• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮
প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২১, ০৯:৪৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুন ২৯, ২০২১, ০৩:৪৪ পিএম

লকডাউন, কঠোর লকডাউন ও আমাদের সচেতনতা

লকডাউন, কঠোর লকডাউন ও আমাদের সচেতনতা

 রূপম চক্রবর্ত্তী
বর্তমান যে হারে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এবং মৃত্যু বেড়ে যাচ্ছে তাতে শাটডাউন অথবা কঠোর লকডাউনের প্রয়োজন আছে। বিগত বেশ কিছুদিন থেকেই আমরা আতংকিত।পৃথিবীর মানুষ ভাবছে কখন কি ঘটে যায়। আমরা হতাশ হচ্ছি আবার হতাশার ভাবকে পাশ কাটিয়ে নতুন করে বেড়ে উঠার স্বপ্ন দেখছি। করোনা ভাইরাস প্রতিনিয়ত রূপ পরিবর্তন করছে। কখনো আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট অথবা কখনো ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। এই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট যখন দিল্লীতে তাণ্ডব চালিয়েছিল তখন বাংলাদেশের অনেক ফেসবুক যোদ্ধা এই ভাইরাসের সাথে ধর্মের একটা সম্পর্ক তৈরী করেছিল। তাদের সুন্দর সুন্দর স্ট্যাটাস পড়ে আমাদের দেশের অনেকে ভেবেছিলাম ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ভারত এবং নেপালে যতটুকু কার্যকর বাংলাদেশে ততটুকু কার্যকর হবেনা। কিন্তু করোনার সেই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এখন আমাদের দেশের মানুষের জন্য আতংকের একটা নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতকে তছনছ করে ইউরোপেও পাড়ি দিয়েছে এই নতুন চরিত্রের কোভিড ১৯ জীবাণু। করোনার এই ধরন অতি দ্রুত বিস্তার ঘটায়। এই ধরনটি আরও তীব্র সংক্রামক। ভারতের বর্তমান করোনা পরিস্থিতির জন্য যে তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা  তার মধ্যে একটি হলো করোনার অতি সংক্রামক ধরনের বিস্তার। এই ধরনটি অতি সংক্রামক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেশি ভারতে করোনার সংক্রমণ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে এই ধরনটি দায়ী।

বিশ্বের অন্তত ১৭টি দেশে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বা ধরণ পাওয়া গেছে। ভারতে প্রথম শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের একটি স্ট্রেনকে ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য কর্তৃক ‘উদ্বেগের রূপ’ হিসেবে ঘোষণা করা হবে। এটি অন্য স্ট্রেনগুলো থেকে আরো বেশি দ্রুত ছড়ায় বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আইইডিসিআর জুন মাসের চার তারিখ বিবিসিকে জানায়, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে। সংস্থাটি সে সময় জানিয়েছিল যে, গত ১৬ই মে'র পর থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে করোনাভাইরাসের ৫০টি নমুনা সংগ্রহ করে জিনোম সিকোয়েন্সিং করার পর ফলাফল হিসেবে দেখা গেছে নমুনার ৮০ শতাংশের মধ্যেই ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট উপস্থিত ছিল।

এই ভ্যারিয়েন্ট যেহেতু ৮০ শতাংশ নমুনার মধ্যে পাওয়া গেছে তাহলে বোঝাই যাচ্ছে আগামীতে আমাদের দেশের কি অবস্থা হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য কোভিড ১৯ সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক  কমিটি ১৪ দিন সম্পূর্ণ শাটডাউন ঘোষণার পরামর্শ দেন। এই ঘোষণার ধারাবাহিকতায় সীমিত আকারে লকডাউন এবং পরবর্তীতে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেয়া হয়। রিকসা, এম্বুলেন্স ছাড়া গণ পরিবহন বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। গণ পরিবহন বন্ধ হলেও যারা বিভিন্ন অফিসে চাকুরী করেন তাদের অনেকেই কর্মস্থলে উপস্থিত থাকবেন। কঠোর লকডাউন, লকডাউন, বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করার পরও মানুষকে ঘরে রাখা যায়নি। কেউ প্রয়োজনে বের হয়েছে। আবার কেউ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হয়েছে। করোনার ২য় ঢেউ শুরু হওয়ার আগে মানুষ এত বেশি ঘুরাঘুরি করেছেন তা বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছিনা।

এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে পৃথিবীর অনেক দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। লকডাউন সময়কালীন অনেকে  চাকুরী হারিয়েছেন। অনেক শ্রমজীবি মানুষ গ্রামের পথে পা বাড়িয়েছেন। প্রতিটি শহর অনেক মানুষের কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করে। কর্মজীবি মানুষগুলোর বিশাল অংশ তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে শহরে থাকেন বিরাট একটা আশা নিয়ে। তারা তাদের ছেলেমেয়েদের শহরের স্কুলে পড়ান একটা বড় স্বপ্ন নিয়ে। অনেক নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন এখন ভেঙে যাওয়ার পথে। বাসা ভাড়া দিতে না পেরে স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে গ্রামে চলে গেছে এই রকম অনেক পরিবার আছে। বিগত একবছর ধরে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত থাকার ভেতর আবার শুরু হয়েছে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এর তাণ্ডব।

দেশের অনেক মানুষের বেশ কিছু সমস্যা আছে। ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট যখন ভারত এবং নেপালকে নাস্তানাবুদ করছিল তখন বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর কোন খেয়াল ছিলনা। সীমান্তবর্তী মানুষগুলোর আরও সচেতন হওয়া দরকার ছিল। টিভি নিউজে সীমান্তবর্তী বাজারের চিত্র দেখে ভেবেছিলাম আমরাও নিরাপদ নই। বাজারে মানুষ এদিক সেদিক ঘুরছে। অথচ প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের কোনো মাস্ক নাই। এর ফলে খুলনা, রাজশাহী,  যশোর অঞ্চলের অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। এক গবেষণায় ৬৮ শতাংশ করোনা রোগী ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত বলে জানা গেল। আজকের চিত্র অনেক ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই লিখাটা যখন লিখতে বসেছি তখন করোনায় যে মৃত্যু হয়েছে সেই মৃত্যু এই যাবত কালের সর্বোচ্চ। প্রতিদিন অসংখ্য কর্মজীবি মানুষ  আমাদের থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। যাদের রয়েছে সাজানো গোছানো একটা পরিবার। কেউ বাবা হারাচ্ছেন। কেউ মা হারাচ্ছেন। কেউ তার প্রিয় সন্তানকে হারাচ্ছেন।

দেশের মানুষ কাজ করছে বলে অর্থনৈতিক চাকা সচল আছে। মানুষ না থাকলে অর্থনৈতিক অবস্থাও ঠিক থাকবেনা। দেশের মানুষকে সংক্রমণের হাত থেকে কিছুটা রক্ষা করার জন্য কঠোর লকডাউনের প্রয়োজন আছে। অনেক মানুষ আত্মসচেতন নই। তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজন যাতে মানুষ সচেতন হয়।  চলমান সীমিত লকডাউনে দেখলাম গার্মেন্টস,  ব্যাংক, অফিস খোলা অন্যদিকে গণপরিবহন বন্ধ। লকডাউন ঘোষণা করার সময় এটাও মাথায় রাখতে হবে যারা ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার দূর থেকে এসে অফিস করেন তাদের কি অবস্থা হবে। অনেক কোম্পানির নিজস্ব পরিবহন নাই। গার্মেন্টস মালিকরা সব প্রতিকূল অবস্থার মাঝে গার্মেন্টস খোলা রাখার পক্ষপাতী। যারা এই সব প্রতিষ্ঠানের মালিক তারা অবশ্যই দেশের সচেতন এবং ধনাঢ্য ব্যাক্তি। অনেক মালিক আছেন যারা বিদেশে বসে আমাদের দেশ ব্যবসায় পরিচালনা করেন। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনে গার্মেন্টস শিল্পের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের বর্তমান অবস্থায় আমি মনে করি সকল গার্মেন্টস, কল কারখানা বন্ধ রেখে করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর লকডাউনে সহযোগিতা করা।

একটু যদি গভীরে যাই তাহলে দেখব বাংলাদেশে অনেক মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করেন৷ যারা দিন আনে দিন খায়৷ তার উপর রয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা৷ করোনায় শুধু তারাই নন, যারা চাকরিজীবী নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সবাই সংকটে আছেন৷ কাজ কমে যাচ্ছে শ্রমজীবি মানুষের ৷ এমনকি অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা চিন্তা করছেন চলতি  মাসের বেতন আগামী মাসের প্রথমে পাবে কিনা। এই পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত মানুষ কিভাবে দিন যাপন করবেন সেটা চিন্তা করার বিষয়। ভোজ্য তেল থেকে শুরু করে অনেক নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম দ্রুত বেড়েই চলেছে। এখনই খাদ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করে সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত গড়ে তোলা প্রয়োজন। চারদিকের যে অবস্থা তাতে আমাদের ভালো থাকা অনেক কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি সময় মৃত্যু চিন্তা আমাদেরকে তাড়া করে ফিরছে। প্রতিদিন করোনা ভাইরাসের কালো থাবা পৃথিবী থেকে অসংখ্য মানুষ পরপারে নিয়ে যাচ্ছে।

এত সব চিন্তার ভেতর প্রত্যেক চাকুরীজীবিদের মাসের শুরুতে ঘর ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। যারা  শহরের ভাড়া বাসায় থাকেন তাদের অনেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত আছেন। আমার পরিচিত অনেকে চাকুরী হারিয়েছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন রকম করারোপের কারণে আমাদেরকে বিভিন্ন কিছু ক্রয়ের সময় বাড়তি বোঝা বহন করতে হয়। আজকের এই পরিস্থিতিতে সবার  কর্তব্য অসহায় মানুষের পাশে  গিয়ে দাঁড়ানো।  তাদের মুখে একটু হাসি ফোটানোর চেষ্টা করা। অনেক দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবার  আছে যারা এক বেলা খেয়ে আরেক বেলা খাওয়ার জোগাড় করার চিন্তা করতে হয়। এই সব মানুষগুলোর সেবা প্রদান করা প্রয়োজন। সেবার মানসিকতা নিয়ে এই করোনাকালীন সময়ে সিটি কর্পোরেশন থেকে শুরু করে সব সেবামূলক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে সেই প্রত্যাশা করছি ।

এমন কঠিন সময়ে বাড়তি কর আরোপ না করে অন্যের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর মানসিকতা নিয়েই সকল মানুষকে এগিয়ে যাওয়ার চেতনা সৃষ্টি  করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাজ করা দরকার বলে মনে করছি। অনেক মানুষ আশা করেন শেষসময়টুকু তাদের প্রিয়জনের সাথে আনন্দে কাটাবেন। সেই আশা করোনার কারণে নিরাশার অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে। পাশের দেশে দেখা গিয়েছিল অক্সিজেনের অভাবে হাসপাতালের গেইটে অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। তাই কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানাব আপনারা সব সময় আমাদের পাশে থাকবেন। বিভিন্ন পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন প্রতি আমার ব্যক্তিগত অনুরোধ  বাড়তি করারোপের চিন্তা থেকে বিরত থাকার জন্য।  যাতে এই দু:সময়ে বাড়ির মালিক আর ভাড়াটিয়ার মধ্যে সম্পর্কের  অবনতি না হয়। যেখানে আজকে সাধারণ মানুষের জীবন পরিচালনা কষ্টকর সেখানে বাড়তি করের বোঝা বহন করা সম্ভব হবেনা।

লকডাউন চলাকালীন অথবা লকডাউন পরবর্তী আমাদের সকলের উচিত নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হওয়া। নিজে সচেতন না হলে করোনা নিয়ন্ত্রন হবেনা। সরকারী নির্দেশ অমান্য করে চললে আমাদের ভয়াবহ বিপদ হবে। যে কোনো অনুষ্ঠান বড় পরিসরে করার দরকার নাই। সব কিছু সীমিত আকারে করব।

সব মানুষ যদি বাইরে চলাফেরায় মুখে মাস্ক পরে, আর ঘরে, তাহলে করোনা সংক্রমণ আমরা অনেকটা  নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।  টিকা নেওয়া থাকলে দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভালো হয়। কিন্তু করোনার  ডেল্টা ভেরিয়েন্ট একটু ভিন্ন। খুব সহজে ও দ্রুত  সংক্রমণ  ঘটায়। দেহের  অ্যান্টিবডিকেও এড়িয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। তাই ডেলটা ও ডেলটা প্লাস ভেরিয়েন্ট বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। যারা টিকা নিয়েছেন তাদেরও মাস্ক পড়তে হবে। আর একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে করোনা কালীন সময়ে এসি বন্ধ রাখাই ভালো। ফ্যান চলতে পারবে। ঘরে অথবা অফিসে  বড় বড় কিছু জানালার ব্যবস্থা করে অবাধ বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।  কাঁচাবাজারগুলো খোলা আকাশের নিচে থাকা ভালো। সরকারে দেওয়া স্বাস্থ্য বিধি মানার পাশাপাশি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের মানুষকে ভালো রাখার চেষ্টা করব।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

বি.দ্র. উক্ত লেখা সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজেস্ব মতামত।

জাগরণ/এসকে