• ঢাকা
  • সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: মার্চ ১০, ২০২০, ০৭:৫৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : মার্চ ১০, ২০২০, ০৭:৫৫ পিএম

শেকড়ের টানে বাঙালির পাশে-৭

কোলকাতার রাস্তায় চাঁদা তুলতেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় 

সবিশেষ
কোলকাতার রাস্তায় চাঁদা তুলতেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় 
উত্তম কুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে অনুষ্ঠানের ফাঁকে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি : ইন্টারনেট


মু ক্তি যু দ্ধে র  সু হৃ দ

একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিন। গোটা ভারতের লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা সোচ্চার আমাদের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ ‘মানবিক বোধে’র টানে। আবার অনেকের মনে এই বোধের সঙ্গে ছিল মাটি ও শেকড়ের টান। এবারের অগ্নিঝরা মার্চে তাদের নিয়েই দৈনিক জাগরণে’র বিশেষ আয়োজন। আজ প্রকাশিত হলো সপ্তম কিস্তি। লিখেছেন জাকির হোসেন

জহর রায়ের সাথে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

একাত্তরে বাংলাদেশের অসহায় শরণার্থীদের সহযোগিতা করতে কোলকাতার রাজপথে, অলিতে গলিতে চাঁদা তুলতেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এই অর্থ তিনি দান করতেন উদ্বাস্তু ত্রাণ 
তহবিলে। ভানু বন্দ্যোপাধায় ওই সময় নেতৃত্ব দিয়ে কোলকাতার খ্যাতিমান ‍অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং চলচ্চিত্র কলাকুশলীদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড় করিয়েছিলেন।  

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জন্ম ১৯২০ সালের ২৬শে অগাস্ট, বিক্রমপুরের পাঁচগাঁওয়ে। তার পারিবারিক নাম সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। আর ডাকনাম ভানু। তার মা সুনীতি দেবী ছিলেন 
কেমব্রিজ থেকে পাশ করা প্রথম মহিলা স্কুল ইন্সপেকট্রেস, আর বাবা জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধায় ছিলেন নবাবি স্টেটের উচ্চপদস্থ চাকুরে। ভানু বন্দ্যোপাধায় ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি’স হাই 
স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং জগন্নাথ কলেজে থেকে স্নাতক পাশ করেন। তিনি ১৯৪১ সালে কলকাতায় যান। সেখানে তিনি আয়রন এন্ড স্টীল কোম্পানি নামে একটি সরকারি অফিসে 
যোগ দেন এবং বালীগঞ্জের অশ্বিনী দত্ত রোডে তার বোনের কাছে দু’বছর থাকার পর টালিগঞ্জের চারু অ্যাভিনিউয়ে বসবাস শুরু করেন।  

খ্যাতিমান কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কৌতুকের সংজ্ঞাটাই পাল্টে দিয়েছেন। ছেলেবেলা থেকেই প্রখর রাজনীতিসচেতন ছিলেন ভানু।  ‘অনুশীলন 
সমিতি’র সদস্য ছিলেন তিনি। রাইটার্সের অলিন্দ যুদ্ধে শহিদ বিনয়-বাদল-দীনেশ ত্রয়ীর বিনয় ও দীনেশের সঙ্গে ভীষণ হৃদ্যতা ছিল তার। বিশেষ করে দীনেশ গুপ্তকে তিনি ঈশ্বরের 
মতো করতেন। আজীবন তাদের মৃত্যুদিনে রাইটার্সে যেতেন, ছবির সামনে নতজানু হয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে ফিরে আসতেন। সাম্যবাদী রাজনৈতিক আদর্শে গভীর বিশ্বাস ছিল তার। 
তিনি গর্ব করে বলতেন, “আমার মায়ের বাবা আমার নাম রেখেছিলেন সাম্যময়... আই অ্যাম অ্যা কমিউনিস্ট, আই বেয়ার ইট ইন মাই নেম।” শিল্পীদের স্বার্থরক্ষায় সংগঠন তৈরি করেন।

জহর রায় ও অজিত চট্টোপাধ্যায়ের সাথে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়


অভিনয় জীবনের মধ্যগগনে থাকার সময়েই। ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োতে যখন ধর্মঘট হয়েছিল, তখন অন্যান্যদের সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ও ছবি বিশ্বাস যুক্ত হন ‘সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড 
ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’-এর আন্দোলনে। সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবির রিলিজ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে পরিচালকের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দৃঢ়ভাবে। প্রযোজকদের 
একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে বারবার রুখে দাঁড়ান। প্রথমে ‘অভিনেতৃ সঙ্ঘ’ ও পরে ‘শিল্পী সংসদ’-এর পুরোভাগে থেকে টানা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কারণে একটা সময় প্রায় 
৫বছর তাঁকে ব্ল্যাক লিস্ট করে দেওয়া হয় চলচ্চিত্র জগতে। কোনো প্রযোজক-পরিচালক সে সময় তাঁকে কাজ দিতেন না। কিন্তু তিনি আপোসের রাস্তায় না হেঁটে ছায়াছবি ছেড়ে জোর 
দেনজলসা, কৌতুক নকশার রেকর্ড, যাত্রা, বোর্ড থিয়েটারে। তার আগেই চাকরি ছেড়েছেন, তিন সন্তানের পড়াশোনা, সংসার সব কিছু সামলাতে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে, 
শরীর খারাপ হয়েছে, কিন্তু হার মানেননি। তার কৌতুক নকশা যত মানুষের কাছে পৌঁছেছে, তার এক শতাংশ মানুষও তার জীবনভর সংগ্রামের কথা জানেন না। সর্বোপরি, চিরকাল 
আড়ালে থেকে গিয়েছে তার ক্ষুরধার মেধা। তার লেখা প্রবন্ধ পড়লে বা পুরনো সাক্ষাৎকারের পাতা উলটোলে তার সামান্য আঁচ পাওয়া যায় মাত্র।

বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের সাথে ভানুবন্দ্যোপাধায়

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয়-জীবন শুরু ১৯৪৭-এ, ‘জাগরণ’ ছবির মাধ্যমে। সেই বছরই ‘অভিযোগ’ নামে অন্য একটি ছবি মুক্তি পায়। এরপর ধীরে ধীরে ছবির সংখ্যা বাড়তে থাকে, 
যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘মন্ত্রমুগ্ধ’(১৯৪৯), ‘বরযাত্রী’ (১৯৫১) এবং ‘পাশের বাড়ি’ (১৯৫২)। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পেল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’, এবং বলা যেতে পারে এই ছবির মাধ্যমেই ভানু 
দর্শকদের নিজের অভিনয়ের গুণে আকৃষ্ট করতে শুরু করেন। এর পরের বছর মুক্তি পায় ‘ওরা থাকে ওধারে’। ১৯৫৮ সালটিতে মুক্তি পাওয়া অনেক ছবির মধ্যে দু’টি ছিল ‘ভানু পেল 
লটারি’এবং ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’। ১৯৫৯-এ মুক্তি পায় ‘পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট" এই ছবিতে ভানু নায়কের ভুমিকায় অভিনয় করেন, বিপরীতে ছিলেন রুমা গুহঠাকুরতা।

তুলসী চক্রবর্তীর সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘৮০তে আসিও না’ ছবিটিতেও ভানু নায়কের ভুমিকায় অভিনয় করেন এবং এখানেও ওনার বিপরীতে ছিলেন রুমা দেবী। ১৯৬৭ সালে ভানুর আরো একটি ছবি মুক্তি পায়,‘মিস প্রিয়ংবদা’ – যেখানে উনি চরিত্রের প্রয়োজনে মহিলা সেজে অভিনয় করেন। এখানে ওনার বিপরীতে ছিলেন লিলি চক্রবর্তী। ভানুর ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে। ভানুর শেষ ছবি ‘শোরগোল’ মুক্তি পায় ১৯৮৪-তে। এর আগেই ১৯৮৩ সালের ৪ মার্চ মাত্র ৬২ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন।

জেড এইচ/ এমএইচবি