• ঢাকা
  • রবিবার, ২৩ জুন, ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
প্রকাশিত: জুন ২, ২০২৩, ০৮:৫৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ৩, ২০২৩, ০২:৫৮ এএম

স্মৃতিতর্পনে কলিম শরাফী

স্মৃতিতর্পনে কলিম শরাফী
বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থার সমবেত সঙ্গীত পরিবেশনা -জাগরণ

রবীন্দ্রনাথের গানের সুর ও কথামালায় স্মরণ করা হলো বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী কলিম শরাফীকে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের নমস্য এই শিল্পীর ৯৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রবীন্দ্রসংগীতের সুরের সুধায় শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয় শিল্পীকে।

শুক্রবার (২ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডির ইউল্যাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় তার জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী সঙ্গীততর্পন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তারই হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী  সংগঠন বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা। অনুষ্ঠানের শুরুতেই দেখানো হয় ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া’ শিরোনামে নিশাত জাহান রানার চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় চল্লিশ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র। যেখানে তুলে ধরা হয় রবীন্দ্রসঙ্গীতের নমস্য শিল্পী কলিম শরাফীর স্মৃতিকথা। কথা আর তথ্যচিত্রে ওঠে আসে সংস্কৃতি-বৈরি পরিবেশের নানা বাধা-বিপত্তির কথা। প্রামাণ্যচিত্রের পর কলিম শরাফীর কণ্ঠে রেকর্ড করা পাঁচটি গান বাজিয়ে শোনানো হয়। গানগুলো হলো- ‘আমি তখন ছিলেম মগন গহন’, ‘এসো আমার ঘরে’, ‘পুব সাগরের পার হতে’, ‘বঁধু, তোমায় করব রাজা’ ও  ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু’। এর পর অতিথিদের নিয়ে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালান বরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম খান।

স্মৃতিচারণ পর্বের মাঝে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন পর্যায়ের গান দিয়ে সাজানো সঙ্গীততর্পনে অংশ নেন বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর সংস্থার শিল্পী ছাড়াও আমন্ত্রিত শিল্পীবৃন্দ। বাইরে প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রার গরম বিরাজ করলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিলনায়তনে রবীন্দ্রগানের সুরে দর্শক-শ্রোতাদের মন ভরিয়ে দেন শিল্পীরা। কথার পিঠে কথা সাজিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় কলিম শরাফীকে।

৯৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেন দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম খান, গবেষক ও শিক্ষক কাজী মদিনা, সঙ্গীত শিল্পী ও সংগঠক মাহমুদ সেলিম, কলিম শরাফীর ভাগিনা আনজুম আহমেদ  এবং বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও কণ্ঠশিল্পী পীযূষ বড়ুয়া। স্মৃতিচারণায় দেশ বরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম বলেন, ‘কলিম শরাফীর মতো লোক এখন বিশেষ প্রয়োজন ছিল। আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক ছোট্ট আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার হাত ধরেই । দেশ ও গানের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তার গানের সংগ্রাম এখনও যেমন মানবমুক্তির দিশা দেখায় তেমনি সাম্প্রদায়িকতা বিরুদ্ধে জেগে ওঠার প্রাণশক্তি যোগায়।’

পথে পথে দিলাম ছড়াইয়ারে/সেই দুঃখে চোখেরও পানি/ওআমার চক্ষু নাই রে ...। বহু বছর আগে গাওয়া এই গানটি আজও হৃদয়ে কড়া নাড়ে। সূর্যসন্তান নামের চলচ্চিত্রে এই গানটি গেয়েছিলেন কলিম শরাফী। প্রিয়পৃথিবী ছেড়ে শিল্পী বিদায় নিলেও গানটি পাড়ি দিয়েছে কালের সীমারেখা। সেইকালোত্তীর্ণ গানের মাঝেই বেঁচে আছেন সুররসিকের অন্তরে। এই পথিকৃৎ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, সাংস্কৃতিক ও সংগ্রামী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কিছুদিন আগে ছিল ৯৯তম জন্মবার্ষিকী। বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের জন্মের ৬৩ বছর পরে একই দিনে ১৯২৪ সালের ৮ মে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা সহ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন কলিম শরাফীর জন্মদিন উদযাপন করলেও কয়েক বছর করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এর প্রকোপের কারণে বন্ধ ছিল সেই আনুষ্ঠানিকতা। এখন করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় ফের মঞ্চে ফিরেছে উদযাপন অনুষ্ঠান। ৯৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে  শুক্রবার গ্রীষ্মের তপ্ত  সন্ধ্যায় ইউল্যাব মিলনায়তনে (ধানমন্ডি ক্যাম্পাস, বাড়ি-৫৬, (লিফট-৬), রোড-৪/এ, সাতমসজিদ রোড, ঢাকা।) উদযাপন-অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা। যেখানে গান আর কথামালায় কলিম শরাফীকে স্মরণ করা হয়। যেখানে অংশ নেন শিল্পী সংস্থার শিল্পীদের পাশাপাশি খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বরা।

বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থার সভাপতি তপন মাহমুদ সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে ভার্চুয়ালি বলেন, ‘গোটা শিল্পীসমাজের কাছেই কলিম শরাফী ছিলেন বাতিঘর। শিল্প ও সংস্কৃতির বহুমাত্রিক পথে ছিল তার বিচরণ। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি গেয়েছেন গণসঙ্গীত। আবার সঙ্গীত শেখানোর কাজটিও করেছেন গভীর মনোযোগে। এমনকি কীর্তিমান এই মানুষটি চলচ্চিত্রও পরিচালনা করেছেন। উল্টোদিকে তার ভেতরে সব সময়ই বিরাজ করেছে একটি প্রতিবাদীসত্তা। এ কারণে সব প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামেও রেখেছেন সোচ্চার ভূমিকা। যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন প্রতিবাদী এক কণ্ঠস্বর। কখনই আপসের পথে হাঁটেননি। আপসনহীনভাবেই সত্য-সুন্দরের পথে ধাবিত করেছেন জীবনকে। সব মিলিয়ে তিনি গান বা নাটকের শিল্পীদের কাছে ছিলেন আদর্শিক এক মানুষ। সে কারণেই আমরা বারবার তাকে স্মরণ করেছি। প্রতি বছর রবীন্দ্রজয়ন্তীর উৎসবে কলিম শরাফীকে নিবেদিত একটি পৃথকপর্বের আয়োজন করা হতো। কিন্তু করোনা বৈশ্বিক মহামারির কারণে স্মরণের সেই আয়োজনটি থমকে ছিল। এবার তাকে নিয়ে স্মৃতিতর্পন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পেরে আমরা যারপরনাই খুশি। আগামীতে তার জন্মশত হবে মহাউৎসবের মধ্য দিয়ে। 

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অতিথিরা মেলে ধরেন কলিম শরাফীর বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক। তারা বলেন, ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের পাশাপাশি দেশাত্মবোধক গানেও ছিল কলিম শরাফীর ব্যাপক জনপ্রিয়তা। ছয় দশকেরও বেশিসময় ধরে তিনি প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রেখেছিলেন নিজেকে। দেশের সবকটি জাতীয় আন্দোলনসহ নানা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন কলিম শরাফী। প্রগতিশীলতার মশাল হাতে সেই তরুণ বয়সে যে সংগ্রাম তিনি সূচনা করেছিলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা চালিয়ে গেছেন নিরলসভাবে। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলেন কলিম শরাফী। মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডনে অবস্থান করে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। গান গেয়ে, বিভিন্ন সভা-সমিতিতে অংশ নিয়ে প্রবাসীদের উদ্বুদ্ধ করেন। এক পর্যায়ে তিনি লন্ডন থেকে পাড়ি জমান আমেরিকায়। সেখানেও তিনি বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখেন। দেশ স্বাধীন হলে কলিম শরাফী দেশে ফেরেন। ২০১০ সালে ২ নভেম্বর ফেরার দেশে পাড়ি জমান বরেণ্য এই ব্যক্তিত্ব।’

জন্মবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে লিটন বৈদ্য গেয়ে শোনান ‘জীবনে আমার যত আনন্দ’,  শাহরিয়ার ইসলাম অর্ণব ‘আমার মিলন লাগি তুমি আসছো কবে থেকে’, নুরুল ইসলাম ‘আজ জোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’। শিল্পী সাবরিনা খান তন্দ্রার কণ্ঠে শোনা গেলো ‘আমি শুধু রইনু বাকি’, প্রান্তিকা সরকার ‘কোন সুদুর হতে আমার মনের মাঝে’। বিজয় সরকার ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে’, কার্তিক চন্দ্র মণ্ডল ‘আজি যত তারা তব আকাশে’, সুমাইয়া ইমান ইমার কণ্ঠে শোনা গেলো রবিঠাকুরের বিচিত্র পর্যায়ের গান ‘ওগো তোরা কে যাবি পারে’,  দেবযানী মিত্র শোনান  ‘যেথায় তোমার লুট হতেছে’, উৎপলা দাশ প্রম্মা শোনান ‘জগৎ জুড়ে উদার সুরে’, রিদওয়ানা আফরিন সুমি শ্রোতাদের মন ভরিয়ে দিলেন পূজা পর্যায়ের গান ‘তুমি খুশি থাক আমার পানে চেয়ে চেয়ে’ গেয়ে। জয়িতা তালুকদারের কণ্ঠে শোনা গেলো ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা।’

জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয় সমবেত সঙ্গীত  ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’ এবং জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে। এর আগে শুভেচ্ছাসূচক বক্তব্য রাখেন সংস্থার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক (সাধারণ) ও কণ্ঠশিল্পী  তানজীনা তমা। সমাপনী বক্তব্য রাখেন পীযূষ বড়ুয়া।

গান, কথামালা ও প্রামাণ্য চিত্র দিয়ে সাজানো স্মৃতিতর্পন অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন আজিজুর রহমান তুহিন।

জাগরণ/সংস্কৃতি/এসএসকে/এমএ