• ঢাকা
  • শনিবার, ১৫ মে, ২০২১, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২১, ০২:০১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ২৯, ২০২১, ০২:২৯ পিএম

মুনিয়ার লাশ উদ্ধার

‘ভিকটিম ব্লেমিং’ ক্ষমতাধরের মুখ ঢেকে দেয়

‘ভিকটিম ব্লেমিং’ ক্ষমতাধরের মুখ ঢেকে দেয়

মুনিয়া নামের মেয়েটিকে ভিকটিম ব্লেমিং করা হচ্ছে বরাবরের মতো। আমাদের বিনোদনহীন সমাজে ভিকটিম ব্লেমিং এক তুমুল উপাদেয় বিনোদন, যা আমাদের শরীর মনকে তাজা করে তোলে নিমেষে। মুনিয়াকে ব্লেম করার সঙ্গে তার পরিবারকেও করা হচ্ছে। যেমন ১৮ বছরের বাচ্চা একটি মেয়ে একা কেন একটি ফ্ল্যাটে থাকত, তার জীবনযাপন কেন পরিবার জানত না!

অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ কথা। তবে সমস্যা হলো, একটি সুস্থ সুন্দর সমতাপূর্ণ সমাজে যখন কোনো টিনেজার খুন হয়ে যায়, সবার আগে সমাজের মানুষেরা সেই খুনের তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন। এরপর তারা সেই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট ও ব্যর্থতার জায়গাটিকে চিহ্নিত করতে উদ্যোগী হন, যে ব্যর্থতার কারণে একটি টিনএজার মেয়ে মাফিয়া চক্রের হাতে পড়ে, মফস্বল থেকে রাজধানীতে আসে এবং একা একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতে শুরু করে। কোন সে পরিস্থিতি, কোন পারিবারিক প্রতিকূলতা, দেখভালের অভাব একটি বাচ্চা মেয়েকে এ রকম কঠিন অবস্থায় একা করে দিয়েছিল- সেই কারণটি অনুসন্ধান করে, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো অল্পবয়সী মেয়ে এ ধরনের ফাঁদে না পড়ে, সেই দিকটি নিয়ে ভাবতে শুরু করে সুস্থ সমাজের মানুষেরা। একমাত্র অসুস্থ, অসভ্য, অভব্য ও অশিক্ষিত, ধর্মান্ধ মৌলবাদী সমাজই একটি খুনের পর, খুন হওয়া মৃত অসহায় মানুষটির চরিত্র কাটাছেঁড়া করে, তার পরিবারকে অসম্মানিত করে।


যতবার যত মুনিয়া এভাবে খুন হবে, আত্মহত্যা করবে, ধর্ষিত হবে, হারিয়ে যাবে, ততবার ভিকটিম ব্লেমিংয়ের ক্লেদ ঘেঁটে আনন্দ উপকরণ সংগ্রহ করবে এ সমাজ। কারণ ভিকটিম ব্লেমিং হলো সেই জিনিস, সেই পর্দা, সেই আড়াল যা দিয়ে ক্ষমতাধর শয়তানের মুখ ঢেকে দেওয়া যায়।

মুনিয়ার ঘটনায় আরও একটি দেখার মতো ব্যাপার আছে। শুধু যে ভিকটিম ব্লেমিং হচ্ছে তাই না, ঠিক উল্টোপিঠে ক্ষমতাধরকে বাঁচিয়ে আনার, তার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার প্রতিযোগিতাও শুরু হয়েছে। আর এটি করছে জাতির বিবেক কিছু গণমাধ্যম, সুবিধাবাদী মৌলবাদী গোষ্ঠী, ক্ষমতাধরটির দ্বারা  নানান উপায়ে অন্যায় সুযোগপ্রাপ্ত লোকেরা। ভিকটিমের ছবিসহ নাম ঠিকানা ‘চৌদ্দগুষ্টি’র পরিচয় প্রকাশ করে অন্য পক্ষে দীর্ঘ সময় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আড়ালে রেখে, ছবি ব্লার করে প্রচার করে গণমাধ্যমগুলো যে অসৎ সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়েছে, সেটি প্রমাণ করে যে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র এক চরম স্বার্থবাদী, অশ্লীল পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে তোষণ করেই টিকে আছে। মুনিয়ার প্রেমিক যদি বসুন্ধরা গ্রুপের সায়েম সোবহান আনভীর না হয়ে একজন সাধারণ পুরুষ হতেন, তবে লাশ উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গেই গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সব মাধ্যমে পুরুষটিকে শুধু অভিযুক্তই না, প্রমাণিত দোষী হিসেবে তুলে ধরতে নানান কায়দাকানুন শুরু করে দিত, এতে কারও কোনো গড়িমসি দেখা যেত না। অভিযুক্ত আনভীর গণমাধ্যমের বিগশটদের ‘কাছের মানুষ’ ছিলেন, তার শিল্পপ্রতিষ্ঠান গণমাধ্যমের বিশাল অঙ্কের বিজ্ঞাপনদাতা তো বটেই। এসব স্বার্থসংশ্লিষ্টতার পায়ের নিচে বসে নিভৃতে কাঁদে ন্যায়বিচার, সুষ্ঠু তদন্ত। কত কত খুন, আত্মহত্যার প্ররোচনা, ধর্ষণ আর নারী পাচারের ঘটনা এভাবেই অন্ধকারে হারিয়ে যায়। আমরাও মনে রাখি না। যদি মনে রাখতাম, তাতেই বা কী লাভ? জনগণের ন্যায়বিচারের দাবিকে কবেই বা গ্রাহ্য করা হয়েছে? সমাজে পুরুষতন্ত্রের যে অসভ্য ক্ষমতার দাপট, সেটিকে ব্যবহার করে পার পেয়ে যাচ্ছে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলের মতো বহু পুরুষ। তাদের ইন্ধন জোগাতে আছেন তাদেরই গোষ্ঠীর বহু নারী ও পুরুষ। আর আশ্রয় দিতে তো রয়ে গেছে পুরো সিস্টেমটাই।

মুনিয়াকে ভিকটিম ব্লেমিং করা হবে। যতবার যত মুনিয়া এভাবে খুন হবে, আত্মহত্যা করবে, ধর্ষিত হবে, হারিয়ে যাবে, ততবার ভিকটিম ব্লেমিংয়ের ক্লেদ ঘেঁটে আনন্দ উপকরণ সংগ্রহ করবে এ সমাজ। কারণ ভিকটিম ব্লেমিং হলো সেই জিনিস, সেই পর্দা, সেই আড়াল যা দিয়ে ক্ষমতাধর শয়তানের মুখ ঢেকে দেওয়া যায়। আর মেয়েটি কেন এ অবস্থার শিকার? কেন পরিবার তার খোঁজ রাখেনি? সেটির আসল কারণ উদ্ধারের দায় তো এ সমাজের। একটি প্রায়-শিশুকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের। একটি মেয়ে কেন পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাইবার স্বপ্ন না দেখে এই বয়সে একটি বয়স্ক বিবাহিত ক্ষমতাধর লোককে বিয়ে করবার স্বপ্ন দেখতে শিখল, সেটি আবিষ্কারের দায় তো আমাদের। আমাদের মেয়েরা কেন এখনো আত্মসম্মান খুইয়ে পুরুষের ঘাড়ে চেপে জীবনের মুক্তি ও সচ্ছলতার স্বপ্নে ডুবে থাকে, কেন দিনের পর দিন অশ্রাব্য গালি সহ্য করে যায়, সেটা বুঝে দেখবার, জানবার, উপলব্ধি করবার দায় তো আমাদের সবার।

মুনিয়ার মৃত্যুর সঠিক কারণ আবিষ্কারে নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছি। এর বিচার যেন কোনোভাবেই কোনো ক্ষমতাধরের প্রভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করবার দাবি জানিয়ে রাখছি। আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, আজও ন্যায়বিচারের দাবিতে আমাদের আহাজারি করতে হয়, তবু ন্যায়বিচার সহজে মেলে না। এই বেদনার ভার আমরা আর কত দিন বয়ে নেব, আমার তা জানা নেই।