• ঢাকা
  • রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬
প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০১৯, ০৮:২৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : আগস্ট ২২, ২০১৯, ০৯:১০ পিএম

বিবৃতি ও কাগুজে জোট হিসেবে টিকে আছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট  

তারেক সালমান
বিবৃতি ও কাগুজে জোট হিসেবে টিকে আছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট  

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশীয় রাজনীতিতে হঠাৎ চমক ও আলোচনা জন্মদিলেও নির্বাচন পরবর্তী কর্মকাণ্ডে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শুধু প্রেস রিলিজ, বিবৃতি ও কাগুজে জোট হিসেবে টিকে আছে। নির্বাচন পরবর্তীতে এ ফ্রন্টের কোনো কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক ময়দানে নেই বললেই চলে। যদিও ফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে অকার্যকর ও নিষ্ক্রিয় মানতে নারাজ। তার দাবি, ফ্রন্ট চলমান আছে। শরিকদের মধ্যে ঐক্য আছে। ভবিষ্যতে বৃহৎ পরিসরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট রাজনীতির মাঠে তাদের কর্মসূচি নিয়ে হাজির হবে।

রাজনৈতিক সূত্রে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৩৯টি। গত নির্বাচনের সময় প্রায় ১৪টি দল ছিল সক্রিয়। নির্বাচনকে সামনে রেখে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত প্রায় ১৫২টি রাজনৈতিক দল মিলে গঠিত হয়েছিল ১৪ রাজনৈতিক জোট। এর মধ্যে অন্যতম দেশীয় রাজনীতিতে ‘ব্যর্থ রাজনীতিক’ হিসেবে পরিচিত ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গজিয়ে ওঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বঙ্গবন্ধুর এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহচর সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ড. কামাল হোসেনকে প্রধান নেতা মেনে ওই ফ্রন্টে যোগ দেন জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী আদর্শের রাজনৈতিক দল বিএনপি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), আবদুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, এক সময়ের প্রখ্যাত ছাত্রনেতা ডাকসুর দুবারের সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য। সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে গণস্বাস্থ্যর প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশনের মালিক ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনসহ অন্যান্যরা। 

বর্তমানে এ জোটের কোনো কর্মকাণ্ড নেই বলে দৈনিক জাগরণকে জানালেন ফ্রন্টের অন্যতম শরিক নাগরিক ঐক্যর আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, যেভাবেই দেখি বা বলি- জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। সোজা কথায় বলতে গেলে এই ফ্রন্টটি এখন ‘অকার্যকর’। 

নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে জোট গঠন করেছিল বিএনপি ও ড. কামাল হোসেন। কিন্তু নির্বাচনে হতাশাজনক হারের পর জোটের বিষয়ে নিরুৎসাহিত হয় বিএনপি। সংসদে যাওয়া না-যাওয়া নিয়ে টানাপড়েনে জোটের দূরত্ব বাড়ে। এছাড়া ঐক্যফ্রন্ট গঠনের ফলে বিএনপির পুরনো বন্ধু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ২০ দল ক্ষুব্ধ ছিল। তাদের মন রক্ষায় এখন আর ঐক্যফ্রন্টকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বিএনপি।

জোট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরক্ত শরিক দলগুলো। দেশে ভয়াবহ বন্যা ও ডেঙ্গু সমস্যা নিয়ে আলোচিত এ জোটটির কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। কার্যত সাধারণের কাছে আলোচিত ঐক্যফ্রন্টের অবস্থান রীতিমতো ঝাপসা হয়ে গেছে, কেউ কেউ বলছেন- এটি শুধুমাত্র নামেই ঐক্যফ্রন্ট। আসলে নেতাকর্মীদের ভেতরে কোনো ঐক্য নেই।  সরকারবিরোধী বৃহৎ এ জোট কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা প্রায় বিলুপ্তির পথে। জনবান্ধব কোনো ইস্যুতে নেই তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া, দীর্ঘদিন ধরে নেই কোনো কর্মসূচি। নিজেদের মধ্যেও নেই কোনো কথাবার্তা। নেতাদের নিজেদের মধ্যেও নেই কোনো যোগাযোগ।
 
তবে ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফ্রন্টের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, কিছুসংখ্যক মহল অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। ঐক্যফ্রন্ট ঠিক আছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাম্প্রতিক কার্যক্রম যাচাই করে দেখা যায়, ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের পর তিনটি কর্মসূচি ডেকেছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এর মধ্যে প্রথমটি ছিল চলতি বছরের মার্চে। খালেদা জিয়ার মুক্তি, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও পুনর্নির্বাচনের দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করার কথা ছিল তাদের। তবে মানববন্ধনের আগের দিন ‘প্রেস ক্লাবের সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির অজুহাতে’ তা বাতিল করা হয়। ৩১ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে পরে ‘হল বরাদ্দ পাওয়া যায়নি’ বলে সেটিও বাতিল করা হয়। সর্বশেষ ২৪ এপ্রিল একটি কর্মসূচি দেন তারা। ধর্ষণের প্রতিবাদ করায় ফেনীর সোনাগাজীতে আগুন দিয়ে হত্যা করা নিহত শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যায় শাহবাগ চত্বরে গণজমায়েতের ডাক দেয় জোটটি। তবে একদিন আগে ‘অনিবার্য কারণবশত’ সেটিও বাতিল করা হয়।

জোট সূত্রে জানা যায়, কার্যত ফ্রন্টকে সামনে নিয়ে এর প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেনের যে উদ্দেশ্য ছিল এর কিছুটা হলেও তিনি বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন। তার নেতৃত্বাধীন নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল গণফোরাম এই প্রথম জাতীয় সংসদে দুটি আসন লাভ করেছে এ জোটের কারণেই। এতে তিনি সন্তুষ্ট। এছাড়া, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে নানা কারণে গত দীর্ঘ সময় ধরে তার সম্পর্কের টানাপড়েন চলছিল। বঙ্গবন্ধুর এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহচর ড. কামালের জন্য বিষয়টি ছিল পীড়াদায়ক। সেই কারণে যেকোনো প্রকারে তিনি চেয়েছিলেন শেষ বয়সে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সামনে নিয়ে নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপের মধ্যদিয়ে সেই শীতল সম্পর্কের অনেকটা উন্নতি ঘটেছে। তিনি আওয়ামী লীগ সভাপতিকে কথা দিয়েছিলেন যেকোনো প্রকারে বিএনপিকে এ নির্বাচনে রেখে নির্বাচনকে অনেকটা গ্রহণযোগ্যতা দেয়ার বিষয়ে। তিনি তার কথা রাখতে পেরেছেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে থেকেছে। যদিও নির্বাচনের পর প্রথমে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেও পরবর্তীতে আবার সংসদে যোগ দিয়ে সরকারকে স্বস্তি দিয়েছে বিএনপি।
  
জোটের নেতাকর্মীদের মন্তব্য, ড. কামালের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না কেউই। সাম্প্রতিককালে তার অদ্ভুত আচরণে ক্ষুব্ধ সবাই। জাতীয় সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে তিনি সুলতান মনসুরকে বহিষ্কার করেছিলেন। অথচ একই ‘অপরাধে’ মোকাব্বিরকে দলে রেখে পরবর্তীতে পদোন্নতি দিয়েছেন। ওই ঘটনায় দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু নিষ্ক্রিয় হয়ে আছেন। তাকে এখন আর ঐক্যফ্রন্ট কিংবা গণফোরামের কোনো অনুষ্ঠানে দেখা যায় না। এছাড়া, বয়সের ভারে প্রায় ন্যুব্জ হয়ে পড়া ড. কামাল আর আগের মতো রাজনীতিতে আগ্রহী নন বলেও গুঞ্জন তার দলে।

জানা গেছে, ড. কামাল হোসেন তার গণফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মাসিক খরচ আর একা বহন করবেন না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন তার দলের নেতাদের। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, এখন থেকে সবাইকে চাঁদা দিয়ে দলের খরচ চালাতে হবে। সেক্ষেত্রে তিনি মাসিক পাঁচ হাজার টাকা দেবেন, কোনোভাবেই এর বেশি নয়। মূলত নির্বাচনের পর থেকে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্যরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ও নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া নিজের ব্যবস্থাপনায় গণফোরামের পরিচালন ব্যয় বহন করে চলেছেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এমন পরিস্থিতির কারণ হিসেবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐক্যফ্রন্টের এক শীর্ষ নেতা বলেন, বিএনপি শরিকদের মর্যাদা দেয়নি। নির্বাচনের আগে থেকেই আসন ভাগাভাগি নিয়ে তাদের সঙ্গে ফ্রন্টের শরিকদের মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। বিএনপি ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আগে যে কয়টি আসন দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিল এর অর্ধেকও দেয়নি। 

তিনি বলেন, নির্বাচনের দিন তারাই প্রথম সিদ্ধান্ত নিল যে সংসদে যাবে না। গণফোরাম তাদের নেতা সুলতান মনসুরকে সংসদে যাওয়ার জন্য বহিষ্কার করল। অথচ বিএনপি নিজেই পরে সংসদে গেল।

ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর ঐক্যফ্রন্ট নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। তাদের আর কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। তারা কোনো জাতীয় সমস্যার প্রতি নজর দিতেও ব্যর্থ হয়েছে। তাই আমরা জোট থেকে বের হওয়ার ঘোষণা দিয়েছি।

জোটের আরেক নেতা বলেন, ঐক্যফ্রন্টের মূল শক্তি বিএনপি। বিএনপির কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সরকারের কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারছে না ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি তাদের কোনো সহযোগিতা করছে না।

ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরামের এক শীর্ষ নেতা জানান, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই স্কাইপির মাধ্যমে রাজনীতি করছে। লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানের ইশারায় দুলছে। সেই তারেক রহমানই ঐক্যফ্রন্টের অলিখিত বিলুপ্তির মূল কারণ। 

বিএনপির কারণে ঐক্যফ্রন্টের এমন পরিণতি- এমনটি আখ্যা দিয়ে জোটের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, যেকোনো জোটের কার্যক্রম পরিচালনা কিংবা আন্দোলনের উদ্যোগ নিতে হয় বড় দলকে। ঐক্যফ্রন্টের ক্ষেত্রেও তা-ই হওয়া উচিত ছিল। তবে বড় দল হয়তো চাচ্ছে না যে ঐক্যফ্রন্ট থাকুক। হয়তো তারা একাই চলতে চাচ্ছে, তাই এমন আচরণ করছে।

এসব বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে পরাজিত করার জন্য আমরা ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিলাম। কিছু মহল অত্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা বলছে যে, বিএনপি যে মিটিং-টিটিং করছে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য করছে। আমরা পরিষ্কার ঘোষণা দিতে চাই, ২০ দল ঠিক আছে, ঐক্যফ্রন্টও ঠিক আছে। আমরা ঐকবদ্ধভাবে এ সরকারকে পরাজিত করব, নেত্রীকে (বেগম খালেদা জিয়া) মুক্ত করব।

এ বিষয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা ও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, জনগণ অবশ্যই বিরোধী দলগুলোর ঐক্য আশা করে। তাদের জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত। জনবিরোধী নানা সিদ্ধান্তে কর্মসূচি দিয়ে জনগণের পাশে থাকতে হবে। আমি মনে করি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ঐক্যফ্রন্টের ঐক্য অটুট রেখে সবাইকে এক হতে হবে। 

টিএস/ বিএস 

আরও পড়ুন

Islami Bank