• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০১৯, ০৮:০২ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ১, ২০১৯, ০৮:০৬ পিএম

‘ব্যাটের গ্রাম’ নরেন্দ্রপুর

জাগরণ ডেস্ক
‘ব্যাটের গ্রাম’ নরেন্দ্রপুর

ক্রিকেট বিশ্বকাপের ঢেউ এখন  সারাদেশে। চায়ের দোকান থেকে যেকোন জায়গা, আলোচ্য বিষয় ক্রিকেট। বিশ্বকাপের ঢেউ   সারাদেশের মতো আছড়ে পড়েছে যশোরের নরেন্দ্রপুরের মিস্ত্রিপাড়ায়। ‘ক্রিকেট ব্যাটের গ্রাম’ খ্যাত মিস্ত্রিপাড়ার ব্যাটের কারিগররা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন । দেশে এ মুহূর্তে  মানুষ বেশি ব্যস্ত ক্রিকেট খেলা নিয়ে। বিশ্বকাপ ছাড়াই সারা বছর ব্যাটের যোগান দেয় এ গ্রামের কারিগররা। আর এখনতো কথাই নেই। আন্তর্জাতিক খেলাগুলোতে আমাদের ক্রিকেটাররা অনেক সুনাম বয়ে আনায় এ খেলা এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশের গ্রাম-গঞ্জে। সেই সাথে বেড়েছে ক্রিকেটের প্র্যাকটিস, ক্রিকেট লীগ ইত্যাদি।কিশোর , তরুন ,যুবাদের শয়নে-স্বপনে এখন ক্রিকেট। তাই সব এলাকাতেই দেদার বিক্রি হচ্ছে ক্রিকেটের সরঞ্জাম। এক সময় ক্রিকেটের সব ধরনের সরঞ্জামই আনা হতো বিদেশ থেকে। তবে সময় বদলেছে। উন্নতমানের সরঞ্জাম এখনো বিদেশ থেকেই আনতে হয়, তবে সাধারণ মানের সরঞ্জামের অনেক কিছুই এখন দেশে তৈরি হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রিকেট ব্যাট। বাংলাদেশের ক্রিকেট ব্যাটের সিংহভাগই আসে যশোরের নরেন্দ্রপুর গ্রাম থেকে। এক সময় দেশের বাইরে থেকে এসব ব্যাট আমদানি করতে হতো এবং বাজারটি ছিল বিদেশি ব্যাটের দখলে। কিন্তু গত এক দশকে এই পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে নরেন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দারা।

কোথায় সে গ্রাম?
যশোর শহর থেকে খুলনা মহাসড়ক ধরে ১০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে গেলেই চোখে পড়বে রূপদিয়া বাজার। এ বাজার থেকে আরও দক্ষিণে দুই কিলোমিটার দূরে নরেন্দ্রপুর গ্রাম। ব্যাটের গ্রাম নামে যে গ্রাম ইতিমধ্যে চারদিকে পরিচিতি পেয়েছে। এখানকার ব্যাট বগুড়া, রংপুর,দিনাজপুরের পাশাপাশি বিক্রি হয় ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে। ছেলেমেয়েদের মধ্যে দিন দিন ক্রিকেট আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় ব্যাটেরও চাহিদা বাড়ছে। সে চাহিদার জোগান দিতে এখানে গড়ে উঠেছে প্রায় ৬০টি ব্যাট তৈরির কারখানা। প্রতিদিনই আশপাশের গ্রামের স্কুলের শিশু-কিশোরেরা এসব কারখানায় আসে ব্যাট কিনতে। ৭০ থেকে ১২০ টাকায় ‘টেপ টেনিস’ ও ‘রাবার ডিউজ’ খেলার উপযোগী ব্যাট নিয়ে তারা ফিরে যায় মহানন্দে।

এই ব্যবসা করেই ঘুরে গেছে সেখানকার অনেক বাসিন্দার জীবন। আগে এ গ্রামের রোকেরা কাঠ মিস্ত্রি থেকে মাঠে ঘাটে মজুর-ক্ষেত মজুরের কাজ করতেন। বছরের সব সময় কাজ থাকতো না । ফলে ভালো ছিলেন না তারা। কিন্তু ব্যাট তৈরি শুরু করেই ঘুরে গেছে তাদের জীবনের চাকা। নরেন্দ্রপুরের তৈরি ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে অবশ্য পেশাদার বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা হয় না। এসব ব্যাট দিয়ে যে খেলা হয় তা শহরের গলি-মাঠ থেকে শুরু করে ফসল কাটার পর ধানক্ষেতে পর্যন্ত।এসব ব্যাট মূলত টেনিস বল বা টেপ দিয়ে মোড়ানো বল দিয়ে ক্রিকেট খেলারই উপযোগী।  পেশাদার ক্রিকেটারদের অনেকেই হয়তো অল্প বয়সে তাদের ক্রিকেট খেলা শুরু করেছেন এ ধরনের ব্যাট দিয়েই।   তবে কারিগরদের দাবি, ‘উইলো’ কাঠ পেলে তারা কাঠের বলে ক্রিকেট খেলার ব্যাটও তৈরি করতে পারবেন। সেই ব্যাট নিয়ে টাইগার টিম মাঠ মাতাতে পারবেন। শুধু তাই নয়, দেশে যারা ক্রিকেটার হিসেবে কাঠের বলে খেলে, তাদের জন্যও সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যাট তৈরি করতে পারবেন এই গ্রামের ব্যাটের কারিগররা।

দেশজুড়ে ক্রিকেট ব্যাটের অন্যতম যোগানদাতা এখন যশোরের নরেন্দ্রপুর এলাকা। এই গ্রামে দেশীয় প্রযুক্তিতে এখন এতোই বেশি ক্রিকেট ব্যাট তৈরি ও বিপণন হচ্ছে যে স্থানীয়রা এখন নরেন্দ্রপুর গ্রামকে চেনে ‘ব্যাটের গ্রাম’ নামে।

যার অবদানে ব্যাটের গ্রাম

এই পাড়ার নাম যিনি বদলে দিয়েছেন তার নাম সঞ্জিত মজুমদার, যিনি এই ব্যাট তৈরির উদ্যোক্তা। সঞ্জিত ১৯৮৪ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গেতার দিদি বাড়িতে যান। সেখানে কাঠের তৈরি নানা শিল্পকর্ম দেখে মাথায় আসে নতুন কিছু করার। এরপর দেশে ফিরে ভাতিজা উত্তম মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির পদ্ধতি শেখেন। ১৯৮৬ সালে ব্যাট তৈরি ও তা বিক্রি শুরু করেন স্থানীয় বাজারে। সেই থেকে শুরু। তার দেখাদেখি আস্তে আস্তে আরও অনেকে জড়িয়ে পড়েন এই পেশায়।

সঞ্জিত মজুমদারের দুই ছেলে তপন ও সুমন মজুমদার এখন ব্যাট তৈরির কাজ করছেন। তপন জানান, উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো মূলত তাদের বাজার। দেশের ৩২টি জেলায় যশোরের তৈরি এসব ব্যাট বাজারজাত করা হয়। বাজার মূলত অগ্রহায়ণ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত। এখন বেশিরভাগ কাঁচামাল তৈরি করে ঘরে রাখতে হচ্ছে।এক সময় মাঠে কামলা দেওয়া গৌরাঙ্গ এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। ৫ থেকে ৬ জন কর্মী কাজ করেন তার কারখানায়। তৈরি করেছেন একটা পাকা বাড়িও। কোথা থেকে শিখলেন ব্যাট তৈরির কাজ- এমন প্রশ্নের জবাবে

গৌরাঙ্গ মজুমদার বলেন, ‘এ অঞ্চলে কেবল আমি একা নই, প্রায় সবাই ব্যাট তৈরির কাজ শিখেছেন সঞ্জিত মজুমদারের কাছে।’ নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের শুধু মিস্ত্রিপাড়া গ্রামই নয়, বটতলা, মহাজেরপাড়া, রূপদিয়াসহ কয়েকটি গ্রামেই এখন তৈরি হচ্ছে ক্রিকেট ব্যাট। দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয় তাদের তৈরী ব্যাট। তিনি বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর ধরে ব্যাট তৈরি ও বিক্রির কাজ করছি। আমার কারখানায় ৭ থেকে ৮ প্রকারের ব্যাট তৈরি হয়।’ এই এলাকায় প্রায় ১৪ বছর ধরে ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কাজ করছেন ওমর আলী। পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র- এ চার মাস থাকে ক্রিকেট ব্যাটের চাহিদা। এ সময়ের আয় দিয়েই চলতে হয় পুরোটা সময় । ভরা মৌসুমে ৩০-৩৫টি কারখানায় চলে ব্যাট তৈরির কাজ। বাকি সময় ১২-১৫টি কারখানায় ব্যাট তৈরি ও মজুদ করা হয়।

কারিগররা জানান, ভালো মানের ব্যাট তৈরি করতে ৭০-৭৫ টাকার কাঠ, মজুরি ৫০ টাকা, হাতল ১০ টাকা, গ্রিপ, স্টিকার, পলিথিন মিলে
আরও ২০ টাকা খরচ হয়। এছাড়া অন্যান্য খরচ আছে। ব্যাট তৈরিতে কদম, জীবন, নিম, গুল্টে (পিটুলি), পুয়ো, ছাতিয়ান, ডেওয়া কাঠ
ব্যবহার করা হয়। ভালো মানের ব্যাট তৈরি করতে নিম ও জীবন কাঠ বেশি ব্যবহৃত হয়। প্রকারভেদে ব্যাট প্রতি খরচ ১৫ থেকে ১৫০ টাকা। বিক্রি হয় ৩০ থেকে ২৫০ টাকা। তার অধীনে ছয়জন কাজ করেন। শ্রমিক মজুরি (ব্যাটের ধরণ অনুযায়ী) প্রতি পিস ৬ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। তাদের তৈরি ব্যাট যশোরের বাজার ছাড়াও বগুড়া, দিনাজপুর,সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, রংপুর অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা নিয়ে যান।

ক্রিকেট ব্যাট তৈরির কারখানা এখন নরেন্দ্রপুরের মিস্ত্রিপাড়া ছাড়িয়ে মহাজেরপাড়া, বলরামপুর, রুদ্রপুর ইত্যাদি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমশ। সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে ৬০-৬৫টির বেশি কারখানা। এসব কারখানায় শুরুতে সবকাজ হাতে করা হলেও বর্তমানে অনেকেই তা মেশিনে
করছেন। এতে কাজের গতি বেড়েছে।এসব কারখানায় মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার ব্যাট তৈরি হচ্ছে। ব্যাট তৈরি কারিগরের পাশাপাশি তাদের ঘরের অন্যান্যরাও এর কাজে তাদের সাহায্য করে। বাড়ির বউ-ছেলেমেয়েরাও ব্যাটে পুডিং লাগানো, ঘষামাজা, রঙ করা, স্টিকার লাগানো, প্যাকেটজাত করা ইত্যাদি টুকটাক কাজ করেন ফলে শ্রম খরচ অনেক বেঁচে যায়। 

ব্যাট নির্মাণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা জানান, একশ ব্যাট বানিয়ে দিলে তারা এক থেকে দেড় হাজার টাকা হারে মজুরি পেয়ে থাকেন।
তাদের পক্ষে সপ্তাহে চারশ ব্যাট তৈরি করা সম্ভব। 

ব্যাট তৈরীর কারুকাজ তাদের নখ দর্পনে  কিন্তু আন্তর্জাতিকমানের ব্যাট তৈরিতে যে পুঁজি দরকার তা তাদের নেই। এবং এজন্য জরুরি কাঠ বিদেশ থেকে আমদানি করতে পারলে দেশেই বিশ্বমানের ব্যাট তৈরি সম্ভব। এজন্য সহজ শর্তে ঋণ বা সরিকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ নজর দিলে বিষয়টি আরো সহজ হবে।

/ডিজি