• ঢাকা
  • সোমবার, ২৩ মে, ২০২২, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
প্রকাশিত: মে ৮, ২০২১, ০২:৩৯ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ৮, ২০২১, ০৮:৩৯ এএম

রবীন্দ্রনাথ-সত্যজিৎ সম্পর্ক

রবীন্দ্রনাথ-সত্যজিৎ সম্পর্ক

আজ (৮ মে) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০ তম জন্মবার্ষিকী। গত ২ মে ছিল চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকী। সারা বিশ্বের দরবারে বাংলাভাষী মানুষ যেসমস্ত কারণের জন্য গর্ব বোধ করে, তার মধ্যে অন্যতম দুটি নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সত্যজিৎ রায়। বাংলার মাটিতে এই দুই প্রাণপুরুষের বেড়ে ওঠা, সৃষ্টি, ভাবনা আজীবনের সম্পদ হয়ে রয়ে গিয়েছে।

দুজনের যুগ আলাদা হলেও রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। তাই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি নিয়ে যে কয়েকটি কাজই সত্যজিৎ করেছেন সবই হয়েছে সেরা। পারিবারিক সম্পর্কের সুবাদেই রবি ঠাকুরের সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য।

বলা হয়, সত্যজিৎ রায় খুব ভালো করে চিনতেন রবীন্দ্রনাথকে। আর তাই জন্যই সত্যজিৎ যখনই রবি ঠাকুরের গল্প নিয়ে কোনো ছবি করেছেন তা সেরার সেরা হয়েছে। তবে শুধু সিনেমার জন্যই সত্যজিৎ কাছে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের— এমনটা নয়। বরং একটা অন্য সম্পর্ক ছিল তাঁদের মধ্যে। সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষরা থাকতেন বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে। সেখান থেকেই সত্যজিতের পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় কলকাতায় চলে যান। তারা সেখানে গিয়ে থাকতে শুরু করেন উত্তর কলকাতার কর্নওয়ালিশ রোডে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে উপেন্দরকিশোর রায়ের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। সত্যজিতের বাবা সুকুমার রায়কেও খুব পছন্দ করতেন রবীন্দ্রনাথ। সুকুমার রায়ের লেখাও বেশ পছন্দের ছিল রবীন্দ্রনাথের।

রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন ৬০, সত্যজিতের তখন জন্ম হয়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম দেখা হয় শান্তিনিকেতনে। সত্যজিতের মা সুপ্রভা রায় ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলেন রবি ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে। তখন সত্যজিতের বয়স ১০ বছর। সত্যজিৎ রায় একটা খাতা নিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের অটোগ্রাফ নেবেন বলে। কিন্তু রবি ঠাকুর খাতায় সই না করে খাতাটা নিজের সঙ্গে করে নিয়ে চলে যান। এতে খুব কষ্ট পান ছোট্ট সত্যজিৎ। পরদিন আবার রবি ঠাকুরের দেখা পেতে সত্যজিৎ তাঁর উত্তরায়ণের বাড়িতে যান। সেখানে যেতেই রবি ঠাকুর খাতাটি ফেরত দেন সত্যজিৎকে। সেই খাতার মধ্যে লেখা ছিল সেই বিখ্যাত কবিতা—

বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

রবীন্দ্রনাথ-সত্যজিৎ সম্পর্ক এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। মূলত শুরু হয় এখান থেকে। ১৯৩৭ শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের বয়স তখন ১৬। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু অবধি তিনি শান্তিনিকেতনেই ছিলেন। এরপর চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তিনি ছবি বানাতে এসে একের পর এক রবি ঠাকুরের গল্পের নিয়ে কাজ করেন। এবং সেই ছবিগুলো সর্বকালের সেরা ছবি হয়ে থেকে গিয়েছে আজও।

১৯৬০ সালের আগে পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের শোধবোধ, শেষরক্ষা, অজন্তা, নৌকাডুবি, দৃষ্টিদান, বিচারক, গোরা, বউঠাকুরাণীর হাট, চিত্রাঙ্গদা, চিরকুমার সভা, কাবুলিওয়ালা, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, ক্ষুধিত পাষাণ নিয়ে ছবি বানান প্রথিতযশা নির্মাতারা। তাঁদের মধ্যে তপন সিংহ পরিচালিত ‘কাবুলীওয়ালা’ ভারতের রাষ্ট্রপতির পদক, বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার ও ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ভারতের ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

১৯৬০ সালে ভারত সরকার দায়িত্ব দিলেন সত্যজিৎ রায়কে। তিনি বানালেন প্রামাণ্যচিত্র ‘রবীন্দ্রনাথ’। সত্যজিৎ রায় ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের তপন সিংহ, মৃণাল সেন, পূর্ণেন্দু পত্রীসহ বিখ্যাত প্রায় সকল চিত্রপরিচালকই ছবি বানানোর ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা বানিয়েছিলেন—নিশীথে, অর্ঘ্য, সুভা ও দেবতার গ্রাস, অতিথি, শাস্তি, ইচ্ছাপূরণ, মেঘ ও রৌদ্র, মাল্যদান, স্ত্রীর পত্র, বিসর্জন, শেষরক্ষা, নৌকাডুবি, মালঞ্চ প্রমুখ চলচ্চিত্র। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে নৌকাডুবি, এটি একাধিক নির্মাতা বানিয়েছিলেন, এমনকি উর্দুতেও এটা বানানো হয়। 

সত্যজিতের পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সমপর্ক এবং শান্তিনিকেতনে কয়েক মাস রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ তদারকিতে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন বলেই হয়তো তাঁর হাতে পড়ে রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাসগুলো সচল ও জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোটগল্প সমাপ্তি, পোস্টমাস্টার ও মনিহারা নিয়ে ‘তিনকন্যা’ বানিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায় ১৯৬১ সালে। রবীন্দ্রনাথের বড় গল্প ‘নষ্টনীড়’ দিয়ে ১৯৬৪-তে বানালেন ‘চারুলতা’। বলা হয়ে থাকে যে সত্যজিতের সবচেয়ে নিখুঁত চলচ্চিত্রের নাম চারুলতা। ছবিটি রাষ্ট্রপতি পদক, বার্লিন ও মেক্সিকো চলচ্চিত্র উত্সবে শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে পুরস্কৃত হয়। সত্যজিৎ এরপর বড় পুরস্কার পান ‘ঘরে বাইরে’র জন্য, এটি ১৯৮৪-তে ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও দামাস্কাস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পায়। সত্যজিৎ তাঁর সারাজীবনের কাজের জন্য পৃথিবীর সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার অস্কার পেয়েছিলেন। উপেন্দ্রকিশোর দিয়ে সূচনা, তারপর সুকুমার-সত্যজিৎ শেষে সন্দ্বীপ রায় হাত দিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। এভাবেই বংশপরম্পরায় রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ে ধারণ করে বয়ে চলে বিখ্যাত রায়-পরিবার।