• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৫, ২০১৯, ০৩:২৫ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ১, ২০২০, ০৮:১১ পিএম

ষড়যন্ত্রের জালে বিপন্ন রাজনীতি-২৩

হিংস্র সমরনায়কের তাণ্ডব (এক)

আবেদ খান
হিংস্র সমরনায়কের তাণ্ডব (এক)

খ্যাতিমান বিজ্ঞানী ড. আবদুল মতিন চৌধুরী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি ছিলেন বিশ্বের বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা বিজ্ঞানী সংস্থার সদস্যও। ১৯৭৬ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার প্রাপকের নাম সুপারিশ করার জন্য পদার্থবিদ্যায় নোবেল কমিটি তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। জেনারেল জিয়া এই স্বনামধন্য বিজ্ঞানীকে তার দলে যোগ দেয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাতে তিনি রাজি হননি। শুধু এই কারণেই জিয়‍া ১৯৭৬ সালে ৫ জুন ড. মতিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করেন। তার বিরুদ্ধে ৭টি মিথ্যা মামলা দেন। মামলাগুলোর মধ্যে ছিল দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা ধরনের অভিযোগ।

ড. মতিন চৌধুরীর গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের ৭ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে একটি ইস্তাহার প্রচার করা হয়। পশ্চিম দুনিয়ার বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য সংস্থা ও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ডক্টর চৌধুরীর মুক্তি দাবি করে বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দেন। কিন্তু তাতে কোনও কাজ হয়নি। জেনারেল জিয়া কোনও কিছুই তোয়াক্কা করেননি। ঢাকার ১নং মার্শাল কোর্টে অত্যন্ত গোপনে ড. মতিন চৌধুরীর বিচার হয়। সরকার পক্ষ কোনও রকম সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত করতে না পারায়, প্রথম ৩টি মামলা খারিজ হয়ে যায়। ফলে ড. মতিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা বাকি মামলাগুলো তুলে নেবার জন্য মার্শাল ল কোর্টের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সরকার পক্ষকে পরামর্শ দেন।

কিন্তু জেনারেল জিয়ার এককথা, কোনও মামলাই তুলে নেয়া চলবে না। যে কোনও উপায়ে ড. চৌধুরীকে শাস্তি দিতেই হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম মামলার কোর্ট ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ’ এই বলে রায় দেন। কিন্তু জেনারেল জিয়ার হুকুমে বিচারকগণ শেষ মুহূর্তে রায় বাতিল করতে বাধ্য হন। নতুন রায়ে ডক্টর চৌধুরীকে দু’বছরের সশ্রম কারদণ্ড দেয়া। এছাড়া প্রতি মামলায় তাকে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডও করা হয়। ষষ্ঠ মামলায়ও ড. মতিন চৌধুরী ‘নির্দোষ’ প্রমাণিত হন।

মতিন চৌধুরী

ঢাকার ১ নং মার্শাল কোর্টে অত্যন্ত গোপনে ড. মতিন চৌধুরীর বিচার হয়। সরকার পক্ষ কোনও রকম সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থিত করতে না পারায়, প্রথম ৩টি মামলা খারিজ হয়ে যায়। ফলে ড. মতিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনা বাকি মামলাগুলো তুলে নেবার জন্য মার্শাল ল কোর্টের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সরকার পক্ষকে পরামর্শ দেন

..............‘’..............

ডক্টর চৌধুরীর বিরুদ্ধে জেনারেল জিয়ার আক্রোশের আরও কয়েকটি কারণ ছিল, প্রথমত ড. মতিন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব তাকে দিয়েছিলেন। শিক্ষক ও ছাত্রমহলেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। জেনারেল জিয়া তাকে পক্ষে টানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। আর সেই আক্রোশেই তিনি ডক্টর চৌধুরীর বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা দায়ের করে তাকে ‘শায়েস্তা’ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ড. মতিন চৌধুরী নির্মম নির্যাতন, নিপীড়ন সত্বেও জেনারেল জিয়ার কাছে মাথা নত করেননি। জেলে ডক্টর চৌধুরীর স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে পড়ে। ১৯৮১ সালের ২৪ জুন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এভাবে জেনারেল জিয়া বেশ কয়েকজন লেখক, সাংবাদিক ও অন্যান্য শ্রেণির বুদ্ধিজীবীকে নির্যাতন করেছেন।  

অর্থা‍ৎ জেনালের জিয়‍া শুধু অভ্যুত্থানকারী সৈনিকদেরই নয়, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও শক্ত হাতে নির্যাতন করেছেন। অ্যামনেস্টি ইণ্টারন্যাশনাল ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জিয়ার হাতেই বিশেষ ক্ষমতার জন্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে। রিপোর্টে বলা হয়, সামরিক আইনের বলে, বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সামরিক ও অসামরিক ব্যক্তিদের যে বিচার হচ্ছে, তা আইনের শাসনের সম্পূর্ণ বিরোধী।

তাছাড়াও ‘স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট’ ও ‘ইমারজেন্সি রুল’ এর বদৌলতে জিয়া ট্রাইব্যুনালে বিচার না করে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ উত্থাপন না করেই অনির্দিষ্টকাল আটক রেখেছেন। 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওই রির্পোটে বলা হয়, ওইসময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক বন্দীর সংখ্যা ছিল ১০ থেকে ১৫ হাজারের মধ্যে।বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোর মতে, ওইসংখ্যা ছিল আরও বেশি। প্রায় ৬২ হাজার।

জেনালের জিয়া

 কে তাকে প্রস্তাব দিল, কে তাকে ভোট দিল! কোনও ঘটনারই প্রয়োজন পড়েনি, শুধু সামরিক ফরমান জারি করে বলেন, ‘এখন থেকে তিনিই দেশের প্রেসিডেন্ট।’

..............‘’..............

বঙ্গবন্ধু সবসময় চেয়েছিলেন দেশের ছাত্রদের মেধাবী করে গড়ে তুলতে। আর জেনারেল জিয়‍া সবসময়ই ছাত্রদের সন্ত্রাসের পথে ঠেলে দিয়েছেন। দেশের ছাত্র রাজনীতিতে প্রথম অস্ত্র, কালো টাকা, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের জন্ম দেন জিয়া। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি কলুষিত করার কাজটি জিয়াই শুরু করেন। তিনি হিজবুল বাহার নামক একটি জাহাজে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়ে ভ্রমণে যেতেন। সেই ভ্রমণগুলোতেই শিক্ষার্থীদের ব্রেন ওয়াশ করে বিএনপির ভ্রষ্ট আদর্শে তাদের দীক্ষা দেয়া হতো। গোলাম ফারুক অভি, নীরুর মতো অনেক মেধাবী ছাত্র এই হিজবুল বাহারের যাত্রী ছিলেন।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, আদর্শের বদলে অর্থ দিয়ে রাজনীতি করার ধারাও শুরু করেন জিয়া। তিনি এ দেশে প্রথম রাজনীতিতে অস্ত্র, পেশীশক্তি, কালো টাকার ব্যবহার শুরু করেন, বাংলাদেশে টাকা দিয়ে রাজনৈতিক নেতা কেনাবেচার রাজনীতি চালু করেন। দল কেনাবেচা, দল ভাঙা, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভেঙে নিজেদের দল ভারী করার ধারা প্রবর্তন করেন। আওয়ামী লীগ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জেনারেল জিয়ার এই কর্মকাণ্ডের ভুক্তভোগী হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগকে ভেঙে তিন ভাগে ভাগ করেছিল জিয়া। 

জেনারেল জিয়ার স্বেচ্ছাচারিতার কোনও সীমা পরিসীমা ছিল না। কেননা তার হাতে ছিল অসীম ক্ষমতা। তিনি ছিলেন পুরোপুরি ডিক্টেটর। একাধারে তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং দেশের প্রেসিডেন্ট। অর্থাৎ তখন তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সর্বময় কর্তা, তার হুকুমই ছিল তখন দেশের হুকুমৎ। এসব কিছুর মধ্যেই স্বৈরাচারী জিয়ার জননেতা হওয়ার সাধ জাগে। কিন্তু গায়ে জেনারেলের উর্দি চাপিয়ে তো জননেতা হওয়া যায় ‍না। তাই তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করেন। সেনাপ্রধানের সব ক্ষমতা নিজের হাতের মুঠোয় রেখে তিনি পুরোপুরি ‘সিভিল’ হওয়ার ভান করেন। সেনাপ্রধানের ‘উর্দি’ খুলে তিনি ‘সাফারি স্যুট’ পরতে আরম্ভ করেন। কিন্তু তিনি তার চোখের কালো চশমা বহাল রাখলেন। কেননা কালো সানগ্লাসের গায়ে তো আর সামরিক বাহিনীর গন্ধ নেই। অনেক অসামরিক লোকই এই চশমা পরে। তাছাড়া এই চশমা সরিয়ে নিলে অসুবিধা আছে, তাতে তার চোখ দেখা যাবে। আর এই চোখ দেখেই যে মানুষের মনের ঠিকানা খুঁজে পাওয়া সম্ভব তা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এককালের গোয়েন্দা অফিসার জেনারেল জিয়া তা খুব ভালোভাবেই বুঝতেন। তাই চোখের কালো চশমা তিনি খোলেননি।    

জেনারেল জিয়ার আমল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্টের অধ্যাদেশ, আদেশ ও আইন জারির সময়কাল বা ষড়যন্ত্রের অমানিশা। তিনি নিজেই এক সামরিক ফরমান জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন, আবার নিজেই আরেক ফরমান জারি করে ঘোষণা দেন তিনি দেশের ‘প্রেসিডেন্ট’। কে তাকে প্রস্তাব দিল, কে তাকে ভোট দিল! কোনও ঘটনারই প্রয়োজন পড়েনি, শুধু সামরিক ফরমান জারি করে বলেন— ‘এখন থেকে তিনিই দেশের প্রেসিডেন্ট।’

সেনাপ্রধানের ‘উর্দি’ খুলে তিনি ‘সাফারি স্যুট’ পরতে আরম্ভ করেন। কিন্তু তিনি তার চোখের কালো চশমা বহাল রাখলেন। কেননা কালো সানগ্লাসের গায়ে তো আর সামরিক বাহিনীর গন্ধ নেই

..............‘’..............

১৯৭৭ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান একা ‘প্রেসিডেন্ট প্রার্থী’ হয়ে ‘হ্যাঁ কিংবা না’ ভোট দেন। কিন্তু এককভাবে নির্বাচনে প্রার্থী বিষয়ে গণতন্ত্রের প্রশ্ন ছাড়াও বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর যে বিধিমালা রয়েছে তাতেও তিনি প্রার্থী হতে পারেন না। বাংলাদেশ আর্মি অ্যাক্ট ২৯২ ও ২৯৩ বিধিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, সামরিক বাহিনীর কোনও সদস্য তার চাকরির মেয়াদ শেষ না হতে কোনও নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সামরিক বাহিনীতে সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে চাকরিরত ছিলেন। সুতরাং, ‘হ্যাঁ-না’ ভোটে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি ও আইনের বরখেলাপ।সে হিসেবে জিয়াউর রহমান ছিলেন অবৈধ রাষ্ট্রপতি। ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল জিয়াউর রহমান একই সাথে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি থাকার জন্য একটি সামরিক ফরমান জারি করেন।তিনি দেশের সংবিধান, আইন-কানুন, সামরিক বাহিনীর বিধি অবৈধভাবে বারবার নিজের স্বার্থে পরিবর্তন এবং জারি করেন।

জেনারেল জিয়া ১৯৭৮ সালের ২১ এপ্রিল এক ঘোষণার মাধ্যমে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘোষণা দেন। তিনি বিরোধী দলগুলোকে মাত্র ৪০ দিনের নোটিসে নির্বাচনে আহ্বান করেন এবং মাত্র ২৩ দিন তাদের প্রচারণার সুযোগ দেন। অন্যদিকে তিনি নিজের নির্বাচনি প্রচারণার জন্য সরকারি প্রশাসনযন্ত্রকে পুরোপুরি কাজে লাগান। সরকারি মালিকানাধীন টিভি, রেডিও এবং সংবাদপত্রকে একচ্ছত্রভাবে কাজে লাগানো হয়। সর্বোপরি তিনি একাধারে প্রেসিডেন্ট, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং সেনাবাহিনীর স্টাফ প্রধান ছিলেন। আর কিছু ঘটুক বা নাই ঘটুক, এসব ক্ষমতার বলে এটা নিশ্চিত হয়েছিল যে, পুলিশ এবং সরকারি কর্মচারীরা তার পক্ষে কাজ করবে। স্বয়ং জিয়া কর্তৃক ঘোষিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অধ্যাদেশ- ১৯৭৮ অনুযায়ী ওই ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে পারবেন না যিনি সরকারি চাকরি করেন এবং এতে বেতন গ্রহণ করতে থাকেন। জিয়া নিজেই এই অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে ১৯৭৮-এর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রেসিডেন্ট হন।

আবেদ খান ● সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ

বি.দ্র. ▪ অনিবার্য কারণবশত এই সপ্তাহে ‘হিংস্র সমরনায়কের তাণ্ডব (দুই)’ প্রকাশ করা সম্ভব হলো না। আগামী বুধবার থেকে যথারীতি প্রকাশিত হবে - বার্তা সম্পাদক ]

আরও পড়ুন