• ঢাকা
  • সোমবার, ২৩ মে, ২০২২, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
প্রকাশিত: মে ১২, ২০২১, ০৩:০২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মে ১২, ২০২১, ০৯:০২ এএম

যুগান্তর কথাশিল্পী জগদীশ গুপ্তের গল্পের জগৎ । আহমেদ আববাস

যুগান্তর কথাশিল্পী জগদীশ গুপ্তের গল্পের জগৎ । আহমেদ আববাস

বাংলা ছোটগল্পের সফল রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর হাতেই বাংলা ছোটগল্প প্রথম ধ্রুপদি বৈশিষ্ট্যে এবং নির্বিকল্প নাটকীয়তায় কাব্য ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। তাঁর বর্ষাযাপন কবিতায় তিনিই প্রথম কাব্যিকভাবে ছোটগল্পের মৌলিক অনুষঙ্গগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরেন—‘ছোটো প্রাণ, ছোটো ব্যথা, ছোটো ছোটো দুঃখকথা—।’ তাঁর প্রবর্তনাতেই বাংলা ছোটগল্পের সূত্রপাত আবার তিনিই এ শিল্পসৃষ্টিকে সার্থকরূপ দান করেন। এ কারণেই তাঁকে বাংলা ছোটগল্পের জনক বলা হয়।

রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কথাসাহিত্যে সমাজ বাস্তবতায় স্বতন্ত্র লেখ্যরীতির এক ক্ষুরধার কথাশিল্পী জগদীশ গুপ্ত। গল্প-উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ সংস্কারমুক্ত এক ভিন্নধারা এবং বিরল বিন্যাসের রচনাশৈলী রূপায়ণ করেন। এ জন্য এই বিশিষ্ট কথাকারকে আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের পথিকৃৎ বলা হয়। মনোবৈকল্য ও মনোবিশ্লেষণকে জগদীশ গুপ্তই প্রথম বাংলা ছোটগল্পে সফলভাবে প্রয়োগ করেন। আর এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বসূরি।

জগৎ ও জীবন সম্পর্কে পৃথক প্রেক্ষিত ও প্রকাশভঙ্গির স্বাতন্ত্র্যই জগদীশ গুপ্তকে একজন পরাক্রমশালী লেখকের মর্যাদা দান করেছে। তার কোনো গল্পেই কোনো দৃশ্যপট বা পটভূমিকা প্রাধান্য পায়নি। পেয়েছে সদ্বংশজাত সুশীল সমাজের মানুষের বাহ্যিক আবরণের ভেতরও যে অন্ত্যজ প্রবৃত্তি বিদ্যমান, সেটাই তিনি সবার আঁখিতে আঙুল দিয়ে উপস্থাপন করেছেন।

জগদীশ গুপ্তের আগে সব লেখকই রবীন্দ্র-প্রভাতকুমার রীতি অনুসরণ করতেন। এমনকি তিরিশের অনেক প্রতিষ্ঠিত কথাসাহিত্যিকও সমাজের অভ্যন্তরে এবং অন্দরের অনেক অন্ধকার দিক পরিহার করে চলতেন। কিন্তু জগদীশ গুপ্তই প্রথম পূর্ববর্তী এবং সমকালের কারও বিন্দুমাত্র পদানুবর্তী না হয়ে, কারও তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ নির্মোহ দৃষ্টিতে আখ্যানভাগ রচনা আরম্ভ করেন। আর সেই সাহসী রচনার সূচনাকারীকে বর্তমান সমাজ ভুলতে বসেছে। বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে তিনি আজ তেমন ততটা পরিচিতও নন্। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর প্রদর্শিত রীতিতেই বর্তমান সময়ের কথাকারগণ লিখছেন। যেমনটি লিখেছেন আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস প্রমুখ লেখকগণ। আর ওপার বাংলায় বুদ্ধদেব বসু, বুদ্ধদেব গুহ কিংবা হালের আবুল বাশার, তিলোত্তমা মজুমদারসহ অনেকেই।

জগদীশ গুপ্তের প্রতিটি উপন্যাস কিংবা গল্পই স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে এক একটি আলাদা জীবনদর্শন, একটি থেকে অপরটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। বাংলা ছোটগল্পের শতবর্ষের ইতিহাসে তার ‘আঠার কলার একটি’ কালজয়ী শিল্পমাধুর্যমণ্ডিত একটি জনপ্রিয় গল্প। এ গল্পের আখ্যান এখনো অমলিন। শিক্ষিতজন ব্যতিরেকেও এ গল্পের কাহিনি কুষ্টিয়া, যশোর এবং রাজশাহী অঞ্চলের অনেক অশিক্ষিত নর-নারীর মুখে মুখে শোনা যায়। তারা জগদীশ গুপ্তের নামও শোনেনি। কিন্তু গল্পের কাহিনি নির্মাণের প্রভাব ও প্রাবল্য সমাজের সাধারণ মানুষের স্মৃতিপটে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। গল্প থেকে সামান্য উদ্ধৃতি: চার বছরের বিবাহিত জীবনে স্ত্রীর অবিরাম সাহচর্য চোখের সামনে একটু পুরোনো হয়ে গেলে নয়নসাহা গ্রামের চাষি বেনুকর মণ্ডল তার স্ত্রী জানকীকে সভয়ে বলে, ‘শুনি, মেয়ে মানুষের আঠারো কলা- সত্যি নাকি?’
স্ত্রী তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেলে বলে, ‘সত্যি নয়। কলা আঠারো তো নয়ই, তার চেয়ে ঢের বেশি, কেউ বলে ছত্রিশ, কেউ বলে চুয়ান্ন। চাষার ঘরে কলা! আচ্ছা দেখাব।’

তারপর একদিন বেনুকর মণ্ডল শুকনো চাষের জমি থেকে জ্যান্ত মাগুর মাছ ধরে এনে স্ত্রীর কাছে তাজা মাছের ঝোল খেতে চাইলে স্ত্রী জানকী কৌশলে নাস্তানাবুদ করে তাকে ঘোল খাইয়ে দেয়। এবং শেষে বলে, ‘আঠারো কলা দেখতে চেয়েছিলে না। এ তারই একটি।’

তাঁর লেখা অনন্যসাধারণ একটি গল্প ‘দিবসের শেষে’। অসাধারণ নির্মাণশৈলী এবং ভিন্নমাত্রার বিষয় বৈচিত্র্যের কারণে আজও এটি বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠগল্প। জগদীশ গুপ্তের লেখনীর শৈল্পিক গুণ এবং উপস্থাপনের অবিরাম রচনাকৌশলহেতু গল্পটি হয়ে উঠেছে অনবদ্য। এত চমৎকার নিয়তিবাদী গল্প বাংলা ভাষায় আর দ্বিতীয়টি রচিত হয়নি। মননশীল ধারণা, শিল্পনৈপুণ্যতা এবং চরিত্রচিত্রণের মুনশিয়ানায় কাহিনির প্রধান চরিত্র পাঁচুর নিয়তি অপরিহার্যতা লাভ করে।

আবার তিনি তার ‘পয়োমুখম’ গল্পে মানুষের অর্থাকাঙ্ক্ষার এক রুচিবিরোধী কদাকার চরিত্র তুলে ধরেন। বাংলা ভাষায় এ-জাতীয় অনন্যসুলভ ও নিরুপম গল্প আর কারও কলমে উঠে আসেনি। তার অপর একটি বিখ্যাত গল্প ‘বেলোয়ারী টোপ’। সেখানে দেখানো হয়েছে— সংলগ্ন হবার জন্য সংসর্গই সংগত কারণ। সমাজে অগ্রহণযোগ্য এবং ঘোর নিন্দনীয় হলেও সংসর্গহেতু দুজন বিপরীত লিঙ্গের ঘনিষ্ঠজনের মাঝে বিধিবিরুদ্ধ নিবিড় ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

তাঁর এক একটি গল্প ভিন্ন ভিন্ন জীবনালেখ্য এবং নির্ভেজাল জীবনদর্শন, যা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে তিনি কখনো প্রীতিপূর্ণ প্রেমের গল্প লেখেননি। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে প্রেম মানে প্রয়োজনীয়তা, প্রেম মানে কামানল কিংবা ইন্দ্রিয়লালসা।

জগদীশ গুপ্তের প্রথম গল্পের বই ‘বিনোদিনী’ প্রকাশিত হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পড়ে মুগ্ধ হয়ে মন্তব্য করেন, ‘জগদীশের রচনায় নৈপুণ্য আছে।’ তাঁর লঘু-গুরু উপন্যাসে তমসাচ্ছন্ন জনসমাজের কলুষিত কাহিনি উন্মোচন করায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঘোর বিরোধিতা করেন। বেজায় আপত্তি সত্ত্বেও লেখার গুণগত মানের জন্য তিনি বলতে বাধ্য হন: ‘ছোটোগল্পের বিশেষ রূপ ও রস তোমার লেখায় পরিস্ফুট দেখিয়া সুখী হইলাম।’ একজন নোবেলজয়ী এবং সাহিত্যাঙ্গনে একচ্ছত্র আধিপত্যকারী একজন লেখকের কাছ থেকে এ ধরনের প্রাপ্তি যথেষ্ট এবং পর্যাপ্ত। এর কিছুদিন পরই একটি ইংরেজি পত্রিকায় আবার রবীন্দ্রনাথ তার সম্পর্কে বলেন, ‘S J Gupta writes little but what he writes is pure gold.’ বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক অশোক গুহের মতে, ‘জগদীশ গুপ্ত ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়— এরা দুজনে একই কলমের ও একই স্কুলের লেখক, স্বগোত্র। দুজনেই আঞ্চলিক ভাষার যথার্থ এবং সুষ্ঠু প্রয়োগ করেছেন, দুজনেই বিশ্লেষণ বুদ্ধিতে সমুজ্জল, দুজনেই হাতড়ে বেড়িয়েছেন কার্যকারণ।’

এই প্রতিভাবান এবং প্রবাদপ্রতিম গল্পকার গড়াই নদীর অববাহিকায় শিল্প-সাহিত্যের তীর্থস্থান কুষ্টিয়ার আমলাপাড়ায় ১৮৮৬ সালের ৩ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি পিতৃভূমি ছিল বর্তমান রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি থানার খোর্দ মেঘাচামি গ্রামে। তাঁর পিতা কৈলাসচন্দ্র গুপ্ত কুষ্টিয়া শহরে এসে আইন ব্যবসা আরম্ভ করেন এবং আমলাপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর মাতার নাম ছিল সৌদামিনী দেবী।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তিনি বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি। ১৯০৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন সমাপ্তির পর দুবছর রিপন কলেজে ঘোরাঘুরি করে ১৯০৭ সালে এফএ পরীক্ষা দিয়ে আর্থিক অসংগতির কারণে তিনি লেখাপড়ার লাগাম টেনে ধরেন। এটা ভাবার অবকাশ নেই যে সামান্য উচ্চমাধ্যমিক! তৎকালীন শিক্ষার মান ছিল অনেক উঁচু মানের এবং প্রখর জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন শিক্ষার্থীরাই কেবল ম্যাট্রিকুলেশন পাস করতে পারত। সেকালের লেখাপড়ার গুণগত মান সম্পর্কে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ হক তাঁর আত্মজৈবনিক কাহিনিতে বলেন, ক্লাস সিক্সে থাকতেই তিনি ইংরেজি ভাষায় কোনো কিছু সাবলীলভাবে লিখতে পারতেন। এ বিষয়ে গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ইংরেজিটা আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার। এটা আমার! এটা আমি রেখে দিতে পারি। পেছন ফিরে দেখি, ব্রিটিশ আমলের লেখাপড়া আমাদের। ক্লাস থ্রি থেকেই ইংরেজিটা জোর দিয়ে শেখানো হতো তখন।’ উদ্ধৃতিঃ ‘হে বৃদ্ধ সময়’/সৈয়দ শামসুল হক।

শিক্ষাজীবনের উপসংহার টেনে কর্মজীবনের প্রস্তুতির জন্য তিনি শর্টহ্যান্ড এবং টাইপিং শেখেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতে দীর্ঘ সময় টাইপিস্ট কিংবা কেরানির চাকরি শেষে ১৯৪৪ সালে কুষ্টিয়ার আমলাপাড়ায় এসে অবিরাম বসবাসের জন্য থিতু হন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তিনি সপরিবার কলকাতায় গমন করেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। 

তিনি তাঁর সাহিত্যজীবন কবিতা দিয়ে শুরু করলেও উপন্যাস ও ছোটগল্পে অসামান্য খ্যাতি লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথ, প্রভাতকুমার কিংবা শরৎবাবুর প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যভিতের ওপর তিনিই প্রথম শিল্পিতভাবে আঘাত করেন। তাঁর লেখা সাহিত্য একটা পুরো সাহিত্যগোষ্ঠীর ওপর প্রতিবাদ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি প্রচলিত সাহিত্যরীতির মর্মমূলে সফলভাবে বিদ্ধ করতে সমর্থ হন এবং সাহিত্যাঙ্গনে তার সমকালে আলোড়ন তুলে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর প্রদর্শিত সাহিত্যরীতির ওপর ভর করেই বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রয়েছে।

জগদীশ গুপ্তের প্রথম মুদ্রিত মৌলিক গল্প ‘পেয়িং গেস্ট’ ১৩৩১ সালে বিজলী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পরে গল্পটি ‘উদয়লেখা’ গল্পগ্রন্থে স্থান পায়। অবশ্য এর আগে ‘মির্জার স্বপ্নদর্শন’ নামে একটি অনুবাদ গল্প ১৯১১ সালে তৎকালীন ‘ভারতী’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। কল্লোল যুগের সবচাইতে প্রভাবশালী এবং শক্তিমান লেখক জগদীশ গুপ্ত শুধু কল্লোল পত্রিকাতেই লিখতেন না। কালি কলম, কল্লোল, প্রগতি, বিজলীসহ সমস্ত অভিজাত সাহিত্য পত্রিকাতেই গল্প লিখতেন। সাড়া জাগানো এবং স্বল্পায়ু কল্লোল পত্রিকায় তিনি দশটি গল্প এবং কালি কলমে একুশটি গল্প ও চারটি প্রবন্ধ লেখেন।

তৎকালীন কল্লোল পত্রিকায় তিনি ছিলেন সবচাইতে শক্তিধর ও প্রভাবশালী লেখক। কল্লোলের আড্ডায় সবাই উপস্থিত থাকলেও তিনি কখনো সেখানে যেতেন না। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তার ‘কল্লোল যুগ’ স্মৃতিগ্রন্থে লিখেছেন, ‘জগদীশ গুপ্ত কখনো কল্লোল অফিসে আসেননি। মফস্বল শহরে থাকতেন, সেখানেই থেকেছেন স্বনিষ্ঠায়। কোলাহলের মধ্যে এসে সাফল্যের সার্টিফিকেট খোঁজেননি। প্রাণ দিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। নদী তার বেগ দ্বারাই বৃদ্ধি পায়। আধুনিক সাহিত্যের নদীতে জগদীশ গুপ্ত বিশাল একটা বেগ।’

জগদীশ গুপ্তের গল্প মানে এক একটি নতুন দরজা উন্মোচন। যে কেউ তার গল্প কিংবা উপন্যাস একবার পড়তে শুরু করলে শেষ না করে থামতে পারবেন না। সীমাহীন কৌতূহল টেনে নিয়ে যাবে শিকড়ে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থসমূহ: বিনোদিনী (১৩৩৪), রূপের বাহিরে (১৩৩৬), শ্রীমতি (১৩৩৭) উদয়লেখা (১৩৩৯), শশাঙ্ক কবিরাজের স্ত্রী (১৩৪১), মেঘাবৃত অশনি (১৩৫৪), স্বনির্বচিত গল্প (১৩৫৭)। উপন্যাস: অসাধু সিদ্ধার্থ (১৩৩৬), লঘুগুরু (১৩৩৮), দুলালের দোলা (১৩৩৮), নিষেধের পটভূমিকায় (১৩৫৯), কলঙ্কিত তীর্থ (১৩৬৭) এবং কবিতা সংকলন-অক্ষরা।

এই শক্তিমান কথাসাহিত্যিক কখনো জনপ্রিয়তার পিছে ছোটেননি। তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী স্বভাবের একজন মানুষ। অন্তরালের সাহিত্যিক, নিজস্ব সীমিত পরিসরের বাইরে বিশেষ আত্মপ্রকাশ করতেন না। তাঁর লেখনীর নৈপুণ্যতার কারণেই কল্লোল পত্রিকা প্রথাবিরোধী ভাষায় বাঁক বদল করতে সমর্থ হয়েছিল। অথচ তিনি কখনো কল্লোল পত্রিকা অফিস চেনেন না। তাঁর শিল্পসম্মত সাহিত্যরচনাই তাঁকে অমরত্বের গৌরব দান করেছে।

শুধু ছোটগল্প নয় উপন্যাস লেখাতেও তিনি অপরিসীম যোগ্যতা এবং কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। বিশিষ্ট গবেষক এবং গদ্যকার অধ্যাপক সরোজকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙলা উপন্যাসের কালান্তর’ প্রবন্ধ সংকলন গ্রন্থে উপন্যাসের ভাষারীতি প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাসাহিত্যে তাৎপর্যময় উপন্যাস-ভাষার স্র্রষ্টা হিসেবে জগদীশ গুপ্তের নাম অবশ্য কর্তব্য। যে দুর্জ্ঞেয় অদৃষ্ট জগদীশ গুপ্তের লেখায় বারে বারে ছায়া ফেলে, তারই স্পর্শের হিমশীতলতা যেন জগদীশ গুপ্তের কথাসাহিত্যের ভাষাশৈলীতে অনুভবযোগ্য।’

১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল এই শক্তিমান ও কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক কলকাতায় দেহান্তরিত হন। তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে অবস্থান করলেও চল্লিশ কোটি বাঙালির মাঝে রেখে গেছেন তার অনবদ্য সাহিত্যকীর্তি। সাম্প্রতিক সাহিত্যে ব্যবহৃত প্রকাশভঙ্গিই তার রূপদানকৃত চমকপ্রদ ভাষারীতি। প্রগাঢ়ভাবে অন্তর্নিহিত জীবনবোধ, অসাধারণ ও নিটোল কাহিনিবিন্যাস এবং চিত্রকল্পময় ভাষায় তার সকল ছোটগল্পই বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ হয়েছে। এ কারণে বাংলা সাহিত্যে তিনি চিরকাল অমর ও অবিস্মরণীয় হয়ে বিরাজ করবেন।