• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৫ জুন, ২০২০, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২০, ০৫:৪৫ এএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ২৮, ২০২০, ০৫:৫৫ এএম

করোনা সংক্রমণে অবরুদ্ধ বিশ্ব

লকডাউনে বিশেষ শিশুর দেখভাল

সাঈদ আহমেদ 
লকডাউনে বিশেষ শিশুর দেখভাল

বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় লকডাউনের কারনে- স্কুল, থেরাপি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় বিশেষ শিশুদের বাবা-মায়েদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। এই শিশুরা শারীরিক, মানসিক বা বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতার কারনে অটিজম, ADHD, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোমের মত বিভিন্ন ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত এবং অন্যদের সাথে স্বাভাবিক যোগাযোগ স্থাপনে আংশিক অথবা পুরোপুরিভাবে অপারগ। সেকারনে তারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাদের প্রতিক্রিয়া জানায় যা আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। কেউ চিৎকার করে, লাফালাফি করে আবার কেউ বা ঝিম ধরে থাকে।

অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন উপসর্গ প্রকাশ করে এবং তাদের পরিচর্যার ধরণ ও প্রক্রিয়াও বিভিন্ন হয়ে থাকে। একারনেই বাবা-মায়েদের হতে হয় অনেক বেশি সচেতন ও উদ্যোগী। তারা চেষ্টা করেন দিন-রাতের সর্বাধিক সময় তাদের শিশুদেরকে বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যস্ত রাখতে। কিন্তু এখন স্কুলসহ সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পিতামাতার কষ্ট ও উদ্বেগের শেষ নেই। এদের মাঝে কোনো কোনো শিশু হাইপার একটিভ। তারা শান্ত হয়ে বসতে চায় না, এমনকি সুযোগ পেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। তাই অভিভাবকেরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। শিশুদের বিকাশ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি রয়েছে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও। অধিকাংশ বিশেষ শিশু বাসার ঠিকানা বলতে পারেনা। যা প্রচণ্ড উদ্বেগের একটি বিষয়।

এদিকে সারা বিশ্ব কোভিড-১৯ এর ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। আমাদের দেশেও করোনাভাইরাস আক্রান্ত মানুষ ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি কতদিনে নিয়ন্ত্রনে আসবে তা কেউ বলতে পারে না। এমতবস্থায়চলমান ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ শিশুর বাবা-মা ও সংশ্লিষ্ট পেশাজিবিদেরকে ভাবতে হবে। উদ্ভুত পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ ব্যবস্থাপনার কথা বিবেচনা করতে হবে। সারা বিশ্বেই বিশেষ শিশুর পরিবার শঙ্কিত। 

যুক্তরাষ্ট্রের এরিজোনা প্রদেশের গভর্নর ডয়াগ ডুসে থেরাপিস্টদেরকে অনলাইন থেরাপি দিতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং এ কাজে টেলিথেরাপি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অকুপেশনাল থেরাপিস্ট হিদার বলেছেন, “টেলিথেরাপির একটা ভালো দিক হল এতে পরিবারের লোকজন বিশেষ করে শিশুর পিতামাতা যুক্ত হন। ইউরোপের সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান অটিজম অ্যাম্বিশন অ্যাভিনির-এ (Autisme Ambition Avenir) কর্মরত মনোবিজ্ঞানী অরলি গাইলনি মনে করেন লকডাউনের সময় বাসায় বিশেষ শিশুর বাবা-মায়ের উচিৎ ছোট ছোট ও বাস্তবধর্মী লক্ষ্য নির্ধারণ করে বাচ্চাদের পড়ালেখা চালিয়ে নেয়া। উচ্চাভিলাষী ও দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিৎ হবে না।

এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, “আপনার শিশু ভালবাসে এমন কাজগুলো বেছে নিন। এছাড়াও, ওদের আচরণ ঠিক করার চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে আমরা স্কুলে তৈরি করা আইইপি (ইন্ডিভিজুয়ালএজুকেশনপ্ল্যান) অনুসরনকরতেপারি।"

ডাঃ লারিসা হারস এমডি শিশুদেরকে আচরণ ও শৃঙ্খলা শেখানোর জন্য নয়টি টিপস দিয়েছেন। এগুলো হলঃ সিদ্ধান্তে স্থির থাকা, শিশুর অবস্থা সম্পর্কে ভালভাবে জানা, প্রত্যাশা ব্যাখ্যা করা, পুরস্কার দেয়া, সহজ ভাষা ব্যবহার করা, প্রশংসা করা, রুটিন তৈরি করা, নিজের উপর ভরসা রাখা এবং শিশুকে বিশ্বাস করা। এসকল প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানতে অভিভাবকগন চোখ রাখতে পারেন এই তাদের ওয়েব সাইটে laid out nine important tips to discipline special children

নিউইয়র্কের চাইল্ড মাইন্ড ইন্সটিটিউট চঞ্চল বিশেষ শিশুকে দেখভালের একটি পূর্ণ গাইড লাইন দিয়েছে প্রকাশ করেছে article: managing problem behavior at home তাদের এই সাইটটিতে।

এছাড়াও, হেল্প গাইড বিশেষ শিশুর পড়ালেখায় যে সকল সমস্যার সম্মুখীন হয় তা সমাধানে কয়েকটি টিপস দিয়েছে। এমাস্টার ল্যান্ড বিশেষ শিশুর আচরণ সংক্রান্ত ১২টি টিপস আলোচনা করেছে তাদের অফিশিয়াল সাইটে special needs parenting 12 tips or managing challenging behavior
 
আমাদের দেশে সরকার, মিডিয়া এবং সংস্লিষট পেশাজীবিরা বিশেষ শিশুর পিতামাতার কষ্ট ও অসহায়ত্ব লাঘবে এগিয়ে আসতে পারেন। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো অকুপেশনাল ও স্পিচ থেরাপিস্টদেরকে নিয়ে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠান প্রচার করতে পারেন যেখানে থেরাপিস্টরা হাতে কলমে থেরাপি প্রদর্শন করবেন আর বাসায় বাচ্চার বাবা-মা বা পরিবারের অন্য কেউ তা অনুসরন করে থেরাপি দেবেন। যে থেরাপিগুল থেরাপিস্ট ছাড়া অন্যরাও দিতে পারেন সেগুলই দেখানো হবে। এছাড়াও, চ্যানেলগুলো বিশেষ শিক্ষকদেরকে নিয়েও অনুষ্ঠান করতে  পারেন যাতে করে তারা বাবা-মাকে পড়ালেখার পদ্ধতি ও টিপস নিয়ে আলোচনা করবেন।বিশেষ শিশুর জন্য পুস্টি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। 

পুস্টিবিদরা বিশেষ শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় পুস্টি, রেসিপি ও রান্নার পদ্ধতি নিয়ে কথা বলবেন। অনুষ্ঠানগুলো লাইভ হলে বাবা-মায়েরা সরাসরি কল করে প্রশ্ন করতে পারেন। রাষ্ট্রীয় চ্যানেল হিসাবে বিটিভির এ বিষয়ে উদ্যোগি হওয়া সবচেইয়ে বেশি জরুরি। কিন্তু বেসরকারি চ্যানেলগুলোও  লাভবান হবে। এই অনুষ্ঠানগুলো পেশাজীবীদের জন্য প্রচারনার মাধ্যম হতে পারে। এছাড়াও, দেশের অসংখ্য প্রতিবন্ধী ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুর বাবা-মা এবং পেশাজীবীরা এই অনুষ্ঠানগুলো দেখবেন। প্রিন্ট মিডিয়া বিশেষ ফিচার এবং থেরপিস্ট, শিক্ষক, চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ ও পিতামাতার সাক্ষাৎকার ছাপতে পারে। পেশাজীবীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সেবা দিতে পারেন। তারা লাইভ সেশনও করতে পারেন। 

আমাদের দেশের অনেক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাস নিচ্ছেন, তাহলে বিশেষ স্কুল নয় কেন? পিতামাতা বা পরিবারের কেউ বাসায় অবস্থান করে সহকারি শিক্ষক হিসাবে কাজ করবেন। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে যেহেতু তাদের অনলাইন ক্লাস নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। সরকার শুধুমাত্র বিশেষ শিশুদের জন্য পার্ক ও অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্র সীমিত মানুষ ও সীমিত সময়ের জন্য খুলে রাখতা পারেন।

করনাভাইরাসের এই দুঃসময়ে বিশেষ শিশুদের দেখভালের জন্য প্রয়োজন সরকার, পিতামাতা, পেশজীবী ও মিডিয়ার আন্তরিকতা ও সমন্বিত প্রচেষ্টা। যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মানুষের জন্যেই দুর্বিসহ, এসকল বিশেষ শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য সময়টা এখন কত কঠিন তা বিবেচনায় নিলে হয়তো বেরিয়ে আসবে আরো অনেক পরিণত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ।

 

লেখক:
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

বিশেষ শিশু বিষয়ক প্রশিক্ষিত আলোচক (ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিস থেকে “অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার” বিষয়ে প্রশিক্ষিত)