• ঢাকা
  • রবিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬
Bongosoft Ltd.
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২, ২০১৯, ০৩:০৩ পিএম

সাক্ষাৎকার

জনগণের টাকা রক্ষা করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব

জনগণের টাকা রক্ষা করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

 

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর। তিনি মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাজার থেকে বিতাড়ন করা হচ্ছে। তারা যেন টিকে থাকতে পারে, এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দৈনিক জাগরণের পক্ষে তার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন এমএ খালেক

জাগরণ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একজন নতুন অর্থমন্ত্রী পেতে যাচ্ছি। কেমন অর্থমন্ত্রী প্রত্যাশা করেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : অর্থমন্ত্রী কিন্তু শুধু একজন মন্ত্রী মাত্র নন, পুরো মন্ত্রিসভার মধ্যে তিনি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। অন্য সব মন্ত্রণালয়ের চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব বেশি। কারণ বলা যেতে পারে, অর্থনীতি রাজনীতিকেও নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি অর্থনীতি সমাজকেও নিয়ন্ত্রণ করে। আর সেজন্যই অর্থমন্ত্রীকে একদিকে যেমন প্রজ্ঞাসম্পন্ন হতে হয়, অন্যদিকে নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কঠোর হতে হয়। আমরা দেখতে পাই, আগের বিএনপি সরকার আমলের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের মধ্যে বেশ কিছুটা এই গুণ ছিল। তিনি দলীয় মনোনীত অর্থমন্ত্রী ছিলেন, দলের জন্য কাজ করতেন কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে তিনি দলের জন্য কাজ করতেন না। এরপর অর্থমন্ত্রী হিসেবে আসেন এসএএমএস কিবরিয়া সাহেব। তিনি ছিলেন আরও এক ডিগ্রি ওপরে। তিনি দলের ছোট ছোট বিষয় দেখতেন। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কখনই দলের স্বার্থ দেখেননি। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিন সব সময়ই জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কিবরিয়া সাহেব অত্যন্ত ভালো একজন অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তার আমলে আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি কখনই ৩ শতাংশ অতিক্রম করেনি। অর্থাৎ সবকিছু সাধারণ মানুষের সামর্থ্যরে মধ্যে রেখে তিনি অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ করেছেন। তার আমলে অর্থনীতি ছিল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। ফলে সেই সময় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তেমন একটা ছিল না বললেই চলে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী সম্পর্কে আমরা সে ধরনের কোনো কথা বলতে পারছি না। আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেব অত্যন্ত প-িত একজন ব্যক্তি। তিনি ভালো ছাত্র ছিলেন। সবই ঠিক আছে, কথা বলেন ভালো। কিন্তু এত দুর্বল অর্থমন্ত্রী তো দূরের কথা, এত দুর্বল মানুষ খুব কমই দেখা যায়। অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন এমন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত তিনি গ্রহণ করতে পারেননি। তার আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ডেকে নিয়ে ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে বসিয়ে সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) কমানোর ব্যবস্থা করেছেন। তার উদ্যোগে একই পরিবার থেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডে ২ জনের স্থলে ৪ জন পরিচালক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগে নিয়ম ছিল একজন পরিচালক অব্যাহতভাবে দুই টার্ম অর্থাৎ ৬ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। এখন তারা অব্যাহতভাবে ৯ বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। গণবিরোধী বা আমানতকারীর স্বার্থবিরোধী এমন আইন আগে কখনই প্রণীত হয়নি। হয়তো বলা হবে, এসব আইনি সংশোধনী জাতীয় সংসদ করেছে। কিন্তু এগুলোর উৎপত্তি তো অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেই হয়েছে। তিনি যেভাবে চান, সেভাবেই আইনি প্রস্তাবগুলো প্রণীত হয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত শেষ পর্যন্ত অবসর নিচ্ছেনÑ এটা বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য অত্যন্ত ভাগ্যের ব্যাপার। 
আগামীতে কে অর্থমন্ত্রী হবেন, এখনো তা জানি না। তবে আমরা চাইব, আগামীতে যিনিই অর্থমন্ত্রী হন তার ভাবমূর্তি অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং স্বচ্ছ থাকতে হবে। তাকে অবশ্যই জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে অটল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কঠোরতা থাকতে হবে। আগামীতে কে অর্থমন্ত্রী হবেন, সে সম্পর্কে অনেক কথাই শোনা যাচ্ছে। একবার শুনেছিলাম, ড. ফরাসউদ্দিন আগামীতে অর্থমন্ত্রী হতে পারেন। আমি মনে করি, ড. ফরাসউদ্দিনের মধ্যে অর্থমন্ত্রী হওয়ার মতো গুণাবলি অনেকটাই আছে। একসঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে বিধায় আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে চিনি এবং জানি। তিনি যদি দায়িত্ব পান তা হলে দলের স্বার্থ দেখবেন ঠিকই, কিন্তু কোথায় থামতে হয় তিনি তা জানেন। জনস্বার্থের সঙ্গে দলীয় স্বার্থকে তিনি কখনই মিলিয়ে ফেলবেন না। শুনেছিলাম তিনি নির্বাচন করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন না। এখন জানি না তিনি অর্থমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আছেন কিনা। আরও কারো কারো নাম কানে আসছে। কিন্তু তাদের কাউকেই কঠোরতম ব্যক্তিত্বের অধিকারী বলে মনে হয়নি। সেজন্যই আমি কিছুটা চিন্তিত। তবে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের মতো যোগ্য ব্যক্তি নেই এটা আমি মানতে রাজি নই। কিন্তু সেই যোগ্য লোকটিকে সরকার খুঁজে নিতে চায় কিনা, সেটাই বড় কথা। 

জাগরণ : আগামীতে যিনি অর্থমন্ত্রী হবেন তার জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি হতে পারে বলে মনে করেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : আমাদের দেশের সব সেক্টরেই আইনের শাসনের অভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে আর্থিক সেক্টরে আইনের শাসনের যে অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা পুনরুদ্ধার করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোয় আইন বলে কিচ্ছু নেই। একদিকে ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তারা ক্রমাগত মন্দ ঋণ সৃষ্টি করে চলেছেন; আবার একই সঙ্গে এমডিরা মিটিং করে সাফাই গাইছেন। আমি বিষয়টি দেখে অবাক। আমরাও তো একদিন এমডি ছিলাম। আমরা যারা ব্যাংক বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি তারা পেশাজীবী, কোনো দলের প্রতিনিধি নই। তারা প্রেস কনফারেন্স করে বললেন, আমরা ঋণ দিয়েছি। কিন্তু সেই ঋণ মন্দ ঋণ হলে আমরা কী করব? এটা কি কোনো যুক্তি হলো? ব্যাংক কর্মকর্তাদের যেমন ঋণদান করা একটি দায়িত্ব, তেমনি সেই ঋণ যথাসময়ে আদায় করাটাও তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। এমডিরা যদি বলেন, ঋণ দেয়ার পর তা মন্দ ঋণে পরিণত হলে আমরা কি করব, তাহলে সেই এমডিদের থাকার দরকারটা কী? এটা খুবই দুঃখজনক যে, ব্যাংকের মতো একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদেরও রাজনীতির মাঠে নামানো হয়েছে। 

জাগরণ : একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১০ বছরে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানাবেন কি?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : যে সেমিনারে এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়, সে সেমিনারে আমি নিজেও উপস্থিত ছিলাম। অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ ছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ ছিলেন। এক সময়কার অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান সাহেব ছিলেন। এ ধরনের আরও বেশ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিবিদ সেই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে ড. ফাহমিদা এ গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন। সেখানে আসলে বলতে চেষ্টা করা হয়েছে, আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরের মন্দ ঋণের পরিমাণ এখন ১ লাখ কোটি টাকা। তিনি দেখিয়েছেন, এই ১ লাখ কোটি টাকা মন্দ ঋণের মধ্যে ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আসলে সেটা ঋণ নয়। কারণ প্রচলিত আইন মেনে এসব ঋণ প্রদান করা হয়নি। ঋণ প্রদানের সময় যেভাবে যাচাই-বাছাই করতে হয়, এগুলোর ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। অর্থাৎ ঋণের আবরণে এসব টাকা আসলে লুট করা হয়েছে। যেমন- বেসিক ব্যাংকের যে ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে, এগুলোকে কি আপনি ঋণ বলবেন? বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান-এমডি মিলে ঋণদানের নামে এই টাকা আসলে তো লুটই করেছেন। এখন লুট শব্দটি ব্যবহার করা হবে কিনা, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। যিনি গবেষণা করেছেন, অর্থাৎ ড. ফাহমিদা অত্যন্ত ভালো ছাত্রী ছিলেন। তিনি অনেক দিন ধরে গবেষণায়রত। কীভাবে গবেষণা করতে হয় তিনি তা জানেন। কাজেই এ ধরনের গবেষণাপত্রের বক্তব্যকে অবজ্ঞা না করে বরং কীভাবে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো যায়, আমাদের সেই পন্থা খুঁজে বের করা প্রয়োজন। কিন্তু সেটা না করে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস বাংলাদেশ এ গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যের প্রতিবাদ করেছে। এটা কাম্য নয়। 

জাগরণ : নতুন যে অর্থমন্ত্রী আসবেন তার জন্য ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ কতটা কঠিন হবে বলে মনে করেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : দু’ভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে। প্রথমত, স্থানীয় ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ আহরণ এবং দ্বিতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের উদ্যোগ গ্রহণ। স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এজন্য ব্যাংকিং সেক্টরকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিতে পারেন। বাইরে থেকে বিনিয়োগকারীদের দেশে নিয়ে আসার মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের এমন একটি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, যেখানে বাইরে থেকে বিনিয়োগ আহরণ করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের জন্য বেশকিছু কাজ করতে হবে। ইতোমধ্যেই বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে অনেক কিছু করেছে। এর মধ্যে সবার আগে উল্লেখ করতে হয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়টি। সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকগুলো অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। শিল্পায়ন দ্রুততর করার জন্য এগুলো বিশেষ অবদান রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগকারীরা একই জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি অর্থাৎ শিল্প স্থাপনের মতো সমস্ত উপকরণ একই সঙ্গে পাবেন। আমাদের দেশে শিল্প স্থাপনের জন্য উপযুক্ত জমির প্রাপ্যতা একটি বড় সমস্যা। কয়েক বছর আগে জাপানি কয়েক উদ্যোক্তা বাংলাদেশে শিল্প স্থাপনের জন্য এসেও উপযুক্ত জমির অভাবে ফিরে যেতে বাধ্য হন। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো স্থাপিত হলে শিল্প স্থাপনের মতো উপযুক্ত জমির অভাব অনেকটাই দূর হবে। সরকার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের কাজ করে চলেছে। এটা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক খাত। আগামী সরকার আমলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বাস্তবায়নে আরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সুবিধা সম্পর্কে অবহিত করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে হবে। আমরা যদি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এখানে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে স্থানীয়ভাবে পুঁজি জোগানোর ওপর চাপ কমবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের সুবিধা গ্রহণ করে লাভবান হতে পারবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার জন্য সম্ভাব্য অর্থমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ তো প্রয়োজন হবেই; পাশাপাশি ব্যুরোক্রেসিকেও সঠিকভাবে সাপোর্ট দিতে হবে। বিশেষ করে বিডা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যারা বিনিয়োগ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তাদের সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। 
অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বেশকিছু কাজ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন সাধন করা না গেলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খুব একটা সুবিধা হবে বলে মনে হয় না। মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী সরকারে থেকেও সম্প্রতি বলেছেন, এখন আর জোড়াতালি দিয়ে ব্যাংক সংস্কার করা যাবে না। আমাদের বড় রকমের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। এ কথাটি যদি সত্যি তাদের হৃদয়ে প্রবেশ করে থাকে এবং সে অনুযায়ী তারা যদি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তাহলে তো ভালো কথা। যদি সত্যি ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য কার্যকর সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেয়া না হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ আহরণের ক্ষেত্রে দুর্দিন নেমে আসতে পারে।
 
জাগরণ : কয়েক বছর আগে যখন নতুন করে ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয় তখন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। সেই ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি ভালো করছে না। এরপরও নতুন করে ব্যাংক স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হবে বলে শোনা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন কি?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : সরকার যে সব ব্যাপারে জ্ঞানসম্পন্ন হবে, তা নাও হতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক রাজনীতিবিদের কিছু সাধারণ জ্ঞান নিশ্চয়ই থাকতে হবে। আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারতের লোকসংখ্যা প্রায় ১৩০ কোটি। তাদের সেখানে বড় ব্যাংকের সংখ্যা ১৮টির মতো। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৬০টির মতো ব্যাংক স্থাপিত হয়েছে। যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে ফেভার করতে চান, তাহলে তাকে একটি ভালো কন্ট্রাক্ট দেন। তাকে রাস্তাঘাট বানাতে দেন। চাইলে সরকার কোনো ব্যক্তিকে নানাভাবে সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু ব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে কেন একজনকে সহায়তা করা হবে? ব্যাংক তো সাধারণ মানুষের আমানত নিয়ে কাজ করে। কাজেই ব্যাংক নিয়ে কেন এই খেলা? জনগণের টাকা নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া কোনো সরকারেরই ঠিক নয়। জনগণের টাকা রক্ষা করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। 

জাগরণ : আপনি প্রায়ই আয়বৈষম্য নিয়ে কথা বলেন। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অসামান্য উন্নতি অর্জন করেছে। কিন্তু আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ার কারণেই কি আয়বৈষম্য বাড়ছে?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : কর্মসংস্থান একটা ডিসটিংক্ট ব্যাপার। কিন্তু আয়ের অসঙ্গতি বা আয়বৈষম্য এর সঙ্গে প্রবৃদ্ধির সম্পর্কটা অন্য জায়গায়। দেখতে হবে প্রবৃদ্ধিটা কার হচ্ছে? যদি উচ্চ মহলে অর্থাৎ কোটিপতিদের প্রবৃদ্ধি হয়, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধিতে আয়বৈষম্য বাড়তে পারে। কাজেই প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সেই প্রবৃদ্ধি যাতে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের হয় এবং একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে সেটা নেই। আমাদের দেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তা সমাজের বিত্তবানদের। সেখানে দরিদ্র মানুষের কোনো অংশগ্রহণ নেই। এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও সেখানে বঞ্চিত হচ্ছে। কাজেই প্রবৃদ্ধি হলেও সমাজে আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবৃদ্ধিতে সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। সমাজে যারা ছোট ছোট ব্যবসায়-বাণিজ্য করতে পারেন, বড়রা তাদের বাজার থেকে আউট করে দিচ্ছে। যারা সমাজে একেবারে বিত্তহীন, তাদের অনেকেই রোজার দিনে মুড়ি ভেজে বাজারে বিক্রি করে দুপয়সা আয় করে। কিন্তু এখন বড় বড় কোম্পানি বাজারে মুড়ি বিক্রি করার মাধ্যমে সেই দরিদ্র মানুষগুলোকে বাজার থেকে আউট করে দিচ্ছে। কাজেই বড় কোম্পানিকে সুযোগ দেবেন কিন্তু যারা বাজারে একেবারেই ছোট বা ব্যক্তিপর্যায়ে অবস্থান করে, তাদের নানাভাবে আর্থিক প্রণোদনা দেয়া যেতে পারেÑ যাতে তারা বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। 

জাগরণ : মুদ্রা পাচার আমাদের দেশের একটি জটিল সমস্যা। আগামী সরকার কীভাবে এ সমস্যা মোকাবেলা করতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : সরকার সব সময় সংস্থা বা ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে কাজ করে। কারণ কোনো কাজ করার জন্য যে অভিজ্ঞতা এবং কলাকৌশল প্রয়োজন হয়, রাজনীতিবিদদের তা থাকে না। যারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেন, তারা এসব ব্যাপারে অভিজ্ঞ হন। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভালো কর্মকর্তা তৈরির জন্য সহায়তা করা। মুদ্রা পাচার বা এ ধরনের অসঙ্গতি দেখার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হচ্ছে ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। আগে আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো সংস্থা ছিল না। ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর থাকাকালে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এটি বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। একে আরও পরিণত করতে হবে। দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের এ ইউনিটে নিয়োগদানের মাধ্যমে এর কর্মক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। একই সঙ্গে এদের বিদেশে পাঠিয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

জাগরণ : বর্তমানে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নির্বাচনের পর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা আছে কি?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : আমি মনে করি, নির্বাচনের পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই থাকবে। কারণ বাজারে চাহিদা ও জোগানের যে অবস্থা, তাতে মনে হচ্ছে আগামীতে মূল্যস্ফীতি তেমন একটা বৃদ্ধির আশঙ্কা নেই। 

জাগরণ : এ বছর কৃষির উৎপাদন বেশ ভালো হয়েছে। চালের উৎপাদন ৩ কোটি ৬২ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত ভালো একটি সংবাদ। কিন্তু কিছু প্রাসঙ্গিকতা আছে, যা আমরা বলতে বলতে হয়রান হয়ে গেছি। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শুনছে না। কৃষকশ্রেণি উদয়াস্ত পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করেছে। আমরা হয়তো ১৬ কোটি মানুষ এ ফসল খেয়ে বেঁচে থাকব। কিন্তু যারা এ ফসল উৎপাদন করল, তারা কি সঠিক দাম পাবে? কৃষক যদি উৎপাদিত পণ্যের সঠিক দাম না পায়, তাহলে ভবিষ্যতে তারা উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারেন। কাজেই কৃষকের জন্য কিছু প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা আগামীতে বর্ধিত উৎপাদনের আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে। 
  
 

Islami Bank