• ঢাকা
  • বুধবার, ০১ এপ্রিল, ২০২০, ১৮ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০, ০৩:০৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০, ০৩:০৬ পিএম

সম্রাট-পাপিয়াদের উত্থানে রাষ্ট্রের দায়

গোলাম মোস্তফা
সম্রাট-পাপিয়াদের উত্থানে রাষ্ট্রের দায়
গোলাম মোস্তফা

‘দ্য গডফাদার’ উপন্যাসটি পড়েননি বা ‘দ্য গডফাদার’ মুভিটি দেখেননি এ রকম পাঠক বা মুভিপ্রেমী সম্ভবত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমেরিকার মাফিয়াদের নিয়ে লেখা ‘দ্য গডফাদার’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। ঈশ্বরের মতো এই পিতা (গডফাদার), অথচ শয়তানের মতো তার কাজ। ‘দ্য গডফাদার’-এর লেখকের নাম মারিও জিয়ানলুইগি পুজো।

শুধু সিনেমা বা উপন্যাসে নয়, আমাদের এই ছোট্ট দেশে আমরা মাঝে মাঝেই এ ধরনের গডফাদারের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। যাদের কাজকর্ম-চলাফেরা-বেশভূষা সিনেমা বা উপন্যাসের গডফাদারদেরও হার মানাচ্ছে। এরা সমাজে এমন কোনো হীন কাজ নেই যা তারা করছেন না। এ মুহূর্তে দেশে প্রদর্শিত হচ্ছে শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ নামের এক রগরগা চিত্রনাট্য। তিনি নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার স্বামীও আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এই ‘কৃতী’ রাজনৈতিক-দম্পতি আটকের পর তাদের সম্পর্কে একের পর এক প্রকাশ পাচ্ছে নানা মুখরোচক কাহিনী। যা চলচ্চিত্র জগতের গডফাদারদের কার্যকলাপও তার কাছে নস্যি।

এর আগে ক্যাসিনোকাণ্ডে দেশের মানুষ শুনেছিল যুবলীগের ‘শ্রেষ্ঠ সংগঠক’ ইসমাইল হোসেন সম্রাট নামে আরেক গডফাদারের নাম। বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত নাম। কী ছিল না তার? টাকাকড়ি, গাড়িবাড়ি, নারী ও হাজার হাজার নেতাকর্মী। আওয়ামী লীগের বড় বড় কর্মসূচিতে বিশাল নেতাকর্মী বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হতেন তিনি। এই সম্রাট-পাপিয়া ছাড়াও আরও অনেকের কীর্তিকলাপ দেশের মানুষের ইতোমধ্যে শোনার সৌভাগ্য হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হয়তো আরও শুনবেন তারা। কারণ এদের মতো আরও অনেকেই আছেন সারাদেশে, একেক জায়গায় একেক নামে।

দেশবাসীর আজ প্রশ্ন, এই সম্রাট কিংবা পাপিয়ারা কীভাবে তৈরি হয়? এরা তো একদিনে তৈরি হয় না। তাদের বেড়ে ওঠার পিছনে সুযোগ দেওয়া হয়। তারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাদের ব্যবহার করে যারা নেতা হন, গাড়িবাড়ি, টাকাপয়সার মালিক হন— তারা কোথায়? শুধু সম্রাট-পাপিয়া, এনু-রুপনদের ধরে জেলে ভরলেই হবে না; এদের গড়ে ওঠার নেপথ্যের গডফাদারদেরও ধরে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এদের গড়ে ওঠার মূলে আঘাত করতে হবে। তবেই যদি সমাজের দুর্গন্ধের কিছুটা রোধ হয়। মানুষ একটু নিরাপদ-স্বস্তিতে বাস করতে পারে।

মূলহোতাদের না ধরে এসব চুনোপুঁটি ধরলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। এর আগেও কখনো ধর্ষক, কখনো মাদক কারবারি, কখনো ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীকে ধরে জেলখানায় ঢোকানো হয়েছে কিংবা ক্রসফায়ারে দেয়া হয়েছে। এতে কি অপরাধ নির্মূল হয়েছে? হয়েছে সমস্যার কোনো সমাধান? না, হয়নি। সমস্যার সমাধানে গত দেড় দশকে সারাদেশে ক্রসফায়ার কি কম হয়েছে? কিন্তু তাতে কি ওইসব অপরাধীর অপরাধ থেমেছে? মোটেও না। কোথাও কোথাও অপরাধের মাত্রায় সাময়িক সময়ের জন্য সামান্য হেরফের হয়েছে মাত্র। এসব অপরাধীর গড়ে ওঠার পিছনে মহামান্য হাইকোর্টের একটি উক্তি এখানে প্রণিধানযোগ্য। রিফাত হত্যামামলায় খোদ হাইকোর্ট বলেছিলেন, নয়ন বন্ডরা একদিনে একা একা তৈরি হয় না। কেউ না কেউ তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। মহামান্য হাইকোর্টের উপলব্ধিটি কিন্তু খুবই সময়োচিত।

ক্যাসিনোকাণ্ডে সম্রাটসহ যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের নেপথ্য মদদদাতাদের আজও স্পর্শ করা হয়নি। যারা ক্যাসিনো-ব্যবসা থেকে নিয়মিত টাকাপয়সা নিয়েছেন, যেসব প্রভাবশালী নেতার নাম নানাভাবে গণমাধ্যমে এসেছে, তাদের একজনেরও কেশাগ্র স্পর্শ করা হয়নি। ফিল্ড অপারেটররা কখনোসখনো এক-আধটু শাস্তি পেলেও মাস্টারমাইন্ডদের কিছুই করা হয়নি। এ রকম পক্ষপাতমূলক পদক্ষেপ নিলে কি অন্যায়-অপরাধ আদৌ দমন হবে? অভিজ্ঞতা কিন্তু একে সমর্থন করে না। শামীমা নূর পাপিয়ার এই চিত্রনাট্য হয়তো কিছুদিন জনগণের সামনে প্রদর্শিত হবে। কিছুদিন পর আবার হয়তো অন্যকিছু সামনে আনা হবে ।

পাপিয়া সম্পর্কে গণমাধ্যমে নেতিবাচক খবর প্রকাশের পর সম্রাট-খালেদদের মতোই দল থেকে তাকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। ‘বহিষ্কার’ করে সংগঠনটি হয়তো নিজেদের দায়মুক্ত ভাবছে। নিশিন্ত-নির্ভার মনে করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সম্রাট-পাপিয়ারা যে নানা অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত-- এসব কাজ তারা তো দিনের আলোতেই করেছেন, গভীর রাতে করেননি কখনো। কোনো লুকোছাপাও করেননি তারা। তাদের গতিবিধি ছিল প্রকাশ্য। তারা বড় বড় নেতাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন, হাসিমুখে কথা বলেছেন। এতদিন কেন তাদের এসব অপকর্ম সংগঠনের কারো চোখে ধরা পড়ল না। দল বা সংগঠনের প্রশ্রয় পেয়েই তো তারা অপরাধী হয়ে উঠেছেন।

এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। পাপিয়াকে আটক করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে। কথাটি অন্য কেউ বলেননি, বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এখানেই আমার প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও সরকারের নেতৃত্বদানে শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনাই। দলের নেতাকর্মীরা শুধু নন, আওয়ামী লীগের ঘোর শক্রপক্ষও এমনটি মনে করেন। এটাই বাস্তবতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে কথাটি সর্বাংশে সঠিক হলেও সব বিষয়ে তাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কেন? পাপিয়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। সে কোনো অপরাধ করলে জেলা কমিটি তাকে শাস্তি দেবে-- তারা কোথায়? তারা না পারলে তাকে শাস্তি দেবে কেন্দ্রীয় কমিটি। তা না করে একেবারে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে? শুধু পাপিয়ার ক্ষেত্রেই নয়, ছোটখাটো অনেক বিষয়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হস্তপেক্ষ করতে দেখি আমরা। এটা কি রাষ্ট্র বা সংগঠনের জন্য কোনো শোভন বা সুখকর? সবক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত মন্ত্রিপরিষদ বা সংগঠনের অন্য নেতাকর্মীদের ‘অসম্মান’ করার শামিল, তা আমরা কখনও ভেবে দেখেছি কি?

সবকিছুতেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা বলে তাকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি—প্রশ্নটি কিন্তু এড়ানোর সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী না বললে দেশে কোনো কাজ হবে না? তাহলে চুরি-চামারি, অপরাধ হচ্ছে কাদের নির্দেশে? একদিন যে এসব অপরাধও প্রধানমন্ত্রীর ঘাড়ে চাপানো হবে না তার গ্যারান্টি কোথায়? কিছুদিন আগেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে প্রশ্ন ছোড়া হয়েছে সবকিছুতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দেয়ার বিষয়ে। সেই ঘটনাটা ছিল আড়ংয়ে অভিযান পরিচালনাকারী ভোক্তা অধিকার সংরণের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে বন্ধের দিনে যেভাবে বদলি করা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরে তার বদলি-আদেশ রদ করা হয়।

সম্রাট-পাপিয়াদের সংকটের জন্ম ও বিস্তার রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রের নীতি-আদর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে রাষ্ট্র বলতে শুধু সরকারি দলকেই বোঝানো হচ্ছে না। পুলিশ-আইন-আদালত সবাইকে বোঝানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ, সচিব, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন সব মিলেই রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সবাই যদি তার নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে তো প্রধানমন্ত্রীকে সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হয় না। তারা যদি তাদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে সম্রাট-পাপিয়ারও জন্ম হতে পারে না। আমলাতন্ত্র-পুলিশসহ সমস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না বা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছে বলেই সম্রাট-পাপিয়ারা এতদিন নানা অপকর্ম করে পার পেয়ে গেছেন।

আজকে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, মদ, অবৈধ অস্ত্র, ব্লুফিল্ম ইত্যাদির কারণে দেশের তরুণ-তরুণী বিপথগামী। এর দায়দায়িত্ব কি রাষ্ট্র এড়াতে পারবে? পারে না। আমাদের সীমান্ত তো কোনো অভিভাবক পাহারা দেয় না। কোনো অভিভাবক সন্তানদের হাতে মাদক, ব্লুফিল্ম কিংবা অবৈধ অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে তো চোরাকারবারিদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করে না। বাংলাদেশের কোনো অভিভাবক নিজের সন্তানকে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নারীপাচার, মানবপাচার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা ইত্যাদি কর্মে নিয়োজিত করে তাদের কাছ থেকে মাসোয়ারা গ্রহণ করে না। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বা সমাজের কর্ণধাররা যদি তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে, তাহলে সম্রাট-পাপিয়ার জন্ম হতে পারে না, দেশের অমূল্য সম্পদ তরুণাও বিপথগামী হবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, এদের গডফাদাররা কি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে? এদের কি কোনোদিন ধরা হবে না? আগে এ প্রশ্নের সুরাহা হোক। দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত হোক। এ দেশের জনগণ গডফাদার মোনায়েম খাঁকে দেখেছে। দেখেছে তাদের চেলাচামুণ্ডা পাঁচপাত্তুরদের উত্থান ও পতন। তারা কিন্তু খরকুটার মতো ভেসে গেছে। আমরা আশা করব, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করবেন। দেশের মানুষকে অযথা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে রেহাই দেবেন।

লেখক ● সাংবাদিক, দৈনিক জাগরণ