• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯
প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২২, ১২:৫৩ এএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ৯, ২০২২, ০৬:৫৩ পিএম

বইঘাঁটা : স্বপ্ন বুনছে মানবিক সমাজের

বইঘাঁটা : স্বপ্ন বুনছে মানবিক সমাজের

কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর কবিতায় বলেছিলেন, ‘‘যেমন রক্তের মধ্যে জন্ম নেয় সোনালি অসুখ/,তারপর ফুটে ওঠে ত্বকে মাংসে বীভৎস ক্ষরতা।/,জাতির শরীরে আজ তেমনি দ্যাখো দুরারোগ্য ব্যাধি/, ধর্মান্ধ পিশাচ আর পরকাল ব্যবসায়ি রূপে/,ক্রমশঃ উঠছে ফুটে ক্ষয়রোগ, রোগেরপ্রকোপ..’’।

বাস্তবিক অর্থে ধর্মান্ধ কট্টরবাদীরা দেশের অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে ইতোমধ্যেই গ্রাস করতে সক্ষম হয়েছে। ধর্মের ধূয়ো তুলে বাঙালির মানবিক মূল্যবোধ ও চিরায়িত সংস্কৃতিকে ধূলিসাৎ করে বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচেষ্টায় তারা সমর্থ হয়েছে বলাই যায়। সত্যিকার অর্থেই জাতির শরীরে আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ধর্মান্ধতার বীভৎস রূপ। সেই বীভৎস ‘রোগেরপ্রকোপ’ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা বিশেষ করে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, সোশ্যাল মিডিয়ায়, ইউটিউবে চোখ রাখলেই তা আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এসবই কলুষিত করছে সমাজকে আর ভয়ানকভাবে দানা বেঁধেছে নতুন এক গণপ্রবণতার- সংখ্যালঘু নিধন! কারা সেই সংখ্যালঘু? যারা দেশে অমুসলিম, বিজ্ঞানমনস্ক মুক্তচিন্তক, মানবিকবোধসম্পন্ন অসাম্প্রদায়িক মানুষ – ধর্মান্ধদের কাছে তারাই সংখ্যালঘু। দেখা যাচ্ছে, এই অনাচার কেবল দেশেই সীমাবদ্ধ নেই, কট্টরপন্থী ধর্মীয় মৌলবাদ পৃথিবী জুড়েই তৎপর। উপমহাদেশের দেশগুলোতেই তারা অধিকতর সক্রিয়।

এরকম একটি সময় ও সমাজে যে কাজটি সবচেয়ে জরুরি তা হলো- এই অপশক্তিকে রুখে দেবার প্রস্তুতি। যার অন্যতম ও দূরদর্শী উপায় হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। তার জন্য চাই বই পড়া; সংস্কৃতির চর্চা বাড়ানো; বিভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানো; বৈচিত্র্যই পৃথিবীর সৌন্দর্য -তা ধারণ করতে পারা; শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রক্ষা করে চলতে পারা ও পরমতসহিষ্ণুতার জ্ঞানার্জন করা অতীব জরুরি। আর বই অনেকাংশেই পারে মানুষকে তার সঙ্কীর্ণতা থেকে বের করে আনতে; মননকে আলোকিত করতে; যেই আলো মানুষের মধ্যকার অন্ধকার দূর করতে পারে এবং চিন্তার ভেদরেখার অবসান ঘটাতে পারে।

ইতোমধ্যেই বইঘাঁটা নামক একটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান তার সীমিত ক্ষমতায় দেশ-বিদেশের বিভন্ন লেখকের অসংখ্য বইয়ের যে এক বৈচিত্রময় সংগ্রহ গড়ে তুলেছে এবং তুলছে -তা নির্দ্বিধায় খুবই সমৃদ্ধ ও অতিমূল্যবান। অর্থাৎ, স্বল্প পরিসরে হলেও বইঘাঁটা সেই কাজটি এগিয়ে নিচ্ছে। পরিসর স্বল্প হতে পারে, কিন্ত কাজটির মহত্ত্ব ও সম্ভাবনা মোটেই স্বল্প নয়। যেমন একটি পর্বতও ধ্বসে পড়তে পারে ছোট্ট এক মূষিকের শুরু করা তার পাদদেশের খনন আবার একটি দেশলাই কাঠিই লাখ লাখ প্রদীপকে আলোকিত করতে পারে। আমার মনে হয় বইঘাঁটা সেই চর্চাটা জারি রেখেছে। কিছু মানুষ জীবনের শত বাস্তবিক জটিলতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বইঘাঁটা নামক এই আনন্দধামে একত্রিত হন; একটি মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখেন এবং আজকের প্রজন্মের মধ্যে সেই স্বপ্ন পূরণের স্পৃহা বুননে প্রয়াসী হন।

বইঘাটা- এই প্রতিষ্ঠানটিকে একটি রিডার্স ফোরাম বা আড্ডাস্থলও বলা যেতে পারে। ২০১৮ সালের আজকের দিনে ফরিদপুরের দক্ষিণ ঝিলটুলীতে সংস্কৃতিকর্মী খন্দকার মাহফুজুল আলম ও লোনা রহমানের বাড়িতে বইঘাটা জন্ম হয়। কিছু জ্ঞানপিপাসু ও প্রসারিত দৃষ্টির মানুষ এখানে নিয়মিতভাবে যাতায়াত করেন, একত্রিত হন। মূলত আড্ডা মারেন। আড্ডার বিষয় বৈচিত্র্যময়- নানা শাখা-প্রশাখা তাদের। ‘মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি’-এরকমই সব নদীই যেমন ঘুরেফিরে শেষে গিয়ে সমুদ্রে মেশে; তাদের আড্ডার মূল বিষয়ও ঘুরেফিরে মানুষে এসে পৌঁছে। যাহোক, এই বয়স্ক স্বাপ্নিক আড্ডাবাজেরা দেশ-বিদেশের নানা ধরনের বই সংগ্রহ করেন। নিজেদের মধ্যে বই আদান-প্রদান করেন এবং বই পড়েন। নিজেরা পড়েন এবং উত্তরপ্রজন্মের মধ্যে পড়ার আগ্রহ, জানার আগ্রহকে উদ্দীপ্ত করেন। প্রতি মাসে বইঘাটার কোনো সদস্যের বাড়িতে একটি আড্ডার আয়োজন করা হয়। বইঘাটার অর্ধশতাধিক সদস্য সেই আড্ডাকে নানাভাবে মাতিয়ে তোলেন। আনুষ্ঠানিকতার বালাইহীন সেই আড্ডার কখনই প্রাণ প্রাচুর্যের কোনো কমতি থাকে না। কেউ গান করেন, কেউ আবৃত্তি করেন কিংবা কেউ বাঁশি বাজান। আবার বিগত মাসে কে কি বই পড়েছেন তার ওপর চলে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দময় বিস্তর আলাপ-সালাপ। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে চলে হোস্ট কর্তৃক আয়োজিত খাবার দাবারের পরিবেশনা; যা আড্ডা জমে ওঠার জন্য অবশ্যই আবশ্যিক পূর্বশর্ত। যিনি হোস্ট তিনি খুবই আনন্দের সঙ্গেই তা করে থাকেন।

বছরে একবার; সম্ভব হলে একাধিকবার দেশের কোনো বিশেষ স্থানে একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়াও বইঘাটার আরেকটি আনন্দের উপলক্ষ্য। প্রতিবছর বইমেলাকে সামনে রেখে ফেব্রুয়ারি মাসে বইঘাটার ''সাঁতার'' নামে একটি আকর্ষণীয় লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। বইঘাটার সদস্যদের লেখা দিয়েই সংকলনটি বের করা হয়। এমনই বিভিন্ন রকমের উদ্যোম, উচ্ছ্বাস আর উৎসাহের মধ্য দিয়ে পুরো বছর চলতে থাকে বইঘাটার আড্ডা; যেখানে নতুন নতুন রসদের সংযোগ ঘটে এবং তা নতুন নতুন আনন্দের অনুষঙ্গে পরিণত হয়।

বইঘাটার আড্ডাস্থল কেবল বয়োজ্যেষ্ঠ স্বাপ্নিকদেরই পদচারণা নয়; এখানকার সদস্যদের পরিবারের কনিষ্ঠজনও সক্রিয় ও স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব নিয়েই উপস্থিত থাকেন। তারাও যেন এখানে বিভিন্নভাবে সংযুক্ত থাকতে আগ্রহ রাখেন এবং নিজেদের পছন্দের জায়গাগুলো আন্দদের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারেন সেই বিষয়টিও খুবই গুরুত্বের সঙ্গে ও সচেতনভাবে পরিকল্পনায় রাখা হয়।

আজকের প্রজন্মই আগামী পৃথিবীর চালিকাশক্তি। পৃথিবীকে ভালবাসার কথা, সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখার কথা এ প্রজন্মকে তো জানাতেই হবে। হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত করতে হবে সেই বার্তা যা প্রাণ-প্রকৃতির জন্য মঙ্গলকর। আজকের অন্তর্জালের বলয়ে আবদ্ধ এই অস্থির পৃথিবীর ব্যবস্থাপত্র ও বিশ্বায়নের পাগলা ঢেউ তো আমাদের সমাজেও লেগেছে। সেখানে যেন তারা খেই হারিয়ে না ফেলে; ভারত উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প, রুগ্ন ও কট্টর ধর্মান্ধতা যেন তাদের কোমল হৃদয়কে দখল করতে না পারে; যেন তারা একটি উন্নত-অগ্রগামী দৃষ্টির অধিকারী হয়; সে জন্যে তাদের মানসকে কিছুটা হলেও প্রস্তুত করে তুলতে হবে আমাদেরই। বইঘাটা নামক এই ছোট্ট প্লাটফর্মটি ইতোমধ্যেই এই একদল তারুণ্যে পরিপূর্ণ বয়স্ক স্বাপ্নিকদের সঙ্গে এ প্রজন্মের দারুণ একটি সেতুবন্ধনও রচনা করতে সমর্থ হয়েছে।  

বইঘাঁটার এ যাত্রা জ্ঞানের আনন্দসুধার অনন্তধারায় উজান বেয়ে ধেয়ে চলুক....