• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯, ০৩:১৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯, ০৬:০১ এএম

ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি (নয়)

জাসদের জন্মরহস্য

আবেদ খান
জাসদের জন্মরহস্য

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদের আবির্ভাব এবং অবিশ্বাস্য বিস্তার যেমন রহস্যজনক, ঠিক তেমনি চমকপ্রদ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা এবং মুক্তিযুদ্ধের অর্জন বিধ্বস্ত করার লক্ষ্যেই জাসদের জন্ম ঘটানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশের বিপ্লবী রোমান্টিসিজম বিস্ময়করভাবে মুক্তিযুদ্ধের সূচিমুখকে বারবার বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত করেছিল। ফলে কখনো কখনো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতির ঘটনা ঘটেছিল। এর ফলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী শক্তিসমূহের কাছে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে অস্বস্তিকর বার্তা পৌঁছাচ্ছিল। আর এর পরিপূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল মুজিবনগর সরকারের ‘মধ্যে’ ঘাপটি মেরে বসে থাকা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি এবং তাদের প্রভু পাক-মার্কিন চক্র। আর স্বাধীনতার পর জাসদের বিভিন্ন হটকারী কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

বঙ্গবন্ধু হত্যা চক্রান্তের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে, এই চক্রান্তের সামনে রাখা হয় আওয়ামী লীগের একটি স্বার্থান্বেষী মহল এবং কয়েকজন ছদ্মবেশী মুক্তিযোদ্ধাকে। এই বীভৎস ষড়যন্ত্রের পেছনে আমেরিকা, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সম্পূর্ণ আড়াল করতেই এই কৌশল অবলম্বন করা হয়। এ জন্য এই হত্যা চক্রান্তের সঙ্গে পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত সৈন্য বা অফিসারকে যুক্ত করা হয়নি। আরো একটি দুরভিসন্ধি থেকে এই চক্রান্তের সঙ্গে কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ছদ্মবেশী মুক্তিযোদ্ধাদের যুক্ত করা হয়। এটা হলো, আমাদের মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে খুনের দায় খোদ তারই দল আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর চাপিয়ে সকল মুক্তিযোদ্ধার ভাবমূর্তি নষ্ট করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দল আওয়ামী লীগকে কলঙ্কিত করা। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সুচতুরভাবে দেশ স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‍ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে জাসদের উত্থান ঘটানো হয়। আর জাসদ যাতে অতি দ্রুত বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে পারে, এ জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে সিআইএ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল সরকারগুলোকে উৎখাতের লক্ষ্যে এবং দেশের মধ্যে অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে মার্কিন গোয়েন্দ‍া সংস্থা সিআইএ একদিকে যেমন মৌলবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীকে সহযোগিতা করে, তেমনি কথিত প্রগতিশীল উগ্রপন্থী রাজনৈতিক দল সৃষ্টি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। সিআইএ জন্মের পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই কৌশল প্রয়োগ করে আসছে, আর এখনো তা চলছেই।

উত্থান পর্ব
তদানীন্তন ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট নূরে আলম সিদ্দিকীর সংসদীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র উত্তরণের হুংকার, অন্যদিকে আ স ম রবের নেতৃত্ব বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লম্ফঝম্ফে ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই একই দিনে বঙ্গবন্ধু নূরে আলম সিদ্দিকী আহূত ছাত্রলীগের সম্মেলনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত হন। অন্যদিকে পল্টন ময়দানে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও সশস্ত্র সংগ্রামের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেয়া হয়।

ছাত্রলীগের এই ভাঙন অচিরেই আওয়ামী লীগের শ্রমিক, কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা ফ্রন্টগুলোতেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। পরিণতিতে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর ‘বিপ্লবে পরিপূর্ণতা প্রদান ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার স্লোগানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। মুজিব বাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ সমাজের একটি বিরাট অংশ জাসদের কাতারে এসে শামিল হয়। জাসদ গঠিত হওয়ার পর স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে জাসদকে ব্যবহার করে। স্বাধীনতাবিরোধী পুঁজিপতি, শোষক শ্রেণি এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহ নিজ নিজ স্বার্থে জাসদকে অর্থ, সম্পদ ও অন্যান্য নানা রকম সাহায্য-সহযোগিতা দিতে থাকে।

ওই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান আর্থসামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এবং আসন্ন খাদ্য সংকটের মুখে ১৯৭৪ সালের জুলাই মাসে জাসদ কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী গণবাহিনী গঠন করে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাহেরের সঙ্গে যথাযথ সংযোগ রক্ষা করে চলতেন সেনাবাহিনীর ডেপুটি প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

নাশকতামূলক তৎপরতা
যাত্রা শুরুর পর থেকেই জাসদ প্রকাশ্যে অনিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু করে। এর পাশাপাশি চালাতে থাকে চোরাগোপ্তা হামলা, খুন, ডাকাতি, রাহাজানি ও হাইজ্যাকিং। এতে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। প্রতিদিনই গোপন হত্যা, কিডন্যাপিং, হাইজ্যাক, ডাকাতি খবরের কাগজে ফলাও করে প্রচারিত হতে থাকে। এক সরকারি হিসাবে দেখা গেছে, ১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৩ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে ২ হাজার ৩৫টি গোপন খুন, ৩৩৭টি কিডন্যাপিং, ১৯০টি ধর্ষণ, ৪ হাজার ৯০৭টি ডাকাতি এবং ৪ হাজার ২৫ জন নিরীহ মানুষ উগ্রপন্থী দুষ্কৃতকারীদের হাতে প্রাণ হারায়।

১৯৭৪ সালে দেশব্যাপী নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে জাসদ মরিয়া হয়ে ওঠে। তাদের একের পর এক নাশকতামূলক কার্যক্রমে  আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, একদিকে জাসদের গণবাহিনী এবং অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধী কথিত বাম উগ্রপন্থ‍ী চক্র মিলে ১৫০টি ছোট-বড় হাটবাজার, অর্ধশতাধিক ব্যাংক, প্রায় দুই ডজন থানা ফাঁড়ি লুট করে। গ্রামগঞ্জে হাজার হাজার ডাকাতির ঘটনা ঘটায়। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করতে ব্যাপক নাশকতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিভিন্ন স্থানে পাটের গুদামে আগুন দেয়। ১৯৭৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত রাশিয়া কর্তৃক নির্মিত ঘোড়াশাল সার কারখানা কন্ট্রোল রুমটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের মাধ্যমে উড়িয়ে দেয়। এর ফলে প্রায় ১০ মাস এই কারখানা বন্ধ থাকে এবং ওই বছর সার ঘাটতি হয় প্রায় এক লাখ টন। এতে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়।

১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর চারদিকে শোনা যায় দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি। এই সুযোগে সকল আন্ডারগ্রাউন্ড সশস্ত্র দলগুলো তাদের কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করে। ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে এক বেতার ভাষণে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের তিন হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে চারজন জাতীয় সংসদ সদস্যকে।’ এ পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে জাসদ সশস্ত্র গ্রুপসমূহের সমন্বয় সাধনের উদ্যোগ নেয়।

সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক
বাকশাল গঠনের পর জাসদ জনগণের প্রতি সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতির আহ্বান জানায়। তাদের প্রচারপত্রে বলা হয়, গণতান্ত্রিক রাজনীতির মাধ্যমে এই সরকারকে অপসারণের আর কোনো পথ খোলা না থাকায় সশস্ত্র বিপ্লবের পথেই শাসনক্ষমতা দখল করতে হবে। জাসদ বিপ্লবী গণবাহিনীতে যোগদানের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়। পরবর্তীকালে দেশবাসীর প্রতি মেজর জলিল ও আ স ম রবের এক যৌথ বিবৃতিতে  দাবি করা হয়, ‘শেখ মুজিবের ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ’ প্রতিরোধের জন্য খুবই গোপনে অথচ তৎপরতার সাথে গড়ে তোলা হয়েছে দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, প্রাক্তন সৈনিকের সমবায়ে বিপ্লবী গণবাহিনী। এবং অতি গোপনে বাংলাদেশের প্রতিটি সেনানিবাসে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ সংগঠিত করা হয়।

আ স ম রব ও মেজর জলিল

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‍বাড়ি ঘেরাও
১৯৭৪ সালের ২০ জানুয়ারি ও ৮ ফেব্রুয়ারি জাসদ সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই কর্মসূচিকে সামনে রেখে দেশব্যাপী বিভিন্ন স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ও গুলি চালায়। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে জাসদ পল্টন ময়দানে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেয়। এ সমাবেশে মেজর জলিল ও আ স ম আবদুর রব জ্বালাময়ী ও উসকানিমূলক বক্তৃতা দেন। এতে  সমাবেশের সবাই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সভা শেষ হতে না হতেই সমাবেশকারীরা মিছিলসহকারে মিন্টো রোডের দিকে রওনা হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল জঙ্গি ভাব। এ মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর জলিল ও আ স ম রব। মিছিলটি গিয়ে থামে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর বাড়ির সামনে। মিছিলকারীরা মুহুর্মুহু স্লোগানে এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে। একপর্যায়ে জাসদের বিক্ষোভকারীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির গেটে আগুন দেয় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েক ট্রাক পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর সদস্য এসে উপস্থিত হয়। তারা পাল্ট‍া গুলি ছুড়লে বিক্ষোভকারীরা এলোপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। অনেকেই হতাহত হয়।

এই সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বটি সেসময় ইত্তেফাকের রিপোর্টার হিসেবে আমি পালন করি। সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়, ৩ জন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে জলিল, রব, মমতাজ বেগম ও মঈনউদ্দীন খান বাদল ছিলেন। তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মমতাজ বেগম তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ পরীক্ষার্থী। কোর্টে রিট করে তিনি প্যারলে মুক্তি পান। জাসদ দাবি করে, ওই দিনের ঘটনায় অত্যন্ত ৫০ জন নিহত হয়েছে। এ অবস্থায় জাসদ হাইকমান্ড সর্বত্র সশস্ত্র প্রতিরোধের নির্দেশ পাঠায়।

১৭ মার্চ প্রসঙ্গে রবের ভাষ্য
১৭ মার্চের ঘটনা সম্পর্কে আ স ম আবদুর রবের ভাষ্য এ রকম, “আমাদের অনুমান ছিল মিছিলে পুলিশ বাধা দিতে পারে। তাই আমরা তিন ভাগ হয়ে তিনটি পথে যাই এবং পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসার সামনে জড়ো হই। চারদিকে স্লোগান চলছে। আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আমরা একটা স্মারকলিপি দেব। কিন্তু তিনি বাড়িতে ছিলেন না। ওই দিন তিনি কেরানীগঞ্জে একটা জনসভায় ছিলেন। কয়েকজনকে দেখলাম বাড়ির গেটে আগুন দিচ্ছে। লোহার গেটে কি আগুন ধরে? হঠাৎ কোত্থেকে কয়েক ট্রাক পুলিশ আর রক্ষীবাহিনী এল। শুরু করল গুলি। জলিল ভাই, মমতাজ আর আমি একসঙ্গে ছিলাম। ইনু কমান্ড দিল, ‘সবাই শুয়ে পড়েন।’ আমরা শুয়ে পড়লাম। বৃষ্টির মতো গুলি যাচ্ছে কানের পাশ দিয়ে, চুলের ভেতর দিয়ে। হঠাৎ দেখলাম, ইডেন কলেজের ছাত্রী মুকুল দেশাই গুলি খেয়ে পড়ে গেল। জাহাঙ্গীর আমার কাছেই ছিল। গুলি লেগে সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেল।” (জাসদের উত্থান-পতন ও অস্থির সময়ের রাজনীতি, পৃষ্ঠা নং-১১০ ও ১১১)

 

রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া
জাসদের এহেন হটকারী কর্মকাণ্ড বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। ১৭ মার্চ এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলী জাসদের উসকানিমূলক ও উত্তেজনা সৃষ্টির রাজনীতির সমালোচনা করে বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, “জাসদের নেতৃত্ব সংকটের প্রতিবাদের নামে ‘জ্বালাও-পোড়াও’, ‘অস্ত্রের বদলে অস্ত্র’, ‘ঘেরাও’ প্রভৃতি উগ্র হিংসাত্মক কার্যপন্থা গ্রহণ করিয়া দেশকে বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাতের দিকে ঠেলিয়া দেওয়ার প্রয়াস পাইয়াছে। ...আমাদের পার্টি সুস্পষ্টভাবেই মনে করে যে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও উহার রাজনীতি দেশ ও জাতির স্বার্থবিরোধী। দেশের ও জনগণের স্বার্থেই এই রাজনীতির মোকাবিলা করা দরকার। তাই জাসদ নেতৃত্বের রাজনীতি, বিশেষত দেশে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য তাহাদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধভাবে রুখিয়া দাঁড়াইবার জন্য আমরা দেশের শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও অন্যান্য জনগণকে আহ্বান করিতেছি। এই সঙ্গে জনজীবন সংকটের প্রতিকারকল্পে যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা সরকারের নিকট আহ্বান জানাইতেছি এবং সমস্ত দেশপ্রেমিক শক্তিগুলি যাহাতে ঐক্যবদ্ধভাবে এ জন্য আন্দোলন গড়িয়া তোলেন, সে জন্য তাহাদের নিকট আহ্বান জানাইতেছি।”

দলের মধ্যেই বিভ্রান্তি ও বিতর্ক
১৭ মার্চের মিছিল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও নিয়ে জাসদের মধ্যে অনেক বিতর্ক হয়। প্রথম প্রশ্ন ছিল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি কেন ঘেরাও করতে হবে, গণভবনে নয় কেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, প্রথম গুলি কারা ছুড়েছে। জাসদের পক্ষ থেকেই প্রথম গুলি ছোড়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। এ প্রসঙ্গে জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির কৃষি সম্পাদক হাবিবুল্লাহ চৌধুরীর মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূণ। হাবিবুল্লাহ চৌধুরীর স্ত্রী মমতাজ বেগম ছিলেন জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলা সম্পাদক। হাবিবুল্লাহ চৌধুরীর ভাষ্যটি এমন, “মমতাজ আমারে কইছিল, গুলি প্রথমে আমরার লোকরাই করছিল। পরে মে মাসে আজিমপুরে চায়না বিল্ডিংয়ের তিনতলায় তিন দিন বৈঠক হয়। প্রথমে শুনলাম, গুলি করছে হাবিবুল হক খান বেনু। পরে জানলাম, এইডা হাসানুল হক ইনুর কাম। সিরাজুল আলম খানরে জিগাইলাম, পোলাপান সব মইরা যাইতেছে, কী ছাতার বিপ্লব করেন। সে জওয়াব দেয় না। প্রশ্ন করলেই সাইড কাইট্টা যায়। কোনো আলোচনা হইতে দেয় নাই। ভলিউম ঘাঁইট্টা খালি তত্ত্ব ঝাড়ে।” (জাসদের উত্থান-পতন ও অস্থির সময়ের রাজনীতি, পৃষ্ঠা নং-১১৩)

ব্যাখ্যাটি হাস্যকর!
চুয়াত্তরের ১৭ মার্চ জাসদের অনেক নেতা ঢাকায় ছিলেন না। দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে কাজী আরেফ আহমেদ ছিলেন সিলেট, শরীফ নুরুল আম্বিয়া ছিলেন যশোর, মনিরুল ইসলাম ছিলেন দাউদকান্দি আর  মাসুদ আহমদে রুমী ছিলেন রংপুরে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েন রুমী। তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল এমন : ‘এমনটা তো হওয়ার কথা নয়?’ ঢাকায় এসে তিনি তার প্রশ্নের জবাব খুঁজতে থাকেন। ইতিমধ্যে জাসদ থেকে প্রচারপত্র ছেপে ১৭ মার্চের ঘেরাও আন্দোলনের যুক্তি তুলে ধরে বলা হয়েছে, ‘এটা হচ্ছে কিউবার বিপ্লবীদের ১৯৫৩ সালে মনকাডা দুর্গ আক্রমণের অনুরূপ।’ রুমী বলেন, মনকাডা অভিযানের কয়েক বছর পর কিউবার সফল বিপ্লব হয়েছে, কিন্তু অনেক দেশে এ রকম কয়েক হাজার অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। তিনি জাসদের এই ‘বালখিল্য’ কাজের ব্যাপারে রীতিমতো ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে রাজনীতি ছেড়ে দৈনিক বাংলা পত্রিকায় ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। রুমীর বক্তব্য ছিল সোজাসাপটা। দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়া যদি গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ না হয়, তাহলে ওই দল করার কোনো মানে হয় না।

বঙ্গবন্ধুকে উৎখাতই ছিল মূল লক্ষ্য!
পনেরোই আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনার আগে জাসদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপ্লব নয়, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানের আড়ালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে উৎখাতের প্রেক্ষাপট তৈরি করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। ফলে পাক-মার্কিন চক্র যখন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে, তখন কার্যত জাসদের রাজনৈতিক প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।

এরপর জাসদের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক না কেন, এ কথা তো সত্য যে, ১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনায় তারা উল্লসিত হয়েছিল, ‘খুনি মুজিব খুন হয়েছেন’ বলে প্রচারপত্র বিলি করেছিল, ১৫ আগস্ট ভোরে গণবাহিনীর প্রধান কর্নেল আবু তাহের রেডিও অফিস ও বঙ্গভবনে গিয়েছিল, খুনি মেজর চক্রের সঙ্গে বৈঠক করেছিল, আওয়ামী লীগ বাদে সব দলকে নিয়ে সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল, ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানকে ‘ক্ষমতার ট্রেন’ বেহাত হয়ে যাওয়া হিসেবে ধরে নিয়েছিল এবং আওয়ামী ও ভারতবিরোধী স্লোগানকে পুঁজি করে সিপাহিদের খেপিয়ে ৭ নভেম্বর সৃষ্টি করেছিল।

১৫ আগস্টের পর জাসদ নেতৃত্ব যা করেছে, সেটি হলো যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় অংশীদার হওয়া। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগের লক্ষ্যেই তারা ১৫ আগস্টের পর অভ্যুত্থানকারীদের কাছে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে, জেনারেল জিয়ার কাঁধে ভর করে ‘সিপাহি বিপ্লব’ করেছে, সামরিক সরকারসমূহের সঙ্গে ফ্রন্ট গঠনের কৌশল নিয়ে এগিয়েছে।

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

[ বি.দ্র : পরবর্তী পর্ব প্রকাশ হবে আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর, বুধবার। ] 

আরও পড়ুন