• ঢাকা
  • রবিবার, ০১ আগস্ট, ২০২১, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮
প্রকাশিত: জুলাই ১৫, ২০২১, ১০:০৮ এএম
সর্বশেষ আপডেট : জুলাই ১৫, ২০২১, ০৪:০৮ এএম

ঝুঁকিপূর্ণ সেতুতে আটকে যাচ্ছে ডুয়েল গেজ ট্রেনের স্বপ্ন 

ঝুঁকিপূর্ণ সেতুতে আটকে যাচ্ছে ডুয়েল গেজ ট্রেনের স্বপ্ন 

মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম 
২০২২ সালের মধ্যে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের ঘুনধুম পর্যন্ত ডুয়েল গেজ ট্রেন চালুর ঘোষণা মন্ত্রণালয়ের। এ জন্য দোহাজারী থেকে রেলপথ সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজও চলছে। প্রকল্পের প্রায় ৭০ ভাগ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি কাজ আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে শেষ হবে। এরপর দ্রুতগতির ডুয়েল গেজ ট্রেন চালু হবে। এমন কথাই বললেন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুনধুম প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান। কিন্তু তার এসব কথা যেন দিবা স্বপ্ন। কারণ এই রেললাইনে কাটা হয়ে রয়েছে কর্ণফুলী নদীর উপর শত বছরের ঝুঁকিপূর্ণ কালুরঘাট সেতু। যার উপর দিয়ে দ্রুতগতির ডুয়েল গেজ ট্রেন চলাচল কোনোমতেই সম্ভব নই।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সেতু বিভাগের প্রকৌশলীদের মতে, অন্তত ২০২৮ সালের আগে কর্ণফুলীর উপর হচ্ছে না নতুন সেতু। ফলে ২০২২ সালে কিভাবে ডুয়েল গেজ ট্রেন চালু হবে তা বোধগম্য নয়। মূলত এই সেতুর কারণেই আটকে থাকবে দ্রুতগতির ডুয়েল গেজ ট্রেন চালুর স্বপ্ন।

এ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ঘুনধুম প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মফিজুর রহমান বিষয়টিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেন, যতদিন ডুয়েল গেজ ট্রেন চালু সম্ভব হবে না, ততদিন মিটার গেজ ট্রেন চলবে। তারপরও কক্সবাজারের ঘুনধুম পর্যন্ত ট্রেন যোগাযোগ তো স্থাপন হবে।

এছাড়া ঢাকা থেকে কক্সবাজারের ঘুনধুম পর্যন্ত কতটুকু রেলপথ ডুয়েল গেজ ট্রেন চলাচলের উপযোগী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ৩২০ কিলোমিটারের মধ্যে ২৪৮ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৭২ কিলোমিটারের কাজ আগামী জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।

এছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ১২৮ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণের কাজ আগামী বছর জানুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার টার্গেট নিয়ে কাজ চলছে। এই রুটের কাজ প্রায় ৭০ ভাগ শেষ হয়েছে। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে নতুন এক সেট দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল শুরু হলে রেলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে উড়াল রেলপথ নির্মাণের সমীক্ষাও চলছে। উড়াল লাইন হলে মাত্র ১ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে কক্সবাজারে রেল চলাচল সম্ভব হবে।

তবে কালুরঘাটে নতুন সেতু ছাড়া ডুয়েল গেজ ট্রেন সম্ভব হবে না। আর কালুরঘাট সেতুর কাজ আলাদা বিভাগের হওয়ায় এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত বলতে পারছি না। এরপরও মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত দিয়েছে ২০২২ সালে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ডুয়েল গেজ ট্রেন চালু হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চাপ রয়েছে। সে লক্ষ্য নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঘুনধুম প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার মূল রেললাইন এবং ৩৯ দশমিক ২ কিলোমিটার লুপ লাইনসহ ১৪০ কিলোমিটার নতুন সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক রেলপথ নির্মাণের কাজ চলছে। তবে এই পথে থাকবে ৩৯টি মেজর ব্রিজ এবং ১৪৫টি মাইনর ব্রিজ ও কালভার্ট। বিভিন্ন শ্রেণির ৯৬টি লেভেল ক্রসিং নির্মাণাধীন রয়েছে।

তাছাড়া যেসব এলাকায় বন্যপ্রাণীর বিচরণ রয়েছে সেসব রেলপথে আলাদাভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে আন্ডারপাস ও ওভারপাস। চট্টগ্রামের দোহাজারী, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ, রামু ও কক্সবাজার পর্যন্ত থাকবে নতুন-নতুন রেলওয়ে টার্মিনাল। রামুতে হবে জংশন। আর কক্সবাজারের রেলওয়ে টার্মিনালে নির্মাণ হবে আইকনিক ইন্টারমডেল বিল্ডিং। টার্মিনালটির নকশা ঝিনুক আকৃতির। যা পর্যটন শিল্পের অন্য একটি দর্শনীয় স্থান বলে বিবেচিত হবে।

বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন চলমান প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। যার মধ্যে এডিবির বিনিয়োগ প্রায় ১৫০ কোটি ডলার। দুই লটে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পনি লিমিটেড এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। ২০১৮ সালের মার্চ ও ১ জুলাই নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলা কাজ শুরু করে।

তবে এই প্রকল্পে জন্য এখন কাটা হয়ে রয়েছে কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাট সেতু। ১৯৩১ সালে নির্মিত এই সেতু চার দশক আগে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে রেলওয়ে। বছরের পর বছর সেতুটি মেরামতে রেলবিভাগ শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়নি। চট্টগ্রামের মানুষের দাবির মুখে গত ৬ বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ অর্থায়নে এ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০১৮ সালের মার্চে কাজ শুরু করে ২০২৩ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা এই সেতুর। কিন্তু ২০১৮ সালে একনেকের এক বৈঠকে নকশায় ত্রুটি ধরা পড়ার পর কার্যত সেই উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। সর্বশেষ নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের একটি গেজেট এই সেতু নির্মাণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ওই গেজেটে দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত নদী হিসেবে কর্ণফুলীর উপর কালুরঘাট সেতু হলে উচ্চতা হতে হবে ১২ দশমিক ২ মিটার। কিন্তু নকশায় উচ্চতা ধরা হয় ৭ দশমিক ২ মিটার। ফলে ১২ দশমিক ২ মিটার উচ্চতায় নতুন করে কালুরঘাট সেতুর ফিজিবিলিটি স্টাডির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্তি প্রধান প্রকৌশলী মো. আহসান জাবির বলেন, কালুরঘাট সেতুর নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডির সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেতুটি সিঙ্গেল ট্র্যাক রেল-কাম সড়ক সেতু হবে নাকি, ডাবল ট্র্যাক রেল-কাম সেতু হবে তা সমীক্ষার ওপরই নির্ভর করছে। ৬ মাসের মধ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ করতে হবে। ফিজিবিলিটি স্টাডি করবে সেতুর অর্থদাতা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংক। যেহেতু সেতুর উচ্চতা বেড়েছে, সুতরাং আগের ডিজাইন আর কাজে লাগবে না। নতুন ডিজাইনে সেতুর ব্যয় কত হবে তা নতুন সমীক্ষার পর নির্ধারণ হবে। নতুন সমীক্ষার পর নতুনভাবে হবে সেতুর ডিজাইন, বাজেট, প্রকল্পের মেয়াদসহ সবকিছু। সড়কের সঙ্গে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন রেলসেতু নির্মাণ প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক কিনা তাও সমীক্ষার পরই জানা যাবে। এসব করতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লেগে যাবে। এরপর প্রকল্প অনুমোদনে ৬ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত সময় লাগে।

জাগরণ/এমআর