• ঢাকা
  • সোমবার, ২৩ মে, ২০২২, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
প্রকাশিত: মার্চ ২৯, ২০২১, ০২:২২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২৯, ২০২১, ০৮:২২ এএম

বঙ্গ ভাণ্ডারে আষাঢ়ের রূপ দর্শন

বঙ্গ ভাণ্ডারে আষাঢ়ের রূপ দর্শন

“এক মশা সকালে কামড়াচ্ছে চিকুনগুনিয়া হচ্ছে। আরেক মশা বিকেলে কামড়াচ্ছে ডেঙ্গু হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে সাধারণ মশারা ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামে গেছে।”

তাপস রায়ের রম্যগ্রন্থ ‘বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ আষাঢ়’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি নেওয়া হয়েছে। এই গ্রন্থে মোট ১৪টি লেখা রয়েছে। বিচিত্র বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন, এই লেখাসমূহ চিন্তার উদ্রেক করবে পাঠকের। লেখক নিজের পরিচয় নিয়ে প্রচলিত ভাবনায় হুল ফুটিয়েছেন। গ্রন্থের দ্বিতীয় ফ্ল্যাপে লেখা হয়েছে, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, লেখকের সঙ্গে পরিচয়ের চেয়ে তার লেখার সঙ্গে পরিচয় থাকাটাই যুক্তিসঙ্গত। সে কারণে ব্যক্তিগত পরিচয় সংক্রান্ত বৃত্তান্ত অনুল্লেখ্য রয়ে গেল।” ব্যক্তি নয়, কাজের দিকে মনোযোগ দিতে বলেন তিনি। তাঁর ভাবনার স্ফূরন প্রতিটি লেখাতেই রয়েছে।

বাঙালির মূল প্রবণতা নিয়ে গ্রন্থ শিরোনামের লেখাটি রচিত হয়েছে। এই জাতির অতিকথনের সংস্কৃতি সর্বত্র। তার স্রোতে কখনো কখনো বাস্তব অলীকের গর্তে প্রবেশ করে। অতিকথন নিয়ে তাপস রচিত বাক্য হলো, “অতিকথন জন্মহারের চেয়েও বঙ্গে আজ বড়ো সমস্যা।” আমরা বুঝে যাই এদেশে জন্মহারও একটা বড়ো সমস্যা, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জয়ী অতিকথন। বাক্যগঠনে তাঁর এই কৌশলগুণে পাঠক সমকালও সংকটকে উপলব্ধি করতে পারে। তিনি রচনার সময় খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের উদ্ধৃতি ও রম্যঘটনা সংযুক্ত করেছেন, যা পাঠকের জন্য বাড়তি পাওনা।

শিক্ষা ব্যবস্থাও এই রম্য লেখকের দৃষ্টিসীমায় রয়েছে, বিশেষত শিক্ষকদের অতিরিক্ত নাম্বার দিয়ে পাশ করানোর প্রবণতা নিয়ে লিখেছেন। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মোক্ষম অস্ত্র ছেড়েছেন এই গ্রন্থের অন্য একটি লেখায়। সেখানে তিনি লেখেন, “প্রয়োজনে পরীক্ষার ফল যেদিন বেরুবে মিষ্টি সরবরাহ করতে গিয়ে কুলিয়ে উঠতে না পেরে মনের দুঃখে ময়রা ব্যাটা দেহখানই ঝুলিয়ে দেবে।” একই সঙ্গে প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে মিথের চরিত্রকে নিয়ে এসেছেন তাঁর লেখায়। এই লেখায় প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে বেদনা যেমন আছে, তেমনি ক্ষোভও পাওয়া যাবে। এটাই এই রম্য লেখকের বৈশিষ্ট্য। তাঁর লেখায় প্রযুক্তিমুখীনতা, মশা আর গ্যাসের সমস্যার সঙ্গে সাধারণের জন্য ভ্যাট কতো সমস্যা নিয়ে আসছে তার ইঙ্গিত রেখেছেন। সকল সংকটকে সঙ্গী করে বাঙালির বেঁচে থাকার এই লড়াইকে তিনি আষাঢ়ে গল্প হিসেবে বলেছেন। কেননা নাগরিক জীবনের ন্যূনতম সুবিধা নেই— তার সঙ্গে করের বাড়তি বোঝা, তারপরও জাতি টিকে আছে ফেসবুক, টুইটারসহ যোগাযোগের নানা মাধ্যমকে সঙ্গী করে।

‘তাড়া খাওয়া ভূতের জীবন’—এই লেখায় তিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তবে তাপস রায়ের দৃষ্টিসীমায় রয়েছে সমকালীন সমাজ ও বিশ্ব। তাই ভূতকে উপমায় রেখে দেশের দুর্নীতি ও পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন নিয়েও তার শব্দরাশি ঝলকে উঠেছে। পরাশক্তিসমূহের সারাবিশ্বে অস্থির অবস্থা তৈরি নিয়ে পাঠককে সচেতন করেছেন। সে সূত্রে বলেছেন, “তাদের শান্তির বাণী ভূতের মুখে রাম নামের মতোই শোনায়।”

তাপস রায়ের আগ্রহের বিষয় তেল, বাঙালির তেল দান ও গ্রহণের কথা নিয়ে লিখেছেন, ‘তেল বের করে নেয়া খৈলজীবন’। যা কি না পাঠকের জন্য আয়না হিসেবে কাজ করে। সে নিজেকে আর চারপাশের মানুষকে পাবে লেখার বাক্যসমূহে। প্রকৃতির গরমের সঙ্গে মানুষের অহংকার মিলিয়ে লিখেছেন, ‘গরম যদি মন্দ তবে’। এই লেখা থেকে উদ্ধৃতির লোভ সামলানো গেল না— “কেউ সম্মান পেতে দেখায় টাকার গরম, প্রেমের জন্য রূপের গরম, চাকরির জন্য মামার গরম, বাঁচার জন্য ক্ষমতার গরম, ছিনিয়ে নিতে শক্তির গরম, আবার কেউ প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলতে কূটবুদ্ধির গরমও দেখায়।” নির্বাচন নিয়ে লিখেছেন, ‘নিঃসঙ্কোচে দেয়া মিথ্যা বচন’। নির্বাচন এলেই নেতা, পাতিনেতা আর কর্মীরা নানা আশ্বাসের বার্তা নিয়ে ভোটারদের দরজায় আসে। আর একই সঙ্গে তারা পুরো এলাকায় দূষণ ছাড়ান। বিশেষত পোস্টার ও দেয়াল লিখনের অত্যাচারে জনগণের নাভিশ্বাস। এমনি করেই প্রতিবারের নির্বাচনে প্রার্থী তার ভোট সংগ্রহ করে আর ভোটার ভোট দেয় নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়নের আশায়।

বাঙালি মধ্যবিত্তের বই কিনে পাঠের অভ্যাস নেই। এখানে বই যেন নেহাত ঘর সাজানোর উপকরণ। বাংলা একাডেমির বইমেলায় যারা যায়, তাদের শতকরা দশভাগ লোকও বই কেনে না। এটা নিয়ে তার বেদনা আছে, যেমন বেদনা আছে পুঁজি সংগ্রহ নিয়ে কার্ল মার্কসের স্ত্রীর বেদনা। বাঙালির সৃষ্টিশীল লেখার সঙ্গে ফেব্রুয়ারি বইমেলাই প্রধান নিয়ামক। লেখক তাঁর লেখা প্রস্তুত করে এই বইমেলাকে কেন্দ্র করে। প্রকাশককে যদি বইমেলার অনেক আগেও পাণ্ডুলিপি দেওয়া হয় সে বইমেলায় বিক্রির জন্যই মুদ্রণ করে। আর পাঠক বইমেলায় বেড়ানোর পাশাপাশি বই কেনে। তার মানে সারা বছরের এই একটি মাস সৃজনশীল বই প্রকাশ ও বিক্রির জন্য নির্ধারিত। গ্রন্থমনস্ক জাতির চিহ্ন নিশ্চয়ই এই বইমেলা নয়। তারপরও তিনি আশা করেন বইমেলায় শত শত বই প্রকাশ হোক। তবে আত্মসমালোচনা করেছেন এই বলে যে, ‘আলস্য ঝেড়ে লেখক লিখুক বারো মাস’।

রাজনীতির বাইরেও তাপস রায়ের রচনা রয়েছে এই গ্রন্থে। যেখানে পরিবার, স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব মিলবে। বর দেখার বিবরণ দিয়ে তিনি কনে দেখার প্রতিতুলনা স্থাপন করেন। সামাজিক নিয়ম ও বিধি তার লেখার ক্ষেত্র। কোরবানি নিয়ে বাঙালি সমাজে আত্মগরিমা প্রকাশের বিষয়টিও রচয়িতার দৃষ্টিপথ এড়িয়ে যায়নি। নিবেদনের চেয়ে নিজেকে প্রকাশই যেন কোনো কোনো বাঙালির কোরবানির প্রয়াস। এ সব বিবেচনায় তিনি এক অসাধারণ গদ্য লিখেছেন।

‘বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ আষাঢ়’ গ্রন্থ নিশ্চিতই রাজনীতি, সমাজ, সামাজিক বিধি নিয়ে রসরচনার একটি ক্ষেত্র সৃজন করেছে। ভাষাভঙ্গির ক্ষেত্রেও নতুনতর ভঙ্গি মিলবে এ গ্রন্থে। তা পাঠককে আরেক আমোদ দেবে। অনার্য প্রকাশিত এ গ্রন্থের প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী আজহার ফরহাদ, বিষয়ের সঙ্গে তা গভীর সম্পর্ক তৈরি করেছে। নান্দনিক মুদ্রণও গ্রন্থ পাঠে আগ্রহ জাগাবে। তবে আশা, তাপস রায় তাঁর লেখনির এই নতুন ভঙ্গি— বিশ্বসাহিত্য ও ব্যক্তিত্বকে সঙ্গী করে মানুষ ও কালকে বিশ্লেষণ করবেন।