• ঢাকা
  • বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: অক্টোবর ৯, ২০১৯, ০৩:২৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : অক্টোবর ৯, ২০১৯, ০৩:৩৯ পিএম

ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি (১৩)

একটি কালো আইনের জন্ম ও মৃত্যু

আবেদ খান
একটি কালো আইনের জন্ম ও মৃত্যু

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের দ্বিপ্রহর। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মৃতদেহ তখনো পড়ে আছে ধানমণ্ডির বাড়িতে। নিজ নিজ বাড়িতে পড়ে আছে শেখ মণি ও সেরনিয়াবাতের ‘লাশ’। এসব মৃতদেহ দ্রুত দাফনের ব্যবস্থা না করলে সারা দেশে উত্তেজনা বাড়তে পারে। তাই খন্দকার মোশতাক নিহত সবার দাফনের উদ্যোগ নেন। বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য সবাইকে বনানী কবরস্থানে দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়া। আর বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয় তাঁর গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায়।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের ১৮ জনের মৃতদেহ তিনটি বাড়ি ও হাসপাতালের মর্গ থেকে সংগ্রহ করে সেগুলো দাফনের তদারকি করেন মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ। ১৬ আগস্ট রাত ৩টায় ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডারের আদেশে মেজর আলাউদ্দিন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যান। বাড়িটি তখন পাহারা দিচ্ছিল মেজর বজলুল হুদা ও তাঁর লোকজন। দুটি ট্রাকে করে ১৮টি লাশ দাফনের জন্য বনানী কবরস্থানে নেয়া হয়। এএসসি (আর্মি সার্ভিসেস কোর) সেপাইদের একটি প্লাটুন গোরখোদকের কাজ করে। স্টেশন কমান্ডার আগেই মেজর আলাউদ্দিনকে বলেছিলেন, ১৬ আগস্ট দিনের প্রথম আলো ফোটার আগেই দাফনের সব কাজ শেষ করতে।  

মেজর আলাউদ্দিন পাকিস্তান থেকে ফিরে চুয়াত্তরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কিছুদিন পর পর তিনি রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নিষ্কৃতি পান। পঁচাত্তরের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগে ফের গ্রেপ্তার হন এবং বেকসুর খালাস পান। ১৯৮১ সালে তাকে অবসর দেওয়া হয়। পরে জেনারেল এরশাদের আমলে গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের পরিচালক পদে নিয়োগ পান এবং ’৮৫ সালে চাকরিচ্যুত হন। ১৯৯৯ সালের ২২ জানুয়ারি  তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুকে দাফন করার দায়িত্ব দেওয়া হয় মেজর কাজী হায়দার আলীকে। ডিজিএফআই কনফারেন্স রুমে মহাপরিচালক আবদুর রউফ তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। ওইসময় অন্য কেউ এ কাজ করতে রাজি হচ্ছিল না। মেজর কাজী হায়দার আলীকে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে দাফন শেষে সন্ধ্যার আগেই ঢাকায় ফিরতে বলা হয়। ঐ সময় গোপালগঞ্জ মহকুমার পুলিশ অফিসার ছিলেন মো. নুরুল আলম, আর ঢাকার এসপি ছিলেন আব্দুস সালাম। ১৬ আগস্ট সকালে আব্দুস সালাম টেলিফোনে নুরুল আলমকে বঙ্গবন্ধুর দাফনের ভার দেন। আব্দুস সালাম তাকে জানান, “দুপুরের মধ্যে হেলিকপ্টার টুঙ্গিপাড়ায় যাবে। বাবা-মার কবরের পাশে তার লাশ দাফন করবেন। যাতে কবরের মধ্যে কফিনসহ লাশ রেখে তাড়াতাড়ি মাটি দেয়া যায় সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। ১৫ মিনিটের মধ্যে দাফন শেষ করে হেলিকপ্টার ফিরে আসবে। হেলিকপ্টার নামানো, লাশ কবর দেয়া এবং ওই লাশ যাতে কবর থেকে কেউ তুলতে না পারে এর জন্য সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। গোপালগঞ্জ পুলিশলাইন এবং নিকটস্থ থানা/ফাঁড়ি হতে পুলিশ এনে টুঙ্গিপাড়ায় নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করেন, যাতে সেনাবাহিনীর সদস্যদের কোনো সমস্যা না হয়, দাফন শেষে তারা যেন দ্রুত ও নিরাপদে ঢাকায় চলে আসতে পারে।’ 

১৬ আগস্ট দুপুরে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ টুঙ্গিপাড়ায় নেয়া হয়। উপরমহলের নির্দেশ মোতাবেক নুরুল আলম সব ব্যবস্থা করে রাখেন। এলাকায় তিনি নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেন। বঙ্গবন্ধুর কফিন হেলিকপ্টার থেকে নামান টুঙ্গিপাড়ার তৎকালীন সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার কাসেম, পোস্টমাস্টার আনোয়ার হোসেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আব্দুল হাই। এছাড়া গ্রামবাসীর মধ্যে ছিলেন আকবর কাজী, মো. ইলিয়াস হোসেন, জহর মুন্সি, সোনা মিয়া কবিরাজ, শেখ নুরুল হক, গেদু মিয়া, সোহরাব মাস্টারসহ আরো কয়েকজন। বঙ্গবন্ধুর কফিন খোলেন ওই গ্রামের কাঠমিস্ত্রি হালিম শেখ। তাকে সহযোগিতা করেন তাঁর ১৭ বছর বয়সী ছেলে আয়ুব আলী শেখ।

বঙ্গবন্ধুর ঘাতকেরা স্থানীয়দের নির্দেশ দেন কফিনসহ দাফন করতে। কিন্তু ইমাম সাহেবের আপত্তি থাকায় তা সম্ভব হয়নি। মৌলভি আব্দুল হালিম লাশ না দেখে দাফন করতে আপত্তি জানান। সেনা অফিসাররা সব নিয়ম মেনে ১৫ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফনের নির্দেশ দেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর কফিন খোলা হয়। ঘাতকদের বুলেটে বঙ্গবন্ধুর বুক ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। হাতেও গুলি লেগেছিল। তখনো তার শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছিল। গায়ে ছিল সাদা গেঞ্জি ও পাঞ্জাবি। পরনে ছিল সাদা চেক লুঙ্গি। পাঞ্জাবির এক পকেটে ছিল চশমা ও প্রিয় পাইপ।

কফিন থেকে বঙ্গবন্ধুর লাশ বের করে গোসলের জন্য নেয়া হয়। স্থানীয় আশরাফ মোল্লার দোকান থেকে কিনে আনা হয় ৫৭০ সাবান। এই সাবান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গোসল করানো হয়। বঙ্গবন্ধুকে গোসল করান মন্নাফ শেখ, সোনা মিয়া ও ইমান উদ্দিন গাজী। কাফনের জন্য রেড ক্রিসেন্ট থেকে আনা হয় মালা শাড়ি। এই শাড়ির জমিন সাদা আর পাড় ছিল লাল-কালো। সেই পাড় ছিঁড়ে ফেলে বঙ্গবন্ধুর কাফন হিসেবে পরানো হয়। দাফন দ্রুত সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা জনসাধারণকে জানাজায় অংশ নিতে বাধা দেন। এ সময় মেজর হায়দার গ্রামবাসীকে অকথ্য ভাষায় গালি দেন এবং তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।

জানাজায় টুঙ্গিপাড়া, পাটগাতী ও পাঁচকাহনিয়া গ্রামের মাত্র ৩০-৩৫ জন অংশ নেয়ার সুযোগ পায়। বঙ্গবন্ধুকে দাফনের জন্য আগে থেকেই টুঙ্গিপাড়ায় কবর খুঁড়ে রাখা হয়। গ্রামের মানুষ দাফনে অংশ নিতে এলে পুলিশ ও সেনাসদস্যরা তাদের বাধা দেয়। জানাজা শেষে পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা শেখ সাহেরা খাতুনের কবরের পাশে বঙ্গবন্ধুর দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজা ও দাফন শেষে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন মরহুম মৌলভি আব্দুল হালিম। দাফন শেষে সেনাসদস্যরা ডায়রিতে শেখ আব্দুল মন্নাফের স্বাক্ষর নিয়ে চলে যান। তবে কবর দেয়ার পর সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। কবরের কাছে কাউকে ঘেঁষতে দেয়া হতো না। এ সত্ত্বেও টুঙ্গিপাড়াবাসী বঙ্গবন্ধুর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মিলাদ ও কোরআনখানির আয়োজন করে।

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দাফন সম্পন্ন করার পর খন্দকার মোশতাক সবকিছু গুছিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেন। মোশতাক তাঁর ক্ষমতাকে সংহত করতে বাংলাদেশবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী কিছু ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপদে বহাল করেন। ফলে এ সময় স্বাধীনতাবিরোধী চক্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে বেশ ত‍ৎপর হয়ে ওঠে।

সেনাবাহিনীকে মোশতাক বিশ্বাস করতেন না। তার আশঙ্কা ছিল সেনাবাহিনীর কাছ থেকে যেকোনো মুহূর্তে আঘাত আসতে পারে। আর যদি আঘাত আসে, তবে তার মসনদ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে, সেই বিষয়ে তিনি ছিলেন নিঃসন্দেহ। তাই তিনি তাড়াহুড়ো করে সামরিক বাহিনীতে পরিবর্তন আনেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দিকে নজর দেন। 

খন্দকার মোশতাক

মোশতাক তখন খুনিদের হাতের পুতুল। মেজর রশিদ, ফারুক এবং তাদেরই সহযোগীদের হাবভাব ও চালচলন দেখে মনে হতো, দেশ এবং সেনাবাহিনী তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। মেজর ফারুক বঙ্গভবনের একটি কালো মার্সিডিজ গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়াত। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে মোশতাক সেনাবাহিনীর কোনো সুপারিশ ছাড়াই মেজর ফারুক ও রশিদকে লে. কর্নেল পদে পদোন্নতি দেন। ডালিমকেও সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে এনে লে. কর্নেল পদে পদোন্নতি দেন। খন্দকার মোশতাক এদেরকে তার নিজের নিরাপত্তার জন্য বঙ্গভবনেই থাকতে উ‍ৎসাহিত করতেন। তারাও বঙ্গভবন ছেড়ে সেনাছাউনিতে ফিরে যেতে নারাজ। বরং তারাই মোশতাকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর বদলে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর প্রধানের আসনে তুলে আনে।  

ব্যক্তিগতভাবে জেনারেল জিয়া সম্পর্কে খন্দকার মোশতাকের ধারণা ভালো ছিল না। তিনি মনে করতেন, জিয়া মতলববাজ, চতুর ও উচ্চাভিলাষী। এ ধরনের লোক যেকোনো মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের গদি ধরে টান দিতে পারে। আর তা যদি সে করেই বসে, তবে মোশতাকের প্রশাসন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। সঙ্গে সঙ্গে তিনিও ছিটকে পড়বেন প্রেসিডেন্টের গদি থেকে।

কিন্তু রশিদ ও ফারুকের এক কথা। তাদের মতে, জিয়া তাদের কাছের লোক এবং শ্রদ্ধাভাজন। জিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে গঠিত সিআইএ এবং আইএসআইয়ের প্ল্যানিং সেলের অন্যতম সদস্য। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জিয়া প্রথম থেকেই ফারুক-রশিদদের সাহস জুগিয়েছেন। জিয়া বলেছিলেন, তিনি সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের সর্বোতভাবে সহযোগিতা করবেন। বঙ্গবন্ধু হত্যায় সফল হলে তিনি তাদের রক্ষা করবেন। কাজেই সৈন্যবাহিনীর প্রধান হবেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, আর কেউ নয়। এটাই ফারুক-রশিদের সাফ কথা। খন্দকার মোশতাক বিনা শর্তে বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের এই দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন। আর পূর্বতন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল সফিউল্লাহকে অব্যাহতি দিয়ে তাঁর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয় রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগের জন্য। তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার এইচ এম এরশাদকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে উপসেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এই নিয়ে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এরশাদ কর্নেল থেকে দুটি পদোন্নতি পেয়ে মেজর জেনারেল হন, যা সেনাবাহিনীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

আরও একটি ক্ষেত্রে খন্দকার মোশতাককে মাথা নিচু করতে হয়। সেটা হলো বিমানবাহিনীর প্রধানের ব্যাপারে। বিমানবাহিনীর প্রধান ছিলেন এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার। খুনিদের ইচ্ছা, তাঁকেও সরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু কাকে আনবেন সেখানে?

এক্ষেত্রে কর্নেল রশিদ এগিয়ে দিল একটি নাম। গ্রুপ ক্যাপ্টেন তোয়াব। একসময় তোয়াব ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একজন অফিসার। গ্রুপ ক্যাপ্টেন তোয়াব স্বাধীনতাযুদ্ধের পুরো সময় জার্মানিতে ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে এসে বিমানবাহিনীর প্রধান করা হয়। এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকারকে রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়।

অবসর গ্রহণের পর তোয়াব তাঁর জার্মান স্ত্রীকে নিয়ে মিউনিখে ছিলেন। তার সঙ্গে কর্নেল রশিদের বরাবরই একটা যোগাযোগ ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগেই তিনি রশিদের মতলবের কথা জানতেন। তাই বিমানবাহিনীর প্রধানের নাম খুঁজতে গিয়ে রশিদের মনে এসেছিল তোয়াবের নাম। বিমানবাহিনীর প্রধান হিসেবে তোয়াবের ব্যাপারে খন্দকার মোশতাক কোনো আপত্তি করেননি। এ ব্যাপারে তার ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। 

খন্দকার মোশতাক ছিলেন পাকা উকিল। অত্যন্ত জটিল, কুটিল ও পাকা বুদ্ধির মানুষ। তিনি সবকিছু সহজভাবে মেনে নেয়ার মতো মানুষ নন। জেনারেল জিয়া সেনাবাহিনীর প্রধান ও তোয়াব বিমানবাহিনীর প্রধান হওয়ার পর মোশতাক যথারীতি ওকালতি প্যাঁচ কষলেন।

জিয়াউর রহমান

কারো সঙ্গে কোনো রকম পরামর্শ না করে তিনি ‘চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ’ এর পদ সৃষ্টি করলেন। আর এই আসনে বসালেন বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রধান মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে। মর্যাদার দিক দিয়ে এ পদটি সেনাবহিনীর তিন প্রধানের পদেরও ওপরে। 
মোশতাক সবার ওপর বসালেন বাংলাদেশের প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল এমএজি ওসমানীকে। জেনারেল ওসমানী হলেন নতুন প্রেসিডেন্টের সামরিক উপদেষ্টা। মোশতাকের প্রত্যাশা ছিল, জেনারেল ওসমানীর সাহায্যে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবেন। কেননা তাকে সেনাবাহিনীর প্রায় সব অফিসারই মেনে চলেন। 

সামরিক বাহিনীর উপরের স্তর সাধ্যমতো সাজানো শেষে খন্দকার মোশতাক নজর দেন প্রশাসনের দিকে। প্রশাসনের সব গুরুত্বপূর্ণ অফিসার তার হুকুমমাফিক না চললে তা যেকোনো মুহূর্তে নতুন সরকারের বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই মোশতাক প্রশাসনের ওপরতলায় তার আস্থাভাজন লোকদের এনে বসালেন।

এইচ টি ইমাম বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন আহমদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অতি সাধারণ বিষয়ে সামরিক আইনের বিধিমালার আওতায় দুটি মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। শফিউল আজমকে করা হয় নতুন সরকারের ক্যাবিনেট সেক্রেটারি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই শফিউল আজম ছিলেন তৎকালীণ পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চিফ সেক্রেটারি। পাক হানাদাররা বাঙালির রক্তে বাংলাদেশের মাটি ভিজিয়ে দিলেও বিষয়টি তার মনে এতটুকু দাগ কাটেনি। তিনি তখনো বহাল তবিয়তে পাকিস্তান সরকারের খেদমত করে গেছেন।

স্বরাষ্ট্রসচিব হলেন সালাহউদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্রসচিব। স্বাধীনতার পর তিনি চাকরি নিয়ে গিয়েছিলেন বিদেশে। খন্দকার মোশতাক তাকে বিদেশ থেকে আনিয়ে স্বরাষ্ট্রসচিবের পদটি উপহার দেন। এবিএস সফদার আগে ছিলেন পাকিস্তান গোয়েন্দা দফতরের একজন অফিসার। তাকে জাতীয় গোয়েন্দা (এনএসআই) দফতরের সেক্রেটারি জেনারেলের আসনে চড়িয়ে দেন। এ ছাড়া তোবারক হোসেন ছিলেন পাকিস্তান পররাষ্ট্র দফতরের একজন বড় অফিসার। পারিবারিক সূত্রে পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তোবারক হোসেনের ছিল নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ক। মোশতাক তার হাতে দেন পররাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব। অর্থাৎ তিনি হন পররাষ্ট্রসচিব।

এতকিছু সত্ত্বেও খন্দকার মোশতাক নিশ্চিত হতে পারেননি। তার আশঙ্কা চারদিকের এই সতর্ক বাঁধ শেষ পর্যন্ত যদি না টেকে? যদি কেউ নতুন অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তার ক্ষমতা কেড়ে নেয়? তাহলে ষড়যন্ত্রকারীরা, খুনিরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তাদের কপালে যে অনিবার্য মৃত্যুদণ্ড!

সেই পথে কাঁটা দেবার জন্য মোশতাক ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর একটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন। এর নাম ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যন্স-১৯৭৫’ বা ১৯৭৫ সালের দায়মুক্তির অধ্যাদেশ। এই অধ্যাদেশের ফলে ভবিষ্যতে কেউ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের ২১ জনকে হত্যার জন্য খুনিদের বিচার করতে পারবে না। শাস্তি দিতে পারবেন না। এমনকী যেসব ব্যক্তি এ কাজের ছক কেটে দিয়েছে, প্ররোচনা দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। সরকারি গেজেটে এই অধ্যাদেশ প্রকাশ করা হয় এবং এ ব্যাপারে তখন অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়, গণমাধ্যমে এ বিষয়ে কিছুই প্রকাশ করা হয়নি। কারণ এটা ওই সময় প্রকাশ হলে সারাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হতো।  

বঙ্গবন্ধুর ঘাতক রশিদ ও ফারুকের মাথায় এ বুদ্ধি আসেনি। তারা এ নিয়ে ভাবেনি। এই চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের জন্ম খন্দকার মোশতাক আর জেনারেল জিয়ার মাথায়। এই দুই চক্রান্তকারীর মনে সব সময় একটা ভয় কাজ করত। তাদের মনে এই শঙ্কা জাগত যে যদি কোনো দিন ক্ষমতা তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় এবং যদি তারা বেঁচে থাকে, তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়ে তাদের ফাঁসিতে ঝুলতে হতে পারে। এ শঙ্কা থেকেই মোশতাক ও জিয়া এই দায়মুক্তির অধ্যাদেশ জারি করেন। 

খন্দকার মোশতাক এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমান স্বাক্ষরিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের প্রথম অংশে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলব‍ৎ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় অংশে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

এরপর নানা নাটকীয়তা ও মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হন। সেসময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েম। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক আইন প্রশাসক হন আর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রহসনের ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এইচ এম এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেননি। কেননা তারা সবাই ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার সুবিধাভোগী। ফলে তারা খুনিদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাসে তাদের চাকরি দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। জিয়া, সাত্তার ও এরশাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় খুনিরা ১৫ আগস্টের হত্যার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা প্রকাশ্যেই বলে বেড়িয়েছে, নানারকম উস্কানিমূলক এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাবার্তা বলেছে। 

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল-সংক্রান্ত আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আমিন উল্লাহর নেতৃত্বে যে কমিটি গঠন করা হয়, তাদের রিপোর্টেই প্রকাশ পায় এই কালো আইনটি বাতিলের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে এরপর তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিল বাতিলের জন্য ‘দি ইনডেমনিটি রিপিল অ্যাক্ট-১৯৯৬’ নামে একটি বিল উত্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সংসদে পাস হয় বহুল সমালোচিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বিল। এরই মাধ্যমে জাতি ২১ বছরের কলঙ্কমুক্ত হয় এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়।

এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তিন প্রধান আসামি লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহকারী (পিএ) এ এফ এম মোহিতুল ইসলাম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় একটি এফআইআর করেন। ১৯৯৭ সালের ১৫ জানুয়ারি সিআইডি এই মামলায় ২০ জনকে অভিযুক্ত করে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চার্জশিট দাখিল করে এবং একই বছরের ১২ মার্চ ছয় আসামির উপস্থিতিতে আদালতে বিচার শুরু হয়।

১৯৯৭ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত বিচারক বিব্রত হওয়াসহ নানা কারণে ৮ বার বিচার কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এভাবে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর মামলার রায়ে বিচারক কাজী গোলাম রসুল ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। অন্যদিকে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ২৪ দিনের শুনানি শেষে বিভক্ত রায় প্রদান করেন। বিচারক এম রুহুল আমিন অভিযুক্ত ১৫ আসামির মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বজায় রাখেন। কিন্তু অপর বিচারক এ বি এম খায়রুল হক অভিযুক্ত ১৫ জনকেই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। পরে হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চে ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে।

পরবর্তীতে ২০০১ সালের অক্টোবরের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিচারকাজ বন্ধ থাকে। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০০৭ সালের ২৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের মুখ্য আইনজীবী বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সুপ্রিম কোর্টে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করেন এবং ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ ২৭ দিনের শুনানি শেষে ৫ আসামিকে নিয়মিত আপিল করার অনুমতিদানের লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন।

২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর ২৯ দিনের শুনানির পর চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষ হয় এবং আদালত ১৯ নভেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। ওইদিন (১৯ নভেম্বর) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির দায়ের করা আপিল আবেদন খারিজ করা হয়। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে ২৮ জানুয়ারি ৫ আসামির ফাঁসির রায় কার্যকর করে জাতি দায়মুক্ত হয়।

লেখক : সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

[ বি.দ্র : পরবর্তী পর্ব প্রকাশ হবে আগামী ১৬ অক্টোবর, বুধবার। ] 

আরও পড়ুন