• ঢাকা
  • বুধবার, ০৮ এপ্রিল, ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬
প্রকাশিত: নভেম্বর ৬, ২০১৯, ১০:২৭ এএম
সর্বশেষ আপডেট : নভেম্বর ৬, ২০১৯, ১০:৩৩ এএম

ওয়াসার দুর্নীতি বন্ধে দুদকের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নেই  

মেহ্দী আজাদ মাসুম 
ওয়াসার দুর্নীতি বন্ধে দুদকের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নেই  
ওয়াসা ভবন

● ১১ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করে ১২ সুপারিশ

● ৪ মাসেও মন্ত্রণালয় ও ওয়াসায় হয় নি কোনও বৈঠক

● মুখে কুলুপ এঁটেছেন এমডি, আশার বাণী শোনালেন মন্ত্রী

ওয়াসার ১১ খাতের দুর্নীতি বন্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দেয়া ১২ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনও অগ্রগতি। নেই কোনও তাগিদ। কর্মকর্তারাই জানেন না, কী আছে দুদকের ওই প্রতিবেদনে। গণমাধ্যমেই দেখেছেন-পড়েছেন, ব্যস এটুকুই। দুদকের সুপারিশমালা নিয়ে বৈঠকেই বসতে পারে নি ওয়াসা ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি না হলেও মন্ত্রী শুনিয়েছেন আশার বাণী। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জমা দেয়া দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেছেন, আলোচনা করে সুপারিশ বাস্তবায়নে তাগিদ দেয়া হবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলামের কাছে ১৮ জুলাই (বৃহস্পতিবার) ঢাকা ওয়াসার ১১ খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা বন্ধে ১২ দফা সুপারিশ সম্বলিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জমা দেন দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান।

প্রতিবেদন গ্রহণ করে ওই সময় তাজুল ইসলাম দুদকের কার্যক্রমের প্রশংসা করে জানিয়েছিলেন, তার মন্ত্রণালয়ের কোনও স্তরেই দুর্নীতি বরদাশত করবেন না। প্রতিবেদন নিয়ে দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবেন। অথচ ওয়াসার দুর্নীতি বন্ধে দুদকের প্রতিবেদন জমা দেয়ার প্রায় ৪ মাস অতিবাহিত হলেও এ নিয়ে কোনও তাগিদ নেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ওয়াসার।

দুর্নীতি বন্ধে দুদকের সুপারিশ বাস্তবায়নে এই দীর্ঘ সময়ে একটি সভাও আহবান করে নি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

শুধু তাই নয়, দুদকের সুপারিশ করা এ অনুসন্ধানী প্রতিবেদননে কোথায় আছে বা তা বাস্তবায়নে মন্ত্রী-সচিব কি নির্দেশনা দিয়েছেন, তাও জানা নেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।    

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অধিশাখার অতিরিক্ত সচিব ইফফাত আরা মাহামুদ দৈনিক জাগরণকে বলেন, দুদকের প্রতিবেদন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও সভা আহবান করা হয় নি। সভা আহবান করা হলে বিষয়টি আমি জানতাম। 

পানি সরবরাহ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পদাধিকার বলে ওয়াসার বোর্ড পরিচালক) জহিরুল ইসলাম দৈনিক জাগরণকে বলেন, দুদকের প্রতিবেদন নিয়ে বৈঠক হয় নি বলে যে ভবিষ্যতে হবে না তা নয়। সহসাই বৈঠক আহবান করা হতে পারে। ওয়াসার দুর্নীতি বন্ধে দুদকের সুপারিশে কি আছে তা তিনি জানেন না বলে স্বীকার করেন।

ঢাকা ওয়াসা পরিচালনা পর্ষদের (বোর্ড) সদস্য ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব শাবান মাহমুদও জানালেন দুদকের ওই প্রতিবেদনের বিষয়ে নিয়ে ওয়াসা বোর্ডে কোনও বৈঠক হয়নি। 

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাসকিম এ খান বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হন নি। তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানান তার একান্ত সহকারী। 

স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম শুনিয়েছেন আশার বাণী। দৈনিক জাগরণকে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে স্থবিরতা ছিল। সেটা কাটিয়ে উঠে সহসাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করা হবে। দুদকের প্রতিবেদন এবং সুপারিশ আমরা খুবই গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি। কোনও ছাড় দেয়া হবে না। দুদক আমাদের কাজকে এগিয়ে দিয়েছে। 

প্রতিবেদনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনও বৈঠক হয়েছে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ঘোষণা দিয়ে সত্যি বৈঠক করতে পারি নি। তবে প্রতিবেদনের বিষয়টি কিন্তু আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সব বৈঠকেই আলোচনা হচ্ছে। আলোচনা কিন্তু থেমে নেই। ডেঙ্গুই আমাদের প্রশাসনিক কাজকে একটু পিছিয়ে দিয়েছে। 

দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান দৈনিক জাগরণকে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনে সুপারিশ বাস্তবায়নে চিঠি দেয়া হবে।

দুদক কমিশনার জানান, দুদক ২০১৭ সালে দেশের ২৫টি মন্ত্রণালয়, অধিদফতর বা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইন ও বিধি-বিধানের পদ্ধতিগত ত্রুটি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাবসহ বিবিধ কারণে যেসব দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি হয়, তার উৎস চিহ্নিত করে সেগুলো বন্ধ বা প্রতিরোধে পৃথক ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে। কমিশন এরই মধ্যে ১৩টি প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করেছে। ওয়াসার প্রতিবেদনটি ছিলো ১৪তম।

মোজাম্মেল হক জানান,  ওয়াসার প্রতিবেদনে দুর্নীতির ১১টি সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করে তা নিরসনে ১২টি সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়।

দুদকের প্রতিবেদনের সার-সংক্ষেপ  

দুদকের দেয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওয়াসার প্রকল্পগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়। এ ছাড়া ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট পদ্ধতি ও রাজনৈতিক পরিচয় এবং কাজ পাওয়ার বিনিময়ে ঘুষ লেনদেন প্রচলিত প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যুক্ত থাকেন।

দুর্নীতির উৎস 

দুদকের প্রতিবেদনে ওয়াসায় দুর্নীতির ১১টি উৎস চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে প্রকল্প কাজে দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে ৮টি। এগুলোর মধ্যে প্রধান হলো ওয়াসার প্রকল্পগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ করা হয় না। উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়, ঢাকাসহ বৃহত্তর মিরপুর এলাকার পানির চাহিদা পূরণে মিরপুরের ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করে প্রকল্পের বিষয়। এ প্রকল্পটি ২০১২ সালের ২২ নভেম্বর অনুমোদন হয়। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী সরকারের ১৪২ কোটি, ওয়াসার ১০ কোটি, প্রকল্প সাহায্য ৩৬৯ কোটি টাকাসহ মোট ৫২১ কোটি টাকার প্রকল্প ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের ২৯ মার্চে সংশোধিত ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ৫৭৩ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। 

দুদক বলছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে অযৌক্তিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ৫২ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তব কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪৬ দশমিক ৭২ ভাগ হলেও ঠিকাদার পরিশোধ করা হয়েছে ৩১৩ কোটি ৭১ লাখ, যা সংশোধিত ডিপিপি মূল্যের ৫৪ দশমিক ৭৫ ভাগ। এ ক্ষেত্রে কাজের অগ্রগতির সঙ্গে ঠিকাদারের পরিশোধিত বিলের অনেক পার্থক্য রয়েছে।

প্রকল্পে ধীর গতি  

ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে ঢাকা মহানগরীর পানি সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি ব্যয়ে ‘সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেজ-৩) প্রকল্প’ ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুলাইয়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্পের কাজের তেমন কোনও অগ্রগতি নেই বলে জানায় দুদক।

সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা (জশলদিয়া) পানি শোধনাগার নির্মাণ (ফেজ-১) প্রকল্প ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও তা হয় নি।

ভূ-উপরিস্থ পানি শোধন করে ঢাকা মহানগরীর পানি সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য ৫ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নেয়া হয় ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প।’ ২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা। প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৮ শতাংশ হলেও ঠিকাদারের হাতে চলে গেছে ২৩৮ কোটি টাকা।

রাজধানী ঢাকার গুলশান, বনানীসহ অন্যান্য এলাকায় পয়োঃবর্জ্য পরিশোধনের জন্য নেয়া হয় ‘দাসেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প।’ ৩ হাজার ৩১৭ কোটি টাকার এ প্রকল্প ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়ার কথা। কিন্তু কাজের অগ্রগতি একেবারে নগণ্য। 

‘ঢাকা মহানগরীর আগারগাঁও এলাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প’ ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। বরাদ্দ ২৪ কোটি টাকা। কিন্তু অগ্রগতি তেমন নেই।

‘ঢাকা পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পে’ বরাদ্দ ৩ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালে ডিসেম্বর পর্যন্ত এর মেয়াদ। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কোনও অগ্রগতি নেই। কাজের অগ্রগতি না থাকলেও বিল পরিশোধ করা হচ্ছে কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারদের।

এমএএম/এসএমএম

আরও পড়ুন