• ঢাকা
  • শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১০ আশ্বিন ১৪২৭
প্রকাশিত: আগস্ট ৪, ২০২০, ০২:৩৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ৪, ২০২০, ০২:৪৭ পিএম

মেজর (অব.) সিনহা নিহতের ঘটনা

খোলাসা হচ্ছে নথি-বিবৃতির সমন্বয়হীন তথ্য ধাঁধার জট!

এস এম সাব্বির খান
খোলাসা হচ্ছে নথি-বিবৃতির সমন্বয়হীন তথ্য ধাঁধার জট!

ত ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর এবং সাবেক এসএসএফ সদস্য সিনহা মো. রাশেদ খান (৩৬) নিহত হন। সে সময় তার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাত নামের অপর ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়।

আলোচিত এই ঘটনার প্রেক্ষিতে টেকনাফ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিতের দায়েরকৃত দুটি মামলার মধ্যে একটির এজহারভুক্ত তথ্য মতে, এ মামলার আসামি করা হয়েছে নিহত সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম ওরফে সিফাতকে। সিফাতের অপরাধ, পরস্পর (সিনহা ও সিফাত) যোগসাজশে সরকারি কাজে বাধা, হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র তাক করা ও মৃত্যু ঘটানো। তবে সে ঘটনায় 'মৃত্যু ঘটানো'র দায়ে নিহত সাবেক মেজর সিনহা ও তাঁর সঙ্গীকে অভিযুক্ত করা হলেও গুলিবর্ষণ সম্পৃক্ত বিবরণিতে উল্লেখ রয়েছে নিরাপত্তা চৌকির ইনচার্জ এসআই লিয়াকতের সার্ভিস রিভোলবার থেকে চারটি গুলি ছোঁড়ার তথ্য! অর্থাৎ মামলার অভিযুক্ত প্রাণঘাতের উদ্দেশ্যে অস্ত্রের প্রয়োগ করেছেন, এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য বিবরণীতে নেই। বরং অস্ত্রের প্রয়োগ শুধুমাত্র এসআই লিয়াকত দ্বারা হয়েছে বলে পুলিশেরই এজহারে নিশ্চিত হয়।

এর বাইরেও সিনহা মো. রাশেদ খান ও সাহেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ
আইনেও মামলা করেছে পুলিশ। সেখানে পুলিশি তল্লাশিতে উদ্ধার দেখানো হয়েছে ৫০ পিস ইয়াবা ও
২৫০ গ্রাম গাঁজা।

মামলার এজহারে উল্লেখিত তথ্যেরভিত্তিতে জানা যায়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা পরেন—এমন পোশাক পরা এক ব্যক্তিসহ সন্দেহভাজন দুইজন লোক মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছেন, যাদেরকে স্থানীয় এলাকাবাসী ডাকাত বলে সন্দেহ করছেন; এই তথ্য অবগত হওয়ার পর তা টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাসকে অবগত করা হয়। পরবর্তীতে তার নির্দেশেই শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে শুরু হয় যানবাহন তল্লাশির কাজ। ঘটনাক্রমে এরই এক পর্যায়ে ফাঁড়ি ইনচার্জের গুলিতে সাবেক ওই সেনা সদস্যের মৃত্যু হয়।

তবে জাতীয় একটি সংবাদপত্রের সাংবাদিকের কাছে মামলার এজহারে উক্ত ঘটনা প্রসঙ্গে পূর্বেই তাকে অবগত করা হয়েছে এবং তাঁর নির্দেশেই তল্লাশি তৎপরতা শুরু করা হয়- এমন তথ্য জেনে ওসি প্রদীপ বলেন, ‘আমাকে জানানো হয়েছিল—এ কথা এজাহারে আছে? তাহলে পড়ে বলতে হবে।’

এছাড়া মৃত্যুর আগে একাধিকবার সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের কাছে তার পরিচয় উপস্থাপন করেছেন বলেও সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এ থেকে সুনির্দিষ্টভাবেই বোঝা যায় যে, ঘটনার পর চালানো অনুসন্ধানে নিহত সিনহার 'সেনা পরিচয়' সম্পর্কে পুলিশ জানতে পেরেছে মর্মে প্রাথমিকভাবে যে তথ্য পুলিশের বিশেষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছিল তা সঠিক নয়।

মামলার এজাহারে বর্ণিত হয়েছে, কমিউনিটি পুলিশের সদস্য নুরুল আমিন (২১) রাত সাড়ে আটটার দিকে ফাঁড়ির ইনচার্জকে মুঠোফোনে জানান, কয়েকজন ডাকাত পাহাড়ে ছোট ছোট টর্চলাইট জ্বালিয়ে এদিক–সেদিক হাঁটাহাঁটি করছে। নুরুল আমিন এ কথা নিজামউদ্দিন ও আরও চারজনকে জানান। স্থানীয় মারিশবুনিয়া নতুন মসজিদের মাইক থেকে পাহাড় থেকে ডাকাত নেমে আসছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। ডাকাত প্রতিহত করতে এলাকার সবাইকে একত্র হতে বলা হয়। কিছুক্ষণ পর দুই ব্যক্তি নেমে আসেন। সে সময় ঘটনাস্থলে ২০ থেকে ৩০ জন ছিলেন।

এক পর্যায়ে পাহাড় থেকে নেমে আসা দুজনকে ‌শনাক্ত করার জন্য তাদের দিকে মো. মাঈন উদ্দীন নামের (১৯) এক ব্যক্তি তার হাতে থাকা টর্চলাইটের আলো ফেললে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একজন অস্ত্র উঁচিয়ে তাঁকে (প্রকাশ অযোগ্য) গালি দেন এবং এলাকার লোকজনকে অস্ত্র উঁচিয়ে ধাওয়া করলে তারা ভয়ে নিরাপদ জায়গায় অবস্থান নেন। পরে ঐ দুজন সিলভার রঙের প্রাইভেটকারে করে মেরিন ড্রাইভ হয়ে কক্সবাজারের দিকে রওনা হন। এ খবর নুরুল আমিন নামের এক ব্যক্তি বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই লিয়াকতকে জানালে তিনি তা টেকনাফ থানার ওসিকে অবগত করেন। তার নির্দেশে বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত আলীর নেতৃত্বে রাত সোয়া নয়টার দিকে শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টে যানবাহন তল্লাশি শুরু হয়।

নন্দদুলাল রক্ষিত এজাহারে বলেন, মিনিট বিশেক পর তল্লাশিচৌকির সামনে থামার জন্য একটি প্রাইভেটকারকে সংকেত দেয়া হয় কিন্তু গাড়িটি সংকেত অমান্য করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে ইনচার্জ লিয়াকত আলী তল্লাশিচৌকিতে থাকা ব্লক দিয়ে গাড়িটির গতিরোধ করেন এবং হাত উঁচিয়ে গাড়ির ভেতরে থাকা ব্যক্তিকে বের হতে বলেন। ওই সময় গাড়িচালকের আসনে থাকা ব্যক্তি নিজেকে সেনাবাহিনীর মেজর বলে পরিচয় দেন এবং তর্ক শুরু করেন। তার পাশে বসা ব্যক্তিটি গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন।

মামলায় বলা হয়, ফাঁড়ির ইনচার্জ এ সময় গাড়িচালকের আসনে বসা ব্যক্তিকে গাড়ি থেকে নেমে হাত মাথার ওপর উঁচু করে ধরে দাঁড়াতে বলেন এবং বিস্তারিত পরিচয় জানতে চান। কিছুক্ষণ তর্কবিতর্কের পর সেনাবাহিনীর মেজর পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি গাড়ি থেকে নেমে তার কোমরের ডান পাশ থেকে পিস্তল বের করে গুলি করতে উদ্যত হন। এ সময় ইনচার্জ লিয়াকত আলী নিজের ও সঙ্গীয় অফিসার ফোর্সদের জানমাল রক্ষার্থে সঙ্গে থাকা পিস্তল দিয়ে চারটি গুলি করেন।’

এ ঘটনার পরবর্তীতে মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে নামা সেনাবাহিনীর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি দল তাদের প্রাপ্ত তথ্যেরভিত্তিতে যে বিবৃতি প্রকাশ করেছে সেখানে সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির বরাত উল্লেখ করে জানায়, ঘটনাকালীন নিরস্ত্র অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার বুকে গুলি চালান এসআই লিয়াকত। যা পুলিশের এজহারে উল্লেখিত তথ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

এছাড়া নিহত মেজর (অব.) সিনহার ময়নাতদন্ত পরবর্তী প্রাথমিক যে সকল তথ্য জানা গেছে সেখানেও আড়ালে রয়েছে তদন্ত স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়। যার মধ্যে নিহত সিনহার হাতের কব্জিতে হাতকড়া পড়ানোর আলামত পাওয়ার কথা সেনা গোয়েন্দাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করা রয়েছে। এদিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের এক আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন হাসপাতালে আনার আগেই অবসরপ্রাপ্ত ওই সাবেক সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছিল। শনিবার সকালে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। প্রাথমিক তথ্যেরভিত্তিতে তিনি জানান, নিহত সিনহার বুকে ও পিঠে জখমের দাগ আছে। ময়নাতদন্তের পরিপূর্ণ রিপোর্ট হাতে এলে বলা যাবে জখমের চিহ্নগুলো কিসের।

একই ঘটনার প্রেক্ষিতে অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বিবৃতি ও প্রকাশিত তথ্যের এমন ভিন্নতা আর অসামঞ্জস্যতায় নানা জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজে পাওয়া জটিল হচ্ছে। আর সেই সঙ্গে ক্রমেই বাড়ছে প্রশ্নের বোঝা। সেক্ষেত্রে নির্ধারিত বিশেষ তদন্ত কমিটির ওপরই আলোচিত এই ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট ও ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জানার প্রতীক্ষায় রয়েছে সারাদেশ। এরইমধ্যে মেজর (অব.) সিনহা নিহতের ঘটনা তদন্তে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তড়িৎ তৎপরতা বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের দাবি, সাম্প্রতিক এই ঘটনা সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিষয়ে নিবেদিত সেনা ও পুলিশের মত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে যেন বিব্রত করতে না। পাশপাশি ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন তৎপরতা যেন অব্যাহত থাকে। দোষী যেই হোক এক্ষেত্রেও সরকারের আইকনিক 'জিরো টলারেন্স' অ্যাকশনই সকলের কাম্য।