• ঢাকা
  • সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০১৯, ০৭:১৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ১৮, ২০১৯, ০৭:২১ পিএম

ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারে শিশুরা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়

আছিয়া পারভীন আলী শম্পা
ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারে শিশুরা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়

আপনার বাচ্চা  আমার চেয়ে  মোবাইলটিভালো বোঝে এমন গল্প করতে যদি আপনার খুব গর্ব হয় অথবা নিজেকে খুব আধুনিক মা হিসাবে সাব্যস্ত করার জন্য যদি বলেন আমার বাচ্চা “কার্টুন” না দেখে খেতেই চায়না । তবে,আপনাকেই বলছি ,নিজের সন্তানের ক্ষতি নিজেই করছেন। হয়তো নিজের দায়িত্ব বা ঝামেলা এড়ানোর জন্য কিংবা আপনার প্রিয় সিরিয়াল যাতে মিস না হয়ে যায়,সে কারনে নিজের বাচ্চাকে ব্যস্ত রাখার সবচেয়ে সহজ এবং সস্তা উপায় ইতিমধ্যে আপনি আপনার সন্তানের অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছেন । হয়তো নিজের দায় এড়ানোর জন্য বলবেন আমি তো বাচ্চাকে মোবাইল দেইনা। তবে,একবার ভাবুন তো আপনি যদি আপনার বাচ্চার  হাতে মোবাইল বা অন্যকোন ডিভাইস না দেন,তাহলে এই বয়সে একটা শিশুর ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের প্রতি এতটা আগ্রহ থাকার কথা নয় ।

মনে রাখবেন,আমরা আমাদের ঘরেরপরিবেশ কেমন রেখেছি,তার উপর নির্ভর করবে আমাদের সন্তান পরবর্তীতে কতটা  মানবীয় গুন সম্পন্ন সফল বা কতটা ব্যর্থ একজন মানুষ হবে ।

ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের ফলে শিশুদের যে ক্ষতি গুলো হয় ঘুমের সমস্যা

যেসব শিশুরা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস এর প্রতি আসক্ত তারা ঘুমের সমস্যাতে খুব ছোট বেলা থেকে ভুগতে থাকে । রাত গভীর হলেও তাদের চোখে ঘুম আসবে না । অর্থাৎ জীবনের প্রথম থেকেই তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিয়ম গড়ে ওঠে যা পরবর্তীতে বাজে অভ্যাসে পরিণত হয় । একটি শিশুর শারীরিক এবং মানুষিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম খুবই গুরুত্বপূর্ণ । যদি শিশুকাল থেকেই পর্যাপ্ত ঘুম না হয়,তবে তা পরবর্তী জীবনে নানা জটিলটা তৈরি করেএবং ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে কারন ছাড়া দেরি করে ঘুমোতে যাওয়া এবং দেরি করে ঘুম  থেকে ওঠা  স্থায়ি বদভ্যাসে পরিণত হয় । 

শিশুদের মানসিক সমস্যা

যেসব শিশুরা স্ক্রীনের সামনে বেশি সময় কাটায় তারা খুব অল্পতে উত্তেজিত হয়,মেজাজ,রাগ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণে তাদের সমস্যা হয়।বিভিন্ন গবেষণায় ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের সাথে শিশুদের মানসিক পরিবর্তনের স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া গেছে। দেখা গেছে যে,ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে শিশুদের মধ্যে হতাশা,উদ্বেগ,বিষণ্ণতা,এ ডিএইচ ডি (এটেনশনডেফিসিট হাইপারএক্টিভিটি ডিসঅর্ডার),অর্থাৎ কোন কাজে মনোযোগ দেবার যে ক্ষমটা সেটা থাকেনা । সবসময় অস্থির ভাব,আত্মহত্যা প্রবনতা,এই ধরণের সমস্যাগুলোর সম্পর্ক পাওয়া যায়,যা শিশুকাল থেকে শুরু হয়ে সারাজীবন অবধি থাকতে পারে।

যেসব শিশুরা দিনে ২ ঘন্টার বেশি ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে সেসব শিশুদের মধ্যে এই সমস্যাগুলো তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে ।

শারীরিক সমস্যা

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে,শিশুদের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের সময় বৃদ্ধির সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা থাকে যেমনঃ ইনসুলিন রেসিস্টান্স,স্থুলতা,পেটের মেদ বৃদ্ধিএবং ডায়াবেটিস রোগ সহ  অন্যান্য জটিলতা। ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের ফলে শিশুদের শারীরিক পরিশ্রম একদম কমে যায়,তাই এই ধরনের জটিলতায় ভোগা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।

চোখের সমস্যা

শিশুরা যত বেশী সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকবে,তত বেশী তাদের বিভিন্ন রকম চোখের সমস্যা দেখা দেবে ।  শিশুদের চোখ পরীক্ষার সময় চোখ শুকিয়ে যাওয়া বা( ড্রাই আইস),চোখের পলক ফেলার পরিবর্তন,দূরের বা কাছের জিনিস দেখতে সমস্যা  এবং নানারকম চোখের  জটিল সমস্যা ।এই ধরণের সমস্যার কারন হিসাবে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকাকে দায়ী করা হয় ।

ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ফিল্ডএক্সপসার

বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগএর কারন হল ইলেক্টোম্যাগনেটিক ফিল্ড এক্সপোজার ।এই ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হয় ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসগুলো ব্যবহারের ফলে । ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের সময় উৎপন্ন ইলেক্টোম্যাগনেটিক ফিল্ড আমাদের মস্তিস্কের জন্য খুবই ক্ষতিকর।তবে,শিশুদের জন্য তা আরও ভয়ানক ।ইলেক্ট্রম্যাগনেটিকফিল্ড এক্সপোজারের ফলে শিশুদের শারীরিক এবং মানসিক উভয় ধরনের জটিলতা হতে পারে । বিশেষ করেশিশুদের মস্তিস্কের বিকাশ,কোনকিছু মনে রাখতে পারার ক্ষমতা,মানসিক বিকাশ,আচরণগত সমস্যা সহ অন্যান্য সমস্যায় ভোগার সম্ভাবনা অনেক গুন বেড়ে যায় ।

ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের প্রতি আসক্তি কমাতে যা করতে পারেন।

  • ঘুমাতে যাবার আগে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার যতটা সম্ভব কম করুন
  • বাচ্চাদের রুমে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস এর ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন ।
  • শিশুদের সামনে পারত পক্ষে মোবাইল ব্যবহার এবং টিভি দেখবেন না ।
  • শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর নজর রাখুন ।
  • ঘুমোতে যাবার আগে মোবাইল  মাথার কাছে রাখবেন না ।
  • মোবাইল বা ভিডিও গেমসের লোভ দেখিয়ে খাবার খাওয়াতে যাবেন না।মনে রাখবেন,ক্ষুধা পেলে সে নিজ থেকেই খাবার খেতে চাইবে । আর,ছোটদের স্টমাকের আকার একটা মটর দানার মত। তাই, জোর করে অতিরিক্ত খাওয়ানোর প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকুন।
  • শারীরিক পরিশ্রম হয় শিশুদের এমন খেলার প্রতি উৎসাহ দিন।
  • ঘরের ছোট ছোট কাজে শিশুদের যুক্ত করুন।
  • শিশুদের সামনে বই পড়ুন। তাদেরকে বিভিন্ন সময় গল্পের বই পড়ে শোনান এতে তাদের কল্পনার জগত উদ্ভাসিত হবে।
  • শিশুদের প্রতি আরো বেশি মনোযোগ দিন এবং ভাল বাসুন।

একজন সচেতন পিতামাতা হিসাবে ফোনের ব্যবহার শিশুদের জন্য ক্ষতিকর এই বিষয়টি যদি এখনো মানতে কষ্ট হয় তবুও আশা করবো বিষয়টি  নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করবেন।আপনার শিশুর মেজাজ মর্জি,মনোযোগ,উদ্বেগ,অস্থিরতা,অতিরিক্ত চঞ্চলতা প্রভৃতি অবস্থা যে ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত এ বিষয়টি একেবারে অগ্রাহ্য করবেন না । নিজের শিশুর প্রতি মনোযোগ দিন। দেখবেন উপরের অনেক বিষয়য়ের সাথে সাদৃশ্য পেয়ে যাবেন । খেয়াল রাখুন আপনারশিশু যেনইলেক্ট্রনিক ডিভাইস এর প্রতি এতোটা আসক্ত না হয় যে,স্বাভাবিক সামাজিক সম্পর্কের প্রতি উদাসিন হয়ে ওঠে ।

যদিও আমি একজন পুষ্টিবিদ, তবে বর্তমানে আমার কাছে শিশুদের পুষ্টির অবস্থার চেয়ে উদ্বেগজনক হল শিশুদের ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের প্রতি প্রবল আসক্তি। আর এর জন্য অবশ্যই পরিবারের আবহ বা পিতামাতা দায়ী।

লেখক : পুষ্টিবিদ, বেক্সিমকো ফার্মা লিমিটেড।