• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮
প্রকাশিত: নভেম্বর ৩০, ২০২১, ০১:৩১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ৩০, ২০২১, ০৭:৩১ এএম

আনিসুল হক : আলোহীন নগরে এক স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

আনিসুল হক : আলোহীন নগরে এক স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। ছবি- সংগৃহীত।

খুব অসময়ে চলে গেলেন আনিসুল হক। তাঁর অকাল প্রস্থানে কেবলমাত্র ঢাকা শহর নয়; পুরো দেশ শোকে স্তব্ধ ছিল। রাজনীতিবিদ না হয়েও সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর বিরামহীন কর্মপ্রবাহ, সর্বত মঙ্গল ভাবনা আর নাগরিক সেবাকে অভিনব পদক্ষেপে সজ্জিত করার দুর্বার আকর্ষণ নগরবাসীকে উচ্চকিত করেছিল। মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও অকাতর সমর্থন ছিল আনিসুল হকের কাজে। এমন নাগরিক আগ্রহ তাঁকে সার্বজনীন মেয়রের মর্যাদা এনে দিয়েছিল। কাজের নেশায় তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান আদর্শ ও উদার ভাবনার এক প্রগতিশীল মানুষ। এই অদমনীয় কর্মচঞ্চল মানুষটি এভাবে অকালে চলে গেলেন। এটা ভাবলেই এখনও সীমাহীন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হই।

আনিসুল হক আমাদের চিরন্তন কৈশোরকালে আবির্ভূত হয়েছিলেন নায়কের মতো। আশির দশকে একটা সাদাকালো টেলিভিশন কিনেছিলেন আব্বা। সেই টেলিভিশনের চৌকাঠে আনিসুল হক, আবেদ খান, আমার মামা মমতাজউদদীন আহমদ ও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকে নিয়মিত দেখতাম। বিস্ময়ভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে আনিসুল হকের উপস্থাপনা আমাদের কিশোরকালকে মোহনীয় আনন্দ দিতো। মফস্বলে আমরা এসব অনুষ্ঠান দেখেই সঙ্গীত, নাটক ও কবিতার প্রতি আকর্ষিত হয়েছি। আমাদের দুরন্ত জীবনে আনিসুল হক ছিলেন কথার এক দুর্বার জাদুকর। সেই জাদুকরের মোহন কথাভাসে আমরা মুগ্ধ ও তন্ময় ছিলাম। কিঞ্চিত হলেও আনিসুল হকের অনুকরণে উৎসাহী ছিলাম।

ঢাকা উত্তরের মেয়র হওয়ার অনেক আগেই আনিস ভাইয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছে। আমার মামা মমতাজউদদীন আহমদ এই সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেটা ২০০০ সালেরও আগের ঘটনা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পুরনো ভবনে কোনো এক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হই। সপ্রতিভ দৃষ্টির আনিস ভাইয়ের অট্টহাসি আর খোশগল্প করার নানা রকম কৌশল দেখে আশ্চর্য্য না হয়ে উপায় নেই। মন খুলে হাসার মানুষও বিরল এ দুনিয়ায়; অথচ আনিস ভাই অবিরাম হেসে হেসে আসর মাত করতেন। দুঃখ ভারাক্রান্ত, বেদনাক্লিষ্ট বাঙালির চেতনাবোধে, অন্তরে যত ক্ষুধা ছিল আনিস ভাই সেই ক্ষুধাকে ক্রমশ দূর করার উদ্যোগ নিয়ে কত শত আয়োজন অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছেন- এ হিসাবটাও এখন জানা জরুরি। টেলিভিশনের ঈদ আনন্দমেলা এক সময় আমাদের অন্যতম প্রিয় আকর্ষণ ছিল। আনিসুল হকের উপস্থাপনা ও পরিকল্পনায় আনন্দমেলা দেখার জন্য আমরা উদগ্রীব থাকতাম। এক একটা অনুষ্ঠানের জন্য কি বিস্তর সময় ও শ্রম তিনি দিয়েছেন, কত অর্থ ব্যয় করেছেন, ভাবা যায়। ‘এখনই’ নামের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, সঙ্গীত নিয়ে ‘জলসা’ নামের অনুষ্ঠানের কথা অবশ্যই মনে আছে দর্শক-শ্রোতাদের। ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ এ অনুষ্ঠানটাও আনিসুল হকের সঞ্চালনায় নন্দিত অনুষ্ঠান। নব্বই-এর গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ডা. মিলনের নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে আনিসুল হকের উপস্থাপনায় একটি প্রামাণ্য অনুষ্ঠান আমাদের মনে আজও দাগ কেটে আছে, মমতাজউদদীন আহমদের গ্রন্থণায় এমন করুণ ও হৃদয়বিদারক প্রামাণ্য অনুষ্ঠানটিকে বিটিভির ইতিহাসে অন্যতম সেরা আয়োজন বলে বিবেচনা করা হয়। আনিসুল হক যে কাজ করতেন সেখানেই তাঁর ব্যাকুল অন্তরের ছাপ লেগে থাকত। সব কাজে নির্মল ভালোবাসা আর আনন্দ খুঁজে বের করার অদম্য আগ্রহ নিয়ে তিনি মাঠে নামতেন। স্বচ্ছতা ও আধুনিকতার সাথে জবাবদিহিতাও পছন্দ ছিল তাঁর। সব রকমের উদ্যোগে তিনি সাধারণ মানুষের ভাবনার মূল্য দিতেন। শিল্পী, চিত্রকর, শিক্ষক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক-সাহিত্যিক এবং মুক্তিযোদ্ধা সবাই ছিলেন আনিস ভাইয়ের আপনজন। তিনি দুহাতে যেভাবে দুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মী বা শিল্পীদের সাহায্য করেছেন, অসুস্থ শুনলে ছুটে গেছেন, আর্থিক সহায়তা করেছেন, চিকিৎসার ভার নিয়েছেন- এটা তাঁর একটা বিরল গুণ। কর্ম, ভালোবাসা ও সাধনায় এমনই মহিমা ছিল আনিসুল হকের।

আমার মামা মমতাজউদদীন আহমদের সঙ্গে আনিস ভাইয়ের সম্পর্কের গভীরতা অনুভব করেছিলাম ২০১৫ সালে মামার ৮০তম জন্মবার্ষিকীর আয়োজনকে ঘিরে। আনিস ভাইয়ের নানা রকম উদ্যোগ-ভাবনার মেলবন্ধে এই অসাধারণ উৎসব আয়োজিত হয়েছিল। পুরো অনুষ্ঠানে আনিস ভাইয়ের সঞ্চালনা দর্শক-শ্রোতাদের মনকে তৃপ্ত করেছিল। ভুল না হলে বলা যায় এটাই ছিল আনিস ভাইয়ের শেষ সঞ্চালনার অনুষ্ঠান। আয়োজনের কয়েকদিন পরে মামা সবাইকে ডেকে রাতের খাবারের আয়োজন করেছিলেন রূপনগরের বাসায়। আনিস ভাই, রুবা আপা, তোফাজ্জল ভাই, কিসলু মামা, রামেন্দু কাকু, আখতার ভাই, বেলী আপা, অশোক দা এসেছিলেন-সেদিন মামাকে নিয়ে আনিস ভাই আরও আরও অনেক পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। মামার বিরাশিতম জন্মদিন খুব সাদামাটা করে পালন করেছিলাম রূপনগরে, আনিস ভাই ও রুবা আপা এসেছিলেন। আমার আর বাবলির জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে যখন ফিরে যাবেন, তখন আমরা বিরিয়ানি নিয়ে উপস্থিত হলাম। আনিস ভাই ও রুবা আপা নিচে নেমে আমাদের সাথে খাবারগুলো দোতলায় নিয়ে গেলেন। তখন তিনি উত্তরের মেয়র, অথচ কি সরল আর সাদাসিধে মানুষ। কোনো রকম আত্মপ্রচার নেই, নিরাহঙ্কার মানুষ তিনি। আমরা একসাথে রাতের খাবার খেলাম, কুমু মামী আরও অনেক খাবারদাবার রেঁধেছিলেন। আনিস ভাই ভোজনরসিক ছিলেন। যদিও সামান্য আহার করতেন, কিন্তু টেবিল ভরা খাবার থাকা চাই। বেশ জমিয়ে আড্ডা হলো। কত রকমের আলোচনা করেছিলাম তাঁর সঙ্গে!

ঢাকা উত্তরের মেয়র হিসেবে আনিস ভাই কটা রাত ঘুমিয়েছেন এ তথ্য এখন কারও অজানা নেই। রাত নেই, দিন নেই ঢাকাকে বাসযোগ্য এবং সুন্দরতম নগরী বানানোর জন্য প্রবল আকাংখা আর স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে তিনি দুরন্ত দূর্বার গতিতে ছুটে চলছিলেন। তিনি চাইতেন পরিচ্ছন্ন, যানজটমুক্ত, মশামুক্ত নগরী হোক ঢাকা। তাই ঢাকাকে পরিবেশবান্ধব সবুজ শহরে রূপান্তরিত করতে তিনি নিরলস এক কর্মবীরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। সব মতের ও ভাবনার মানুষকে একত্রিত করে তিনি এগিয়েছেন। কারওয়ান বাজারকে যানজটমুক্ত করতে কম বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকাবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়ে যে মায়াময় অভিযাত্রার সূচনা করেছিলেন তিনি, সেই ভাবনার কাছাকাছি পৌঁছুবার ক্ষমতা কতদিনে অর্জিত হবে বলতে পারব না আমরা কেউ। গুলশান বা বনানীতে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, সবকিছু ফেলে ছুটে গেছেন তিনি। নিজেই অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র হাতে নিয়েছেন, আগুন না নেভানো অবধি ঘরে ফিরেননি। পাকিদের দোসর মোনায়েম খানের দখল করা সম্পত্তি তিনি উদ্ধার করে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে দিয়েছিলেন। ফুটওভার ব্রিজগুলোকে পরিচ্ছন্ন করে গাছ লাগিয়ে নাগরিকদের ব্যবহার উপযোগী করেছিলেন। নগরীতে পাবলিক টয়লেটের অভাব ছিল, তিনি এ সংকট থেকে উত্তরণে ১০০টি আধুনিক গণশৌচাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রশস্ত রাস্তার ধারে গাছ লাগানো, তরুণদের খেলার মাঠ, ছাদকৃষিকে উৎসাহ দান, সিসিটিভি বসিয়ে জননিরাপত্তা দেখভাল করা, এলইডি লাইট স্থাপনসহ অ্যাপসের মাধ্যমে নাগরিক সেবা দান- এমন শত শত কাজ দুবছরে আনিস ভাই নির্দ্বিধায় করেছিলেন। নাগরিক সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া সহজসাধ্য ছিল না। কিন্ত অদ্ভুত শক্তি ও সাহস নিয়ে আনিস ভাই অসম্ভবকে সম্ভব বানানোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বিভোর হলেন। ক্লান্তিহীন এ পথচলা আর সহ্য করল না শরীর, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলেন তিনি। স্বপ্নের জাদুকর একদিন চিরবিদায় নিলেন। তাঁকে বিদায় জানাতে ঢাকাবাসী অন্তরের সমস্ত ক্রন্দন আর অশ্রু নিয়ে হাজির হলেন আর্মি মাঠে। অশ্রুস্নাত সকল নাগরিকের ভালোবাসা আর আকুতিতে নগর ছাড়লেন উত্তরের মেয়র।

আনিস ভাইয়ের আকস্মিক বিদায়ে তাৎক্ষণিক কিছু প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলাম। আমার মামা মমতাজউদদীন আহমদ ও আমার সম্পাদনায় গ্রন্থটি প্রকাশ করেন বিশ্বসাহিত্য ভবনের মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন। এক নিমিষেই গ্রন্থটি বাজার থেকে নিঃশেষ হয়ে যায়। সম্পাদিত এই গ্রন্থটি ত্রুটিহীন ছিল না, তবু এটি পাঠকের হাতে দিতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আনিসুল হককে নিয়ে আমাদের ভালোবাসা অনন্তকাল থাকবে। তিনি নগরবাসীর কাছে ছিলেন প্রিয়জন হয়ে, আরও অধিক প্রিয় হয়ে থাকবেন থরে থরে সাজানো নগরউদ্যানে। অনির্বাণ আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে আনিসুল হকের অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল কেবল, অমোচ্য স্মৃতিতে নাগরিকবাসী সেই অভিযাত্রীকে মনে রেখেছেন এখনও।

এই ধূসর নগরে স্বপ্নের আরেক জন ফেরিওয়ালা খুব দরকার।

 

 

লেখক ● সাংবাদিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী।। 

 

এসকেএইচ //