাড়িতে আশ্রয় নিতে যান। কিন্তু প্রধান সচিব তখন বাড়ি ছিলেন না। সারারাতই তিনি দূতাবাসে কাটিয়েছেন। তাঁর পত্মী শেখ ভ্রাতৃদ্বয়কে বাড়িতে বসিয়ে স্বামীর কাছে টেলিফোন করেন। সব কথা জানান। প্রধান সচিব ওয়াশিংটন থেকে অনুমতি আনিয়ে মাত্র দিন কয়েকের জন্য তাঁদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিতে সম্মত হন। অবশ্য শেখ সেলিম ও তাঁর ভাই একদিনের বেশি সে বাড়িতে থাকেননি।’

আবার পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট সকাল থেকে আবছা মেঘের আড়ালে একটি গাড়ি ঢোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। গাড়িটি পূর্ব দিক থেকে পাশ্চিম দিকে যায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাস্তায় কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে বাইরে চলে যায়। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গোলাগুলি চলেছে। গাড়িটির বিবরণ ও প্লেট নম্বর দেখে অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম নিশ্চিত হন যে গাড়িটি মার্কিন দূতাবাসের। ১৫ আগস্ট সকালে ওই গাড়িটি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। আবার বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘাতক ফারুক বলেছে, তার লোকেরা যখন হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিল তখন ঢাকার রাজপথে বহুসংখ্যক মার্কিন দূতাবাসের গাড়ির আনাগোনায় সে অবাক হয়ে যায়...

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার রাতে (১৯৭৫ সালের ১৪-১৫ আগস্ট) ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের প্রধান সচিব বাসায় ফেরেননি। সারারাতই দূতাবাসে ছিলেন। কেন ছিলেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে, একটা সিদ্ধান্তই আমাদের মনে আসবে, ঐদিন ভোর রাতে (ইংরেজি ক্যালেন্ডার মতে ১৫ আগস্ট) অভ্যুত্থানের খবর তাদের কাছে ছিল। ১৫ই আগস্ট রাতে ঐ দূতাবাসের এ ধরনের কর্মব্যস্ততা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্ত আসতে পারি যে, ঐ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল। 

আমাদের সংগৃহীত তথ্যাদিও প্রমাণ করে যে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে যে আন্তর্জাতিক দুষ্টচক্র কাজ করে, তাদের প্রধান ছিল মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ। এর পরই পাকিস্তান ও পশ্চিম এশিয়ার দুএকটি মুসলিম রাষ্ট্র- বিশেষ করে সৌদি আরবের স্থান। এই আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীর দলই বাংলাদেশে তাদের ক্রীতদাসদের দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক, সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটিয়েছে। বাংলার মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রধান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এর উদ্দেশ্য একটাই। বাংলাদেশের পালের হাওয়াকে অন্য পথে ঘুরিয়ে দেয়া। বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের তল্পিবাহক করা। কিন্তু চক্রান্তকারীদের এ উদ্দেশ্য যে পুরোপুরি সফল হয়নি, বাংলাদেশের পরবর্তী ইতিহাসে তার প্রমাণ মিলবে। 

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ।

[ পরবর্তী পর্ব প্রকাশিত হবে আগামী ২৯ আগস্ট ]

আরও পড়ুন