• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: এপ্রিল ২২, ২০১৯, ০৮:১৭ এএম
সর্বশেষ আপডেট : এপ্রিল ২২, ২০১৯, ০৪:৪৪ পিএম

হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

আশুলিয়ায় খোলা আকাশের নিচে সিসা কারখানা 

আশুলিয়া সংবাদদাতা
আশুলিয়ায় খোলা আকাশের নিচে সিসা কারখানা 
আশুলিয়ার রাঙ্গামাটি এলাকায় গড়ে উঠা সিসা কারখানায় এসব ব্যাটারি গলিয়ে সিসা বের করা হয়- ছবি: জাগরণ


আশুলিয়ার রাঙ্গামাটি যাত্রাবাড়ি এলাকায় খোলা আকাশের নিচে গড়ে তোলা হয়েছে অনুমোদনহীন সিসা কারখানা। সিসা গলানোর কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ আশপাশের পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ক্ষতিকর রাসায়নিকের কারণে ওই এলাকায় বসবাসকারী মানুষ রয়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। এ কারখানার নির্গত ধোঁয়ার কারণে এরই মধ্যে নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের।

অনুমোদনহীন এ কারখানার বিষাক্ত গ্যাসে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। ব্যাহত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শুধু তাই নয় সিসা কারখানার পাশে দিয়ে বয়ে যাওয়া গাজীখালী নদীতে সিসা কারখানার আবর্জনা ফেলানোর কারণে নদীসহ আশপাশের ধানি জমি বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। কমে গেছে ফলনও। এলাকাবাসি বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না। তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছেন শীঘ্রই ওই সিসা কারখানায় অভিযান চালানো হবে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত ২ বছর ধরে এই সিসা কারখানাটি এখানে গড়ে তোলা হয়েছে। জমিটি ভাড়া নেয় গাইবান্ধার মঞ্জুর হোসেন নামের এক ব্যক্তি। তবে এ কারখানার কোন অনুমোদন নেই। শুধু ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে চালাচ্ছেন কারখানা। 
পরিত্যক্ত ব্যাটারি পুড়িয়ে বিশুদ্ধ সিসা বের করা হয় এ কারখানায়। উচ্চ তাপমাত্রায় ব্যাটারির পাত গলিয়ে সিসা ও লোহা আলাদা করা হয়। পরে ওই সিসা আবারো ব্যাটারি তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। 

জানা গেছে, উচ্চ তাপমাত্রায় পাত গলানোর সময় কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর যৌগ উৎপন্ন হয়। ধোঁয়ার মাধ্যমে এসব পদার্থ চারদিকে প্রায় এক বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। যা থেকে পরিবেশ, ফসল এবং মানবদেহের ক্ষতিসাধন করে থাকে। ফলে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হন মানুষজন।

স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে পুরাতন ব্যাটারি সংগ্রহ করে তা আগুনে গলিয়ে বিশুদ্ধ সিসা বের করা হয়। সিসা গলানোর গন্ধ ও ধোঁয়ায় আশপাশের লোকজন থাকতে পারছেন না। অনেকের শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে। এছাড়া কারখানার পাশের ধানি জমিতে লাগানো ধান মৌসুম ছাড়া পাতা মরে যাচ্ছে। ওই কারখানার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে তুরাগ নদের শাখা গাজী খাল। কারখানার বর্জ্য ওই খালে ফেলে দূষণ করছে। কারখানার পার্শ্ববর্তী এলাকার গাছপালা মরে যাচ্ছে। 

কারখানার পাশেই বসবাসকারী কার্তিক জানান, রাত ৮টার পর সিসা গলানোর কাজ শুরু হয় চলে ভোর পর্যন্ত। এ সময় গন্ধে ঘরে থাকা যায় না। এরই মধ্যে এ পাড়ার দুই শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে। মরে গেছে দুটি বড় গরু সহ ৫টি বকনা বাছুর। 

আরেক বাসিন্দা খুশি পমেড বলেন, সিসা গলানো কারখানার কারণে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে এ এলাকার দুই শিশুকে হাসপাতালে পর্যন্ত ভর্তি হতে হয়েছিল। এছাড়া আমার একটি গরু মারা গিয়েছে। আশপাশে জমিতে ধান নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আমগুলো গাছ থেকে ছোট অবস্থায় পচে যাচ্ছে। 

বাংলাদেশ কোরিয়া মৈত্রী হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সফিক বলেন, সিসা উচ্চ তাপমাত্রায় গলানোর সময় সহযোগী হিসেবে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সালফার ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর যৌগ উৎপন্ন হয়। এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে অ্যাজমা, চোখের রোগ, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

সূত্র জানায়, এ কারখানা থেকে ধোঁয়া ও ভারী ধাতু ছাইয়ের সাথে বাতাসে মিশে আশপাশের কৃষি জমিতে পড়ছে। আর এসব জমিতে জন্মানো ঘাস খেয়ে গবাদিপশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, পার্শ্ববর্তী আব্দুল হালিমের ঘর থেকে বাঁশের খুঁটি দিয়ে দুই তারে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে কারখানাটিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই বিদ্যুৎ দিয়ে কারখানায় মেশিন চালানো সহ মটর, বৈদ্যুতিক বাতি ও বৈদ্যুতিক পাখা চালানো হচ্ছে।    

সরেজমিনে ওই কারখানায় গিয়ে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে পুরানো ড্রাইসেল ব্যাটারি ও সিসাযুক্ত দ্রব্য সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো কারখানায় এনে পুড়িয়ে প্রথমে সিসা বের করা হয়। পরে চুলায় দিয়ে ঢালাই করা হয় এবং নতুন ব্যাটারিতে ব্যবহার উপযোগী করা হয়। পরে সাভার ও ঢাকা সহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য সরবরাহ করা হয়। 

কারখানার মালিক মঞ্জুর হোসন জানান, খোলা আকাশের নীচে ব্যাটারি গলিয়ে সিসা বের করতে গিয়ে পরিবেশ ও এলাকাবাসী জন্য ক্ষতিকর বিষয়টি জানা আছে। এরপরও করি। তবে কিছুদিনের মধ্যে কারখানা বন্ধ করে দিব।

এ ব্যাপারে ঢাকা কলেজ এর রসায়ন বিভাগের প্রভাষক মো. আসলাম হোসেন বলেন, খোলা জায়গায় ব্যাটারি গলানো হলে ব্যাটারির রাসায়নিক আলোক রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুতে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃস্বরণ করে এবং বায়ু দূষণ হয়। সেই সাথে বায়ু মণ্ডল উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এছাড়া গলিত ব্যাটারি থেকে যে ধাতু আসে যেমন-লেড, ক্যাডমিয়াম ইত্যাদি বায়ু, মাটি ও পানির সাথে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করে বিভিন্ন রোগবালাই সৃষ্টি করে। যেমন- স্মৃতি হ্রাস, ক্যান্সার ইত্যাদি। এরফলে বিশেষ করে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ব্যাটারি ব্যবহৃত বিভিন্ন এসিড যেমন- সালফিউরিক এসিড সরাসরি পানি ও মাটিতে যায় এবং এতে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণী, উদ্ভিদ ও গাছপালা মারা যায়। ফলে ওই অঞ্চলের ইকোসিস্টেম নষ্ট হয়ে যায়।  

পরিবেশ দূষণকারী অবৈধ সিসা ঢালাই কারখানা দ্রুত বন্ধ করা না গেলে এ এলাকা মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে, আশঙ্কা স্থানীয়দের। তবে সংশ্লীষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসির।

টিএফ