• ঢাকা
  • শনিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২১, ২৭ চৈত্র ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ৯, ২০২১, ১০:০৫ এএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ১৩, ২০২১, ০৪:৩৩ পিএম

ধর্ষণের শিকার নারী-শিশুর ছবি-পরিচয় প্রকাশ ও রুচির বিকৃতি

ধর্ষণের শিকার নারী-শিশুর ছবি-পরিচয় প্রকাশ ও রুচির বিকৃতি

রুচি গঠন ও রুচির জোগান দেওয়ার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, এই সত্য গণমাধ্যমের অনেকেই মানতে চান না। মানতে চান না—এমন কথা জোর দিয়ে বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। অনেক গণমাধ্যমই সুরুচি-নৈতিকতাবোধকে কবর দিয়ে কাটতি বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই প্রতিযোগিতার অসুস্থ চর্চার অংশ হিসেবে অন্যান্য ঘটনা-ব্যক্তির মতোই ধর্ষণের শিকার নারী-শিশুরও ছবি-পরিচয় প্রকাশে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে শুরু হয় তুমুল প্রতিযোগিতা। কার চেয়ে কে বেশি তথ্য-ছবি প্রকাশ করতে পারবে, তাতেই ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় কতিপয় গণমাধ্যমকে। অথচ এই সংক্রান্ত আইন ও নৈতিকতার নীতিতে পরিষ্কারভাবে ধর্ষণের শিকার নারী-শিশুর ছবি-নাম প্রকাশে নিষেধ করা হয়েছে। এরপরও কেন ছবি-পরিচয় প্রকাশিত হয়, এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি কারণ বের হয়ে আসবে। 

যেমন—

১।  প্রতিযোগিতার মনোভাব।
২। আইন ও নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধার অভাব।
৩। ভুক্তভোগীর সামাজিক নিরাপত্তা-সম্মানের প্রতি অশ্রদ্ধা।
৪। শাস্তি না দেওয়া।

পাঠকের কাছে ছাপা পত্রিকার চেয়ে দ্রুত পৌঁছে যায় অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো। এখানে দ্রুত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের চেয়ে সবার আগে দেওয়ার প্রতিযোগিতা হয় বেশি। যারা যত রগড়-সংবাদ সবার আগে দিতে পারবে, তাদের সংগ্রহেই সবচেয়ে বেশি হিট জমা হবে। তাতে সংবাদ পরিবেশন করে সমাজসেবার লক্ষ্য নেই এসব নিউজপোর্টালের। বিপরীতে তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করে প্রচুর হিট সংগ্রহের। হিট যাদের যত বেশি হবে, তারা র্যাংকিং নির্ণায়ক সাইট অ্যালেক্সার বিচারে তত এগিয়ে থাকবে। এই এগিয়ে থাকার সূত্রকে কাজে লাগিয়ে নিউজ পোর্টালগুলো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এ ক্ষেত্রে রুচি নয়, নৈতিকতা নয়, এক শ্রেণীর বিকৃত মানসিকতার পাঠকের চাহিদার জোগান দেওয়াই এসব পোর্টালের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। 

এরপর আছে প্রচলিত নীতি-নৈতিকতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব। অধিকাংশ গণমাধ্যমে আইন ও নৈতিকতার চর্চাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। গণমাধ্যমকে নিজেদের সমাজের দর্পণ দাবি করলেও সেখানে কুরুচির দৃশ্য দেখাতেই আগ্রহ বেশি তাদের। নীতি-নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা কিংবা আইন মেনে চলার বিষয়ে উদাসীন তারা। দেশের আইন ও প্রচলিত নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে রুচিগঠন কিংবা সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন।

উল্লিখি কারণ দুটি ছাড়া আরও একটি গুরুতর হেতু রয়েছে। ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীর সামাজিক নিরাপত্তা-সম্মানের প্রতি গণমাধ্যমের শ্রদ্ধাবোধ-দায়বোধ না থাকা। গণমাধ্যমগুলো মনে করে, সংবাদ প্রচার করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। প্রকাশিত সংবাদের কারণে কারও সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলো কি না, কারও সম্মান ধুলায় মিশে গেলো কি না—তা দেখার কাজ তাদের নয়। তারা কেবল সমাজে সংঘটিত ঘটনাবলির সচিত্র বিবরণ তুলে ধরতে পারলেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করা হলো বলেই মনে করে। কিন্তু ভেবে দেখে না—সমাজে সংঘটিত ঘটনাবলির খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর নাম-পরিচয়-ছবি প্রকাশের চেয়ে অপরাধীর নাম-পরিচয়-ছবি প্রকাশই একমাত্র সিদ্ধান্ত হতে পারে। এতে অপরাধীকে আইনি প্রক্রিয়ায় সাজা দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিকভাবেও বয়কট করার সুযোগ তৈরি হবে। আর নৈতিকতার দিক থেকেও তিরস্কারের মাধ্যমে, বোঝানোর মাধ্যমে তাকে সৎপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলতে পারে। তবে, সব অপরাধীর ক্ষেত্রে তিরস্কার-কিংবা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা সমীচীন নয়। বিশেষত ধর্ষণ, খুন ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার ক্ষেত্রে। এই ধরনের অপরাধীদের কেবল আইনের বিধান অনুযায়ী দণ্ড দেওয়াই একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত।  

এই তিন কারণের বাইরে বড় কারণটি হলো, শাস্তি। এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে শাস্তির আওতায় আনা হয় না। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করা হয় না। ফলে গণমাধ্যমগুলোও ধরে নেয়, ধর্ষণের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর ছবি-পরিচয় প্রকাশ কোনো অপরাধ নয়। বরং তাদের পেশাগত দায়িত্ব। শাস্তি কার্যকর না করার কারণে কোনটা অপরাধ, কোনটা পেশাগত দায়িত্ব, তাও খেয়াল করেন না অনেক সংবাদকর্মী। 

এদিকে, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০’-এর ১৪ নম্বর দফায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘(১) এই আইনে বর্ণিত অপরাধের শিকার হইয়াছেন এইরূপ নারী বা শিশুর ব্যাপারে সংঘটিত অপরাধ বা তৎসম্পর্কিত আইনগত কার্যধারার সংবাদ বা তথ্য বা নাম-ঠিকানা বা অন্যবিধ তথ্য কোনো সংবাদপত্রে বা অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ বা পরিবেশন করা যাইবে, যাহাতে উক্ত নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়।’ পরিচয়-ছবি প্রকাশকে অপরাধ বিবেচনা করে এর শাস্তির ধরন-পরিমাণও নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘এই বিধান লঙ্ঘন করা হইলে উক্ত লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের প্রত্যেকে অনধিক দুই বৎসর কারাদণ্ডে বা অনূর্ধ্ব এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।’

কেবল ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশু নয়, ছোটখাটো অপরাধে জড়িত শিশু কিংবা মামলার শিশুসাক্ষীর ক্ষেত্রেও একই বিধান। তাদেরও নাম-পরিচয়-ছবি প্রকাশে আইনে নিষেধ রয়েছে। ২০১৩ সালের শিশু আইনের ২৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘(১) শিশু-আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলায় জড়িত বা সাক্ষ্য প্রদানকারী কোনো শিশুর ছবি বা এমন কোনো বর্ণনা, সংবাদ বা রিপোর্ট প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মাধ্যম অথবা ইন্টারনেটে প্রকাশ বা প্রচার করা যাইবে না, যাহা সংশ্লিষ্ট শিশুকে শনাক্তকরণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহায্য করে।’

অথচ হলি আর্টিজান হামলা মামলাসহ একাধিক মামলায় শিশু সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশে গণমাধ্যমগুলোকে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে দেখা গেছে। কেবল এই মামলার ক্ষেত্রেই নয়, প্রায় শিশু সাক্ষী থেকে শুরু করে শিশু অপরাধে যুক্তদের নাম-পরিচয়-ছবি প্রকাশিত হচ্ছে। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, প্রাপ্তবয়স্কদের ধরন ও শিশুর অপরাধের ধরন একই মাত্রার নয়। প্রাপ্তবয়স্কদের যে কর্মকাণ্ড অপরাধ বলে অনিবার্যভাবে বিবেচ্য, সেই কাজ শিশুর ক্ষেত্রে তা না-ও হতে পারে। শিশুরা সংঘবদ্ধ হয়ে, পরিকল্পিতভাবে কোনো অপরাধ করে না। যুক্তির খাতিরে তাদের কাজকে সংঘবদ্ধ অপরাধ বললেও তাদের শাস্তি না দিয়ে সংশোধনাগারে পাঠানোর বিধান রয়েছে। তারা প্রাপ্তবয়স্ক হতে হতে নিজের ভুল বুঝতে পারবে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। আইন ও নৈতিকতাও বলে, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ দিতে হবে। 

এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার (২০২১ সালের ৮ মার্চ) ধর্ষণের শিকার জীবিত বা মৃত নারীর কোনো ধরনের ছবি বা পরিচয় গণমাধ্যমে প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের দ্বৈত বেঞ্চ। একইসঙ্গে, ধর্ষণের শিকার নারীর ছবি ও পরিচয় প্রকাশ বন্ধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—তাও জানতে চেয়েছেন আদালত। এই রুলের পর ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের ছবি-পরিচয় প্রকাশে গণমাধ্যম সতর্ক হবে, এমনটা আশা করা যায়।

এখন প্রশ্ন উঠছে, ধর্ষণের শিকার নারী-শিশুর ছবি-পরিচয় কেন গোপন রাখতে হবে। ছবি-পরিচয় প্রকাশ করলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে? একে একে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো। উত্তরগুলো মোটামুটি এমন হতে পারে: 

১। পরিবার ও তার সামাজিক নিরাপত্তা।
২। পরিবার ও তার সম্মানহানি থেকে রক্ষা পেতে।
৩। স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার দিতে। 

ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীর ছবি ও পরিচয় প্রকাশিত হলে সমাজে তা ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তা ছড়িয়ে পড়ে। এতে ভুক্তভোগীকে সহজে শনাক্ত করা যায়। আর সহজে শনাক্তকরার বিপজ্জনক দিক হলো, তাকে নিরাপদ কোনো স্থানে আশ্রয় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যেখানেই তাকে রাখা হোক না কেন, ছবি-পরিচয় প্রকাশিত হয়ে পড়ার পর ধর্ষকশ্রেণীর কাছে সেই খবর পৌঁছে যায়। তখন ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। এমনকি নিরাপত্তা বিঘ্নিতও হয়। অনেকেই আবার ধর্ষণের শিকার নারী-শিশু মৃত্যুর পর ছবি-পরিচয় প্রকাশে দোষ দেখেন না। তাদের যুক্তি হলো—মৃত্যুর পর ছবি-পরিচয় প্রকাশে সমস্যা নেই। কারণ ভুক্তভোগী জাগতিক সব চাওয়া-পাওয়া থেকে মুক্ত। কিন্তু যারা এমনটা বলেন, তারা হয়তো একথা মনে রাখেন না যে, ধর্ষণের শিকার নারী-শিশু মারা গেলেও তার পরিবারের আরও সদস্য রয়েছে। রয়েছে তাদের স্বজনরাও। ছবি-পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার পর পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের পদেপদে হেনস্তা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পথে-ঘাটে দেখা হলেই স্বল্পপরিচিত কিংবা একেবারে অপরিচিত লোকটিও প্রসঙ্গ টেনে স্বজনদের মনে খোঁচা দিতে পারেন। রক্তাক্ত করতে পারেন পুরনো ক্ষততে খোঁচা মেরে। তাই ভুক্তভোগী জীবিত থাকুন কিংবা মৃত্যুবরণ করুন, কোনোভাবেই তার ছবি-পরিচয় প্রকাশ করা উচিত হয়। সর্বাবস্থায়ই তার, পরিবারের সদস্য  ও স্বজনদের সম্মানের প্রতিও গণমাধ্যমকে নজর দিতে হবে। 

এরপর আছে কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের অপ্রসঙ্গ। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে ওই ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। অভিযোগ যে কারও বিরুদ্ধে যে কেউ তুলতে পারে। এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু শিশু-কিশোরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মাত্রই ছবি-পরিচয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। সমাজ তাদের দিকে বাঁকাচোখে তাকাতে পারে। প্রতিবেশীরা বিদ্রূপ করতে পারে।  

গণমাধ্যমকর্মীদের মনে রাখতে হবে—তাদের তুচ্ছ কাটতির লোভের বলি যেন ধর্ষণের শিকার নারী-শিশুকে হতে না হয়। একইসঙ্গে কিশোর অপরাধী কিংবা শিশুসাক্ষীরাও যেন তাদের লোভের থাবায় নিষ্পেষিত না হয়। গণমাধ্যমের কাজ সুরুচির প্রতিষ্ঠা করা, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা। এই সংবাদ পরিবেশনের লক্ষ্য হওয়া উচিত মাঙ্গলিক।কোনোভাবেই কুরুচিপূর্ণ উদ্দেশ্যহাসিল যেন গণমাধ্যমের লক্ষ্য না হয়। আর গণমাধ্যমে এই রুচি-নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আইন লঙ্ঘনের দায়ে গণমাধ্যমকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। গণমাধ্যম দোষ করতে পারে না, তারা সমাজের বিচারপতি—এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কেই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এই সত্য সবাইকেই মানতে হবে। না হলে একদিন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধেও সচেতন নাগরিক সমাজ গেয়ে উঠবে—‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা/ আজ জেগেছে এই জনতা।’

লেখক: কবি-প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক

 

আরও পড়ুন