• ঢাকা
  • বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০১৯, ১২:৩৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১৮, ২০১৯, ১২:৪০ পিএম

প্রতিবেদন জমা

চট্টগ্রামে বিস্ফোরণকে ঘিরে বাড়ছে রহস্য 

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা
চট্টগ্রামে বিস্ফোরণকে ঘিরে বাড়ছে রহস্য 

চট্টগ্রামে বিস্ফোরণকে ঘিরে বাড়ছে রহস্য। শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠে স্থানীয় জনমনে। গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের ভয়াবহতা কিভাবে এতটা হতে পারে? কিভাবে ভবনের নিচ তলার দুটি দেয়াল উপড়ে যেতে পারে। সময়ের সাথে প্রশ্ন বাড়ছিল। বাড়ছিল রহস্যও। 
কিন্তু সেই প্রশ্ন আরো জেঁকে বসেছে রোববার (১৭ নভেম্বর) সন্ধ্যায় কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিল) এর তদন্ত টিমের প্রতিবেদন প্রকাশের পর। প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাস লাইনে কোন লিকেজ নেই। রাইজারও অক্ষত। এমনকি রান্না ঘরে গ্যাস জমেও বিস্ফোরণ হয়নি। 

তাহলে বিস্ফোরণটা হলো কোথা থেকে। কিভাবে? সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্ফোরণে কুঞ্জমনি ভবনের নিচ তলার দুটি দেয়াল উপড়ে সড়কের অপরপ্রান্তে এসে পড়েছে। সড়কটি অন্তত ২০ ফুট চওড়া। এ অবস্থায় বিস্ফোরণটি কত যে শক্তিশালী ছিল তা সহজেই অনুমেয়। 

পার্শ্ববর্তী বড়ুয়া ভবনের নিচ তলায় জনতা ফার্মেসির মালিক যিশু নাথও বলছেন একই কথা। তিনি বলেন, আমি দোকানে আসছিলাম। ২০০ মিটার দূরে ছিলাম। হঠাৎ শুনি বিকট শব্দ। দোকানে এসে দেখি কুঞ্জমনি ভবনের দেয়াল আমার দোকানের ভেতর ঢুকে গেছে। সাথে দুজন নারীর নিথর দেহ। তবে তাদের পরিচয় জানি না। দেয়ালের চাপায় আরো কয়েকজন। তারা তখন নেই। 

তিনি বলেন, দুই ভবনের মাঝখানে সড়কটি অন্তত ২০ ফুট চওড়া। যা উপড়ে এসে ভবনের দেয়াল চলে আসে আমার দোকানের ভেতর। দেখে যেন মনে হবে শক্তিশালী কোন বোমার বিস্ফোরণের মতো। অথচ উদ্ধার কাজের পর দেখলাম ধসে পড়া দেয়াল ছাড়া বিস্ফোরণের আর কোনো আলামতই নেই। গ্যাস লাইনের রাইজারে একটু কালো দাগ পর্যন্ত পড়েনি। ফলে বিস্ফোরণ নিয়ে নানা আলোচনা জনসাধারণের মুখে। 

বিস্ফোরণের পর কোতোয়ালী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন প্রাথমিক ধারণা থেকে বলেছিলেন, গ্যাস লাইনের রাইজার বিস্ফোরণে ভবনের দেয়াল উপড়ে পড়ে ৭ জন নিহত ও ১০ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট পানি ঢালার কাজও করে। অথচ সেখানে কোন আগুন লাগেনি।

আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক পূর্ণচন্দ্র মূৎসদ্দী সাংবাদিকদের বলেন, গ্যাস লাইনের রাইজার বিস্ফোরণে দুর্ঘটনা ঘটে। তবে গ্যাস লাইনে লিকেজ থাকায় সিগারেটের আগুন থেকে বা ভবনের নিচ দিয়ে যাওয়া গ্যাস লাইনের মেরামত কাজ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। 
কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। ঘটনার পর কেজিডিসিএলের গঠিত চার সদস্যের তদন্ত কমিটি দিনভর তদন্ত শেষে রোববার সন্ধ্যায় প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে কমিটির প্রধান মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং ও সার্ভিসেস) প্রকৌশলী সারোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের তদন্তে গ্যাসের লাইনে কোনো লিকেজ পাওয়া যাইনি। গ্যাসের লাইন এবং রাইজার অক্ষত পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসার রান্নাঘরে চুলার সঙ্গে সংযোগ লাইনও অক্ষত পাওয়া গেছে। রান্নাঘরে গ্যাস জমে বিস্ফোরণ হলে রান্নাঘর ক্ষতিগ্রস্ত হত। কিন্তু সেটাও অক্ষত আছে। রান্নাঘরের পাশে আরেকটি কক্ষে বিস্ফোরণ হয়েছে, যার নিচে সেফটি ট্যাংক আছে। এতে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, গ্যাসের লাইন থেকে বিস্ফোরণ হয়নি।

কেজিডিসিএল গঠিত এ কমিটি প্রাথমিক তদন্ত শেষে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান, পরিচালক (অপারেশন) এবং কেজিডিসিএলর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে তদন্ত কমিটির কার্যক্রমও সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন- উপ-মহাব্যবস্থাপক (কোয়ালিটি কন্ট্রোল) প্রকৌশলী আহসান হাবিব, উপ-মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয়) প্রকৌশলী আবু জাহের এবং উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্লানিং) প্রকৌশলী শফিউল আলম।

এ নিয়ে রহস্য দানা বাধলেও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিস্ফোরণের ঘটনা নিশ্চিত হতে আরো দুটি তদন্ত টিম কাজ করছে। এরমধ্যে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ জেড এম শরীফ হোসেনকে প্রধান করে জেলা প্রশাসনের পাঁচ সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনা এবং ব্যাপক হতাহতের কারণ অনুসন্ধান করে কমিটিকে সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এছাড়া চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকেও তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। সিএমপির উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন বিশেষ শাখার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (পুলিশ সুপার পদমর্যাদা) মঞ্জুর মোরশেদ এবং কোতোয়ালী জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা।

নোবেল চাকমা জানিয়েছেন, কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান।

প্রসঙ্গত, রোববার (১৭ নভেম্বর) সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানার পাথরঘাটা ব্রিক ফিল্ড রোডে ধনা বড়ুয়ার কুঞ্জমনি ভবন নামে পাঁচতলা বাড়ির নিচতলায় বিস্ফোরণে দুটি দেওয়াল বিধ্বস্ত হয়। আশপাশের আরও কয়েকটি বাসা এবং দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণে নারী ও কিশোরসহ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। যাদের অধিকাংশই পথচারী। 

কেএসটি

আরও পড়ুন