• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০১৯, ০৬:০১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ৭, ২০১৯, ০৬:০৩ পিএম

 ছাত্ররাজনীতি হোক প্রতিবাদী মানুষ গড়ার কারখানা

মো. মোজাহিদুল ইসলাম নয়ন
 ছাত্ররাজনীতি হোক প্রতিবাদী মানুষ গড়ার কারখানা

ছাত্র রাজনীতির বুনিয়াদী সংজ্ঞা বা ধারনায় একটি সংগঠনের যা যা করার কথা, সেরকম উল্লেখযোগ্য কোনো গঠনমূলক কাজে ছাত্রলীগকে দেখা যায়নি। মহাকলের খাতায় যে বছরগুলো চলে গেছে সেখানে আমরা বরং বার বার তাদের পেয়েছি অস্ত্র আর রক্তমাখা হাতে। দেশবাসী তাদের চোখে স্বপ্নের স্বর্ণরশ্মি না দেখলেও, দেখেছে মানুষখেকো পিশাচের ভয়াবহতা। যার সর্বসাম্প্রতিক ইভেন্ট তারা সারলো গত ৫ নভেম্বর, জাহাঙ্গীরনগরে। ইভেন্টের নাম ছিল-‘মিশন শিক্ষক-সহপাঠী যুগপৎ প্রহার’

প্রায় দুই মাসের অধিক সময়ব্যাপী চলা আন্দোলনে শিক্ষা কার্যক্রম একরকম বন্ধই বলা যায়। ১৪০০ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল তছরুপের আশংকায় শিক্ষকদের একটি বড় অংশ উপাচার্যের নেয়া পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। যার সাথে গরিষ্ঠ সংখ্যক শিক্ষার্থীও যৌক্তিক কারনে যোগ দিয়ে একাত্ম হয়েছে। কিন্তু বরাদ্দ অর্থের যথেচ্ছ ব্যাবহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের ক্ষতি করে নেয়া অবকাঠামো নির্মাণ এবং ছাত্রলীগের সাথে অর্থ লেনদেনকে কেন্দ্র করে সেই আন্দোলন একটি পর্যায়ে একদফায় অর্থাৎ উপাচার্য ড. ফারজানার পদত্যাগ-এ।

পদত্যাগের দাবিতে গৃহিত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সেদিন ছাত্রলীগ হামলা করলো এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যে তারা তাদের উপর অর্পিত মহান দায়িত্ব পালন করল! আর এই দায়িত্বের মূল টার্মস অব রেফারেন্স ছিল- উপাচার্য বিরোধী শিক্ষক, সহপাঠী এবং বন্ধুদের বেধড়ক পেটানো। বিভিন্ন সূত্র বলছে-ছাত্রলীগ সেখানে খুব বেশী ভালো পারফর্ম করতে পারে নাই, তারা গোটা পঞ্চাশেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে জখম আর ভূপাতিত করেছে মাত্র। এবং এই আক্রমন পরিচালনা করা, বিপন্ন ভি.সি ‘র বিপদের দিনে হাত বাড়িয়ে দেয়া একটি সরকার দলীয় সংগঠনের পবিত্র দায়িত্ব।
 
এ নিয়ে মূলধারা আর সোস্যাল মিডিয়ায় যে সমালোচনা হচ্ছে, যে ধিক্কার বর্ষিত হচ্ছে তা দেখে সংগঠনটির হর্তাকর্তারা নিশ্চয়ই বিরক্ত হচ্ছেন। যেখানে একটি ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন হয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ আর ক্ষমতালোভী উপাচার্যের সম্ভ্রম রক্ষার্থে বেয়াড়া শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের একটু শাসন করেছে তা নিয়ে হুদাই হৈচৈ করা তো ঠিক না? আর এরকম সমালোচনা চলতে থাকলে তো ছাত্রলীগ আগামীদিনগুলিতে ভালো কাজ করা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে, তখন?

ইতিহাসের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে রাজনীতির ইতিহাস আমার পাঠ্য। সেদিক থেকে ছাত্রলীগের অন্তত ত্রিশ বছরের রোজনামচা আমি জানি। মূল দল আওয়ামী যখন ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল তখন তাদের মেরুদণ্ডহীন অবয়ব তো আমরা দেখেছি। উত্তরবঙ্গের একটি মফস্বল শহরে রাজনৈতিক একজন সামান্য কর্মী হিসেবে দেখেছি-কারা বা কয়জন  তখন সংগঠনটির সাথে যুক্ত ছিল। ছাত্র রাজনীতির সেই স্বর্ণযুগে ঐ এলাকাগুলিতে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছিল বেশ সক্রিয়।

 ছাত্র সমস্যাভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিবাদ, এরশাদশাহীর বিরুদ্ধে আন্দোলন- সবকিছুরই নেতৃত্ব তখন ছিল বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর হাতে। বিপরীতে আজকের প্রতাপশালী ছাত্র সংগঠনটির ভূমিকা ছিল সহযোগীর, অন্যকিছু নয়।  তবে একটা কথা ঠিক, সেটা ক্ষমতার বাইরে থাকার কারনে হোক অথবা সংখ্যায় কম হওয়ার জন্যই হোক- সে সময় তারা গঠনমূলক রাজনীতি করারই চেষ্টা করতো। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর বিএনপি ক্ষমতাসীন হলে এই ছাত্রলীগ বাড়-বাড়ন্ত ছাত্রদলের কাছে পাত্তাও পেত না। শুধু তাই নয়, তারা বেশ কয়েকবার বিএনপির অঙ্গ সংগঠনটির কাছে পিটুনিও খেয়েছে। অথচ আজ ছাত্রলীগ যে বাহুবল দেখাচ্ছে সেটা তারা শিবির বিরোধী আন্দোলন এবং সমসাময়িক অন্যান্য আন্দোলনে কিছুই দেখাতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়েও তাদের দেখেছি, বিএনপি আমলে তারা কী অবস্থায় ছিল। পুরো ক্যাম্পাসে মাত্র জনাকয়েক নিজেদের ছাত্রলীগের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিত (তাও প্রকাশ্যে নয়)। ‘৯৬ তে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে তাদের চেহারা রাতারাতি পাল্টে যায়। প্রথমদিকে তারা হাটা-চলার ভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে, ক্যান্টিনে বাকি (ফাউ) খাওয়া শুরু করে। এরপর নিজেদের দলে ভেড়ানোর জন্য অন্যান্য সংগঠনের সদস্যদের উপর চাপ প্রয়োগ, অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্য ঘোরাঘুরি এবং পরিশেষে চাঁদাবাজী ও অন্তঃকলহে জড়িয়ে পড়ে। এত কিছুর পরও তাদের পতন অব্যাহত থাকে-যার অন্য নাম নারী নির্যাতন-নিপীড়ন। অনৈতিক কাজে সর্বোচ্চ তৎপর এ সংগঠনটি আশ্চর্যজনকভাবে নির্বিকার থাকতো ন্যায্য দাবী আদায়ের ক্ষেত্রে। শুধু তাই নয়, প্রায় ক্ষেত্রেই তাদেরকে আবিস্কার করা যেত সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপক্ষ শিবিরে।

ছাত্রলীগের জনৈক নেতার বিরুদ্ধে শতাধিক ধর্ষণের অভিযোগ এবং শাস্তির দাবীতে ক্যাম্পাস উত্তাল হলে সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ অস্ত্রের মুখে প্রতিবাদী কন্ঠ রোধ করতে প্রয়াস পায়। হলের রুমে রুমে গিয়ে একটিভিস্ট শিক্ষার্থীদের তারা হুমকি-ধামকি দেয়। এতোকিছুর পরও তাদের শেষ রক্ষা হয় নি। যারা যারা অপরাধ করেছে তাদের চেহারা একটা সময় দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের প্রবল দাবির মুখে দাগী কয়েকজনকে অনিচ্ছা সত্বেও বহিষ্কার করতে বাধ্য হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

শুধু ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন নয়, বরং সমসাময়িক ন্যায্য সব আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের তারা হতোদ্যম করতে চাইতো চোখরাঙ্গানি দিয়ে। ক্ষমতার ক্রীড়নক ছাত্রসংগঠন সংশ্লিষ্টরা ভালো করেই জানে নেতা- নেত্রীদের তুষ্ট করতে পারলে একদিন ঠিকই আখের গুছিয়ে নিতে পারবে। আর সে কারনে লেখাপড়া, শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা এবং শিক্ষকের মর্যাদার মতো মূল্যাবোধকে  তারা ভ্যালু দেয় না। তাদের  চেনা চৌহদ্দির মধ্যে যে মাৎস্যন্যায় চলে সেখানে বরং তারা দেখতে পায় আদর্শবান মানুষের বিপন্ন বাস্তবতা। আর কে বা চায়- বিপন্ন জীবন বেছে নিতে?
ক্ষমতার মূল সার্ভার বা ন্যাশনাল গ্রীডে সংযুক্ত থেকে তারা শক্তি সংগ্রহ করে। একই জায়গা থেকে তারা ইন্সট্রাকশনও পায়। প্রাপ্ত সে ক্ষমতার ৩৩ কে. ভি ভোল্টেজ অল্পবয়সী একজন শিক্ষার্থীর জন্য বেমানান।  সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী বা সমষ্টি সেটা আর বইতে পারে না। তখন তারা হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হিংস্র বিয়িং-এ পরিনত হয়। ঐ বিপুল শক্তি নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ আবরারদের ওপর। প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতকে স্তব্ধ করতে তারা ভিকটিমকে মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মারতে থাকে একরকম এডভেঞ্চারের অংশ হিসেবে। এ অপশক্তির ধ্বজাধারী হয়ে তারা জুবায়েরকে হত্যা করে, প্রকাশ্য দিন-দুপুরে কুপিয়ে মারে বিশ্বজিৎকেও। প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পরিগ্রহ করা সেই শক্তিকে নিজস্বার্থ চরিতার্থ করতে সুশীল-কুশীল সিন্ডিকেট ভাড়ায় খাটাতে প্রয়াস পায়। আর সেই অনৈতিক ডিলটি সম্পন্ন হয় অর্থ আর অনৈতিক বাটখাড়াতেই।

ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন আর তাদের তান্ডবের বিরুদ্ধে বরাবরই ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা দেখিয়ে এসেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। জাহাঙ্গীরনগর আজ প্রতিবাদের তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। আর তারই সর্বসাম্প্রতিক  প্রতিরোধ চলছে ভি.সি ফারজানার বিরুদ্ধে। সরকারের লেজুড়বৃত্তি করা প্রশাসন, অর্থের লোভে আকন্ঠ ডুবে থাকা প্রশাসন শিক্ষার্থীদের কন্ঠ রোধ করতে ৫ নভেম্বরেই  অনির্দিষ্টকালের বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা হলত্যাগে অসম্মতি জানিয়ে, হলের তালা ভেঙ্গে সেই অনৈতিক সিদ্ধান্তেরও দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছে।

শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এটাই কাঙ্খিত।আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে অনেক কিছু। একজন শিক্ষার্থী যখন অন্যায়কে ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথে ক্ষতিকর হিসেবে দেখতে পায় তখন সে তার  পারিপার্শ্বিকতাকেও স্পষ্ট দেখতেও পায়। সে তখন উপলব্ধি করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা একজন নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব। সে বুঝেশুনেই বেছে নেয় প্রতিবাদের সঠিক পথ।

 লেখক : মানবাধিকার ও উন্নয়নকর্মী