• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০১৯, ০৮:০৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ৭, ২০১৯, ০৮:০৪ পিএম

এ সপ্তাহের গল্প

দ্বৈত সত্ত্বা

লাবণ্য সায়মা রহমান
দ্বৈত সত্ত্বা

নীনা খুব সুশ্রী  মেয়ে। ওর ঘন কালো মসৃন ত্বক, সরু নাক, হরিণটানা দুটো চোখ আর ঝকঝকে দাঁতের হাসি দেখলে যে কোনো মানুষের চোখ থমকে যায় ওর দিকে। দোহারা শরীরের গড়ন, উচ্চতাটাও সুন্দর, ওকে কেউ বেটে বলতে পারে না, আবার খুব যে লম্বা সে তেমনও নয়। পিঠ ছড়িয়ে কোমর অব্দি কোঁকড়ানো বেশিটা কালো আর খানিকটা লালচে চুল ওর রুপে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।

কালো গায়ের রং তাই আবার বাঙ্গালী সমাজের কেউ কেউ ওকে সুন্দর বলতে কার্পণ্য করে, বলে মিষ্টি মেয়ে। কিন্তু দেহের গড়ন, মুখশ্রী এবং সুমিষ্ট কন্ঠস্বর সবমিলিয়ে নীনা একজন তিলোত্তমা। দেখার যার চোখ আছে সে মানুষ ওই রুপে পাগলপারা হতে বাধ্য। সে থাক না হয় রুপের কথা তবে যে গুন ওর আছে সে গুনের কাছে নতজানু হবে যে কেউ। 

তবু কোথাও কি যেনো একটা ঘাটতি আছে, সে শুধু নীনা নিজে জানে। ওর ভেতরকার মানুষটাকে আর কেই বা চিনবে ওর নিজের মতো করে? কৈশর জীবনে নীনা বুঝতে পারতো না বিষয়টা, কিন্তু তারুন্যে পৌঁছতে পৌঁছতে নীনা অনেকটা বুঝে গেছে তার কিসে সমস্যা। যে কথা বলা যায় না কিংবা কাউকে বোঝানো যাবে না এমন কিছু। কি সেই কথা? 

পর্ব :২ 

সে কথা এক অদ্ভুত কথা, নীনা জানে তবু এ নিয়ে বিচলিত হয় না সে কখনো। এই যে কারো কাছে বিশেষ কিছু সুন্দর জিনিস দেখলেই মাথাটা তার ধাই করে গরম হয়ে যায়, গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, ঈর্ষা হয় যে সেরকম কিছু নয় তবে চিন্তার মধ্যে সারাক্ষন একটা বিষয় ঘুরে ফিরে আসে যে জিনিসটা পেতেই হবে তার। এবং সুযোগ বুঝে চুপচাপ সেটা সরিয়ে ফেলে নীনা সকলের অজান্তে সুনিপুনভাবে।

অন্যের কাছ থেকে কৌশলে আত্মস্থ করা জিনিসটা নিজের জিনিস ভেবে ব্যবহার করতে কোনো রকম অনুতাপ বোধ করেনা নীনা। এমনিভাবে ওর খুব কাছের বন্ধুদের বিশেষ শখের কিছু জিনিস খোয়া যায় হঠাৎ কিন্তু কেউ কখনো নীনাকে সন্দেহ করতেই পারেনা। কারন বন্ধু হিসেবে সে অতুল্য, ওকে নিয়ে এ কথা কেউ  দুঃস্বপ্নেও ভাববে না। 

একবার নীনার বান্ধবীর বড় বোন শর্মিষ্ঠার একজোড়া মুনষ্টোনের কানের দুল দেখে এমন কাতর হয়ে গেছিলো নীনা আর তর সইছিলো না, কারনে অকারনে শর্মিষ্ঠার রুমে ঢুকে কিছু সময়ের মধ্যে সরিয়ে নিয়েছিলো দুলজোড়া। শর্মিষ্ঠা বুঝে গিয়েছিলো এটা নীনার কাজ এবং সে একজন ক্লিপটোম্যানিয়াক তবু প্রমানের অভাবে কাউকে বিশ্বাস করাতে পারেনি সে কথা।  
পর্ব: ৩ 

যেহেতু নীনা স্বচ্ছল পরিবারের মেয়ে তাই কখনো কোনো কিছু পাবার জন্যে তাকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। তবু নীনা বোঝে তার কেনাকাটার প্রতি ঝোকটা বড্ড বেশি বেশি। এটা দিন দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে সে টের পায় কিন্তু সামাল দিতে পারে না। নিজের টাকা শেষ করে বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে হলেও কিনে ফেলে কতো অপ্রয়োজনীয় জিনিস। তবু নীনাকে সবাই সেই মেয়েদের দলেই ফেলে, আরে ওই তো ওই মেয়েমানুষ কেনাকাটা করবেই এ আর এমনকি? 

এই যে নিজেকে সামাল দিতে না পারার প্রবনতা, এটা নীনা কিছুটা বোঝা আবার বোঝেও না। একটা ইমপালস্ কোথা থেকে এসে মাথায় ভর করে, ব্যাখা পায় না নীনা। কেনো এতো তীব্র চাওয়া হয়ে দাঁড়ায় তার সামর্থ্যের অধিক কিছু? বেশি ভাবতে গেলে সব গুবলেট পাকিয়ে যায়, ভাবনাগুলো তাই দূরে সরিয়ে রাখে নীনা।

নীনা সত্যি অনন্যা। যেমনি ভালো লেখা পড়ায় তেমনি নাচ, গানে পারদর্শী এমনকি রান্নার প্রতিও এতোটা আগ্রহী যে তার অন্যসব ত্রুটিগুলো কারো দৃষ্টিগোচর হয় না। ওই যে তার বন্ধু বাৎসল্য সেও সকলকে মুগ্ধ করে, কখনো কোনো বন্ধুর আর্থিক সমস্যায় এগিয়ে আসে নীনা সবার আগে। তবু কোথায় যেনো কিসের একটা ছন্দপতন ঘটে যেতে থাকে নীনার ভেতরে চুপিসারে। 
পর্ব : ৪ 

নীনা রুপসী এবং বহু মানবিক গুন সম্পন্ন মানুষ তাকে ভালোবাসতে চাইবে অনেকে, সেটাই স্বাভাবিক। নীনার ভাবনাটা এমন যাকে সঙ্গী হিসেবে সে পেতে চায় সে হবে সুদর্শন আর উদার মনের। সেজন্যে অন্য বিষয়ে ছাড় দিতে কার্পণ্য নেই নীনার। মনের মধ্যে এঁকে রাখা ছবিটা কি হুবুহু মেলে জীবনে? মেলেনা। তবু মানুষ তাঁর কল্পনার কাছাকাছি পৌঁছতে চায়।

নীনার জীবনে প্রেম আসে হঠাৎ মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো করে প্রেম আসে। তারই অলক্ষ্যে প্রেম আসে, ভাসিয়ে নিয়ে যেতে সে আসে। আনন্দ, উচ্ছ্বাস, শিহরন আর অচেনা সব অনুভূতিরা একে একে জড়ো হতে থাকে নীনার মনের মধ্যে।  সে মানুষটাকে ভেবে ভেবে সারাবেলা পার হয়ে যায়। নীনা জানেনা সে কখন ক্লাসে কখন বাড়িতে কখন বন্ধুদের আড্ডায় আর কখন শপিংমলে। সবই করছে কিন্তু নিজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায় না নীনা। 

ভালোবাসার আগ্রাসন বড্ড কঠিন আগ্রাসন, ও থেকে মুক্তি মেলেনা সহজে। আকুল পরাণ খোঁজে কেবল সে মানুষটাকেই, পাশে পেতে চায় নিবিড় করে, কতো কথা বলতে সাধ হয় যখন তখন, ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়। সুখের কথা হচ্ছে নীনার ভালোবাসার মানুষটাও তেমনি ব্যাকুল ওকে পাবার জন্যে। প্রত্যয় হাসান অশ্রু নামের একজন আপাদমস্তক প্রেমিক এবং সুদর্শন যুবকের প্রেমে নিমগ্ন হয়ে থাকে নীনা।
পর্ব: ৫ 

প্রত্যয় হাসান অশ্রু একজন সফল কর্পোরেট, ঢাকার একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর এইচ আর হেড হিসেবে কাজ করছে। বয়সের তুলনায় অনেক ধাপ এগিয়ে আছে সে। নীনার এক বন্ধুর বাড়িতে দেখা হয় ওদের, সেই থেকে শুরু এবং তারপর বিরতিহীন কথোপকথন, যখন তখন দেখা করতে যাওয়া এসব চলতেই থাকে। প্রেমের স্রোত যেমনি করে বয়ে যায় তার আপন ধারায় তেমনি ভাসে ওরা দুজন সে স্রোতে।

নীনার অনার্স পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়, অশ্রুর সঙ্গে বিয়েতে  ওর পরিবার থেকে কোনে আপত্তি থাকেনা, কারন বিয়ের বাজারে সে সুযোগ্য পাত্র। মহা আডম্বরে বিয়ে সম্পন্ন হয় ওদের। মধুচন্দ্রিমাক্ষন কাটতে থাকে ওদের টানা কবছর, এর মধ্যে নীনা মা হয়, নিটোল নামের এক কণ্যা শিশুকে নিয়ে  কেটে যায় ব্যস্ত সময়। অশ্রুর কাজের চাপ বাড়তেই থাকে আর ওদের দুজনের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। প্রেমের ডিঙ্গা তখন উজান বেয়ে ক্রমশ ভাটির দিকে বইতে থাকে।

নিটোল বড় হতে থাকে, নীনার ব্যস্ততা কমতে থাকে একটু একটু করে। অশ্রু দেশের বাইরে ট্যুরে থাকে বছরে কয়েকবার এবং দেশে থাকলেও মিটিং নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকে যে একান্তে নীনার সাথে কথাও হয়না আজকাল। ঢাকায় দুটো ফ্ল্যাট হয় ওদের, অশ্রু অফিস থেকে গাড়ী পায়, নীনা আর নিটোলের জন্য আরেকটা গাড়ী বরাদ্দ থাকে।এমন ভরপুর সংসারেও বিষন্ন লাগতে থাকে নীনার যেনো অন্য কিছু চাই, অন্যরকম এক্সাইমেন্ট।
পর্ব: ৬

নিসঙ্গতাই নীনার বিষন্নতার অন্যতম কারন হয়ে দাঁড়ায় কি? সমস্ত অস্তিত্বকে গ্রাস করে নিতে থাকে অদ্ভুত অবসন্নতা। সাইকিয়াট্রিষ্টের কাছে যাওয়া শুরু করে নীনা, ওষুধ নেবার আগে স্পিচ থেরাপি নিতে থাকে, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঘুরতে যায় নীনা তবে একাই যায় কেননা কর্মব্যস্ত স্বামী বা কলেজ পড়ুয়া কণ্যার পক্ষে তাকে আলাদা করে সময় দেবার অবকাশ নেই। 

সমুদ্র প্রিয় বলে কক্সবাজারে চলে যায় নীনা পুরো এক সপ্তাহের জন্য, সকল বন্দোবস্ত অবশ্য করে দেয় অশ্রু। ঘুরতে ঘুরতে দেখা হয়ে যায় তারই সমবয়সী সুঠামদেহী সুদর্শন অন্তিমের সঙ্গে। অন্তিম ব্যানার্জি ফটোগ্রাফার, অবিবাহিত এবং আকর্ষনীয় পুরুষ। নিসর্গের কাছে গিয়ে মনটা ক্যামন উড়ু উড়ু হয়ে যায় কোনো পিছুটান মনে রাখতে ইচ্ছে হয় না নীনার। সাগরের ঢেউয়ের মতোন অন্তিমের সঙ্গে তার উথাল পাথাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সে সম্পর্ক ঢাকা অব্দি গড়ায়।

উৎফুল্ল নীনাকে দেখে পরিবারের সবাই স্বস্তি পায় কিন্তু নীনার ভেতরে চলতে থাকে লুকোচুরি খেলা। এক মনে অন্তিমের ফিয়াসেঁ আবার আরেক মনে অশ্রুর স্ত্রী সে। এমন দ্বিমুখী সত্ত্বা নিয়ে কোনো অনুতাপ বোধ হয় না নীনার। নিজে নিজে কিছু উত্তর খুঁজে নেয়, তার মনে হয় যে মানুষ মাত্রই কয়েকটা সত্ত্বা ধারন করে। প্রতিনিয়ত মানুষ কতোই না ছল করে চলে সে পুরুষ কিংবা মহিলা হোক। নীনা বোধ করে সে যে ভালো আছে এটাই বড় কথা তার জন্যে।

পর্ব: ৭ 

নির্ঘুম রাত কাটতে থাকে নীনার, কথারাও যেনো ফুরাতে চায় না, কেনাকাটায় অনেক বেশি ব্যয় করা শুরু করেছে আবার, সবকিছুই কেমন নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে যেতে থাকে নীনার। অশ্রু কি করে খেয়াল করে বিষয়টা এবং নীনাকে ফের ডাক্তার দেখাতে বলে। নীনা তার সাইকিয়াট্রিষ্টের কাছে সব কথা স্বীকার করে, অন্তিমের কথাও জানায়। এবার তার চিকিৎসক জানিয়ে দেয় যে নীনা বাইপোলার ডিজইর্ডার এর রোগী। লিথিয়াম নামের একটা ওষুধ খেতে হবে তাকে স্বাভাবিক হবার জন্য। 

নীনা মনে মনে অবাক হয়ে ভাবে কেনো তাকে সমাজের নিয়মবদ্ধ মানুষ হতেই হবে? আদতে কি মানুষ শৃঙখলিত থাকতে চায়? সভ্যতা কিংবা সমাজবদ্ধ হয়ে চলার জন্য ক্রমশ মানুষ নিজেকে অভিযোজিত করেছে নানান ভাবে। এসব কি অবদমন নয়? কেবল রীতি মেনে চলাটাই সুস্থতা?   নীনার নিজেকে একটুও অসুস্থ মনে হয়না। বাইপোলার অসুখটাও সে মানতে রাজি নয়। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান নীনার এমন বেসামাল আচরনকে অস্বাভাবিকই বিবেচনা করে। 

নীনা ভাবে বহুগামিতা কেবল মানুষের মধ্যে কেনো প্রাণীকূলে বহু প্রানীর মধ্যেই আছে, সে সব প্রানীরাও কি বাইপোলার? কিংবা আপাত মনোগ্যামী আর গোপনে গোপনে বহু সম্পর্কে সম্পর্কিত মানুষটাকে কি সংজ্ঞায় ফেলা যায়? এসব ভেবে তলিয়ে যেতে থাকে নীনা, বোঝে সে এ এক অমীমাংসিত বিষয়। তবু তার সন্তান নিটোলের জন্য আর স্বামী অশ্রুর প্রতি গভীর মমতা থেকে নীনা শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজেকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে তার চিকিৎসা দরকার। অন্তিম তার জীবনের সুখস্মৃতিই হয়ে রয়। লিথিয়াম খেতে খেতে নীনা নিজেকে হারিয়ে ফেলে মনে হয় সে এক জড় পদার্থ, ঘুম খাওয়া সবকিছু মেপেই হয়, সামাজিকতা চলে নিয়ম মাফিক তবু ভেতরে সে বোধ করে শোক তাপহীন একটা যন্ত্র। এই কি স্বাভাবিক জীবন কিংবা সামাজিক জীব হয়ে বেঁচে থাকা ?