• ঢাকা
  • সোমবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৯, ২৭ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: এপ্রিল ৯, ২০১৯, ০৮:২১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ৯, ২০১৯, ০৮:২১ পিএম

পুড়ে যাওয়াদের স্বজনরা একদিন ইট খুলে নেবে

অজয় দাশগুপ্ত
পুড়ে যাওয়াদের স্বজনরা একদিন ইট খুলে নেবে

আমি যখন অস্ট্রেলিয়ার বড় বড় ব্যাংকগুলোতে কাজ করতাম, কিছু ট্রেনিং করা ছিল বাধ্যতামূলক। সেগুলো না করলে পদোন্নতি দূরে থাক চাকরি থাকারও নিশ্চয়তা ছিল না। তেমনি একটা ট্রেনিং ছিল ফায়ার ড্রিলিং। আমি তো অবাক আর ভয়ে থতমত খেয়ে গেছি। আমি আগুনের কী জানি! কীভাবে পাস করব, আর কী বলব কী উত্তর দেব!

করতে গিয়ে যা জানলাম আর শিখলাম, তার কোনো তুলনা হয় না। ব্যাংকের চাকরির পর এখন করি পরীক্ষকের চাকরি। ছাত্রছাত্রী নিয়ে কাজ কারবার। সে চাকরিতেও দিই মাস আগে ফায়ার ট্রেনিং করতে হয়েছিল। এবার আবার দায়িত্ব বেশি। শীর্ষ জন জাপানে ছিলেন বলে আমাকেই মনোনীত করা হয়েছিল প্রধান হিসেবে।

লাল সবুজ হলুদ কোন জার্সির কী ব্যবহার, কোন যন্ত্র খীভাবে চলে- সব হাতে কলমে ট্রেনিং। এবং ব্যবহারিক। দশতলা ভবন পুরো খালি করে মহড়া হলো নিচে নামার। সঠিক জায়গায় খীভাবে যেতে হবে কী করতে হবে- এসব। এমন না যে এগুলো করতে হবে বলে করা। না করে দেখুন না। হাজার হাজার ডলার জরিমানা গুনতে হবে, সাথে কারাবাসও বিচিত্র কিছু না।

এই যে আপনারা উন্নতির জোয়ারের কথা বলছেন, তারা কি এই বিষয়টা নিশ্চিত করতে পেরেছেন? দেশের কোথাও কি এমন নিয়ম আছে? কেউ কি তা মানে আদৌ? জরিমানার বদলে ঘুষ দেয়া সস্তার সমাজে এর বেশি আর কী হতে পারে?

আমি এদেশে না আসলে জানতামই না দমকল বাহিনীর মানুষরা কত বড় সেলিব্রেটি। এখানে তাদের বিভিন্ন সভায় অতিথি করে আনার পাশাপাশি তাদের বীরের মর্যাদা দেয়া হয় । বলা হয় ফায়ার ফাইটার। অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট নিজেই ছিলেন একজন ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটার। সম্মান আর মর্যাদার ভেতর দিয়ে মানুষের মনে যে সম্ভ্রম আর কৌতূহল জাগিয়ে তোলা, সেদিক থেকে আমাদের দেশে ফায়ার সার্ভিস কোনোকালেই সে জায়গা পায়নি। মনে করা হয় আগুন লাগলে তারা আসে আর নিজেদের কাজ করে।

একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে মানুষ যখন পোড়া আলুর মতো হয়ে মরছে তখন আমরা কি দেখছি? এখনো দোয চাপানো আর দায় অস্বীকারের সংস্কৃতি। রাজউক অনুমোদিত নকশায় ভবন হয়নি। এ কথা বা বিষয়টা এত দিন পরে জানা গেল? রাজউকের কি কোনো শাখা নাই যারা এসব নিশ্চিত করে? কেন এই ভবন থেকে বের হবার সঠিক সিঁড়ি নাই? এটা তো গ্রামের ভবন না। ঢাকা নামের কসমোপলিটন সিটির অভিজাত এলাকার ভবন। এখানে এই ফাঁকের জন্য কারা কারা ঘুষ খেয়েছিলেন আর ঘুষ দিয়েছিলেন তাদের নামগুলো কি জানা যাবে?

আর একটা কথা, ভবনের নকশার ঠিক নাই, সিঁড়ি ঠিক নাই, নিরাপত্তার ঠিক নাই, বের হবার নিয়ম নাই; খালি বিদেশের অনুকরণে কিছু চমৎকার কাচ আর আলিশান ডেকোরেশন করলেই হয়ে গেল? একের পর এক আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া মানুষদের স্বজনেরা একদিন কিন্তু ইট খুলে নেবে।

এই যে আপনারা মিডিয়ায় বাহাদুরি করে বলছেন মানুষ কেন জড়ো হয়েছিল, এর মানে কি? আপনারা তো মানুষ পুড়ে ছাই হবার সময়ও কেউ কেউ গানবাজনা করেছেন টিভিতে। সাধারণ মানুষ ছুটে গিয়েছিল ভালোবাসা আর অন্তরের টানে। তারা তাদের স্বজনদের জন্য গিয়েছিল। বিকৃত উচ্চারণে বনানী থেকে অমুক বলছি তমুক বলছি আমাদের সাথে থাকুন বলার জন্য যায়নি। আর তাদের এক বিরাট অংশ কীভাবে সাহায্য করেছিল তা একটি বালকের ছবিতেই স্পষ্ট। যে ভাঙা পাইপটি ধরে আপ্রাণ চেষ্টা করছিল পানির স্রোত ঠিক রাখার। তার কাছ থেকেই শিখতে হবে দেশ ও জাতিকে। মুখে বড় বড় কথা আর কাজের বেলায় ঠনঠনে রাজনীতি কি পারবে আগুন থেকে বাঁচাতে? অগ্নিদগ্ধ মানুষের আত্মার অভিশাপ কখন কোথায় লেগে যায় কে জানে?

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক, কলামিস্ট।