• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২০, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৭, ২০১৯, ০৯:৩৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ডিসেম্বর ৭, ২০১৯, ০৯:৪৮ পিএম

সরকারের সাফল্য ম্লান করে দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

মেহ্দী আজাদ মাসুম 
সরকারের সাফল্য ম্লান করে দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
পেঁয়াজের দাম কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না -ছবি : বিবিসি বাংলা

মন্ত্রী-সচিব ব্যবসায়ীবান্ধব, জনমনে অসন্তোষ
সক্রিয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, নিষ্ক্রিয় মন্ত্রণালয়
● ৩৮ টাকার পেঁয়াজের বিক্রয়মূল্য ২৪০ টাকা

সর্বত্র আলোচনায় পেঁয়াজ। পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণহীন। পেঁয়াজে অসন্তোষ-ক্ষোভ সারা দেশজুড়ে। স্বাভাবিক অবস্থা থেকে পেঁয়াজের মূল্য ৬ গুণেরও বেশি। ৩৮ টাকা থেকে বেড়ে এখন ২৪০ টাকায় এসে থমকে আছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ অপ্রতুল। মন্ত্রী আর সচিবের মধ্যে নেই তেমন কোনও তৎপরতা। শুধু তাই নয়, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এই দুই কর্তাব্যক্তির সঙ্গে কথা বললে মনেই হবে না পেঁয়াজ নিয়ে দেশের মানুষের মাঝে কোনও ক্ষোভ বা অসন্তোষ আছে। মনেই হবে না কোথাও বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। মনে হবে সব কিছুই আছে স্বাভাবিক। 

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ অবশ্য এ অবস্থা নিয়ে কথা বলতে অপারগতা জানিয়েছেন। তবে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মন্ত্রিসভায় সফল্য-ব্যর্থতা নিরূপণ করার এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। আর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দাবি করেছেন, তার মন্ত্রণালয়ে তেমন কোনও স্থবিরতা নেই। স্বাভাবিকভাবেই চলছে সব। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হলো ব্যবসায়ী টিপু মুনশির হাতে। এর আগে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য প্রবীণ রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ। মন্ত্রী হিসেবে টিপু মুনশি দায়িত্ব পাওয়ার পর তার দক্ষতা মেলে ধরবেন— এমনটাই প্রত্যাশা ছিল নীতি-নির্ধারকদের। তবে বাস্তবে তা হয়নি। প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েও টিপু মুনশি তার যোগ্যতা বা মেধার বিকাশ ঘটাতে পারেননি। পারেননি তার মন্ত্রণালয়কে সরকারের উন্নয়নের ধারায় তাল মেলাতে। বলছেন, শুধুই শিখছেন। শিখতে কত সময় ব্যয় হবে তার কোনও পরিসংখ্যান নেই তার।  

চলতি বছর ‘কোরবানির চামড়া’ নিয়ে ব্যবসায়ীদের কারসাজির বিষয়ে টিপু মুনশি বলেছিলেন, ব্যবসায়ীরা আমাকে কথা দিয়ে তা রাখেননি। এর পর ভোগ্যপণ্য, শাক-সবজি, চাল, ডাল, তেল এবং সর্বশেষ পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কাছে ধরাশায়ী হন ব্যবসায়ীবান্ধব এই মন্ত্রী। অনেকেই মনে করছেন, নিবিড় সম্পর্কের কারণেই পেঁয়াজের বাজার অস্থির হওয়ার পরও এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থাই নিতে পারেননি তিনি। এসব নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করলেও এ নিয়ে মন্ত্রীর মাঝে দেখা যায়নি তেমন কোনও উদ্বেগ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রায় এক বছর হতে চলছে। এই স্বল্পসময়ে সরকারের ব্যর্থতার চেয়ে সাফল্যের পাল্লাই ভারী। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পাশাপাশি নিজ দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযানে তছনছ হয়ে গেছে অবৈধ পথে অঢেল অর্থে গড়ে তোলা নিজ দলীয় নেতা-কর্মীদের সাম্রাজ্য। এসব সাম্রাজ্যের সম্রাটদের ঠিকানা এখন কারাগারে। চলমান এ শুদ্ধি অভিযানে সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছ সরকার। এ ছাড়াও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবকল্যাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান সরকারকে এনে দিয়েছে সাফল্য। 

তবে সরকারের এসব সাফল্যে ব্যতিক্রম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। উন্নয়নের ছোয়া তো নয়ই, স্বাভাবিক কার্যক্রমের ছন্দও হারিয়ে ফেলেছে এ মন্ত্রণালয়। কেন যেন নিষ্ক্রিয়তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। এক পেঁয়াজ নিয়ে যেসময় গোটা দেশজুড়ে অসন্তোষ-ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক সেসময়েও মন্ত্রী-সচিবের মধ্যে কোনও উদ্বেগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। মন্ত্রণালয়ে বিরাজ করছে চরম স্থবিরতা। মন্ত্রী যাওবা একটু-আধটু গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন, সচিব তার ধারে-কাছেও নেই। বন্ধ করে রাখেন মন্ত্রণালয়ের তার কক্ষের দরজা। সাংবাদিকদের প্রশ্ন শুনলে ভোঁ-দৌড়ও দেন কখনও কখনও।

রাজধানীসহ সারাদেশে পেঁয়াজের দাম এখন আকাশছোঁয়া। ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়ার বাংলাদেশে ৩৮ টাকার পেঁয়াজ এক লাফে বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় পৌঁছায়। মিয়ানমারসহ কয়েকটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির মধ্যেই ৮০ এবং ৯০ টাকার পেঁয়াজ পৌঁছায় ১২০ টাকায়। এর পর আরও কয়েকটি ধাপে ধাপে বেড়ে ২৪০ টাকায় এসে থমকে আছে। পেঁয়াজের বাজার ঠিক রাখতে বিদেশ থেকে আমদানির সত্ত্বেও দাম কমেনি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

এসব নিয়ে সরকারের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ভেতরেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকের আলোচনায়ও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। অনেকেই চামড়ার কারসাজির পর পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার বিষয়ে মন্ত্রীর অদক্ষতাকে ইঙ্গিত করছেন। 

তবে মন্ত্রণালয়ের স্থবিরতা মানতে রাজি নন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি দাবি করেছেন, স্বাভাবিকভাবেই চলছে তার মন্ত্রণালয়। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এবার কোরবানির চামড়া নিয়ে যা ঘটেছে, তা ছিল তার অপরিপক্বতা। তিনি বলেছেন, পেঁয়াজ নিয়ে যা হয়েছে, তা কারসাজি নয়, ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় আমাদের দেশে এর প্রভাব পড়েছে। এর সুযোগ কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিয়েছেন।

‘চামড়া নিয়ে শিখছেন, পেঁয়াজ নিয়ে শিখছেন, শিখতে আর কত সময় লাগতে পারে’— এ প্রশ্নের জবাবে টিপু মুনশি বলেন, ‘মানুষের শেখার কোনও শেষ নেই। আমি ব্যবসায়ী ছিলাম। সেখান থেকে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী হয়েছি। আমার অভিজ্ঞতায় একটু ঘাটতি থাকতেই পারে। এখন অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। এটা বলা কি দোষের?’   

এই প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দৈনিক জাগরণকে বলেন, আমি সরকারের একজন মন্ত্রী। কোনও মন্ত্রণালয়ের স্থবিরতা বা সাফল্য নিয়ে মন্তব্য করা আমার শোভন নয়। মন্ত্রিসভায় সফল্য-ব্যর্থতা নিরূপণ করার এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন— মন্ত্রিসভায় কাকে সরকারে রাখবেন, কাকে রাখবেন না। প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত নেন, তা দেশের স্বার্থেই নেন।

এমএএম/এফসি

আরও পড়ুন