• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯, ৩০ কার্তিক ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ৭, ২০১৯, ০৮:২৬ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ৭, ২০১৯, ০৮:২৬ পিএম

সহস্র পদচারণায় শেষ হলো ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিন

জাগরণ প্রতিবেদক
সহস্র পদচারণায় শেষ হলো ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিন
ঢাকা লিট ফেস্ট উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী-ছবি : সংগৃহীত

লালনের সুরে যাত্রা শুরু ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিন। আর শেষ হলো অগণিত আলোচনা ও সহস্র মানুষের পদচারণায়। লিট ফেস্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বাবু ও ম্যানবুকার পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়া সাহিত্যিক মনিকা আলী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী,  ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্, কাজী আনিস আহমেদ এবং আহসান আকবর, বাংলা ট্রিবিউন এর সম্পাদক জুলফিকার রাসেল ও ঢাকা ট্রিবিউন এর সম্পাদক জাফর সোবহান। এর আগে সাধনা নৃত্য গোষ্ঠীর পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ‘২০১১ সালে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজকে তার নবম আসর। বাংলা সাহিত্যকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজন। আমাদের আশা, একদিন লিট ফেস্ট বাংলাকে নিয়ে যাবে বিশ্বের কাছে। এর আগে হে ফেস্টিভ্যাল ছিল বহির্বিশ্বের সাহিত্যকে বাংলাদেশে পরিচিত করার জন্য। যারা আয়োজক তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এরকম একটা শুভ উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য। ঢাকা লিট ফেস্টের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সহযোগিতা করছে। আগামী বছর এই আয়োজনের শ্রী এবং মান আরও বৃদ্ধি করা হবে বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

ঢাকা লিট ফেস্টে আসতে পারে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ম্যানবুকারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত সাহিত্যিক মনিকা আলী। এসময় তিনি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।

এরপরপরই ‘প্ল্যানারি ফিকশন : রেজিস্ট্যানস অর রিফিউজ’নামক সেশন শুরু হয়, বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে। এতে উপস্থিত ছিলেন মনিকা আলীসহ পাঁচ দেশের পাঁচ জন নারী লেখক। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ভারতীয় লেখক সুমনা রায়। বাকিরা হলেন- ব্রাজিলীয় লেখক মারিয়া ফিলোমেনা বইসো লেপেসকি, ফিনল্যান্ডের মিন্না লিন্ডগ্রেন, ব্রিটিশ-ব্রাজিলীয় জারা রদ্রিগেজ ফাউলার‌।

সুমনা রায় শুরুতেই প্রশ্ন করেন, ফিকশন কী? এর জবাবে মনিকা আলী বলেন, ‘ফিকশন হলো ছোট ছোট জিনিসকে আবেগ ও কাব্যিকতার ছোঁয়ায় বড় পরিসরে ধরা।’ তার মতে, সাহিত্যিক পরিচর্যায় যেকোনও ক্ষুদ্র জিনিস বড় পরিসরে তুলে ধরা যায়।

মিন্না লিন্ডগ্রেন বলেন, ‘সোশ্যাল লাইফের গল্পকে তুলে ধরা আমার কাজ। আমি বয়স্ক মানুষের গল্প লিখি। সাম্প্রতিক বইটিতে বয়স্ক ব্যক্তির ভালোবাসা ও অপ্রাপ্তির বিষয় ফুটিয়ে তুলেছি। তাই আমার কাছে ফিকশন হলো সমাজের কথা বলা।’

মারিয়া ফিলোমেনা বইমো লেপেসকি একজনও চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘সবার জন্যই কল্পনা শক্তি খুবই দরকারি, আমরা বই পড়লেই সবচেয়ে সুন্দর করে কল্পনা করা শিখি। সেজন্যই আমার কাছে ফিকশন হলো মনোরঞ্জনের মাধ্যম।’

জারা রদ্রিগেজ ফাউলার বলেন, ‘যেহেতু আমি নারীবাদী লেখিকা, সেহেতু আমার কাছে ফিকশন হলো সমাজের প্রতিচ্ছবিকে বইয়ের অক্ষরে ফুটিয়ে তোলা। নারীদের অধিকার, সুবিধা ও অসুবিধাগুলোকে গল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার জন্যই আমি ফিকশনকে ব্যবহার করি।’

কসমিক টেন্টে ‘কবিতা আড্ডা: এপার ওপার’ শীর্ষক পরিবেশনায় কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ওপার বাংলার জনপ্রিয় লেখক কবি মৃদুল দাশগুপ্ত, জহর সেন মজুমদার, গৌতম গুহ রায়, এপার বাংলার কামাল চৌধুরী এবং মোহাম্মফ সাদিক। সেশনের শুরুতে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, কবিতা শুধু এপার বাংলা বা ওপার বাংলার মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কবিতা সমগ্র বিশ্বের সীমাকে ধারণ করে।’

তিনি তুলে ধরেন স্বাধীনতা পূর্ববতী ৭০ দশকের কবিতার ভাবার্থ। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়কার কবিতার তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কবিতা সার্থক তখন, যখন তা জনসাধারণের অন্তরে পৌঁছে যেতে পারে।’

কবি কামাল চৌধুরী বলেন, ‘কবিতা দুই ধরনের, স্বাধীনতার কবিতা ও জনগণের কবিতা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে অধ্যয়নরত নির্দিষ্ট কবিতা। সত্তর দশকের কবিতা পত্রপল্লবে বিকশিত হয়েছিল যা জনসাধারণের মধ্যে সহজেই মিশে গিয়েছিল।’

কবি জহর সেন জীবনানন্দ দাশের দুটি পঙ্তি ‘অদ্ভুত আঁধার এক পৃথিবীতে এসেছে আজ’ ও ‘আবহমানের ভাঁড় এসেছে গাধার পিঠে চড়ে’ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কবিতা কোনও নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দুতে সীমাবদ্ধ নয়, কবিতা ক্রমশ প্রসারিত।’

কবি মৃদুল দাশগুপ্ত বলেন ‘প্রকৃত সাহিত্য সাধনা কবিতার ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কবিতার কোনও দেশ নেই।’ 

কলকাতা লেখকদের যেভাবে আমরা সাদরে গ্রহণ করি, কলকাতা কি এপার বাংলার লেখকদের সেভাবে গ্রহণ করেন কিনা- দর্শকের এমন প্রশ্নের উত্তরে কবি মৃদুল দাশগুপ্ত উদ্যোক্তা ও পুস্তক বিক্রেতাদের প্রচারণা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। জায়গার কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, বিপণন আর প্রচারণার সীমাবদ্ধ জায়গা থেকে এগিয়ে আসলেই কবিতা ও কবিদের উৎকর্ষ সাধন হবে। এছাড়াও তরুণ কবিদের সাধনা করার পরামর্শ দেন তিনি। 

কবি জীবনানন্দ দাশ তার ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপির ওপরে লিখেছিলেন ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’। এই ত্রস্ত নীলিমার মাধ্যমেই বাংলা ভাঙার গল্প বলা হয়েছে। ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৯-এর প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) ‘ভাঙা বাংলা: ত্রস্ত নিলীমায়’ সেশনে সেই ভাঙা বাংলার গল্পের বিশদ আলোচনা করলেন ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৯-এর প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) ‘ভাঙা বাংলা: ত্রস্ত নিলীমায়’ সেশনে পশ্চিমবঙ্গের ঔপন্যাসিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী এবং বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ, গল্পকার, কবি ও গবেষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন লেখক ও শিক্ষক শামীম রেজা।

স্বপ্নময় চক্রবর্তী পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হলেও তার পূর্বপুরুষ ছিলেন এপার বাংলার অর্থাৎ বাংলাদেশের নোয়াখালির মানুষ। ১৯৯২ সালে স্বপ্নময় চক্রবর্তী ‘চতুষ্পাঠী’ নামে একটি উপন্যাস লেখেন। এই উপন্যাসে স্বপ্নময় চক্রবর্তী দেখিয়েছেন, অচল পয়সার মতো ইংরেজি না জানা, আচার্যদেব ও তার পৌত্র, পিতৃহীন বিলুর চোখ দিয়ে ক্যালাইডোস্কোপের মতো উদ্ভাসিত ষাটের দশক। উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট দেশভাগ পরবর্তী মানুষদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা।

স্বপ্নময় চক্রবর্তীর কাছে সঞ্চালক শামীম রেজা জানতে চান, কীভাবে বেড়ে উঠেছেন তিনি? ভাঙা বাংলা নিয়ে তার ভাবনাই বা কী? এর উত্তরে স্বপ্নময় চক্রবর্তী বলেন, ‘আমি জানতাম না, আমি ভাঙা বাংলায় জন্মেছি। পরে যখন ধীরে ধীরে দেশের বাড়ি, দেশের পুকুর, দেশের মানুষের কথা জানলাম, আমার ঠাকুরদাদা ও ঠাকুরমায়ের কাছে তাদের জন্মস্থান ও দেশের বাড়ি সম্পর্কে জানলাম, তখন বুঝতে পারি, আমাদের যে আত্মার বন্ধন ছিল, তা অনেক আগেই ছিন্ন হয়ে গেছে।’

বিকাল ৪টায় আবদুল করিম সাহিত্য মিলনায়তনে দেওয়া হয় জেমকন তরুণ সাহিত্য পুরস্কার।

অভিষেক সরকারের ছোটগল্প ‘নিষিদ্ধ’ এবং রফিকুজ্জামান রণির ‘ধোঁয়াশার তামাটে রঙ’ কবিতার পাণ্ডুলিপির জন্য তাদের পুরস্কৃত করা হয়। জেমকন গ্রুপের পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ তাদের হাতে পুরস্কার হিসেবে এক লাখ টাকা ও ক্রেস্ট তুলে দেন।  এ সময় কাজী আনিস আহমেদ বলেন, ‘জেমকন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আজকের কাগজ ও কাগজ প্রকাশন ২০০০ সালে প্রথম তরুণদের সৃজনশীল লেখার পাণ্ডুলিপি আহ্বান করে। আহ্বানকৃত পাণ্ডুলিপি থেকে নির্বাচিত পাণ্ডুলিপিকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কৃত পাণ্ডুলিপিটি কাগজ প্রকাশন পরবর্তী বছর বইমেলায় গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে।

এসএমএম

আরও পড়ুন