• ঢাকা
  • সোমবার, ০১ জুন, ২০২০, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১১, ২০১৯, ০৫:৫৭ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : ডিসেম্বর ১১, ২০১৯, ০৬:১৪ পিএম

ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি-২২

অন্ধকারের পথে যাত্রা শুরু

আবেদ খান
অন্ধকারের পথে যাত্রা শুরু

ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পরে আর সামান্য কাল অপেক্ষা করেননি জিয়াউর রহমান। দেশকে পাকিস্তানে পরিণত করার জন্য এমন কিছু নেই যা তিনি করেননি। জেনারেল জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কুখ্যাত রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে। এই শাহ আজিজুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘে গিয়েছিলেন এবং পাকিস্তানের পক্ষে ওকালতি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানে হামলা চালিয়ে অন্যায় কিছু করেনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের নামে সেখানে যা চলছে, তা হলো ভারতের মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের উচিত সেটাকে পাকিস্তানের ঘরোয়া ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করা।” দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শাহ আজিজুর রহমান দালাল আইনে গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ফলে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি মুক্তি লাভ করেন।

শাহ আজিজ ছাড়াও জিয়া আরও কয়েকজন ‘রাজাকার’কে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। তারা হলেন- মসিউর রহমান (যাদু মিয়া), মির্জা গোলাম হাফিজ, আবদুল আলিম, সামসুল হুদা চৌধুরী, এস এম শফিউল আজম ও খন্দকার আবদুল হামিদ। মসিউর রহমান (যাদু মিয়া) ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে যান। কিন্তু পরে দেশে ফিরে এসে পাকস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের ঠিকাদারি করে মোটা টাকা কামিয়েছেন। তার দায়িত্ব ছিল চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে সিমেন্ট নামানো ও তা দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেয়া। স্বাধীনতার পর তিনি দালাল আইনে গ্রেফতার হন এবং ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে মুক্তি লাভ করেন। একই বছরের জুন মাসে তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট মুক্তিলাভ করেন।

মির্জা গোলাম হাফিজ মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মুক্তিকামী বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীনতাবিরোধী বলে উল্লেখ করেন। এ সম্পর্কে তিনি বিবৃতিও দিয়েছিলেন। বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশের এই তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধ আসলে একটি ভারতীয় ষড়যন্ত্র।”

খন্দকার আবদুল হামিদ ছিলেন ‍পাকিস্তানি ভাবধারার। রাজাকার বাহিনী কর্তৃক বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণের সঙ্গে খন্দকার আবদুল হামিদ যুক্ত ছিলেন বলে অনেকেই মনে করেন। স্বাধীনতার পর তিনি দালাল আইনে গ্রেফতার হন এবং ১৯৭৩ সালে মুক্তি লাভ করেন। জেল থেকে মুক্তির পর ওই বছরই তিনি ব্যারিস্টার মইনুলের মাধ্যমে  ইত্তেফাকের সিনিয়র ‘লিডার রাইটার’ হিসেবে যোগ দেন। এ পত্রিকায় তিনি ‘স্পষ্টভাষী’ ছদ্মনামে মঞ্চে নেপথ্যে কলামে এবং ‘মর্দে মুমীন’ নামে উপ-সম্পাদকীয় কলামে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন উদ্যোগের বিরুদ্ধে লিখতেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি বরাবরই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে শেরপুর থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় যুব উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৮১ সালে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। পরে ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় তিনি স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রম, জনশক্তি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নিযুক্ত হন। এই খন্দকার হামিদই বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের তত্ব উপস্থাপন করেন এবং সে সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদ শব্দ উচ্চারণও ছিল দেশদ্রোহিতার শামিল। তাই তিনি খালি মাঠে বিনা বাধায় তরবারি ঘুরাতে পেরেছিলেন।

‘‘জিয়াউর রহমান বলেন, “হবে, হবে, সবকিছুই হবে। আগে হিন্দুর লেখা জাতীয় সংগীত বদলানো হোক। তারপর জাতীয় পতাকার কথা ভাবব’’

..............‘’..............

সামসুল হুদা চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান বেতারের একজন প্রযোজক। ওই সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাক-বেতার থেকে কতগুলো অনুষ্ঠান প্রচার করেছিলেন। আর একাত্তরে আবদুল আলীম ছিলেন উত্তরের জনপদ জয়পুরহাটের এক মূর্তিমান আতঙ্ক। বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তিনি মেতে উঠেছিলেন ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বরতায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর আফজাল ও শান্তি কমিটির সদস্যদের নিয়ে জয়পুরহাটে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় নির্বিচারে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়। আবদুল আলীম ২০১৪ সালের ৩০ আগস্ট মারা গেছেন।

শুধু পাকিস্তানি দালালদের মন্ত্রিসভায় নেয়াই নয়, প্রেসিডেন্ট জিয়া নিজেও ছিলেন পাকিস্তান অন্তঃপ্রাণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দাবি ছিল, অখণ্ড পাকিস্তানের টাকা-পয়সা ও অন্যান্য সম্পত্তির অর্ধেক প্রাপ্য বাংলাদেশের। পাকিস্তানকে সেসব টাকা-পয়সা, ধন-সম্পত্তি বাংলাদেশকে ফেরত দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জেনারেল জিয়ার অবস্থান ছিল ঠিক এর উল্টো। বাংলাদেশে পাকিস্তানের যেসব সম্পত্তি জাতীয়করণ করা হয়েছিল, জিয়া সেগুলো পাকিস্তানে ফিরিয়ে দেন। ক্ষেত্রবিশেষ উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও দেন। কিন্তু পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনার কথা তিনি একবারও মুখ ফুটে বলেননি। বরং ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে তিনি যখন পাকিস্তান সফরে যান, তখন পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদপত্রে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে নিয়ে একটি ‘কনফেডারেশন’ গঠনে আগ্রহী। জেনারেল জিয়া ওই পাকিস্তান সফরকে ঘিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠনের কথাটা তখন আবার নতুন করে বাজারে চালু হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতাবিরোধী সম্প্রদায়িক অপশক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে জেনারেল জিয়া তার দল বিএনপিতে পাকিস্তানপন্থী সামরিক ও বেসামরিক আমলা, মুসলিম লীগ, দক্ষিণপন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীদের ৩০০ জনের মধ্যে ২৫০ জনই ছিল চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধী। তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দালালির অভিযোগে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিল। জিয়া জাতীয় সংসদে মুক্তিযোদ্ধা আর পাকিস্তানি দালালদের একই আসনে বসান এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’-এর অনুকরণে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র চালাতে থাকেন।

‘‘১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিনেট অধিবেশনে কোরআন তেলাওয়াতের আগে জাতীয় সংগীত গাওয়ায় জিয়াউর রহমানকে বিএনপির নেতা ডা. ইউসুফ  বলেন, “স্যার, আমাদের পতাকায় ইসলামি রং নেই, এটা আমাদের ভালো লাগে না। এটা ইসলামি তাহজ্জিব ও তমুদ্দুনের সাথে মিলছে না।”

..............‘’..............

১৯৭৯ সালের ১২ জানুয়ারি পাকিস্তানের যোগাযোগমন্ত্রী ফিদা মহম্মদ খান পেশোয়ারের এক জনসভায় বলেন, ‘‘বাংলাদেশের আগামী সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের জন্য মুসলিম লীগ যথেষ্ট শক্তিশালী। এখানে মুসলিম লীগ যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পুনর্মিলনের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।’’ (মর্নিং নিউজ, ১৩ জানুয়ারি, ১৯৮৯)

পাকিস্তানের আরেক রাজনীতিক ইস্তিকলাল পার্টির নেতা এয়ার মার্শাল (অব.) আজগর খান। তিনি তার দলের নির্বাচনি ইশতেহারে বলেন, “তার পার্টি বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ‘কনফেডারেশন’ গঠন করতে চায়। ১৯৭৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলো এ সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে।

দালাল আইন বাতিল

১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী চক্র এক আদেশে ১৯৭২ সালের দালাল আইন বাতিল করে। এরপর Second Proclaimation Order No. 3 of 1975-এর প্রথম তফসিল থেকে বাংলাদেশ দালাল আইনের যে সেফগার্ড ছিল, তা তুলে দেয়া হয়। দালাল আইনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকার, আল বদর ও আল শামস বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি এক অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী দালালদের বিচারের জন্য সারা দেশে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। জিয়াউর রহমান দালাল আইন বাতিল করে ১১ হাজার সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন। ১৯৭৬ সালের ১৮ জানুয়ারি দেশত্যাগী পাকিস্তানি নাগরিকদের নাগরিকত্ব ফেরত পাওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে বলা হয়।

জাতীয়তা পরিবর্তন

১৯৭৬ সালের ৩ মার্চ জিয়াউর রহমান এক সামরিক ফরমানবলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলুণ্ঠিত করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ঘোষণা করেন। ১৯৭৬ সালের ৩ মে জিয়াউর রহমান এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮ নং অনুচ্ছেদ বাতিল করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নষ্ট পথ উন্মোচন করেন। Second Proclaimation Order No. 3 of 1976 জারি করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাবলি তুলে দেয়া হয়। Second Proclaimation জারি করে সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ তুলে দিয়ে দালালদের ভোটার হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়, যা ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল সংবিধানের নবম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনে পরিণত করেন জিয়াউর রহমান। Proclaimation No. 1 of 1977 জারি করে সংসদে নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে সংবিধানের কিছু অংশ তুলে দেয়া হয়। এর ফলে স্বাধীনতাবিরোধী মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপি, নেজামে ইসলামসহ অপরাপর ধর্মভিত্তিক উগ্র সাম্প্রদায়িক দলগুলো তৎপরতা শুরু করে। পুনর্বাসিত হয় যুদ্ধাপরাধী মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর সদস্যরা।

‘‘শাহ আজিজ ছাড়াও জিয়া আরও কয়েকজন ‘রাজাকার’কে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। তারা হলেন- মসিউর রহমান (যাদু মিয়া), মির্জা গোলাম হাফিজ, আবদুল আলিম, সামসুল হুদা চৌধুরী, এস এম শফিউল আজম ও খন্দকার আবদুল হামিদ। মসিউর রহমান (যাদু মিয়া) ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে যান। কিন্তু পরে দেশে ফিরে এসে পাকস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করেন’’

..............‘’..............

জাতীয় পতাকা ও সংগীত বদলের প্রচেষ্টা

১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে জেনারেল জিয়া জাতীয় পতাকা পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে নতুন জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়েছিল। এই পতাকা বর্তমান পতাকার চেয়ে একটু ভিন্ন ছিল। এতে পতাকার জমিন ঘন সবুজই ছিল, তবে মাঝখানের বৃত্তটির রঙ লালের পরিবর্তে কমলা করা হয়। ওইদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানেও ওই বৃত্তের রঙ কমলা বলে উল্লেখ করা হয়। জাতীয় পতাকা পরিবর্তনকে ঘিরে চারদিকে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে জিয়া ওই নতুন ধরনের পতাকা বাধ্য হয়ে বদলান।

এর আগে ১৯৭৮ সালের ১২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিনেট অধিবেশনে কোরআন তেলাওয়াতের আগে জাতীয় সংগীত গাওয়ায় জিয়াউর রহমানকে বিএনপির নেতা ডা. ইউসুফ  বলেন, “স্যার, আমাদের পতাকায় ইসলামি রং নেই, এটা আমাদের ভালো লাগে না। এটা ইসলামি তাহজ্জিব ও তমুদ্দুনের সাথে মিলছে না।”

উত্তরে জিয়াউর রহমান বলেন, “হবে, হবে, সবকিছুই হবে। আগে হিন্দুর লেখা জাতীয় সংগীত বদলানো হোক। তারপর জাতীয় পতাকার কথা ভাবব।”

স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস পরিবর্তনের উদ্যোগ

২৬ মার্চ‍ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। আমাদের সংবিধানের ৫৫ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে সমগ্র জাতি প্রতিবছর ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করবে। কিন্তু জেনারেল জিয়া সংবিধানের এই সুস্পষ্ট নির্দেশকে অমান্য করে আমাদের বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বরকে স্বাধীনতা দিবস রূপে চালু করার চেষ্টা করেন। জিয়া চেয়েছিলেন ২৬ মার্চকে জাতীয় দিবস হিসেবে পালন করতে। কিন্তু চারদিকে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ওঠায় তিনি আর তা করে উঠতে পারেননি।

গোলাম আযমের আগমন

১৯৭৮ সালের ১১ জুলাই পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে গোলাম আযম ঢাকায় আসেন। তার ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও জিয়া সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরবর্তীতে কয়েক দফা ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে ’৯২ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। ’৯৪ সালে খালেদা জিয়ার আমলে আদালতের রায়ে নাগরিকত্ব ফেরত পান। মুক্তিযুদ্ধের পরও গোলাম আযম বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করার ষড়যন্ত্র করেন। যুক্তরাজ্যে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি করেন। জেনারেল জিয়ার আমলে গোলাম আযম বাংলাদেশে আসার পর থেকেই জামায়াতে ইসলামীকে সংগঠিত করতে উদ্যোগী হন এবং নানা তৎপরতা শুরু করেন। নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার পর গোলাম আযমকে জামায়াতের আমির বলে ঘোষণা দেয়া হয়।

নাগরিকত্ব ফিরে পেতে ভাষা আন্দোলনের প্রশ্নে গোলাম আযমের ‘ভেলকিবাজি’ ছিল বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। নব্বই দশকের শুরুতে যখন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলন তুঙ্গে, ঠিক তখনই গোলাম আযমকে বায়ান্নর ‘ভাষাসৈনিক’ হিসাবে  উল্লেখ করা হয়। রাজধানী ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে সে সময় গোলাম আযমকে ‘ভাষাসৈনিক’ অভিহিত করে চিকা মারা হয়। আর জামায়াতকেও তখন ভাষা দিবস পালন করতে দেখা যায়। কেননা তখন গোলাম আযম দেখলেন ধর্মের কথায় আর সুবিধা হচ্ছে না, তাই নাগরিকত্ব নেয়ার আগে তিনি ভাষাসৈনিকের তকমা নিলেন। নিজেকে দাবি করলেন একজন ভাষাসৈনিক হিসাবে।

‘‘১৯৭৮ সালের ১১ জুলাই পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে গোলাম আযম ঢাকায় আসেন। তার ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও জিয়া সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরবর্তীতে কয়েক দফা ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে ’৯২ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। ’৯৪ সালে খালেদা জিয়ার আমলে আদালতের রায়ে নাগরিকত্ব ফেরত পান। মুক্তিযুদ্ধের পরও গোলাম আযম বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত করার ষড়যন্ত্র করেন। যুক্তরাজ্যে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি করেন’’

..............‘’..............

ভাষা আন্দোলনের মতো একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনে নিজেদের সম্পৃক্ততা জাহির করা ছিল জামায়াতে ইসলামীর একটি সেই সময়ের একটি ‘রাজনৈতিক কৌশল’। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক সমাবেশে ভাষণ দেন। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পক্ষ থেকে তাকে দেয়া একটি মানপত্রে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। মানপত্রটি পড়ার কথা ছিল ডাকসুর তখনকার ভিপি অরবিন্দ বোসের। কিন্তু একজন হিন্দু ছাত্রকে দিয়ে মানপত্র পাঠ করালে তা নিয়ে মুসলিম লীগ সরকারে বিরূপ প্রচার হতে পারে— এমন আশঙ্কায় সেই দায়িত্ব পড়ে ডাকসুর তখনকার সেক্রেটারি গোলাম আযমের ওপর। ভাষাসৈনিক হিসাবে গোলাম আযমের দৌড় কিন্তু এ পর্যন্তই। আর সেটুকুও গোলাম আযম ‘অনেকখানি চাপে পড়ে’ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি যখন মওদুদীবাদ প্রতিষ্ঠায় তৎপর হন তখন তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়াটাকে তার একটা মস্তবড় ভুল বলে উল্লেখ করেন। কেননা মওদুদী তার “মুসলমান আউর মুউজুদাহ সিয়াসি কাসমাকাস” (মুসলমান এবং বর্তমান রাজনৈতিক সমস্যা) বইয়ে ‘ন্যাশনালিজম’ আদর্শকে কুফরি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর এ জন্যই ১৯৭০ সালে আঞ্জুমানে ইয়ারানে শক্করের উদ্যোগে এক সম্বর্ধনা সভায় গোলাম আযম ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়াকে আখ্যায়িত করেন ‘মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল’ হিসাবে। ১৯৭০ সালের ২০ জুন ‘বাংলা ভাষার আন্দোলন করা ভুল হইয়াছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গোলাম আযমের সেই বক্তব্য প্রকাশিত হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার পঞ্চম পৃষ্ঠায়। গোলাম আযমকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “মুসলমানদের অধিকাংশ তমদ্দুন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার উর্দু ভাষায় সংরক্ষিত আছে।” জাতীয় ভাষার প্রশ্ন ওঠার পর পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলকারীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন— তা উল্লেখ করে শ্রোতাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন গোলাম আযম বলেন, “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে তা মোটেও সঠিক কাজ হয়নি।”

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সেই গোলাম আযম এবং জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ নামে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এই ভিডিও’র কভারে লেখা ছিল ‘মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান’। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে গোলাম আযম এবং জামায়াত তখন মাতৃভাষাকে খোদার ‘সেরা দান’ হিসেবে জনগণের কাছে উপস্থিত করার চেষ্টা করে। ওই ভিডিওতে গোলাম আযম দুই দফা সাক্ষাৎকারে নিজেকে ভাষা আন্দোলনের ‘একজন সক্রিয় নেতা’ হিসাবে জাহির করার চেষ্টা করেন। ভাষা আন্দোলনে গোলাম আযমের ‘অগত্যা’ অংশগ্রহণের কাহিনী, সেজন্য ১৯৭০ সালের দুঃখ প্রকাশ এবং ভাষা আন্দোলনকে ‘ভুল’ আখ্যায়িত করা, এরপর ১৯৯২ সালে আবার নিজেকে ‘ভাষাসৈনিক’ হিসেবে প্রচার এবং বাংলা ভাষাকে ‘খোদার সেরা দান’ হিসেবে গৌরবান্বিত করার চেষ্টাসহ পুরো বিষয়টি ছিল জামায়াতে ইসলামীর একটি রাজনৈতিক কৌশল। এর সঙ্গে যে প্রকৃত ইসলামী নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক নেই, একথা বলাই বাহুল্য।

মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত একাত্তরের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে বলা হয়, তার অপরাধ মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার যোগ্য হলেও বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাকে এই দণ্ড দেয়া হলো। তার বিরুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীকে সহায়তা ও চক্রান্তের দায়ে ছয়টি, পরিকল্পনার দায়ে তিনটি, উসকানির দায়ে ২৮টি, সম্পৃক্ততার দায়ে ২৪টি এবং ব্যক্তিগতভাবে হত্যা ও নির্যাতনের দায়ে ৬২টি অভিযোগ উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে ৬১টি অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়। রায়ে গোলাম আযমকে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের ইতিহাসে নৃশংসতম গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্যতম হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গোলাম আযম শুধু তার ব্যক্তিগত কৃতকর্ম নয়, অধীনদের অপরাধের জন্যও দায়ী বলে রায় দেন আদালত।

আবেদ খান ● সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক জাগরণ

আরও পড়ুন