• ঢাকা
  • বুধবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২২, ১৩ মাঘ ১৪২৮
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২২, ০১:৪১ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ১০, ২০২২, ০৭:৪১ এএম

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুবর্ণজয়ন্তীঃ

যেভাবে ফিরলেন বঙ্গবন্ধু

যেভাবে ফিরলেন বঙ্গবন্ধু
ফাইল ফটো।

অপেক্ষমাণ জনতার মুহুর্মুহু স্লোগানে সেদিন মুখরিত ছিল বাংলার আকাশ। ৮৩ বছর বয়সের ইনসাফ মিঞ্চা এসেছিলেন ফুলবাড়িয়া স্টেশন এলাকা থেকে। টঙ্গী থেকে পায়ে হেঁটে এসেছিলেন হাতেম আলী। শুধু একনজর নেতাকে দেখবেন, তাদের প্রিয় মুজিব ভাই আজ ফিরছেন বিজয়ীর বেশে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির দিনটি এমনই ছিল। আনন্দে উদ্বেল লাখো লাখো জনতা তাদের প্রিয় নেতা মুজিবকে অভিবাদন জানাতে ঢাকা মহানগরীর আনাচে-কানাচে থেকে সমবেত হতে থাকেন। লোকে লোকারণ্য এ নগরে দীর্ঘ ঋজু দেহের স্বপ্নবান অগ্নিপুরুষ প্রিয় ভূমিতে যখন ফিরলেন তখন দুপুর ১টা ৪১ মিনিট। রক্তস্নাত বাংলার রাজধানী ঢাকা নগরীতে দখলদার শক্তির কারাপ্রাচীর পেরিয়ে মুজিব এসেছেন, প্রকৃতিও যেনো রৌদ্র উজ্জ্বল হয়ে ওঠলো। সেদিনের সেই জনসমুদ্রে জনতার উল্লাস আর স্লোগানের গর্জন রচনা করেছিলো এক নতুন ইতিহাসের। বিরামহীন করতালিতে নেতা মুজিবকে বরণ করে নিল বাংলার অপেক্ষমাণ জনগণ।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ছিল সোমবার, আজ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সুবর্ণজয়ন্তীর এই ঐতিহাসিক দিনটিও সোমবার। কিন্তু গত ৫০ বছরের ইতিহাসে কতই না নির্মম-নিষ্ঠুর ঘটনা সংঘঠিত হয়ে গেলো। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে শহিদ হলেন; জাতির পতাকা খামছে ধরেছিলো পুরনো শকুনের দল। তাদের থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করে পিতার দেখানো পথেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে একটি সবল রাষ্ট্রে পরিণত করতে দিবা-নিশি কাজ করে চলেছেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে বাংলাদেশের উন্নতি এবং সাফল্য আজ বিশ্বনেতাদের কাছেও অনুকরণীয় হয়ে ওঠেছে। জয়তু শেখ হাসিনা। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান তিনি।

প্রাসঙ্গিক কারণেই বলে রাখা উচিৎ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি বিজিত হলেও বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি তাদের বিজয়ের আনন্দকে ম্লান করে রেখেছিলো। তারা নেতা মুজিবের জন্য অধীর অপেক্ষায় ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বিজয়ের আনন্দ তাদের মুক্তির স্বাদকে পূর্ণতা দেয়নি। ফলে ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে দ্রুত রাষ্ট্রপতি ও বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানানো হয়। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইংল্যান্ড, কিউবাসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করে। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে বিনা শর্তে মুক্তির ঘোষণা দেয় ভুট্টো। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মুক্তি নিয়ে তাদের নানারকম টালবাহানা বাঙালিকে অস্থির করে তুলে। অবশেষে পাকিস্তানি সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিয়ে একটি বিমানে লন্ডনে পাঠায়। বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমান বোয়িং ৭০৭ লন্ডনে পৌঁছে ৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ছ’টায়। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে যে সম্মান প্রদর্শন করেন তা ছিল ইতিহাসে নজিরবিহীন। ব্রিটিশ সরকারের প্রটোকলের কোনো তোয়াক্কা না করে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বনেতার মর্যাদা দিয়েছিলেন। তাঁর আগ্রহে এবং ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ রয়েল এয়ারফোর্সের একটি ভিআইপি বিমানে উঠানো হয়। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ লন্ডন থেকে সরাসরি দিল্লীর পালাম বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু অবতরণ করেন ভারতের স্থানীয় সময় সকাল আটটা বেজে দশ মিনিটে। তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিতে ছুটে আসেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি পি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ মন্ত্রীপরিষদের সদস্য, কূটনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ। অভ্যর্থনা পর্ব শেষে সেখানে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। ভাষণে তিনি ভারতের জনগণ ও ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। 

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ ঢাকায় অন্তত পঞ্চাশ লাখের বেশি মানুষ এসেছিলেন জাতির পিতাকে অভিনন্দন ও ভালোবাসা জানাতে। আগত মানুষের দিকে তাকিয়ে শিশুর মতো কেঁদে ফেলেন বঙ্গবন্ধু। কান্নাভেজা কণ্ঠে মর্মস্পর্শী ভাষণে তিনি বলেন, ‘...পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিশালায় থেকে আমি জানতাম, তারা আমাকে হত্যা করবে। কিন্তু তাদের কাছে আমার অনুরোধ ছিল, আমার লাশটা তারা যেন বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়, বাংলার পবিত্র মাটি যেন আমি পাই। আমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিলাম, তাদের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে বাংলার মানুষদের মাথা নিচু করব না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙ্গালি করে মানুষ করনি।’ কিন্তু আজ আর কবিগুরুর সে কথা বাংলার মানুষের বেলায় খাটে না-তাঁর প্রত্যাশাকে আমরা বাস্তবায়িত করেছি। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে, তারা বীরের জাতি, তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মত বাঁচতে জানে।”

২০২২ সালের ১০ জানুয়ারির এ আনন্দঘন দিনে বাংলাদেশের মানুষ দূরন্ত দুর্বার গতিতে ছুটে চলা এক অনন্য নেতার ছায়াতলে সমবেত হয়েছেন, পথ হারানো মানুষের মাঝে তিনি পিতার অসম্পূর্ণ কাজের গুরুদায়িত্ব বহন করে বাঙালি জাতিকে সম্মানিত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠায় অবিচল হাঁটছেন। তাঁর যদি একজনও সঙ্গী না থাকে তবু তিনি একাই পথ চলবেন, তাঁর দেহে যতক্ষণ থাকবে প্রাণ, ততক্ষণ তিনি স্পন্দিত হবেন। কোনো বাধায় ‘শেখের বেটি’কে অবরুদ্ধ রাখতে সাহস করবে না।
 

 

লেখক ● সাংবাদিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী।। 

 

এসকেএইচ//