• ঢাকা
  • রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২০, ৯ কার্তিক ১৪২৭
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০, ০১:৫৯ এএম
সর্বশেষ আপডেট : সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০, ০২:০৪ এএম

আজ ঐতিহাসিক ২৫ সেপ্টেম্বর

রাষ্ট্রপুঞ্জে বঙ্গবন্ধু বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ

এস এম সাব্বির খান
রাষ্ট্রপুঞ্জে বঙ্গবন্ধু বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান - ফাইল ছবি।

জাতিসংঘ ধিবেশনে জাতির পিতার তিহাসি ভাষণ

১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য হিসেবে যোগদানের অনন্য মর্যাদা অর্জন করে। যার প্রেক্ষিতে ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে ভাষণ দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ শুধুমাত্র রাষ্ট্রপুঞ্জের মহামঞ্চে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি অর্জনের সাক্ষী হিসেবে ইতিহাসের আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়নি; সেই ঐতিহাসিক বক্তব্যে একদিকে তিনি যেমন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উত্থানের বার্তা জানান দিয়েছিলেন, তেমনি তৎকালীন  বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরে মানবতা ও বিশ্বশান্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল, ক্ষুধা ও সংঘাতমুক্ত সম্ভাবনাময় নতুন বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষিতে নিজের বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি ও দূরদর্শী অভিমত তুলে ধরেছিলেন। একজন বিশ্বমানের নেতা হিসেবে এই এক বক্তব্যেই বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু তাঁর ব্যক্তিত্বের স্বকীয়তা ও নেতৃত্বের বহুমাত্রিকতায় গোটা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছিলেন।

জাতিসংঘের সেই অধিবেশনে দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণের শুরুতেই গোটা বাঙালি জাতিকে মর্যাদার এক অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু। যে ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে জেগে ওঠা সংগ্রামের বহ্নিপ্রলয় শত্রু বিনাশে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে; তার প্রতি সম্মান জানিয়ে সাহসীকতার সঙ্গে সেই বাংলা ভাষায় নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করে সারাবিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। একইসঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এমন বহু বিষয় নিজের সেই বক্তব্যে তিনি তুলে ধরেছিলেন; যা দীর্ঘ ৪৬ বছর পর বর্তমান বাংলাদেশ তথা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে প্রত্যক্ষ সত্যরূপে প্রতীয়মান।

বিশ্বপরিসরে এর আগে এমনভাবে বাংলা ভাষাকে কেউ পরিচয় করিয়ে দেয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তার হাত ধরে বিশ্বের দরবারে প্রথম বাংলা ভাষা পরিচিত পেয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাঙ্গনের কোথাও তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেননি। ১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পুরস্কার পাওয়া দ্বিতীয় বাঙালি তিনি। তিনিও তার বক্তব্যটি রেখেছিলেন ইংরেজিতে। আর বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনুস ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। বঙ্গবন্ধু তার ব্যক্তিসত্ত্বায় বাঙালি জাতিসত্ত্বার আদর্শকে এমনভাবে ধারণ করতে পেরেছেন বলেই হয়তো ইতিহাসের পাতায় তিনি সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ বাঙালির মর্যাদায় আসীন।

পর্যায়ক্রমে বক্তব্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণে অংশে তিনি তৎকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নানামুখী আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংকট ও এর সমাধান, খাদ্য সংকট উত্তরণে রাষ্ট্রসমূহের সম্মিলিত উদ্যোগ, বিজ্ঞানভিত্তিক (ডিজিটাল) নতুন বিশ্বের চ্যালেঞ্জসমূহ ও তা মোকাবেলার উপায়, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘাত, বৈষম্যবাদ নিরসন, মানবাধিকার বিকাশ, রাষ্ট্রগুলোর মাঝে আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিনিময় সহজীকরণের ক্ষেত্র উন্মুক্তকরণ ও পারস্পারিক সম্পর্ক উন্নীতকরণসহ নানা বিষয় তুলে ধরেছিলেন; যা বহু প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের নেতারাও নিজেদের অবস্থান থেকে সেভাবে মূল্যায়ণ করতে পারেননি। কোনো রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের প্রথম কোনো অধিবেশনে উপস্থিত হয়ে এমন শক্তিশালী, দুঃসাহসী, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী বক্তব্য উপস্থাপনের একমাত্র নজিরবিহীন ঘটনার ঐতিহাসিক সাক্ষী- বাঙালি জাতির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই বক্তব্য।

তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে একজন আদর্শ নেতা হিসেবে তিনি কতটা অবগত ছিলেন, তার প্রমাণও নিজের বক্তব্যে জানান দিয়ে গেছেন জাতির পিতা। সদ্য স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে তিনি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দুঃসাহসী বক্তব্য উপস্থাপন করেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ তৎকালীন বিশ্বের সামরিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতেই তিনি দেশে দেশে দুর্বলের ওপর সবলদের সামরিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানান এবং এই সংকট সমাধানের ব্যাপারে বিশ্বনেতাদের একাংশের অনাগ্রহের সমালোচনাও করেন। পাশাপাশি, স্বাধীকার সংগ্রামরত রাষ্ট্রগুলোর প্রতি প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশ ও অপর চারটি দেশ- আলজেরিয়া, গিনি, বিসাউ এবং ভিয়েতনামের স্বাধীকার আন্দোলনের সংগ্রামী সাফল্যের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু ফিলিস্তিন, জাম্বিয়া, নামিবিয়াসহ দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে বলিষ্ঠ কন্ঠে একাত্মতা ঘোষণা করেন। মানবতার পক্ষে সিংহবীর শেখ মুজিবের সেই দৃপ্ত ঘোষণা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্ব বিবেককে। নির্যাতিতের পক্ষে বিশ্বমঞ্চে এক মানবতাবাদী মহানায়কের সেই বজ্রকন্ঠ সেদিন প্রতিধ্বনিত হয়েছিল ভিয়েতনামের বিধ্বস্ত প্রান্তর হতে ফিলিস্তিনের রক্তাক্ত উপত্যকা পর্যন্ত।

নিজের সেই ভাষণের প্রতিটি পর্যায়ে জাতির পিতা শেখ মুজিব যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছিলেন- সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, সেটি ছিল মূলত আজকের সময়ে একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বিশ্বায়ণ বাস্তবায়নের আদর্শ রোডম্যাপ।  পিনপতন নীরবতার মাঝে অধিবেশনস্থলে উপস্থিত প্রত্যেকে সেদিন বিমুগ্ধ চিত্তে শুনেছিলেন বিশ্বমানবতার তরে বঙ্গবন্ধুর সেই হিরন্ময় বাণী। যার প্রেক্ষিতে সারাবিশ্বের চোখে সমীহ অর্জনে গর্বিত হয়েছিলো বাংলাদেশ। এক কথায় বলতে গেলে, সেদিন সেই অধিবেশনস্থলে প্রবেশ করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা সহস্রাব্দের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু। কিন্তু অধিবেশন শেষে যিনি বেরিয়ে এসেছিলেন, তিনি ছিলেন বাঙালি জাতিসত্ত্বার অহংকার, আধুনিক বিশ্বের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা, মানবতাবাদী বিশ্বনেতা - বিশ্ববন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি যেতে যেতে সেদিন বহু প্রতিকূলতার মাঝেও সম্ভাবনাময় নতুন বিশ্বের আগমনী বার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন - 

"মানুষের অজয় শক্তির প্রতি বিশ্বাস, মানুষের অসম্ভবকে জয় করার ক্ষমতা এবং অজেয়কে জয় করার শক্তির প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাস রাখিয়া আমি আমার বক্তৃতা শেষ করিতে চাই। আমাদের মতো যেইসব দেশ সংগ্রাম ও আত্মদানের মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে, এই বিশ্বাস তাহাদের দৃঢ়। আমরা দুঃখ ভোগ করিতে পারি কিন্তু মরিব না। টিকিয়া থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে জনগণের দৃঢ়তাই চরম শক্তি। আমাদের লক্ষ্য স্ব-নির্ভরতা। আমাদের পথ হইতেছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও যৌথ প্রচেষ্টা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সম্পদ ও প্রযুক্তিবিদ্যার শরিকানা মানুষের দুঃখ-দুর্দশা হ্রাস করিবে এবং আমাদের কর্মকাণ্ডকেও সহজতর করিবে ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই। নতুন বিশ্বের অভ্যুদ্বয় ঘটিতেছে। আমাদের নিজেদের শক্তির উপর আমাদের বিশ্বাস রাখিতে হইবে। আর লক্ষ্য পূরণ এবং সুন্দর ভাবীকালের জন্য আমাদের নিজেদেরকে গড়িয়া তুলিবার জন্য জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই আমরা আগাইয়া যাইব।"

আরআইএস/এইউ/এসকে