• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ, ২০২১, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৪, ২০২১, ০৪:৩৪ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২৪, ২০২১, ০৪:৩৪ পিএম

সুভাষ বসু: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবিস্মরণীয় নাম

সুভাষ বসু: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবিস্মরণীয় নাম

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের আপোষহীন ধারার প্রতিনিধিত্বকারী নেতা সুভাষ চন্দ্র বসুর ১২৫তম জন্মদিন চলে গেলো গতকাল (২৩ জানুয়ারি)। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি ছিলেন এক মহৎ ও উজ্জ্বল চরিত্রের অধিকারী,  নেতাজি নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা, তীব্র প্রতিকুলতা, জেল-জুলুম, কংগ্রেসের অভ্যন্তরে নানা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, প্রভাবশালী নেতাদের তীব্র বিরোধিতার মধ্যে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি অবিচল ছিলেন এবং পুরো জীবন এই স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করে গেছেন।

১৮৯৭ সালে ২৩ জানুয়ারি ওড়িষ্যার কটক শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলের ওড়িষ্যা শহরের নাম করা আইনজীবী। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং  পড়াশোনার বিষয়ে অত্যন্ত মনোযোগী। কটকের এক প্রোটেস্ট্যান্ট  ইউরোপীয় স্কুলে শুরু হয় তার প্রাথমিক শিক্ষা। এরপর সেখান থেকে তিনি ভর্তি হন কটকের রাভেনশো কলেজিয়েট স্কুলে। ওই স্কুলের প্রিন্সিপাল বেনিমাধব দাসের ব্যক্তিত্ব ছোট সুভাসের মনন জগতে ভীষণ প্রভাব ফেলে। তাঁর কারণে সুভাষ বিবেকানন্দের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

১৯১১ সালে নেতাজি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কলকাতায় প্রথমস্থান অধিকার করেন। এবং ওই বছরই ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সিতে। সেখানে এক বছরের জন্য বহিষ্কৃত হন সাদা চামড়ার শিক্ষকের অব্যাহত অপমানের প্রতিবাদ করার অপরাধে। ১৯১৭ সালে স্যার আশুতোষের চেষ্টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত স্কটিশ চার্চ কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। এবং দর্শন শাস্ত্রে প্রথম বিভাগ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।

এই সময় জালিয়ানওয়ালাবাগে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থান তুমুল আন্দোলনে উত্তাল। ইংরেজ সরকারও তখন কঠোর অবস্থান নেয় আন্দোলন দমনে। এই আন্দোলন থেকে সুভাষকে দূরে রাখতে, তার পিতা তাকে ইংল্যান্ডে পঠিয়ে দেন। সেখানে অল্প কিছু দিনের মধ্যে সুভাষ আইসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, কেবল তাই নয়, চতুর্থ স্থান দখল করেন। এই সময় গভীর চিন্তায় পড়ে যান তিনি, একদিকে পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান, অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকারের এমন লোভনীয় চাকরি। অবশেষে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ (অনার্সসহ) ডিগ্রি  নিয়ে ১৯২১ সালের ১৬ জুলাই দেশে ফিরে আসেন দেশমাতৃকার আহ্বানে।

ওই সময় ভারতব্যাপী মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তার রাজনৈতিক গুরু সি আর দাশের আহ্বানে আশৈশব স্বাধীনতার স্বপ্ন লালিত সুভাষ বসু জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে  মহাত্মা গান্ধীর আপোষকামী নীতি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। ধীরে ধীরে এই নীতির বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করতে থাকেন। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর তিনি ভারতীয় যুব কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনের অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হন। এই কংগ্রেসে তিনি প্রথম গান্ধীজির মতের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বক্তৃব্য রাখেন। ব্যক্তি গান্ধীকে শ্রদ্ধা করলেও তিনি ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে গান্ধীর আপোষকামী নীতিকে ভ্রান্ত এবং ভারতের জন্য ভয়ঙ্কর বলে মনে করতেন।

পরপর দুইবার জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন সুভাষ। ১৯৩৮ সালে হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশনে প্রাক্কালে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন আপোষহীন ধারার প্রতিনিধি হিসেবে। কিন্তু আপোষকামীরা এতে বাধা না দিলেও কংগ্রেসে সভাপতির ভাষণের পর তারা আৎকে ওঠেন। সুভাস বসু ওই সভায় স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, কংগ্রেসের আশু কাজ কবে ভারতবর্ষ থেকে সাম্রাজ্যবাদকে বিতাড়ন করা ও পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন। এরপর থেকেই কংগ্রেসের অভ্যন্তরে আপোষকামী ও দক্ষিণপন্থীদের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র তীব্র থেকে তীব্র হতে থাকে সুভাষ বসুর বিরুদ্ধে।

১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের ৫২তম অধিবেমন বসে ত্রিপুরীতে। এই অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচন, কংগ্রেসের অধিবেশন ও পরবর্তী ঘটনাবলী ছিল সুভাষ বসুর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

দেশীয় রাজ্য ও ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চল নিয়ে একটি যুক্তরাষ্ট্র প্রবর্তন করতে চেয়েছিল ব্রিটিশরা। গান্ধীসহ কংগ্রেসের আরেপাষকামী দক্ষিণপন্থীরা এটা সমর্থন করলেও  সরাসরি এর বিরোধিতা করেন সুভাষ বসু। তিনি ব্রিটিশ সরকারের সাথে কোন প্রকার আপোষ করতে রাজী নন, এটাই ছিল তার বড় অপরাধ। নানা ষড়যন্ত্রের পর সকলকে অবাক করে দিয়ে সরাসরি ভোটে অংশ নিয়ে ২০৩ ভোট বেশি পেয়ে সুভাষ বসু দ্বিতীয়বারের মতো কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। আপোষকামীরা হেরে যাওয়ার পর আরো মরিয়া হয়ে অব্যাহত চক্রান্ত করতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত সুভাষ বসুকে কংগ্রেস থেকে পদত্যাগে বাধ্য করে। এই চত্রান্ত কতোটা গভীর ছিল, স্বয়ং গান্ধী প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, আমি শুরু থেকেই তার সভাপতি হওয়ার বিরুদ্ধে ছিলাম।

অখণ্ড ভারতবর্ষ এবং হিন্দু মুসলমানের ঐক্যের বিষয়ে তিনি ছিলেন অবিচল। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ মুসলিম লীগ কর্তৃক লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর তিনি অত্যন্ত মুষড়ে পড়েন, তা এই কারণেই যে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের আর কোন সম্ভাবনাই আর অবশিষ্ট রইলো না। কংগ্রেসের সদস্য না হয়েও সুভাষ বসুর সমর্থক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ লাহোর প্রস্তাবের বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করার পর তিনি এতে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেণ।  লাহোর প্রস্তাবে যা বলা হয়েছে তার চাইতেও বেশি কিছু দিতে রাজি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। আবুল মনসুরের অনুরোধে জিন্নার সাথে সাক্ষাৎ করে তার মনোভাবের কথা জানালে জিন্না তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, যে কোন ধরনের সমঝোতা হবে কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের মধ্যে, কোন ব্যক্তির মধ্যে না। কংগ্রেসের  মধ্যে সুভাষ বসুর ব্যাপক সমর্থন থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কংগ্রেসের নেতা ছিলেন না। কংগ্রেসকে এই বিষয়ে রাজী করাতে নেহেরু হয়ে গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করলেও গান্ধীর অনমনীয় মনোভাবের কারণে ভারতে হিন্দু –মুসলিম ঐক্যের সুভাষ বসুর সেই শেষ চেষ্টাও সফল হয়নি।

এখানেও নেতাজি দমে থাকেননি। রাজনৈতিক আলাপ আলোচনার আর কোন পথ খোলা না থাকায় বিদেশে পাড়ি দিয়ে কিছু করা যায় কিনা সে চেষ্টার অংশ হিসেবে প্রথমে সোভিয়েত ইউনিয়নে যান। সেখান থেকে রোম হয়ে জার্মান, জার্মান থেকে জাপান পৌঁছান। ১৯৪৩ সালে সেখানে বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর হাতে গড়া আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে জাপান আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করে। ধারণা করা হয় ১৯৮৫ সালের ১৮ আগস্ট এক বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজি মারা যান।