• ঢাকা
  • রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২১, ৪ মাঘ ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৮, ২০২১, ০৬:৪৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ৮, ২০২১, ০৬:৪৬ পিএম

করোনাসৃষ্ট হতাশা ও বিলুপ্তির হুমকির মাঝে আলোর সন্ধানে

স্লাভয় জিজেক
করোনাসৃষ্ট হতাশা ও বিলুপ্তির হুমকির মাঝে আলোর সন্ধানে

১৯৭৯ সালে উডি এ্যালানের দেওয়া একটি উদ্ধৃতির খানিকটা কভিডের ফলে মানব প্রজাতির দুর্দশার বর্ণনার ক্ষেত্রে ভালোভাবেই খেটে যায়। আমাদের টিকে থাকতে এবং নতুন সমাজ গড়ে তুলতে একটি কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে।  প্যানডামিকের সময় আমরা আমাদের গণমাধ্যম থেকে ‘শেষ থেকে শুরু’র একই আওয়াজ বারবার শুনে আসছি।  যদিও এখনো অসংখ্য সংক্রমণ শনাক্ত এবং মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েই যাচ্ছে, তবে মিলিয়ন মিলিয়ন জনগণের ভ্যাকসিন নেওয়ার মাধ্যমে সুড়ঙ্গের শেষে আলোর রেখাটা ক্ষীণ হলেও অন্তত দেখা যাচ্ছে।  আগামী কয়েক মাস কিভাবে টিকে থাকব সে সম্পর্কে দুঃশ্চিন্তা সত্ত্বেও কিছু স্বস্তির চিহ্নও বিদ্যমান আছে।  আমরা এখনো উদ্বিগ্নতা কটিয়ে উঠতে পারছি না যে কবে এই প্যানডামিক দৃশ্যপট থেকে বিদায় হবে-কেন যেন মনে হচ্ছে সমাপ্তি ছাড়াই এই মহামারীকে টেনে নিয়ে যেতে হবে।  সবাই এখন একটা আশায় আছে যে কবে এই দুঃস্বপ্ন কেটে যাবে, আমরা এই ভয়াবহ স্মৃতিকে ঝেড়ে ফেলতে পারব এবং যত দ্রুত একটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব।

কিছু বুদ্ধিজীবী এই বিপর্যয়ের মধ্যে ফ্রেডরিখ হোল্ডারলাইনের ‘পাতমোস’-এর স্তোত্র থেকে উদ্দীপনা ছড়াতে চাইছে ‘যেখানে বিপদ আছে, সেখানে রক্ষার উপায়ও বেড়ে ওঠে’।  এটা আমাদের দুর্দশার সঙ্গে ভালোভাবেই প্রাসঙ্গিক।  আসলেই কী এই প্রাসঙ্গিকতা দৃশ্যমান? এটি কী এতই সাধারণ যে বিজ্ঞান খুবই স্বল্প সময়ে এ পরিস্থিতি থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারবে? প্যানডামিক কী আমাদের নৈতিকতা এবং দুর্বলতাকে দেখিয়ে দিয়ে গেল এবং আমাদের দাম্ভিকতা থেকে নিরাময়ের পথ বাতলে দিল এবং শিক্ষা দিল যে আমরা আসলে প্রকৃতির একটি অংশ মাত্র, এর কর্তা নয়।

আমাদের হোল্ডারলাইনের কবিতার পংক্তির দিকে আবার ফিরে যাওয়াই হবে খুবই সঠিক কাজ: ‘কিন্তু যেখানে আমাদের রক্ষাকারী বেড়ে উঠছে, সেখানেও বিপদ আছে।’ এবং এই বিপদগুলো বহুমাত্রিক। এখন আমাদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণী মনে রাখতে হবে। তারা বলেছেন, প্যানডামিকের প্রতিক্রিয়া খুবই ভয়াবহ হবে, এটাকে কেবলমাত্র খুব বৃহৎ হিসাবেই বিবেচনা করলে চলবে না এবং সারা বিশ্বকে কভিড-১৯-এর সময়কার জীবন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। 

কেবলমাত্র কভিড প্যানডামিকের সমাপ্তির বিষয়টি অনিশ্চিত নয়, আরও এ ধরনের বিপদ বাড়ছে, নতুন ধরনের প্যানডামিকও দিগন্তে উকি মারছে; বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অগ্নিকাণ্ড এবং খরা পরিবেশকে ক্ষতির সম্মুখীন করছে।  প্যানডামিকের অর্থনৈতিক অভিঘাত ২০২১ সালের সামাজিক বিক্ষোভকে আরও উসকে দেবে।  আমাদের জীবনের ওপর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা আরও তীব্র হবে… এবং আমাদের শুধু কভিড-১৯-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিলে চলবে না, উপরন্তু এসব আন্তঃসংযুক্ত পাঁচমিশালী ঘটনা থেকেও একই শিক্ষা নেওয়া দরকার।  আমরা এখন সমগ্র প্যানডামিকের সবচাইতে ভয়ঙ্কর সময় অতিক্রান্ত করছি।  এখন শিথিলতা দেওয়ার অর্থ হবে অনেকটা রাস্তায় গাড়ী চলা শুরু করার জন্য চাকা ঘোরানোর সময় ঘুমিয়ে যাওয়ার মতো।  আমাদের এখন অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেগুলো সবই বিশুদ্ধ বিজ্ঞান থেকে উদ্ভূত হবে না-আমাদের এখনকার মুহুর্তগুলো র‌্যাডিকাল রাজনৈতিক পছন্দগুলো বেছে নেওয়ার উপযুক্ত সময়। 

এটা সত্যি, বিজ্ঞান আমাদের বাঁচাতে পারে। গ্রেটা থুনবার্গ সঠিক ছিল বলেই আমাদের তাকে বিশ্বাস করতে হবে, কিন্তু একটি সত্যিকারের বৈজ্ঞানিক ভাবমানস অনুযায়ী, আমাদের ইয়্যুগান হেবেরমাসের দেওয়া দুটি জিনিসকে স্মরণে রাখতে হবে: আমরা কেবলমাত্র নতুন বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করি না, অনেক বিষয় সম্পর্কে জানা প্রয়োজন হলেও তা না জানা থাকলে জানার চেষ্টা চালাই, এর সঙ্গে আমরা অজ্ঞেয় পরিস্থিতিতে ক্রিয়ালাপ চালানোর জন্য বলপ্রয়োগ করার সময় জানতে চাই না যে আমাদের এইসব ক্রিয়ায় কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

এই অজ্ঞেয়তা শুধু আমাদের প্যানডামিক সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করছে না-আমরা অন্তত এ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছি-এর অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মনোস্তাত্ত্বিক ফলাফল সম্পর্কে জ্ঞাত হচ্ছি। এটা কোনো সাধারণ বিষয় নয় যে আমরা জানি না কী ঘটছে, এবং এই অজানা একটি সামাজিক ঘটনা, এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ড খোদাই করা হয়ে যাচ্ছে। 

আমাদের এখানে আরেকটি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার: এটা কেবলমাত্র আমরা যা জানি না তা সম্পর্কে আরো বেশি জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, কিছু সময়ে বাস্তবতা যদি তার নিজের আইন ভুলে গিয়ে কর্মকাণ্ড চালানোর মতো পরিস্থিতি হাজির করে সে সম্পর্কেও অবহিত হওয়া জরুরি। আমরা সেই কৌতুকটি সম্পর্কে জানি, যেটাকে বলা হয়,‘বাস্তবতায় কী জ্ঞান মূর্ত হচ্ছে’-এটা সেই বাণী যেটার মাধ্যমে একটি পাথর জানে তার পতিত হওয়ার সময় কী আইন মেনে চলতে হবে।  কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্সের মূল শিক্ষা হলো প্রকৃতি তার নিজেরই অনেক নিয়ম জানে না এবং এজন্য আলবার্ট আইনস্টাইন কোয়ান্টাম ফিজিক্স এবং প্রকৃতির অনির্দিষ্টতা সম্পর্কে এর মূল সূত্রায়ণ সম্পর্কে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছিলেন-এজন্য আইনস্টাইনের কাছে কোয়ান্টাম ফিজিক্স ছিল একটি অসম্পূর্ণ তত্ত্ব যা কিছু অজানা বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করে চলে। 

যদিও আইনস্টাইন এবং পদার্থবিজ্ঞানী নীলস বোর উভয়েই ছিল নাস্তিক, তবু তাদের ইশ্বর সম্পর্কে উক্তিগুলো খেয়াল করতে হবে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘ইশ্বর পাশা খেলেন না’ এবং বোর বিপরীতে বলেছিলেন, ‘ইশ্বরকে কী করা দরকার, তা বলা বন্ধ কর’। আসলে তাদের এই বৈপরিত্য ইশ্বর সম্পর্কে ছিল না, এটা ছিল আমাদের বিশ্ব ব্রক্ষাণ্ডের প্রকৃতি সম্পর্কে। আইনস্টাইন কখনোই এটা গ্রহণ করতে পারেননি যে প্রকৃতি কিছু কিছু অর্থে ‘অসম্পূর্ণ’।  এই প্যানডামিক মনে হয় সংকেত দিচ্ছে যে বোরই সঠিক ছিলেন। 

এই অনির্দ্দিষ্টতা আমাদের সাবএটোমিক পর্যায়কে পতিত করার সকল পথে পৌঁছে দিয়েছে, আমাদের হস্তক্ষেপের জায়গাকে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে, কিন্তু এটা সম্ভব কেবলমাত্র আমরা যদি পূর্ণমাত্রায় ধরে নিই-আমরা যদি প্রকৃতিবাদ এবং ঐশ্বরিক দৈবযোগের মতো নিয়তিবাদকে যদি বর্জন করব।  একজন স্লোভিয়ান ধর্মতাত্ত্বিক চার্চকে কোয়ারেন্টাইন আইন থেকে মুক্ত রেখে খোলা রাখার পক্ষে ওকালতি করেছিলেন।  তখন তাকে এর মাধ্যমে অনেক জীবনের করুণ সমাপ্তির পথ বাতলে দেওয়ার জন্য ভৎর্সনা করা হলে তিনি প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ‘চার্চের প্রধান লক্ষ্য স্বাস্থ্য নয়, মুক্তি’। 

সংক্ষেপে, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং ভোগান্তি আসলে ইশ্বরের কাছে অমরত্ব প্রাপ্তির জন্য মুক্তির বিষয় নয়।  এটাই মাদার তেরেসা কলকাতায় করেছিলেন।  তার লক্ষ্য ছিল যেসব ক্ষুধার্ত, নগ্ন, উদ্বাস্তু, পঙ্গু, অন্ধ, কুষ্ঠরোগীদের মতো মানুষ, যারা সমাজের কাছে অপ্রত্যাশিত, ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অযোগ্য, অবহেলিত, যাদেরকে সমাজ তার বোঝা মনে করে এবং সমাজ যাদের পরিহার করে চলতে চায়, তাদের সেবা করা।  কিন্তু এখানে সমালোচনা রয়েছে যে তিনি তাদের স্বাস্থ্য রক্ষার চাইতে বেশি গুরুত্ব দিতেন আত্মার মুক্তিলাভে এবং মৃত্যুশয্যায় ক্যাথলিজমের প্রতি আনুগত্যের প্রতি।  সুতরাং, আমরা খুব সহজেই কল্পনা করতে পারি যে যখন প্যানডামিক সারা বিশ্বকে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে তখন তিনি এটাই করতেন: কোনো টিকার ব্যবস্থা নেই, এমনকী রেস্পিরেটরও নেই, কিন্তু শুধুমাত্র ধূসর পরিবেশের মধ্যে আমাদের জীবনের শেষ ঘণ্টাগুলোর জন্য আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা আছে।

এবং আমরা কল্পনা করতে পারি যদি নিকট ভবিষ্যতে প্যানডামিক আরও বিস্তার লাভ করে, এখন এর নতুন ধরনও দেখা যাচ্ছে এবং ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত প্রদান করা যাচ্ছে না: স্প্যানিশ ফ্লুর চাইতে বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করবে, এবং প্যানডামিককে মোকাবিলা করার দিশা পাওয়া যাবে না, আমাদের কর্তৃপক্ষরা এইসব মৃত্যু, যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর জন্য ঔষুধ দিতে না পারার দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে থাকবেন, তখন চার্চ হতাশা নিরসনের লক্ষ্যে বিশ্বস্ত থেকে আত্মার চরম মুক্তির জন্য গণ কথোপকথনের আহ্বান জানাতে থাকবে।

আমাদের এখন ১৯৭৯ সালে উডি অ্যালেনের লেখা একটি নিবন্ধের প্রারম্ভে লেখা উক্তির দিকে চোখ ফেরাতে হবে: ‘ইতিহাসের অন্য যেকোনো সময়ের চাইতে মানব প্রজাতি এখন একটি ক্রসরোডের সম্মুখীন হয়েছে।  একটি রাস্তা আমাদের হতাশা এবং চরম নিরাশয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।  আরেকটি পথ আমাদের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।  আমাদের এখন সঠিক রাস্তা খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করতে হবে। ’ আমাদের এখন এই হতাশা এবং চরম নিরাশয় থেকে উত্তরণের একটিই সঠিক পথ সামনে খোলা আছে: আমরা যদি একদম শূণ্যপ্রান্তে পৌঁছে সামনের নতুন সমাজ গড়ে তুলতে পারি।

এখানে এখন একটি ভুল পদক্ষেপ আমাদের একটি নতুন বিভক্ত সমাজের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে সুবিধাভোগীরা বিচ্ছিন্ন বুদবুদের মধ্যে বাস করবে আর বাকীরা বর্বর পরিস্থিতিতে জীবন পার করবে।  বর্তমানে, যেকোনো সময়ের চাইতে সমতাবাদ শুধু অনিশ্চিত আদর্শ নয়, উপরন্তু খুবই প্রয়োজনীয়: সকলের জন্য ভ্যাকসিন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা, বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াই… এখানে একটি ছোট আকারের অপ্রত্যাশিত কথাকে নির্দেশনায় পরিণত করা যায়, ২০২০ সালের শেষদিকে এখনও পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ ভ্যাকসিনের আবিষ্কারে মূল ভূমিকা রাখা বায়োনটেক এর সিইও আগার শিন জার্মানিতে ট্রাকে চড়ে ভ্রমণের সময় বলেছেন: ‘এই মুহুর্তে এটাকে ভালো মনে হচ্ছে না-এখানে যে এক ধরনের শূণ্যতা তৈরি হয়েছে, কেননা এখনও অনুমোদিত অন্যান্য ভ্যাকসিনের ঘাটতি রয়েছে এবং আমরা আমাদের ভ্যাকসিন দিয়ে সেই শূণ্যতা পূরণের চেষ্টা চালাচ্ছি।’ এটি একটি চমৎকার মুহুর্ত যখন একটি কোম্পানির সিএইও চাচ্ছেন তাদের প্রতিযোগীরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠুক, কেননা তিনি জানেন যে প্যানডামিককে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া পরাভূত করা যাবে না।

তাই রেলের সুড়ঙ্গপথের শেষে যে আলোর রেখা আশার আলো জ্বালিয়ে রাখছে তাকে আরও তীব্র করার প্রচেষ্টায় থাকতে হবে, যাতে অন্যদিক থেকে আরেকটি বড় ট্রেন ছুটে এসে এই আলোকে ম্লান না করে দেয়। 

 

লেখক: বহুবিদ্যা-বিশ্লেষক দার্শনিক। তিনি লিউব্লিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ সোশিওলজি অ্যান্ড ফিলসফির জ্যেষ্ঠ গবেষক।

 

আরটি টেলিভিশনের অনলাইন থেকে ভাষান্তর: অনিন্দ্য আরিফ।