• ঢাকা
  • রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ০১:১২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ০১:১২ পিএম

জিনিয়াস ও সবুজ মোজা

জিনিয়াস ও সবুজ মোজা

গানটি সে আজ সকালে বেশ কয়েকবার গেয়েছে গুনগুনিয়ে। কিন্তু গানটি যেন ক্রমাগত এক পিছুটান রেখে যাচ্ছে তার প্রতিটি কাজের ভেতর। গানটিকে সে কবে প্রথম ভালোবেসেছিল, তা তার মনে নেই। ছোটবেলায় গানের স্কুলে! হতে পারে। তবে এটা মনে পড়ে, অজস্র ক্লান্তির ভেতর গানটি গুনগুনিয়ে ধীরে ধীরে বেজে উঠত মনের তারে। গুমরে ওঠা ভেতর থেকে সে মুক্তি চাইত। আর গানটির কাজ ছিল গভীর ক্লান্তির ভেতর দিয়ে এক টুকরো আকাশ হয়ে ওঠা। শেষ পর্যন্ত এই গানটিই যেন হয়ে উঠল তার আত্মিক প্রকাশ। কোনো এক প্রশান্তির আকাঙ্ক্ষায় মনে হতো, এখনই সে ছুট লাগাবে এক তেপান্তরের মাঠের দিকে। দীর্ঘ বছর সে টের পেত এই ক্লান্তি, এই ব্যবহৃত জীবনের ভেতর দিয়ে এক অনবরত টানাপোড়েন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে এই অবেলায়, মোবাইলে সেভ করা গানের লিস্ট থেকে গানটিকে না পেয়ে একটু চমকে ওঠে জিনিয়া। তবে কি তার অগোচরে কেউ ডিলিট করে দিয়েছে গানটিকে! কেন! ওইটুকুই তার একমাত্র আশ্রয় বলে! 
সে কি ব্যবহৃত হচ্ছে! 
হ্যাঁ!...না!
তবে তার সত্তার রূপটি কেবলই নিজেকে হারাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে কেন!
একটা কিছু গোলমাল রয়েছে! 
কোথায়! 
জিনিয়া খোঁজে। খুঁজে বেড়ায়। শুধুই খোঁজে। এই নরম দুপুরটা শরীর আর মনের ভেতর জ্বালা ধরিয়ে দেয়। তার মেয়েটা স্কুলে। হাজব্যান্ড অফিসে। এই সময় সব কাজের শেষে অন্য মহিলারা টিভি দেখে। শপিং কমপ্লেক্সে ঘুরে বেড়ায়। মেয়েদের অনেক গ্রুপ আছে। অনেকে গ্রুপ চ্যাটে সময় কাটায়। এতে জীবনের ক্লান্তি দূর হয়। তবে ওর কেন হয় না! জিনিয়া আবার নিজেকে নিজের ভেতর থেকে বের করে এনে হাতের তালুতে রাখে। নিজের সমস্ত মন দিয়ে নিজেকে আবিষ্কারের নেশায় পাগল হয়।...মাধুরী...মাধুরী...মাধুরীমা...হুম এটাই তার নাম। তার হাজব্যান্ডের দেওয়া নাম। বাবা-মায়ের দেওয়া নাম, কবে যেন হারিয়ে গেছে মাধু নামের নিচে। বিয়ে হওয়ার পর সে আবিষ্কার করেছিল তার হাজব্যান্ড তানভীর একজন জিনিয়াস আর্টিস্ট। সে ছবি আঁকে। যদিও বিয়ের আগে তার সে ব্যাপারটি জানা ছিল না। একজন ভালো চাকরিজীবীর সঙ্গেই বাবা-মা তাকে বিয়ে দিয়েছিল। ছবি আঁকার বিষয়টি উনি গোপন করেছিলেন। কেন বিষয়টি গোপনীয়, আজও সে জানে না। যদিও গত বছর তার মেয়ের বয়স দশ বছর পার হয়ে গেল। আশ্চর্য! দশ বছর! হ্যাঁ, অনেক কিছুই সে জানতে চায়নি, গত দশ বছরে। তাছাড়া তানভীরের এই ছবি আঁকার নেশা তার ভালোই লাগত! এটা ভেবে বেশ ভালো লাগত যে তানভীর সত্যিই জিনিয়াস! মাধুরী নামের ফ্রেমেই যেন জিনিয়ার চোখবাঁধা জীবন! দশ বছরের বিবাহিত জীবন, এক স্থানান্তরিত জীবন। 
একজন জিনিয়াসকে বিয়ে করার আনন্দে সে উচ্ছ্বসিত ছিল, বিবাহিত জীবনের প্রথম দিকে। ছবি আঁকার ঘরটি ছিল আলো-আঁধারের রহস্যে ভরা। যেন কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটি সবুজ পাহাড়, যেন গভীর বনের ভেতর দিয়ে পথ হারিয়ে যাওয়া কোনো রাস্তা। সে দীর্ঘ সময়ে ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি, কোনো এক ধূর্ত আলিবাবার খপ্পরে, বদ্ধ গুহায় সে সোনা হয়ে দিন কাটাচ্ছে। তার ত্বক ছিল তখন সোনার মতো উজ্জ্বল দ্যুতির। তার হৃদয় থেকে বের হওয়া আলোতে তার জিনিয়াস হাজব্যান্ড তানভীর কুয়াশায় ঘেরা সেই সবুজ পাহাড়টিকে প্রতিদিন আবিষ্কারের নেশায় মগ্ন হতো। সেখানে জীবনবৃক্ষ আর মৃত বৃক্ষরা পাশাপাশি। তুলির টানে ফুটে উঠত তাদের বিভিন্ন রূপ, বিচ্ছিন্নতা, অথবা অতলস্পর্শী বোধ।

মাঝে মাঝেই সে তানভীরের নিমগ্ন মনটিকে গভীরভাবে অনুভব করেছে। ভালোবেসেছে গভীর নিমগ্ন মানুষটিকে। কখনো সংসারের অনেক কাজের ভেতর থেকে, দূর থেকে, কখনো নীরবে কাছে বসে থেকে। চুপ করে পাশাপাশি বসে থাকা খুব সহজ বিষয় নয়। কিন্তু বিষয়টি তাদের দাম্পত্যে ঘটেছিল দীর্ঘ সময়। সময়ের ভার ছিল ফুলের গন্ধের মতো। কোনো অবসাদ নেই। তখন যেন তানভীরের আঁকা ছবিতে ফুটে উঠত জিনিয়ার আত্মার প্রতিচ্ছায়া।
তারপর কেমন করে সময় বদলে গেল। অতি দ্রুত। মেয়ের জন্ম হলো, মেয়ে বড়ও হয়ে গেল। হঠাৎ যেন দুজনের মাঝখানটায় হাজির হয়ে গেল ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন... আরও আরও কত কী! প্রযুক্তির ভেতরের আশ্চর্যে ওদের দুজনের সঙ্গে সঙ্গে যেন মেয়েটিও ভিন্ন রকম মোবাইল জগতের আবেগে সাতরং হয়ে উঠল। বিষয়টা বুঝে উঠতে না উঠতেই পরিবারের তিনটি মানুষ যেন হয়ে উঠল প্রাণহীন ছায়ামূর্তি। প্রত্যেকের এখন অসীম একাকী আলাদা জগৎ। 
তবে নিজের মেয়েকে সে শক্তহাতে নিজের দিকে, আর সহজ, স্বাভাবিক জীবনের দিকে এক নতুন টানের কাছে সে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল। হয়তো বড় হতে হতে তার গন্তব্য ভিন্ন হবে। তবু তাতে স্বাভাবিক, শান্ত আর সুস্থিরতা থাকবে। আসলেই কী থাকবে! সংশয় তাকে বিপন্ন করে ক্রমাগত! তবে সে জেনে নিয়েছে, এই বিপন্নতা সাময়িক নয়। এটি এক দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়ারই অংশ। এই প্রক্রিয়ার প্রথম ভাগে আছে প্রতিদিনের ঝগড়া-বিবাদ। তারপর ভাঙচুর...আর ক্রমেই দীর্ঘ বিষণ্ণতার দিকে যাওয়া।

২.
আজকাল নিজেকে তুমি কী ভাবো বলো তো! 
কেন! কী করেছি! তানভীরের হঠাৎ অবান্তর প্রশ্ন তাকে বিপন্ন করে। জিনিয়া ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে।
কতবার না বললাম! স্টুডিওতে আস!
কেন ওখানে কী হবে! তোমার নিজের মনে ছবি আঁকছ তো আঁক! আমি বসে থাকব কেন! 
আগে কী বসতে না! 
হ্যাঁ, বসতাম! তখন টের পেতাম না কিছুই! ভালো লাগত। 
এখন লাগে না! কেন!
লাগে না তা জানি। কেন! তা জানি না। হতে পারে, আমাদের মাঝখানে আর কারো ছায়া দেখি!
তুমি তো একেবারেই পাগল! দিনে দিনে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে! 
তা হতে পারে। জিনিয়াসদের মধ্যে অনেকের স্ত্রীই তো সে রকম ছিল! সে-ও জিনিয়াসদের একটি ক্রেডিট! কী বলো! হয় তারা আত্মহত্যা করে, নয়তো পাগল হয়ে যায়! তাই না! তাদের স্ত্রীরা সব সময়ই পাগল হয়ে যায়, তাদেরকে ভালোবাসে বলে। আমি আর ব্যতিক্রম কেন! পিকাসোর নারীরাও তাই ছিল না! তুমিই তো বলেছিলে!
হ্যাঁ, বলেছিলাম!
তো পিকাসোর মতো আজকাল তোমারও বেশ পরিচিতি বাড়ছে! ফেসবুক, টুইটার—সব জায়গায়। দুটো আর্ট এক্সিজিবিশনে আমি তো অনেক খাটুনি খাটলাম। আর্ট গ্যালারিতে কোন ছবি কোথায় থাকবে, কার সঙ্গে কতটুকু হাসি বিনিময়, কতটুকু সাদা শাড়িতে কতটা সম্মোহন—সবই তো করা হলো। আর কেন! এখন খুব ক্লান্ত লাগে তানভীর! আই আ্যাম রিয়েলি টায়ার্ড।
ও হিংসে হচ্ছে! আমার বড় হওয়াকে হিংসে! আচ্ছা…আমিও দেখে নেব!
জিনিয়া বলতেই থাকে, আর কত দেখাবে তানভীর! তোমার মদ খাওয়া, তারপর স্ল্যাং বলা, তারপর আমার শরীর নিয়ে হেলাফেলা! কোথায় প্রেম! যা আমার অনুভূতিকে নিয়ে যাবে অনেক দূরে গানের মতো! আমার জীবন, তোমার ওই শিল্পের চেয়ে অনেক বড়। তোমার কামুকতার নিবৃত্তির শেষে এক টুকরো মাংস ছাড়া আমি আর কিছুই নই।—আমি এটা বুঝতে পারি। শুধু আমি কেন! পৃথিবীর সব মেয়ে, সে শিক্ষিত কি অশিক্ষিত, এটা সবাই বোঝে। আক্রোশ থেকে সর্বাঙ্গে যা তৈরি হয়, তা বিষ। তা ছড়িয়ে পড়ে সংসারের আনাচে-কানাচে। সেটা আর সংসার থাকে না।
তোমার মতো মূর্খ আমায় কি বুঝবে! আমার দোষগুলোও আমার শিল্পকে নষ্ট করতে পারবে না।
তানিয়া আর কথা বলে না। চুপ করে ভাবে। হ্যাঁ, তোমার দোষগুলো ঠিক ঠিক ঢেকে যাবে, তোমার কাজের আড়ালে। তাই হোক। এই পৃথিবীর কেউ না জানুক, একজন সফল শিল্পীর জীবনে কতজন নারীর মৃতদেহ থাকে! তুমি এক সাদা মানুষ, মৃত নারীর শরীরের ওপরে।

কাজ করতে করতে, মেয়ের কপালে চুমু খেতে খেতে, এক চিলতে বারান্দায় শরতের আকাশ দেখতে দেখতে জিনিয়া কেবলই ভাবে—জীবনের ভারসাম্য ও, প্রেমের অনুভব এই দুটো দিক থেকেই পাওয়া যায় সহজ স্বাভাবিক আনন্দ। তানভীরের মাঝে মনের প্রকাশ কোথায়! এখন এখানে কেবলই তাড়না! নিজেকে প্রচারের তাড়না, প্রচার পাওয়ার পরও ব্যর্থতার তাড়না, অস্থিরতার তাড়না, কামুকতার তাড়না। দুই মিনিট সুস্থভাবে বসবার সুযোগ নেই। আজ এখানে, কাল ওখানে—যেন এক ভূতের নৃত্য। আর সস্তা মেয়েগুলো তো ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে মুখিয়েই আছে—বড় শিল্পীদের সঙ্গে একখানা ছবি পোস্ট করবেন। আহা! ওই একখানি ছবিতে জীবন ধন্য! আহা, ওরা যদি জানত, ওই ছবিটি তোলার এক মিনিট পরই, মহান শিল্পী ওই মেয়েটিকে ডাকে বেশ্যা! গলার ভেতর মদ ঢেলে ঢেলে তার শরীরের স্ট্যাটেস্টিকস মাপে! আর কোথাও দেখা হওয়ার পর, খুব কৌশলে জানতে চায়, সে আসলে কতটা খোলামেলা হতে পারবে! কী ভয়ানক! বাঘের লুকিয়ে রাখা নখগুলো যদি দেখতে পারত, এই সব মেয়ে! কোনো কোনো মেয়ে প্রকৃত শিল্পকে ধারণ করে, ভালোবেসেই আসে, এই নখর জীবনে। শেষে এক বিরাট ফাঁদে আটকে পড়ে, আর বের হতে পারে না। শেষে রক্তখেকো হায়েনার রূপ নিয়ে বের হয়। কেউ কেউ আত্মহত্যায় তলিয়ে যায়, কেউ ঘর ছাড়ে। 
অনেক দিন মাধুরী নামটি তানভীরের মুখ থেকে সে শোনেনি। তানভীর হয়তো ভুলেই গেছে, তারই দেওয়া নাম। দশ বছর আগে, শিল্পের জন্য, হৃদয়ের তুমুল গন্ধের জন্য সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ত মাধু-মাধু…মাধুরী…মধুরীমা…। আজ আর কোনো নাম নেই। মায়ের দেওয়া নামেও তাকে কেউ ডাকে না। সংসার যেন এক কারাগার। দেয়ালের পর দেয়াল। আজকাল আর ছবি আঁকার জন্য জিনিয়ার দরকার নেই। ল্যাপটপেই অনেক চমৎকার শরীর উপস্থিত থাকে। তানভীর ওখান থেকেই রসদ নেয়। 
 
৩.
বাগানে সুন্দর দুটি হলুদ জবা ফুটেছে। এত সুন্দর! ভোরবেলায় মনটা একেবারে আলো হয়ে যায়! প্রতিদিনের রক্তের মধ্যে তৈরি হওয়া নির্জীবতা যখন বিক্ষুব্ধ হয়ে তার তেজে তার নিজেকেই পোড়াতে থাকে, তখন এই নির্মল ভোর এক অপার বিস্ময়ের মতো! সমস্ত ক্ষুব্ধতাকে নরম আর নীরব করে দেয়। গত রাতের অপমানগুলো আর গায়ে লেগে থাকে না। প্যাঁচানো সাপের মতো উদ্ভট সময়। এক জাঁকাল জীবন্ত খিদেময় সময়ের অন্ধকার গহ্বরের ভেতর ঢুকে থাকা রাত্রি যেন বিশ্বাসঘাতকতার চাদর মোড়ানো! কেন এসব মনে হয়! সে বুঝতে পারে না। কিন্তু তার মন যে তাকে ভুল নির্দেশ দেয় না, সেটি সে জানে। যাপিত অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে সে হলুদ জবার দিকে তাকায়। ওর খাঁজকাটা সবুজ পাতায় পৃথিবীর সব সবুজ এসে জড়ো হয়েছে। রং ওঠা জীবনটা যেন কিছুটা সান্ত্বনা খোঁজে সেই সবুজ পাতার কাছে। 
ওমা! এ কী! চমকে ওঠে জিনিয়া! পুরো সবুজ পাতাটা খেয়ে নড়ে উঠল একটি ক্যাটারপিলার। হ্যাঁ, পাতাটা খেয়ে বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে সে! দু-এক দিনের মধ্যেই প্রজাপতি হয়ে ঘুরে বেড়াবে। এই চুপ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে সমস্ত দৃশ্যমান জগৎ আর না দেখা জগতের এক অন্য রকম উপলব্ধি যেন নিমেষেই চৈতন্যের ভেতর দোলা দেয়! সেখানে প্রশ্নগুলো কেবলই ঘুরে বেড়ায়। উত্তরগুলো অমীমাংসিত। তবে কি তানভীর ওই ক্যাটারপিলারটির মতো! আর সে ওই সবুজ পাতা! মরে যাওয়া…নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া এক সবুজ পাতা! একটি নিষ্ফল আর জন্মান্ধ জীবন তার! যেখানে প্রজাপতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই আর!
খুব ছোটবেলায় রংধনুর সাত রং দেখতে তার বড়ই ভালো লাগত। মাঝে মাঝে ঘুমের গভীরে সেই সব রং যেন স্বপ্ন-স্বপ্ন। এখন সে নিজেই রংধনুর সব রংকে বাদ দিয়েছে। শুধু বেগুনি রংটি যেন গাঢ় হতে হতে একদম জমাট বাঁধা রক্তের মতো কালো হয়ে ঘুমের ভেতর গড়িয়ে যায়। 

৪.
তানভীরের আঁকার ঘরটি এই দুপুর সময়ে বন্ধ থাকে। একটি গোপন চাবি সে নিজের কাছে রেখেছে। মাঝে মাঝে যখন এমন একলা সময়, তখন সে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ । নানা প্রশ্ন যেন তাকে বিভ্রান্ত করে। এই গোপন ঘরটি কি সে চেয়েছিল নিজেকে আন্দোলিত করার জন্য! অথচ এখানে দুজন মানুষ…একেবারেই অসম। ওই যে তানভীরের পোর্ট্রেট, তাতে তার চোখে পৃথিবীর সব অবসাদ। জিনিয়ার শরীর আর মনের সব রং নিয়েও যেখানে অবসাদ কাটেনি। এখানে একটি বড় আয়না আছে, চমৎকার এক দোল খাওয়া চেয়ারে দোল খেতে খেতে জিনিয়ার অনেকবার মনে হয়েছে, এবার সে প্রেমে আলিঙ্গনাবদ্ধ হবে। না, কখনো আসেনি সে সুসময়। বরং ছবি আঁকার ক্লান্তির পর তানভীর চেয়েছে এক কাপ ব্লেন্ড করা গভীর কালো কফি। এখানে আলো-ছায়ার অন্ধকারে অনেক দিন সে নীরবে অপেক্ষা করেছে ভালোবাসার বৃষ্টি নামবে বলে। তারপর অপেক্ষা করে করে বুনো গাছের মতো শরীরে ধারণ করেছে বিষ। সেসব এখন এক একটি ক্যাকটাসের কাঁটা।—এই ঘরটিতে যেন অনেক দিন আগেই তার মৃত্যু ঘটেছিল। ওই ছবিগুলোর কোথাও কোথাও তার মরে যাওয়া আত্মার কান্না শোনা যায়। এই ঘরটিতেই বন্দি হয়ে আছে তার যন্ত্রণায় মুচড়ে যাওয়া দেহ।

৫.
আগামীকাল একটা বুফে পার্টি আছে। হোটেল সোনারগাঁওয়ে। তানভীরের জন্য জুতো কিনতে হবে। জিনিয়াকে এক সপ্তাহ আগেই বলে রেখেছে তানভীর। তাই তাকে আজ তানভীরের সঙ্গে যেতেই হবে। জিনিয়া সঙ্গে থাকলে, তার অনেক কিছুই পারফেক্ট হয়। তার জিনিয়াস হাজব্যান্ড এই জায়গাটিতে তার ওপর ভীষণ নির্ভরশীল। একজন জিনিয়াস ব্যক্তির মস্তিষ্ক যে একটু অন্যভাবে নির্মিত, সেটা জিনিয়া এত দিনে জেনে গেছে। সে জন্য জিনিয়া সব কাজই করে সবটুকু দায়িত্ব নিয়ে, আগেও যেমন করত। 
কিন্তু আজ সে খুবই ক্লান্ত। ক্লান্তি এড়াতে সে গাঢ় হলুদ রঙের জামা পড়ে। লাল গাঢ় লিপস্টিক ঠোঁটে মাখিয়ে সে সুখী নারীর ভূমিকায় অভিনয় করতে চায়, পুরোটা সময়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ক্ষণস্থায়ী অভিনয়টি করতেও সে ব্যর্থ হয়। তানভীরের দামি জুতো কেনার পর, তার হঠাৎ করেই বমি ভাব হতে থাকে। জুতোর দোকানের অসংখ্য কালো জুতো, যেন ব্ল্যাক হোলের গভীর অন্ধকার। এক ফোঁটা আলো নেই কোথাও! উহ্! মাগো! তীব্র অন্ধকার! মাথার ভেতরে কেবলই ঘুরপাক খায়। আধবোজা নিষ্পলক চোখে, বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সে চেয়ে থাকে কালো জুতার অন্ধকারের ভেতর, হঠাৎ পাওয়া এক জোড়া গাঢ় সবুজ মোজার দিকে।
ওই গাঢ় সবুজ রংটা কি তাকে একটিবার ভেতর-বাইরে বদলে দিতে পারবে!