• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর ক্ষণগণনা

মুজিববর্ষ
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২০, ০৯:৩৮ পিএম
সর্বশেষ আপডেট : জানুয়ারি ২১, ২০২০, ০৯:৫৪ পিএম

আতঙ্কের নাম নবেল করোনা ভাইরাস

এস এম সাব্বির খান
আতঙ্কের নাম নবেল করোনা ভাইরাস

মিডিল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম
............

▪ চীন থেকে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে গোটা এশিয়ায়
▪ বাংলাদেশ ও ভারতে সতর্কতা জারি
▪ লক্ষণ প্রকাশ ২ থেকে ১৪ দিনে

২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে চীনে আলাদা প্রকৃতির একটি প্রাণঘাতি ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছে যার বিস্তার ক্রমেই ব্যাপক আকার ধারণ করছে। মূলত ফুসফুসে বড় ধরনের সংক্রমণ ঘটায় এই ভাইরাস।চীনা কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে নিশ্চিত করেছে, এই ভাইরাস সংক্রমণে মারা গেছেন ৪ জন। আক্রান্ত কমপক্ষে ২০০ জন। যদিও স্বাস্থ্য বিশ্লেষকের ধারণা, আক্রান্তের সংখ্যা দুই হাজারের কাছাকাছি।

বাংলাদেশে প্রথম ব্যক্তি শনাক্ত

বাংলাদেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তির সন্ধান মিলেছে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে। এরপর পরই নজরদারি শুরু হয়েছে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও।

জারি করা হয়েছে সতর্কতা।

বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার সারোয়ার ই জামান দৈনিক জাগরণকে জানান, চীন থেকে আসা যাত্রীদের স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। জ্বর বা কাশি থাকলে পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এজন্য একটি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে।

চীনে ৪ জনের মৃত্যু

চীনের উহানে রহস্যজনক ভাইরাসে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে প্রাণ গেলো চারজনের। আক্রান্ত কমপক্ষে ২১৮ জন। 

মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) ভাইরাসে আক্রান্ত ৮৯ বছরের এক বৃদ্ধ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আক্রান্তের মধ্যে ১৫ চিকিৎসাকর্মী থাকার তথ্য নিশ্চিত করেছে উহান কর্তৃপক্ষ।

গুয়াংডং প্রদেশে, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসটি ছড়ানোর খবর নিশ্চিত করেছে দেশটি।এরই মধ্যে থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ায় ভাইরাসে আক্রান্ত কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভাইরাস মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে।

এ ইস্যুতে জরুরি বৈঠকে বসার কথা জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে বলেন, চীনে করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আমাদের আরও সতর্ক থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এক সাথে কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট নিউমোনিয়া প্রতিরোধকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে চীন।

বুধবার (২২ জানুয়ারি) বেইজিং সময় বিকেলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে জরুরি বৈঠক ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

চীনের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র জানায়, মার্স ভাইরাসের মতো এতে আক্রান্তের শরীরে জ্বর, সর্দি ও কাশি অনুভূত হয়। জ্বরের তীব্রতা বাড়লে দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট। এরপর দেখা দিতে পারে নিউমোনিয়া। ভাইরাসে আক্রান্তের লক্ষণ প্রকাশ পায় ২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে।

ছোঁয়াচে এই রোগটি, চীনের উহানের একটি সামুদ্রিক খাবার বিক্রির বাজার থেকে ছড়িয়ে পড়েছে।

২০ বছর আগে, মার্স ভাইরাসে এশিয়ার কয়েকটি দেশে মৃত্যু হয় ৮শরও বেশি মানুষের।

নাম ও শ্রেণি 

ভাইরাসটিকে এক ধরনের ‘করোনা’ ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এটি একটি কমন ভাইরাস যা নাক, সাইনাস বা গলার উপরিভাগে সংক্রমণ ঘটায়। 

কতটা ভয়ানক এবং দ্রুত ছড়ায় এই ভাইরাস

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, মানুষের আক্রান্ত হবার ঘটনাটি ঘটেছে চীনের উহান শহরে সামুদ্রিক মাছ পাইকারি বিক্রি হয় এমন একটি বাজারে।

করোনা ভাইরাস পরিবারে আছে তবে এ ধরনের ছয়টি ভাইরাস আগে পরিচিত থাকলেও এখন যেটিতে সংক্রমিত হচ্ছে মানুষ সেটি নতুন। বেশিরভাগ করোনা ভাইরাসই বিপজ্জনক নয়, কিন্তু আগে থেকে অপরিচিত এই নতুন ভাইরাসটি ভাইরাল নিউমোনিয়াকে মহামারীর দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে।

কী কী লক্ষণ দেখা যায়

রেসপিরেটরি লক্ষণ ছাড়াও জ্বর, কাঁশি, শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যাই মূলত প্রধান লক্ষণ।

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নতুন করে সার্স ভাইরাসের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ২০০০ সালের শুরুতে প্রধানত এশিয়ার অনেক দেশে ৭৭৪ জনের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।

নতুন ভাইরাসটির জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এটি অনেকটাই সার্স ভাইরাসের মতো।

এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক উলহাউসেনের বক্তব্য, আমরা যখন নতুন কোনও করোনা ভাইরাস দেখি, তখন আমরা জানতে চাই এর লক্ষণগুলো কতটা মারাত্মক। এ ভাইরাসটি অনেকটা ফ্লুর মতো কিন্তু সার্স ভাইরাসের চেয়ে মারাত্মক নয়।

কত দ্রুত ছড়াতে পারে এই ভাইরাস

ডিসেম্বরে উহান শহরে প্রথম এ ভাইরাসটি তার অস্তিত্ব জানান দিয়েছিল এবং এ পর্যন্ত মারা গেছে ৪ জন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের কারণ হলো, লুনার নিউ ইয়ার বা চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে যখন লাখ লাখ মানুষ বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করে, সেই সময়ে নতুন এই ভাইরাসে বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও থাইল্যান্ডও এ নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হবার খবর নিশ্চিত করেছে।

লন্ডনে ইমপেরিয়াল কলেজের এমআরসি সেন্টার ফর গ্লোবাল ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যানালাইসিস এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এরই মধ্যে ১৭০০ মানুষ নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে।

এটি কী মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ হয় 

এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হওয়ার কিছু ঘটনা ঘটেছে।সিঙ্গাপুরের ডিউক-নুস মেডিকেল স্কুলের ওয়াং লিন ফা সম্প্রতি উহান সফরে করে এসেছেন।

তিনি বলেন, মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের লক্ষণগুলোর দিকে তীকক্ষ্ণ দৃষ্টি দেয়া হচ্ছে। চাইনিজ নিউ ইয়ার আসছে। চীনে অন্তত ৪০ কোটি মানুষ এ সময় ভ্রমণ করবে বিভিন্ন জায়গায়। প্রত্যেকেই উদ্বিগ্ন। এটার দিকে ভালো ভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে আমাদের।

নিউমোনিয়া থেকে কিডনি বিকল

আক্রান্ত মানুষদের উপসর্গের ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে, এই ভাইরাসরা হানা দেয় চুপিসাড়ে। শরীরের ভেতর বাড়তে থাকে আড়েবহরে। বিস্ফোরণ ঘটায় আচমকাই। শুরুটা হয় সর্দি-কাশি. জ্বর দিয়ে। শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে। কাবু করে নিউমোনিয়া। অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা দেয় সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম। ভাইরাসের শান্তি হয় না তাতেও। ছড়িয়ে পড়ে গোটা শরীরেই।

ঠেকানোর উপায় 

বিশ্বজুড়ে এটি ছড়িয়ে পড়ার আশংকা নিয়ে হাসপাতালগুলোকে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এরই মধ্যে বেশ কিছু সর্তকতামূলক নিদের্শনা জারি করা হয়েছে সংশ্লিষ মহল থেকে।

● সংক্রমিত ব্যক্তিকে আলাদা করে রেখে চিকিৎসা দিতে হবে। 

● উহান প্রদেশের সেই মাছের বাজার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। 

● অরক্ষিত প্রাণি থেকে সাবধানতার পাশাপাশি ডিম ও মাংস রান্না এবং ঠান্ডা বা ফ্লুতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

● চীনা নববর্ষের সময় যারা ভ্রমণ করবে তাদের শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা আছে কি না সেটি দেখা হবে বা হচ্ছে। 

● উহান থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং শুরু সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ে।

● যুক্তরাষ্ট্রও বড় বিমানবন্দরগুলোতে একই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। 

কেনো আতঙ্ক এই ভাইরাস 

ওয়েলকাম ট্রাস্ট এর ড. জোসি গোল্ডিং বলেন, নতুন করে সংক্রমণের খবর না পাওয়া পর্যন্ত এটা বলা কঠিন যে এ মুহূর্তে আমাদের কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। সার্সের বিষয়টা আমাদের ভালোভাবেই মনে আছে এবং সেজন্যই বেশি ভয় হচ্ছে। কিন্তু এখন আমরা অনেক বেশি প্রস্তুত এ ধরনের রোগের সাথে লড়াই করার জন্য।

নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন বলছেন, আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত এ কারণে যে যে কোনও ভাইরাসই মানুষকে আক্রমণ করতে পারে। একবার মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারলে এটি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ভাইরাসকে সে সুযোগ দেয়া উচিত নয়।

তথ্য সূত্র ও ছবি >> বিবিসি বাংলা, সিএনএন ও দ্য ওয়াল।

এসকে/এসএমএম

আরও পড়ুন